সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

 

তাদেউজ রজেভিচ-এর কয়েকটি কবিতা

মাসুদুজ্জামান | ২৯ জুন ২০১০ ৮:২৯ অপরাহ্ন

বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালের সবচেয়ে প্রভাবশালী পোলিশ কবি তাদেউজ রজেভিচ (জন্ম ১৯২১)। প্রতীক, উপমা, শব্দব্যবহারের অভূতপূর্ব কলাপ্রকৌশলে পোলান্ডের কবিতার তথাকথিত লিরিকময়তাকে একেবারে বদলে দিয়েছেন তিনি। খুবই শক্তিশালী, অন্তর্ভেদী তার দৃষ্টি আর উপস্থাপনা। তিনি বলেছেন, “কবিতার তথাকথিত ছন্দোস্পন্দের বিষয়টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের বন্দিশিবির সৃষ্টির মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে গেছে।” যুদ্ধের বীভৎসতা, নির্যাতন আর যুদ্ধপরবর্তী সময়ের সংকট ও অপ্রাপ্তিকে তিনি তার কবিতার বিষয় করে তুলেছেন। রজেভিচকে মনে করা হয় যুদ্ধোত্তর পোলিশ কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। তবে শুধু কবি নন, তিনি পোলিশ ভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার, সমালোচক ও ছোটগল্পের রচয়িতা।

tadeusz-r2.jpg
তাদেউজ রজেভিচ (Tadeusz Rozewicz; জন্ম. রাদোমস্কো, পোল্যান্ড ৯/১০/১৯২১)

পশ্চিমের অনেক সমালোচক প্রশ্ন তুলেছিলেন, ফ্যাসিবাদী রূঢ় বাস্তবতা আর নির্মমতার পর কী ভালো কবিতা রচনা করা সম্ভব? বিশেষ করে রাজনীতি যেখানে প্রধান ও প্রখর হয়ে ওঠে? রজেভিচ পোলিশ কবিতার ইতিহাসে ‘চতুর্থ সাহিত্য ঘরানা’র সৃষ্টি করে দেখিয়ে দিয়েছেন, রাজনীতি ও নির্মমতার ভেতর থেকেও নিয়ন্ত্রিত শৈলী, পরিমিত শব্দ ব্যবহার, অন্তর্গত অনুভবকে অবলম্বন করে ভালো কবিতা লেখা সম্ভব। কাব্যজীবনের প্রাথমিক পর্বে এই ধরনের কবিতা রচনার মধ্য দিয়েই পোলিশ সাহিত্যভুবনে তার আবির্ভাব ঘটে উদ্বেগ (১৯৪৭) ও লাল দস্তানা (১৯৪৮) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

জীবনের প্রথম দিকে তীব্র সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন রজেভিচ। গেস্টাপো বাহিনী তার বড়ো ভাইকে খুন করে, এই ভাইয়ের স্মৃতি তিনি কখনও ভুলতে পারেননি; নিজেও মৃত্যুর প্রান্ত থেকে ফিরে এসেছিলেন। কবিতায়, গল্পে, এমনকি নানা ধরনের গদ্যে সেই নির্মমতার কথা ঘুরে-ফিরে এসেছে। ফলে সমকালসম্পৃক্ত, আপাত অগভীর কবিতা রচনা করাই ছিল তার জন্যে স্বাভাবিক, কিন্তু তিনি প্রচলিত পথে না হেঁটে রচনা করতে থাকেন অন্তর্গত সংবেদনশীল কবিতা। তারই মাধ্যমে অস্তিত্বের জন্যেই বেঁচে থাকা—পোলিশ কবিতার ধারায় সংযুক্ত হলো এই নতুন সংবেদ। শূন্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম হয়ে উঠলো তার কবিতার মর্মবস্তু। পরবর্তী সময়পর্বে রচিত রাজপুত্রের সঙ্গে কথপোকথন (১৯৬০), অনামা কণ্ঠস্বর (১৯৬১), একটি মুখ (১৯৬৪) তৃতীয় মুখ (১৯৬৮) ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে এই বিষয়টিই প্রধান হয়ে উঠেছে।

রজেভিচের সময়ে আভাঁগার্দধর্মী কবিতার ধারাটি পোলান্ডে বেশ শক্তিশালী ছিল। এই ধরনের কবিতায় সরাসরি উপমা, বাক্প্রতিমা, শব্দের ব্যবহার ঘটতো। রজেভিচ সেই পথে না হেঁটে রচনা করেছেন মানব অস্তিত্বের স্মারক হয়ে উঠতে পারে এমন সব কবিতা, যা তার কথায় হয়ে উঠেছে জন্মের কার্যকারণ আর মৃত্যুর কার্যকারণে পরম্পরিত জীবনবেদ। কবিতায় এই জীবনের কথা সবটা বলা সম্ভব নয় ভেবে এই সময় তিনি গড়ে তোলেন ‘মুক্তমঞ্চ’, লিখে ফেলেন বেশ কিছু নাটক—কার্ডে লিপিবদ্ধ নির্ঘণ্ট (১৯৬৮), উপবিষ্ট অপেক্ষমান বৃদ্ধা (১৯৬৯), সেই চারজনকে নিয়ে (১৯৭২) ইত্যাদি।

সমালোচকদের মতে তার কানটি প্রখর, অর্থাৎ তার শ্রবণদক্ষতা ও তজ্জনিত প্রতিক্রিয়া চোখে পড়ার মতো। সমকালের নন্দনরীতি সম্পর্কে তিনি যেমন ছিলেন সচেতন, তেমনি সৃষ্টিশীলতার কোন নতুন রাস্তায় তাকে হাঁটতে হবে, সেটাও তিনি বেশ ভালোই জানতেন। নারীবাদ ও উত্তর-আধুনিকতার দ্বারা স্পৃষ্ট হয়ে এভাবেই তিনি রচনা করেন কাব্যগ্রন্থ শ্বেতবিবাহ (১৯৭৫)।

রজেভিচ এখন আর আগের মতো সৃষ্টিশলিতায় সক্রিয় নেই, তবে তিনি লিখে চলেছেন তার কবিজীবননির্ভর আত্মজীবনী। কবিতা ও জীবন যে একাকার হয়ে থাকে, সেটাই হচ্ছে এই আত্মজীবনীর মূল বিষয়। রজেভিচ এমন এক কবি যিনি কবিতার সংজ্ঞাকে অগ্রাহ্য আর প্রবলভাবে প্রতিরোধ করেছেন। কবিতার যত ধরনের তথাকথিত ফাঁদ আছে, তার সবগুলো তিনি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। তাকে তাই বলা হয় নৈঃশব্দ্যের কবি, সংবেদনার কবি। অনেকে তাকে ‘প্রায়-মিস্টিক’ কবি বলেও আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ধ্রুপদী আভাঁগার্দ কবি হিসেবেও পরিচিত, উত্তর-আধুনিক কবির শিরোপাও জুটেছে তার।

যেভাবেই আখ্যায়িত করা হোক না কেন, রজেভিচের স্বর ও কাব্যশৈলী সরল কিন্তু স্নায়ুক্ষয়ী, সন্ত্রাস আর শূন্যতাকে তিনি ধরতে পারেন সহজেই। তিনি বলেছেন, আমার লক্ষ্য “পদ্য লেখা নয় ঘটনার বিবরণ দেয়া।” কিন্তু দেখা গেছে এই ঘটনার বিবরণই হয়ে উঠেছে এক-একটি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অভূতপূর্ব কবিতা। তার শেষের দিকের লেখায় মানবজীবনের দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ, হতাশা, আনন্দ, বেদনার ছবি বেশ স্পষ্ট। কবিতায় নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী আরেক পোলিশ কবি চেশোয়াভ মিউশ তাকে এসব কারণে চিহ্নিত করেছেন নৈরাজ্যের কবি বলে, “রজেভিচ হচ্ছেন নৈরাজ্যের কবি যিনি নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতাকে বিন্যস্ত করে কবিতা লিখতে ভালোবাসেন।”

এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১৪। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় তার কবিতা অনূদিত হয়েছে। এখানে অনূদিত কবিতাগুলোর উৎস বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং জে. ডি. ম্যাকক্লাচির সম্পাদিত দ্য ভিনটেজ বুক অফ কনটেমপোর‌্যারি ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি (১৯৯৬)।

অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান

 

কবি কে

তিনিই কবি যিনি কবিতা লেখেন
আবার তিনিও কবি যিনি পদ্যটদ্য লেখেন না।

তিনিই আসলে কবি যিনি পায়ের বেড়ি খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেন
আবার তিনিও কবি যিনি এই শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে ভালোবাসেন

কবিকে আসলে বিশ্বাসী হতে হয়
তিনিও কবি যার কোনো কিছুতে বিশ্বাস নেই

কবি আসলে এমন মানুষ যাকে মিথ্যে কথা বলতে হয়
আবার তিনিও কবি যাকে বলা হয়েছে অনেক মিথ্যে কথা

তিনিই হলেন কবি যিনি টাল খেয়ে ভেঙে পড়েন
আবার তিনিও কবি যিনি উদ্ধত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ান

কবি তিনিই যাকে সবকিছু ছেড়েছুড়ে ফেলে দিতে হয়
আবার তিনিও কবি যিনি কোনো কিছুই ছেড়ে চলে যান না। (সম্পূর্ণ…)

15

জাপানি কবিতা

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ | ১২ জুন ২০১০ ৫:৩৭ অপরাহ্ন

pine_trees.jpg
পাইন গাছ, হাসেগাওয়া তোহাকু, ১৫৯৩

সম্রাট্ গোতোবা (১১৮০-১২৩৯)

তানকা

যখন তাকাই, দূর
ধোঁয়াশে পাহাড়ি ঢাল,
মিনোসে নদী—
কেন ভাবি, হেমন্তেই
সন্ধ্যারা সুন্দর?
 

বাশো মাৎসুয়ো (১৬৪৪-১৬৯৪)

হাইকু


পুরাতন দিঘি
হঠাৎ একটা ব্যাঙের ঝাঁপ,
জলীয় আওয়াজ।


বসন্ত-বৃষ্টির
জল জমিয়ে সুন্দরী
মোগামি নদী।


আকাশে রাকা
নোতুন চাঁদ, মাটিতে ম্লান
শুভ্র যবের শিষ।


ফুজি-র সুবাতাস
একটা পাখায় ভ’রে দিই।
এ-ই, এদো-র স্মারক।

(এদো: তোকিয়োর প্রাচীন নাম)


ঘোড়ার পিঠে ঘুম,
দূর চাঁদ স্বপ্নের প্রলম্বন,
গরম চা-র ধোঁয়া।


বসন্ত পালায়।
পাখিদের কান্নায়, যত
মাছের চোখে জল।


কী যে সৌভাগ্য!
দক্ষিণের উপত্যকায়
সুগন্ধ তুষার! (সম্পূর্ণ…)

15

ধম্মপদ, ক’এক টুকরো

গৌতম চৌধুরী | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ৩:৪৬ অপরাহ্ন

শল্যশাস্ত্র না জেনে ডাক্তারের ছুরি-কাঁচি নিয়ে খুব একচোট নাচানাচি করলে ব্যাপারটা যা দাঁড়ায়, তেমন একটা বালখিল্যতাই করা গেল ধম্মপদ-এর এই শ্লোকগুলো নিয়ে। হাতে এসেছিল ১৩৬০ বঙ্গাব্দে লেখা আচার্য প্রবোধচন্দ্র সেনের একটি চটি বইধম্মপদ-পরিচয়। বইটির শেষে প্রবোধচন্দ্র ধম্মপদের প্রায় ৭০টি পদের মূল এবং বাংলা গদ্যানুবাদ উৎকলিত করেছেন। তাঁর সেই গদ্যানুবাদগুলিই ছিল আমার আশ্রয়। সেগুলি অবলম্বন করেই, পালিভাষার ‘প’ না জেনেও হঠকারীর মতো কয়েকটি পদের পদ্যরূপ দিতে প্রলুব্ধ হলাম।

এই আকর্ষণের মূল কারণ হল, এই পদগুলির দার্শনিক কচকচিহীন সওয়াল। কোনও পারলৌকিক মোক্ষের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন এই পদগুলি সরাসরি আবেদন জানিয়েছে ব্যক্তিমানুষের ইহলৌকিক জীবনাচরণের কাছে। ব্যক্তিস্বরূপের বিনির্মাণের সেই আহ্বান এই অস্ত্রশাসিত পৃথিবীতে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বলে অনায়াসেই রায় দিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবু, ব্যক্তিক স্তরে তার প্রয়োগ কষ্টকর হলেও, আজও অবান্তর হয়ে যায়নি বলে মনে হ’ল। এই অনুভবটুকুই আমার এই সামান্য চর্চার প্রাপ্তি।

প্রাত্যহিকের ভাষার স্থূল অবলেপ দিয়ে হয়ত অনেক জায়গাতেই মূলের গাম্ভীর্যকে ব্যাহত করেছি। তবে জ্ঞানত, কোনও বাচনকে বিপরীতগামী করে তোলার স্বাধীনতা নিইনি। - অনুবাদক

gc111.jpg

অনুবাদ: গৌতম চৌধুরী

উৎসর্গ: ব্রাত্য রাইসু, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, সৌম্য দাশগুপ্ত

১.

বুলি কপচাও বহু সংহিতা ঘেঁটে
ওরে প্রমত্ত, আচরণে স্রেফ ফাঁকি
পাবে না পাবে না পাবে না শ্রমণতা

গরু গোনে যারা পরের গোয়ালে হেঁটে
দুধের সোয়াদ যোগাবে সে-বিদ্যা কি
পাবে না পাবে না পাবে না শ্রমণতা

যমকবগ্‌গো, ১৯।১৯

২.

দমে উদ্যমে
সংযমে অপ্রমাদে
মেধাবী রচেন দ্বীপ
কে তাকে ভাসাবে?
ধায় জল কলনাদে,
অধরা অন্তরীপ!

অপ্পমাদবগ্‌গো, ৫।২৫

৩.

বিদ্বেষকারী
যত ক্ষতি করে
যত ক্ষতি করেবৈরী
মিথ্যায় ভরা
মনটিতে তোর
আরও ক্ষতি আছে তৈরি

চিত্তবগ্‌গো, ১০।৪২

৪.

সুভাষিতের ভাষণ শুধু বাজে
যদি না কেউ ভরিয়ে তোলে কাজে
যেমন রূপ-রঙের ছলাকলায়
সুরভিহীন ফুলটি নিষ্ফলা

পুপ্‌ফবগ্‌গো, ৮।৫১ (সম্পূর্ণ…)

15

স্টিফেন ডান-এর দুটি কবিতা

শামস আল মমীন | ৩ জুলাই ২০০৯ ১১:২০ অপরাহ্ন

[স্টিফেন ডান কবিতার বই ডিফারেন্ট আওয়ারস (২০০০)-এর জন্য পুলিৎজার পুরস্কার পান ২০০১ সালে। বিশ বৎসর বয়সে কর্পোরেট চাকুরিতে ক্রমাগত ভালো করতে থাকায় ভয় পেয়ে চাকুরি ছেড়ে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন তিনি। এরপর কবি সস্ত্রীক এক dunn1.jpg
……..
স্টিফেন ডান (Stephen Dunn, জন্ম. কুইনস, নিউ ইয়র্ক, ১৯৩৯)
……..
বৎসরের জন্য স্পেনযাত্রা করেন। সেখানে উপন্যাস লিখবার চেষ্টা কবিতা রচনায় মোড় নেয়। এ সময়ে কবির সে সময়কার একমাত্র সাহিত্যিক বন্ধু স্যাম টোপারফ তাঁর কাছে বেড়াতে আসেন। তিনি পরামর্শ দেন কবিতা ঠিক পথে এগুচ্ছে। স্টিফেন ডান এরপর পুরোপুরি কবিতায় মন দেন। বিভিন্ন কলেজে কবিতা এবং ক্রিয়েটিভ রাইটিং-এর শিক্ষক, সম্পাদক তিনি। পেশাদার বাস্কেটবল খেলোয়াড় ছিলেন।

কীভাবে কবিতা লেখেন সে ব্যাপারে বলতে গিয়ে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কবিতা যখন শুরু করেন তখন কোনো নির্দিষ্ট ডিজাইন থাকে না তাঁর। কখনো কোনো ছবি থেকে কখনো কোনো আইডিয়া দিয়ে অগ্রসর হন তিনি। এবং তাঁর স্বভাব হলো যা তিনি বলতে চান তা বলা থেকে বিরত থাকেন। ফলে তাঁর কবিতার আগানোটি এক অর্থে নানান বাদ দেওয়ার সমাহার যেখানে তিনি হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিলেন।]

অনুবাদ: শামস আল মমীন

বাড়িতে নিয়মিত যা যা করি

মা যখন মারা গেল
ভেবেছিলাম: এবার একটা মৃত্যুর কবিতা লেখা হবে।
ওটা ক্ষমার অযোগ্য

তবুও নিজেকে ক্ষমা চোখে দেখি
মায়েদের ভালবাসা পেয়ে
ছেলেরা যেমন করতে পারে।

তাঁর কফিনে স্থির চেয়ে থাকি
যদিও জানি কতকাল এই শুয়ে থাকা,
কত জীবনের সুখ স্মৃতি

মগজের কোষে।
ঠিক বলা মুশকিল
কী ভাবে আমরা বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠি,

কিন্তু মনে আছে আমার, মাত্র
বারো আমি, ১৯৫১, পৃথিবী তখনো
আমার কাছে অপরিচিত।

আমি মার কাছে (ভয়ে ভয়ে)
তার স্তন দেখার আবদার করি
কোনো দ্বিধা কিম্বা লজ্জা ছাড়াই
মা আমাকে তার কামরায় নিয়ে যায়
আমি স্থির তাকাই ওদের দিকে,
সাহস হয়নি আর কিছু জিগ্যেস করি।

আজ, এতদিন পর, একজন বলে
কর্কট রাশির জাতকেরা মায়ের আশির্বাদ না পেলে
অভিশপ্ত হয়, কিন্তু আমি, কর্কটরাশি হয়েও,

নিজেকে আবার ভাগ্যবান মনে করি। (সম্পূর্ণ…)

15

সংযোজন

আরবি কবিতা

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ | ১ জানুয়ারি ২০০৯ ৬:০৪ অপরাহ্ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রথম কি দ্বিতীয় বর্ষে আমি যখন, আমাদের ইংরেজি বিভাগের এক সিনিয়র ভাই ইকবাল শাইলোর একখানা অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ করেন, সপ্ত ঝুলন্ত গীতিকায় রোমান্টিসিজম। ঐ বইটি পড়বার আগে nostalzia-khaled-al-saai.jpg
…….
নস্টালজিয়া, ক্যানভাসে অ্যাক্রেলিক, ২০০৭; শিল্পী: খালেদ আল-সাই (জন্ম. সিরিয়া ১৯৭০)
……..
প্রাক্-ইসলামিক তো বটেই, কোনোরূপ আরবি কবিতারই বিষয়ে আমার কিঞ্চিন্মাত্র জ্ঞান ছিল না। ঐ বইয়েরই কল্যাণে জানতে পারলাম যে ইসলামের অধিষ্ঠানের পূর্বে কাবা শরিফে এক বাৎসরিক মেলা বসত, যাতে কবিতা প্রতিযোগিতাও হ’ত, এবং নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ সাতটি কবিতাকে পরের বছরের মেলা পর্যন্ত কাবা-গাত্রে ঝুলিয়ে রাখা হ’ত (যার থেকে সপ্ত “ঝুলন্ত” কবিতা)। ইসলামের আগমনে, বলা বাহুল্য, এই প্রথা বিলুপ্ত হয়, এবং ঐ বাৎসরিক কাবা-গমনও ইসলামি হজ-এ রূপ নেয়। তারপর বেশ কিছুকাল, যাকে বলে সেকুলার সাহিত্য থ মেরে থাকে। কিন্তু যেই-না মক্কা-মদিনার তাঁবু থেকে বাগদাদ-দামেস্কের দরবারে ইসলামের কেন্দ্র স’রে যাওয়া, অমনি আবার আরবি কবিতার উৎসমুখ খুলে যায়, এবং নানা ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও, সেই ফোয়ারা আজও বারিবর্ষণক্লান্ত হয় নি।

lion.jpg……
ক্যালিগ্রাফিক সিংহ, ইসলামের চতুর্থ খলিফা ইমাম আলী ইবনে আবু তালিবের শক্তির প্রতীক
………
“আরব” কথাটা কানে এলেই আমাদের মরম দখল ক’রে বসে মরুবালু, খেজুরগাছ, উট আর বেদুইন। আমরা বেমালুম ভুলে যাই যে আরব জাহানের সিংহভাগ বাসিন্দা প্রথমাবধি ছিলেন নগরবাসী, এমনকি বিশ্বের প্রাচীনতম নগরসভ্যতাগুলির council-of-the-king-of-the.jpg……
কাকরাজার সভা, সংস্কৃত পঞ্চতন্ত্রের অরবী অনুবাদকালিলাহ্‌ ওয়া-দিমনাহ্‌(Kalilah wa-Dimnah) (১২১০)-র অলংকরণ।
……..
জাতক — যাদের হাতে শুধু যে নগর নির্মাণের সূচনা ঘটেছিল তা-ই নয়, ঘটেছিল নানা শিল্পমাধ্যমেরও বিকাশ (ভারত [সিন্ধু/হরপ্পা], চীন, তুরস্ক [হিত্তি/মিতান্নি], মিসর, আমেরিকার সভ্যতাগুলিও হরেদরে একই সময়ে বিকশিত হ’লেও, সেসব সভ্যতার প্রাচীনতম পর্যায়গুলোর থেকে নিছক কবিতার নিদর্শন বড় বেশি পাওয়া যায় নি)। অপিচ স্মরণ করুন যে আরবি গীতিকবিতা একদা য়ুরোপিয় গীতিকবিতার নবজন্মকেও সম্ভব করেছিল একদিন: হিস্পানি মুরদের দ্বারা, ত্রুবাদুরদের, মিনেস্যেঙ্গারদের পথিকৃৎ-রূপে।

আধুনিক আরবি কবিতাও — যা প্রধানতঃ পাশ্চাত্ত্য নিপীড়নের এক শৈল্পিক প্রতিবাদরূপে বিংশ শতকের প্রথম পাদে বিকশিত হ’তে শুরু করে — মরু-আরব নয়, বরং বাগদাদ দামেস্ক বৈরুত জেরুসালেম কায়রোরই অবদান, আর এর বিষয়ে আমাকে প্রথম অবহিত করেছিলেন আমার দুই কবি-বন্ধু সৈয়দ তারিক এবং সাজ্জাদ শরিফ। সাজ্জাদেরই অনুবাদে সম্ভবতঃ, আদনিসের কবিতা আমি প্রথম পড়েছিলাম।

musicians-persian-654-12.jpg
মিউজিশিয়ানস, পারস্য, ৬৫৪-১২৫৬

লাতিন আমেরিকার কবিতার সঙ্গে আধুনিক আরবি কবিতার একটা বিশেষ মিল আমার নজরে পড়ে। উভয়েরই প্রধান প্রণোদনা রাজনৈতিক — এবং, তা-সত্ত্বেও, তারা অধিকাংশ সময়েই, বাংলাদেশের (ধরা যাক) সত্তরের গরিষ্ঠাংশ কবিতার মতো, চিৎকারসর্বস্ব স্লোগানের ভুসিমালে পর্যবসিত হয় নি। আরবের চামড়ার নীচে তেল নয়, কবিতা প্রবাহিত হয় — এমন কথা কবি নিজার কাব্বানি বলেছিলেন একদা, কবি-বন্ধু রাজু আলাউদ্দিন-এর একটা অনুবাদে দেখেছিলাম যেন। আমি পরে যত পড়েছি আরবি কবিতা, তত এই কথাকে সত্য হ’য়ে উঠতে দেখেছি আমার সংবেদনে। এমনিতে বিশুদ্ধ রাজনৈতিক কবিতার, কবিতা হ’য়ে ওঠাটা প্রায় একটা ডিঙি নৌকায় ক’রে বসফরাস পেরোনোর শামিল… ট্র্যাপিজের মতো প্রায়, একচুল বাঁয়ে হেললে গলাবাজি, আর ডানে হেললে শিল্পবিলাস। কত শত শতাব্দীর অত্যন্তপরিচয় কবিতার সঙ্গে থাকলে এই বিপজ্জনক দড়ির উপর দিয়ে নাচতে-নাচতে বৈতরণি ত’রে যাওয়া যায় তা আমরা অনুমানই করতে পারি শুধু আদনিস বা দারবিশ বা, পক্ষান্তরে, নেরুদার কবিতাকে চোখের সামনে রেখে।

কিন্তু আমার অনুবাদগুলোর থেকে কী পাবেন পাঠক? বলা হয়, কবিতার অনুবাদে যা হারিয়ে যায়, তা-ই কবিতা। আর তা যদি হয় অনুবাদের অনুবাদ? অলমতি বিস্তরেণ।

পুনশ্চ: বন্ধু জুয়েল মাজহার আমাকে নাম-ভুলে-যাওয়া সিনিয়র ভাইয়ের নাম আর বইটার পুরো নাম স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন পরে। তাঁকে অশেষ কৃতজ্ঞতা।

the-phoenix-by-manafi-al-h.jpg
ফিনিক্স, মানাফি আল-হায়াওয়ান, পারস্য, ১৩ শতক

আবু আল-শামাক্‌মাক্‌ (?-৭৯৬)

যদি আমি…

যদি আমি জাহাজ ভাসাই দরিয়ায়
শুকায় ফেনারা যত, ঢেউ জ’মে যায়।

যদি হাতে রেখে দেখি দ্যুতিমান্ মণি
মণিখানি কাচ হয়ে যায় যে তখনই।

যদি পান করি মিঠা ফোরাতের জল,
আমার মুখের মধ্যে লবণ কেবল।

আল্লা আর মালিকের প্রতি আর্জি মম:
আমার বাজেরা ওড়ে মুরগির সম।

আব্বাস ইব্‌ন্‌ আল-আহ্‌নাফ (৭৫০-৮০৯)

নির্‌-‌জনতা

আব্বাস, তোমার জামা আমি যেন হই
বা আমার জামা তুমি, সখা!
অথবা আমরা যেন একই পাত্রে রই
তুমি মদ, আমি জল তথা।
কিংবা হ’য়ে একজোড়া চখি আর চখা
মরুভূতে খুঁজি নির্জনতা –
নির্‌-‌জনতা।

(ইরাক)
(সম্পূর্ণ…)

15

মাহমুদ দারবিশের তিনটি কবিতা

‘নির্বাসন ছাড়া আমি কে?’, ‘পাসপোর্ট’, ‘রিতা আর রাইফেল’

অবনি অনার্য | ২৬ আগস্ট ২০০৮ ১১:৫৮ অপরাহ্ন

নির্বাসন ছাড়া আমি কে?

তীরবর্তী পথিক, নদীর মতোই… জল দিয়ে বাঁধা হলো তোমার নামের সাথে। আমার মুক্তদূরত্ব থেকে কোনো কিছুই আর ফিরিয়ে নিয়ে যাবে না আমার পাম গাছের কাছে — না শান্তি, না যুদ্ধ। কোনো কিছুই আর আমাকে টেস্টামেন্টের বইগুলোতে উৎকীর্ণ করবে না। কিছুই না, ভাটাপড়া তীর আলোকপ্রভ করবার মতো কিছুই আর নেই, টাইগ্রিস আর নিল নদীর মধ্য দিয়ে কিছুই আর প্রবাহিত হয় না। ফারাওদের সুপ্রাচীন রথ থেকে আমাকে আর কেউ নামিয়ে দেয় না। খানিক সময় দেবার মতো কেউ আর নেই, বিশ্বাসে অটল থাকবার অবকাশও কেউ দেয় না — না অঙ্গীকার, না নস্টালজিয়া। আমার এখন কী করা উচিত? নির্বাসনে যাওয়া ছাড়া আমার আর কী করবার আছে, সারারাত জলের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছাড়া কী করতে পারি আমি?
জল দিয়ে
বাঁধা হলো
তোমার নামের সাথে…
আমার স্বপ্নের প্রজাপতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে বর্তমানে নিয়ে আসবার মতো কিছু নেই — না মাটি না আগুন। সামারকান্দের গোলাপ ছাড়া আমি আর কী করতে পারি? চন্দ্রাকৃতির পাথর দিয়ে বংশী পলিশ করা স্কয়ারে আমি কী করতে পারি? আমরা উভয়েই কত ভারহীন হয়ে গেছি, যেমন দূরবর্তী বাতাসে আমাদের বাড়িগুলো হয়ে গেছে প্রায়-ভরহীন। মেঘেদের অদ্ভুৎসব সৃষ্টির সঙ্গে বন্ধুতা হয়ে গেছে আমাদের উভয়ের; আত্মপরিচয়ের ভূমির মাধ্যাকর্ষণ শক্তির নাগালের বাইরে। এখন আমরা কী করতে পারি… নির্বাসন ছাড়া আমাদের আর কী করার আছে, সুদীর্ঘ রাত জলের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া কী করতে পারি আমরা?
জল দিয়ে
বাঁধা হলো
তোমার নামের সাথে…
তোমার জন্য আছি কেবল আমি, আমার জন্য শুধু তুমি… প্রেমিকের ঊরুতে চুমু খায় এক অচেনা পথিক: শোনো হে পথিক! এই সুনসান নীরবতায় আমাদের জন্য যা রাখা আছে, তা দিয়ে কী করতে পারি আমরা, মধ্যদুপুরের যে-ঘুম এক কীংবদন্তী থেকে অন্য কোনো কীংবদন্তীকে বিচ্ছিন্ন করে, তাকে নিয়ে কী করার আছে আমাদের? আমাদেরকে নিয়ে যাবার মতো কেউ নেই — না পথ, না বাড়ি। শুরু থেকেই এই পথ একই আছে তো, নাকি পাহাড়ের উপর মোঙ্গলদের অর্শ্ববহরের মধ্যে ঘোটকীর সন্ধান পেয়ে গেছে আমাদের স্বপ্নগুলো, আর আমাদের বিকিয়ে দিয়েছে? তাহলে আমাদের কী আছে করার?
জল দিয়ে
বাঁধা হলো
তোমার নামের সাথে…
(সম্পূর্ণ…)

15

মাহমুদ দারবিশের কবিতা

‘বিস্মৃতির স্মৃতি’

অজয় দাশগুপ্ত | ১৬ আগস্ট ২০০৮ ১:১২ পূর্বাহ্ন

১৯৮২ সালে ইজরায়েল যখন লেবাননে আক্রমণ হানে, তখন বেইরুটে নির্বাসিতের জীবন কাটাচ্ছিলেন মাহমুদ দারবিশ। ইজরায়েলি বিমান থেকে এক সন্ধ্যায় বেইরুটে কয়েক পশলা বোমাবর্ষণের পর দারবিশের কলম থেকে বেরিয়ে আসে এই কবিতাটি।

বিস্মৃতির স্মৃতি

এই সেই রাস্তা,
আর এখন ঘড়িতে সন্ধ্যা ৭টা।
দিগন্ত যেন ইস্পাত বলয়।
আমার নিষ্পাপ আবেগের কথা
আমি এখন কাকে বলবো?…
এই রাস্তায় এমন আস্তে হাঁটছি
যেন একটা জেট বিমানও
আমাকে বোমার লক্ষ্য হিসাবে ভুল না করে।
শূন্যতা তার করাল বিস্তৃত করেছে,
কিন্তু তাও আমাকে গ্রাস করলো না।
লক্ষ্যহীনভাবে এগিয়ে চলেছি,
যেন এই রাস্তাগুলোকে আমি
প্রথমবার চেনার চেষ্টা করছি
এবং শেষবারের মতো হেঁটে চলেছি।

অনুবাদ: অজয় দাশগুপ্ত

গড়িয়া, কলকাতা

ajoy_dasgupta@hotmail.com

15

মাহমুদ দারবিশের দীর্ঘ কবিতা

‘অবরোধের কালে’

বদরে মুনীর | ১৫ আগস্ট ২০০৮ ৪:৩৮ অপরাহ্ন

boy-paestine.jpg
ঢিল ছুড়তে গিয়ে ইজরাইলি সেনাদের হাতে ধরা পড়েছে প্যালেস্টাইনি বালক

এখানে, এই পাহাড়ের ঢালে, সন্ধ্যা আর সময়ের কামানের সামনে
ভাঙাচোরা ছায়ার বাগান পাশে রেখে,
আমরা তা-ই করি যা বন্দিদের করণীয়,
আর যা করে বেকারেরা;
আশার আবাদ করি।

একটা দেশ প্রস্তুত হচ্ছে প্রত্যূষের জন্য। আমরা এগোচ্ছি সহজ সরলতায়
কেননা নিকট থেকে দেখতে পাচ্ছি বিজয়ের ক্ষণ:
বোমা বর্ষণের আলোয় জ্বলে না আমাদের কোনও রাত্রি,
শত্রুরা সতর্ক; আমাদের জন্য আলো জ্বালে
কারা প্রকোষ্ঠের অন্ধকারে।

এখানে কোথাও কোনও “আমি” নাই।
এখানে আদম স্মরণ করছে তার কাদার কণিকা।

মৃত্যুর কিনার থেকে আদম বলেন:
হারানোর মতো আর কোনও অবশেষ নাই আমার:
আমি মুক্ত; অবকাশের প্রায় কাছাকাছি।
নিজেরই হাতের মুঠে সমাহিত আমার ভবিষ্যৎ।
শীঘ্রই দেখব আমি আমার জীবন,
জন্ম নেবো মুক্ত, আর পিতামাতাহীন,
এবং যেমন আমার নাম, আমি বেছে নেবো মহানীল অক্ষরসমূহ…

তোমরা যারা দরজায় দাঁড়িয়ে আছো, ভেতরে আসো,
আমাদের সাথে পান করো আরবের কফি
তখন বুঝবে তোমরাও মানুষ আমাদেরই মতো
বাড়ির দোরগোড়ায় যারা দাঁড়িয়ে আছো
আমাদের সকাল থেকে বার হয়ে আসো
আমরা নিশ্চিত হবো তোমাদের মতো আমরাও মানুষ। (সম্পূর্ণ…)

15

মাহমুদ দারবিশের তিনটি কবিতা

‘পরিচয়পত্র’, ‘ও আমার পিতা, ইউসুফ আমি’ এবং ‘আমার মা’

জুয়েল মাজহার | ১৫ আগস্ট ২০০৮ ৩:৪২ অপরাহ্ন

palestine-1.jpg
বিলাপরত প্যালেস্টাইনি ও ইজরাইলের নিরাপত্তারক্ষী

পরিচয়পত্র

লিখে রাখো!
আমি একজন আরব
এবং আমার পরিচয়পত্রের নম্বর ৫০ হাজার
আমার ৮ টি সন্তান
আর নবমটি পৃথিবীতে আসবে গ্রীষ্মকালের পর
তোমরা কি ক্ষুব্ধ হবে তাতে?

লিখে রাখো!
আমি একজন আরব
কোয়ারিতে সহ-শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করছি আমি
আট সন্তানের বাবা আমি
আমি ওদের এনে দিই রুটি
পোশাক আর বই
এনে দিই পাথর থেকে..

মাগি না ভিক্ষা আমি তোমার দুয়ারে
তোমার কক্ষের দোরগোড়ায় নিজেরে করি না আমি ছোটো
তুমি কি করবে রাগ আমার ওপর?

লিখে রাখো
আমি একজন আরব
আমার একটি নাম আছে পদবিবিহীন
যেদেশে লোকেরা ক্ষুব্ধ
সেই দেশে আমি এক সহিষ্ণু মানুষ (সম্পূর্ণ…)

15

মাহ্‌মুদ দারবিশের একটি কবিতা

আমি গণহত্যা দেখেছি

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ | ১০ আগস্ট ২০০৮ ৫:১৭ অপরাহ্ন

৯ আগস্ট ২০০৮ তারিখে আমেরিকার টেক্সাসে মারা গেলেন প্যালেস্টাইনের কবি মাহ্‌মুদ দারবিশ। ৩০টির বেশি কবিতার আর ৮টি গদ্য গ্রন্থের প্রণেতা এই কবি তাঁর গভীর প্যালেস্টাইন প্রীতির জন্য বিখ্যাত। দারবিশ আরবি ভাষায় লেখালেখি করলেও ইংরেজি, হিব্রু ও ফরাসি ভাষায় বাক্যালাপের দক্ষতা তাঁর ছিল। দারবিশের অনেক কবিতা থেকে গান তৈরি হয়েছে। মৃত্যুর আগে দারবিশ প্যালেস্টাইনে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে গেছেন।

mahmud-darwish.jpg
মাহ্‌মুদ দারবিশ (Mahmoud Darwish, ১৩/৩/১৯৪১ — ৯/৮/২০০৮)

আমি গণহত্যা দেখেছি

আমি গণহত্যা দেখেছি, একখানা
মানচিত্র মেরেছে আমাকে
সরল কথার আমি ছানা
দেখেছি কাঁকর-খোয়া উড়তে ঝাঁকে-ঝাঁকে
দেখেছি নীহারকণা বোমার মতন ঝ’রে পড়তে
মুখের উপরে হায় আমার মনের দরজা বন্ধ করল ওরা
কার্ফিউ কায়েম করল, ব্যারিকেডে রাস্তা ভরল ওরা
আমার হৃদয় বদ্‌লে গেল সরু একটা গলিতে
বদ্‌লে গেল পাঁজর পাথরে
আর, কার্নেশন ফুটল থরে-থরে
আর, কার্নেশন ফুটল থরে-থরে

অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

AG210022@ncr.com

15

ভ্ল­াদিমির মায়াকভস্কি ও আন্দ্রেই ভজ্‌নেসেন্‌স্কির দুটি কবিতা

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ | ২০ জুন ২০০৮ ৫:০৮ অপরাহ্ন

অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

majakovskijface.jpg
ভ­াদিমির মায়াকভস্কি (জন্ম. বাঘদাতি, জর্জিয়া ১৯/৭/১৮৯৩ — ১৪/৫/১৯৩০)

১.

ভিন্নরুচির্হিঃ লোকাঃ

ভ্ল­াদিমির মায়াকভস্কি

ঘোড়াটি
দেখে উটটিকে
নিজস্ব কর্কশ অট্টহাস্যে লুটোপুটি
ফেটে প’ড়ে বলে, “মন,
চেয়ে দ্যাখ্,
ঘোড়াত্বের কী-সাঙ্ঘাতিক এ-
অতিরঞ্জন!”

বিরক্ত উটটি তখন:
“তুই — ঘোড়া!
নাহ্!
তুই তো অপরিণত এক
উটই।”

শুধু বিধাতাই,
সর্বজ্ঞ যে-জন,
জানত, ওরা
স্তন্যপায়ী
দু’টি
ভিন্ন ঘরানার।
(সম্পূর্ণ…)

15

ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকার কবিতা

ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের জন্য বিলাপ

জুয়েল মাজহার | ৩০ মে ২০০৮ ৪:২৪ অপরাহ্ন

lor.jpg
ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের কবরে স্থাপত্য

মূল: ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকা

ভূমিকা ও অনুবাদ: জুয়েল মাজহার

ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের জন্য বিলাপ
(Llanto Por Ignacio Sanchez Mejias)

১. জখম ও মৃত্যু
(La Cogida y la Muerte)

ঘড়িতে তখন বিকেল পাঁচটা।
কাঁটায় কাঁটায় বিকেল পাঁচটা।
এনেছে ছেলেটা শাদা এক থান
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
রয়েছে সাজানো লেবুর ঝুড়ি একখানা
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
বাকিটা মৃত্যু এবং কেবলই মৃত্যু সে।

বাতাস উড়িয়ে নিয়েছে উল কার্পাসের
যখন ঘড়িতে বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
আর অক্সাইড-গুঁড়ো-ছিটানো
উড়লো কাচ আর নিকেল
ঘড়িতে যখন বাজলো বিকেল পাঁচটা।
লড়াইয়ে এখন মেতেছে ঘুঘু ও চিতাবাঘে
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
গুঁতোগুঁতি করে ঊরুতে একটি একাকী শিঙ
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
আর উদারায় বাজলো তার
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
বিষের ঘণ্টা বাজলো আর উঠলো ধোঁয়া
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
কোনায় কোনায় জমাট নীরবতা
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
আর এলো ওই তুঙ্গ-হৃদয় একাকী ষাঁড়!
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
বরফ তখন অতিরিক্ত ঝরালো ঘাম
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা,
ষাঁড়-লড়াইয়ের বৃত্ত যখন আয়োডিনে ছয়লাপ
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
জখমের ’পর মৃত্যু তার পাড়লো ডিম
বিকেল পাঁচটায়।
বিকেল পাঁচটায়।
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা ।

চাকায় বসানো শবাধার এক শয্যা তার
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
কানে বাজে ওই বাঁশি ও হাড়ের অনুরণন
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
এখন তার কপাল ফুঁড়ে হাম্বা হাম্বা ডাকছে ষাঁড়
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
সারা ঘর করে যাতনায় ঝিলমিল
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
পচা-ক্ষত এক আসছে এখন দূর থেকে
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা। (সম্পূর্ণ…)

 
পরের পাতা »

**************************************************************

    বাংলাদেশে গণতন্ত্রের স্বরূপ                                                  
                                       মিলন আহমেদ
 বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং উপযোগি শাসন পদ্ধতি হচ্ছে গণতন্ত্র । পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্রই তাদের শাসন ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বলে দাবী করছে । বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ৩৯ বছরের সকল সরকারই তাদের শাসন প্রক্রিয়াকে গণতান্ত্রিক বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। একটি রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা কতটুকু গণতান্ত্রিক তা পরিমাপের যন্ত্র না থাকলেও একেবারেই যে উপলদ্ধি করা যায় না তা নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে মনেকরি, গণতন্ত্র আসলে পরিমানের বিষয় এবং সে কারণে তা আপেক্ষিকও বটে। বিষয়টি নির্ভর করে কোন রাষ্ট্রের শাসন কাঠামোতে কতটুকু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা সন্নিবেশিত হয়েছে এবং তা কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে তার উপর। রাষ্ট্রীয় বাবস্থাপনায় গণতন্ত্রের উপাদান সমূহের সন্নিবেশ ঘটলে তাকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র বলি। অর্থাৎ গণতন্ত্র যদি কোন রাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে তখন সরকার পরিবর্তনের সাথে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশংকা থাকে না । তবে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের অনেকগুলি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য থাকা জরুরী। যেমনঃ ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ, স্বায়ত্বশাসিত স্থানীয় সরকার, নর-নারীর সম অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা , স্বাধীন মত প্রকাশের ব্যবস্থা ইত্যাদি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি বাস্তবায়নে কিছুটা অগ্রগতি হয়তো লক্ষ্য করা যায় এবং গণমাধ্যমগুলো কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করে একথা সত্যি , কিন্তু গণতন্ত্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় পুরোপুরিই অনুপস্থিত।
        বাংলাদেশে স্থানীয় স্বায়ত্বশাসিত সরকারের কোন অস্তিত্ব নেই বললেই চলে বরং যে সমস্ত স্থানীয় সরকার দেখা যায় তা সম্পুর্র্ণভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্ট। এখানে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন তা হল ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশন সমূহের চেয়ারম্যানগন জনগনের ভোটে নির্বাচিত হচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেন ঐ প্রতিষ্ঠানসমূহ  স্ব-শাসিত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় সরকারের উক্ত ইউনিট সমূহে কোন স্ব-শাসন নেই । সম্প্রতি সরকারের পক্ষ হতে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার কথা বলা হচ্ছে কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্ট হিসেবে ক্ষমতায়ন হলে আমার মনে হয় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকতা পাবে না। গণতন্ত্র্রের জন্য প্রয়োজন স্থানীয় সরকার গুলির স্ব-শাসন ও গণতন্ত্রায়ন। স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন হচ্ছে গণতান্ত্রি¿ক শাসন ব্যবস্থার ভিত্তিমূল, কারণ স্থানীয় পর্যায় থেকেই গণতন্ত্রের শুভ জয়যাত্রা শুরু হয়- যা বাংলাদেশে অনুপস্থিত। গণতন্ত্রের  আর একটি শর্ত ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতার অবস্থা এখানে কী তা সবাই জানে। ৭৫ এর পট-পরিবর্তনের পর এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান ঘটে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে বিদায় দেওয়া হয়েছে এবং ১৯৮৮ সালে “রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম” করার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িকতার আলখেল্লা পরানো হয়েছে। সম্প্রতি উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী সরকার পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করার যে প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে যাচ্ছে তা এদেশে গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক একটি দিক। এরপর আমরা আসতে পারি নর-নারীর সম অধিকারের বিষয়টিতে। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র্র হচ্ছে রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান। অধ্যাপক লিন্ডসের ভাষায় “ উবসড়পৎধপু রং ধ ঃযবড়ৎু ড়ভ ংড়পরবঃু ধং বিষষ ধং ধ ঃযবড়ৎু ড়ভ মড়াবৎহসবহঃ.” প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতে, (ডেমোক্রেসি ইজ এ গর্ভাণমেন্ট অব দ্যা পিপোল, বাই দ্যা পিপোল, এ- ফর দ্যা পিপোল) “ উবসড়পৎধপু রং ধ মড়াবৎহসবহঃ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, নু ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ধহফ ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব.”লিন্ডস তার ংড়পরবঃু (সোসাইটি) দ্বারা শুধু পুরুষ বা শুধু নারী যেমন বোঝাননি তেমনি আব্রাহাম লিংকন ঢ়বড়ঢ়ষব (পিপোল) শব্দটি দ্বারা নারী এবং পুরুষ উভয়কেই বুঝিয়েছেন নিশ্চয়ই। কাজেই ধর্ম,বর্ণ লিঙ্গভেদে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা গণতন্ত্রের  প্রধান পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের সংবিধানে ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে বটে,কিন্তু তা শুধু সংবিধানের সৌন্দর্য বিধান করেছে। পরিবারের আওতায় সমানাধিকারের বিধানগুলোর ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করে নারী অধিকার চরমভাবে হরণ করা হয়েছে এবং গণতন্ত্রকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। একই কারনে নারীরা রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক,সামাজিক সব দিক দিয়ে বঞ্চিত, অবহেলিত, নির্যাতিত। রাষ্ট্র নিজে যেহেতু নারীর সাথে প্রতারণা করছে, সেক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ নারীকে দিচ্ছে সীমাহীন অত্যাচার এবং নির্যাতন। নারী আজ যৌতুকের বলি হচ্ছে, স্বামী এবং স্বামীর বাড়ির লোকদের হাতে চরমভাবে নির্যাতিত হচ্ছে এবং প্রেমিকের দ্বারা নিষ্ঠুরভাবে প্রতারিত হচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী এ দেশে গড়ে প্রতিদিন ১.৬৩ জন অর্থাৎ প্রতিমাসে ৪৯ জন নারী নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করে। এই হিসাবটি গত ৭ বছরের গড়।আমার মনে হয় বর্তমান সময়ের হিসাবে নারীদের আত্মহত্যার সংখ্যা আরও অনেক বেশি। পিতার সম্পত্তিতে পূত্র ও কন্যার অধিকার সমান না হলে এবং স্বামী বা স্ত্রীর সম্পত্তিতে একে অপরের অধিকার সমান না হলে গণতন্ত্রের স্বরূপ কেমন হয় তা সবারই বোঝা ঊচিত। লিঙ্গ ভেদে দুই ধরনের অধিকারকে গণতন্ত্র হিসাবে কোন আধুনিক     রাষ্ট্র-চিন্তাবিদ সমর্থন করেন কি না তা আমার জানা নেই। আমাদের পুরুষতন্ত্রের পতাকাবাহী রাজনীতিবিদরা ঠিকই মুখে গণতন্ত্রের কথা বলছেন কিন্তু অর্ধেক জনগোষ্ঠিকে বঞ্চিত রেখে তারা গোটা জাতিকে ধোকা দিচ্ছেন। পুষতান্ত্রিক গণতন্ত্র বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কিছু নেই - সেটা আমি আবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। রাষ্ট্রের এই অগণতান্ত্রিক চরিত্রের কারণেই যে কিশোরী আত্মহত্যা ভয়ানক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ধর্ষণের মাত্রাও অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন সবচেয়ে বেশী। সম্প্রতি সন্তানকে সাথে নিয়ে বিষ খেয়ে অথবা আগুনে পুড়ে আতœহত্যার ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  
 বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ হচ্ছে পুরুষ ও মহিলা একে  অপরের পরিপূরক,তাদের মধ্যে বৈষম্য থাকবে না, থাকবে বৈচিত্রতা। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠনিক রূপ দিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যেমন জরুরী তেমনি নর-নারীর সমান ভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কোন বিকল্প নাই। তবে নারী রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতায়িত হলে অবশ্যই তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতার দুয়ার খুলে যাবে।
লেখক ঃ প্রভাষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), খিদিরপুর ডিগ্রী কলেজ, পাবনা।ই-মেইলঃ সরষড়হ.ধযসবফ৮@মসধরষ.পড়স

 

title

সিলেটের সাত উপজেলার ৪০ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

বদরউদ্দিন আহমদ/জালাল আহমদ: সিলেট একটিমাত্র ‘ক্রস ড্যাম’-এর কারণেই ডুবেছে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া এবং সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা ও ফেঞ্চুগঞ্জসহ সাত উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। ডুবেছে ৪০ হাজার হেক্টর আমন ধান। তলিয়ে গেছে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্যও পড়েছে হুমকির মুখে। ভুক্তভোগী মানুষ ওই বুড়িখাড়ীর বাঁধটি কেটে দেয়ার দাবিতে আন্দোলনেও নেমেছে। ইতিমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধŸতন কর্মকর্তারা বাঁধটি পরিদর্শনও করেছেন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর হাওরপাড়ের ৬ সংসদ সদস্য পানিসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে মন্ত্রী আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জুড়ী-কুশিয়ারা নদীসঙ্গমে ড্রেজিং শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর বুড়িখাড়ী নামক স্থানে ২০০৪ সালে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে অপরিকল্পিতভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বাঁধ নির্মাণ করে। বাঁধটি দেয়ায় ভাটির চেয়ে উজানের পানি ৪-৫ ফুট বেশি উচ্চতায় রয়েছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বিঘœ ঘটে। এ কারণে চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতায় দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ভুগছে দুই জেলার প্রায় ১০ লাখ মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার লোকজনের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, বাঁধ দেয়ার পূর্বে বন্যার পানি বুড়িখাড়ী খাল দিয়ে সরাসরি কুশিয়ারা নদীতে গিয়ে পড়তো। কিন্তু বর্তমানে বন্যার পানি কুশিয়ারা নদীতে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের খননকৃত খাল ও জুড়ী নদী হয়ে। এতে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বিঘœ ঘটছে। আর এ কারণেই সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার। ভুক্তভোগী এলাকার জনসাধারণের দাবি, এখনই বাঁধ অপসারণ করতে হবে। অথচ সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা মনে করেন, এ বাঁধের কারণে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ৩টি গ্রাম রক্ষা পেয়েছে। তবে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, প্রায় ৪ বছর আগে এ খালের ওপর বাঁধ নির্মাণের কাজ করা হয়। জোট সরকারের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমানের একান্ত সচিব কাইয়ুম চৌধুরী প্রভাব খাটিয়ে বাঁধটি নির্মাণ করেন। উদ্দেশ্য বাঁধের ভাটিতে মাছ চাষ করা।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বিগত জোট সরকারের আমলে ২০০৪-২০০৫ এবং ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে কুশিয়ারা নদী থেকে ৫৫০ মিটার উজানে বুড়িখাড়ী খালের ওপর প্রায় ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্য ‘ক্রস ড্যাম’ (বাঁধ) নির্মাণ এবং জুড়ী নদীর ১ কিমি খনন কাজ করা হয়। এতে ব্যয় হয় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। এ বাঁধ নির্মাণের কারণে হাকালুকি হাওরসহ ৩২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে বলে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের দাবি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড যাই বলুক না কেন বাঁধের কারণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এসব এলাকার লক্ষাধিক কৃষক পরিবার। চলতি সময়ে ১ বড়লেখায় ১২ হাজার হেক্টর আমন ধান, বিয়ানীবাজারে ৮ হাজার হেক্টর, গোলাপগঞ্জে ২ হাজার হেক্টর, জুড়ীতে ৬ হাজার ৪৫০ হেক্টর এবং কুলাউড়া উপজেলায় সাড়ে ৯ হাজার হেক্টর আমন ধান তলিয়ে গেছে। বন্যায় এসব উপজেলায় চলতি বছরে বোরো ও আউশ মৌসুমে ধানের ফলন হয়নি। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোর লক্ষাধিক কৃষক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। ফেঞ্চুগঞ্জের বুড়িখাড়ীর এই বাঁধের কারণে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে জলাবদ্ধ মানুষ অভাব-অনটনের মধ্যে দিন যাপন করছে।
জানা গেছে, এপ্রিল মাসের প্রথম দিক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত (প্রায় ছয় মাস) দেশের অন্যতম বৃহত্তম হাকালুকি হাওরপারের সাত উপজেলার লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। জলাবদ্ধতায় এ অঞ্চলের ১ লাখ ৩৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধানসহ আউশ, শাইল ও সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে বাড়ি-ঘরসহ অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। এ পর্যন্ত পানিতে ডুবে শিশুসহ প্রায় ১৫ জনের অকাল মৃত্যু হয়েছে। শুধু হাওরের ধান নয়, বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মূল সড়কসহ প্রায় তিনশটি গ্রামের বহু রাস্তাঘাট, বাড়ি-ঘর, শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো পানিতে তলিয়ে আছে। অগণিত শিক্ষার্থীর লেখাপড়া মারাত্মক আকারে বিঘিœত হচ্ছে। হাজারো বাড়িঘর ভেঙে ও ভেসে যাওয়ায় বহু মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। অপরদিকে সীমাহীন কষ্ট আর দুর্ভোগ সয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বড়লেখার হাকালুকি হাওরপাড়ের প্রায় ২৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী চলমান দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা দিচ্ছে। কয়েকটি বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষ ৫-৭ ফুট পানিতে নিমজ্জিত থাকায় পার্শ্ববর্তী তুলনামূলক উঁচু বাড়ি, মন্দির ও দোকানঘরে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। যদিও দীর্ঘ জলাবদ্ধতার কারণে এসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা ৪-৫ মাস ক্লাসে পাঠগ্রহণ করতে পারেনি। সম্প্রতি সরেজমিন হাওরপাড়ের কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের করুণ চিত্র। বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়নের হাকালুকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খুটাউরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্রীরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভোলারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশের রাস্তা ও মাঠ ২/৩ ফুট পানির নিচে। গ্রামে যাতায়াতের রাস্তাগুলোও পানিতে নিমজ্জিত। কাঁদা আর পানি ডিঙিয়ে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে ছাত্রছাত্রী স্কুলে পৌঁছে শ্রেণীকক্ষে অথবা অন্যত্র গিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। হাল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মুর্শিবাদকোরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৫-৭ ফুট পানির নিচে থাকায় পার্শ্ববর্তী গ্রামের আব্দুল লতিফ ও সফিক উদ্দিনের বাড়িতে শিক্ষকরা পরীক্ষা নিচ্ছেন। গগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানির নিচে থাকায় বাংলাবাজারের একটি মন্দিরে পরীক্ষা চলছে। মৌলভীবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ শাহাব উদ্দিন বলেন, জনদুর্ভোগের বিষয়টি তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন। ২ সেপ্টেম্বর বড়লেখার বিভিন্ন জলাবদ্ধ এলাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে পরিদর্শনও করানো হয়েছে। এ ছাড়া ২৭ সেপ্টেম্বর তিনিসহ হাওড়পাড়ের ৬ সংসদ সদস্য পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মন্ত্রী আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জুড়ী-কুশিয়ারা নদীসঙ্গমে ড্রেজিং শুরুর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট ঃ ‘বাকশাল’ বনাম ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’
জাহাঙ্গীর হোসেন


“বাকশাল কি সত্যি আমাদের জন্য ক্ষতিকর ছিল?” এই শিরোনামে আমার একটি লেখা গত ৩১ মার্চ ২০১০ দৈনিক ‘আমাদের সময়ে’ প্রকাশিত হলে, দেশ-বিদেশের পাঠকদের থেকে ব্যাপক সাড়া পাই। কমপক্ষে দুই হাজার দেশী-বিদেশী পাঠক, অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও বর্তমান সাংসদ লেখাটির ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ করে। কমপক্ষে ২২-জন পাঠক আমাকে ‘দালাল’ ইত্যাদি বলে সেলফোন ও ‘আমাদের সময়ে’র ব্লগে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ, ই-মেইল ও এসএমএস করে। তবে অনেকেই বাকশাল সম্পর্কে জানতে চায় ও আমাকে বিস্তারিত লিখতে অনুরোধ করে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিপরীতে বাকশাল সত্যি কি আমাদের জন্যে ক্ষতিকর ছিল? নাকি তথাকথিত ‘বহুদলীয়’ গণতন্ত্র নামক ‘দুষ্টচক্রে’ আমরা কেবল ঘুরপাক খাচ্ছি, এ  প্রশ্নের  উত্তর  খোঁজার জন্যে আজকের এ লেখার পুন. অবতারণা।
    স্বাধীনতার পর ‘স্বাধীন দেশ পরিচালনায় অভিজ্ঞতাহীন’ সরকার পঞ্চমুখী সমস্যায় আক্রান্ত পচাত্তর সালে দেশের ‘নানাবিধ বাস্তবতা’ মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধু ‘বাকশাল’ তথা ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ নামক একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের পরিকল্পনা করেছিলেন কিন্তু দেশে ‘বাকশাল’ বা ‘বাকশালী শাসন ব্যবস্থা’ কখনো কায়েম বা বাস্তবায়িত হয়নি এমনকি ‘পরীক্ষামূলকও’ নয়। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে পচাত্তরের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ‘গণতন্ত্র’ মানে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাই ছিল। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নানা ছদ্মাবরণে শাসরিক শাসন এবং পরবর্তীতে মেজর জিয়ার বহুল কথিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ প্রবর্তিত হয়ে অদ্যাবধি এদেশে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ই প্রচলিত আছে। অর্থাৎ দীর্ঘ প্রায় ৪০-বছর আমরা ‘অবাধ বহুদলীয় গণতন্ত্রে’র মধ্যে বসবাস করেও, একদলীয় বাকশাল-কে গালি দেয়া ছাড়া, জনভারাক্রান্ত এ দেশের উন্নয়নে আর চোখে পড়ার মত কি কি অর্জন করেছি তা রীতিমত রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ‘গবেষণার বিষয়’। এ ক্ষেত্রে ‘বাকশাল’ কেন এবং কি করতে চেয়েছিল একটু জানার চেষ্টা করা যাক।
আমরা এদেশের দেশপ্রেমিক সচেতন মানুষেরা সবাই জানি, স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ একটা ধ্বংসস্তুপের মধ্যে দাঁড়িয়েছিল। চারদিকে ছিল নানাবিধ দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। সমস্যা মোকাবেলায় বড় বড় শিল্প কারখানা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়া হলেও, সবার মধ্যে কাজ না করে বেতন নেয়ার একটা ‘ফ্রি-স্টাইল’ ভাব চলে আসে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, চোরাকারবারী, মুনাফাখোরী, লুটপাট, হত্যা ইত্যাদি সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে প্রবেশ করে ব্যাপকভাবে। সমস্যা সমাধানকল্পে জাতির মধ্যে বিভাজন দেখা দেয়, কেউ কেউ নিজ নিজ মতানুসারে ‘ফ্রি-স্টাইল’ নীতি গ্রহণ করে। বর্ণিত অবস্থার অবসানকল্পে জাতিকে একটি ঐক্যমতে আনা, সংহতি ও সংগঠিত করার লক্ষ্যে “লেট আস ওয়ার্ক টুগেদার” নীতিকে মূল আদর্শ ধরে, বঙ্গবন্ধু ‘বাকশাল’ প্রবর্তন করেন। যার মূল লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও ভিত্তি ছিল, দেশে প্রচলিত পুরণো ও শোসনমূলক আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রচলিত ধীরগতির বিচার ব্যবস্থার পরিবর্তন, কুষক ও শ্রমিকের জন্যে বাধ্যতামূলক সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন এবং বন্টন নীতি এবং প্রচলিত ‘ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের’ পরিবর্তে বৃহত্তর জনগণের জন্যে ‘শোসিতের গণতন্ত্র’। এ ব্যবস্থায় প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ করে প্রশাসনকে গ্রামমুখী করা, গণভোটের মাধ্যমে থানা চেয়ারম্যাান, জেলা গভর্নর, সংসদ সদস্য ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থা, স্থানীয়ভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা, আধুনিক ও জনকেন্দ্রিক বিচার ব্যবস্থা (যে কারনে বিচারিক কোন সদস্যকে বাকশালের সদস্য হতে আইনে নিবৃত করা হয়েছিল), রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় সমবায়ের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর চাষাবাদ, যাতে উৎপাদিত ফসলের অংশীদারিত্ব, ভূমি ও সম্পদের সর্বোচ্চ সিলিং, নর-নারী ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে (কেবল বিচার বিভাগের লোকজন ব্যতিত) সরকারী বেসরকারী চাকুরীজীবীসহ সকল শ্রেণীর পেশাজীবীর বাকশালের সদস্য হওয়ার অবাধ স্বাধীনতা ইত্যাদি সকল কার্যক্রমই এদেশের মেহনতী মানুষের কল্যাণে গৃহীত হয়েছিল, যা কিছুটা ছিল পুঁজিবাদী তথা ধনীক শ্রেণীর সরাসরি বিরুদ্ধে (এ জন্যেই কি বাকশালের বিরুদ্ধে বুর্জোয়া গোষ্ঠীর এত গোস্সা?)। তবে তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে বহুদল, হরতাল, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও অবাধ বাক-স্বাধীনতার নামে ‘ইয়েলো জার্নালিজম’ (ভূয়া ও মিথ্যা খবর তৈরি করে মানুষকে বিদ্রোহী করে তুলা)  ইত্যাদি নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হয়েছিল বাকশালে।
একটি দল দেশে থাকলে দেশ ‘খারাপ হবে’, আর বহুদল থাকলে দেশ ‘ভাল হবে’ এ কথা বাংলাদেশ ও চীনে প্রমাণিত হয়নি। চীনে একটি মাত্র দল অথচ বাংলাদেশে বহুদল। চীনে হরতাল, ধর্মঘট, মিছিল, অগ্নি সংযোগ এমনকি পতিতাবৃত্তি-ভিক্ষাবৃত্তি ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হলেও, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে মানুষের উপর জোর করে এগুলো চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে প্রতিনিয়ত। হরতাল না করতে চাইলে তাকে আগুনে পুরিয়ে দেয়ার ঘটনাও এদেশে গণতন্ত্রের নামে মানুষ দেখতে পায়, মানে গণতন্ত্রের নামে হরতাল ডেকে জনগণকে তা পালনে বাধ্য করা হচ্ছে, যদি তা জনগণ পছন্দ না করে তবুও। তথাকথিত ‘গণতন্ত্রের’ জন্যেই ঢাকার কসাইরা সম্প্রতি ‘অগণতান্ত্রিক’ হুমকি দিয়েছে যে, ১৫-দিনের মধ্যে সরকার ‘এনথ্রাক্স’-আতংক দূর করে তাদের ‘মাংস বিক্রির রাস্তা উন্মুক্ত’ (কেজিতে ৯০০ গ্রাম বিক্রির অবাধ স্বাধীনতা) না করলে তারা ‘ঢাকাকে অচল করে দেবে’। চমৎকার ‘গণতান্ত্রিক’ হুমকি বটে, যেন সরকার ‘এনথ্রাক্স’ ইচ্ছে করে আমদানি করেছে। এসব গণতান্ত্রিক ‘হুমকি-ধামকি ও কর্মকান্ডে’ এ দেশের অধিকাংশ মানুষই এখন হারে হারে টের পাচ্ছে যে, ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ (বাংলাদেশ স্টাইল) কাকে বলে এবং সাধারণ মানুষের প্রাপ্তি এখানে কি?
বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র প্রচলিত, তা অনেকটা স্বার্থবাদী ও ধনীক শ্রেণীর মানে ‘শোসকের গণতন্ত্র’। এখানের গরিব অসচেতন জনগণ কেবল ‘একটি ভোট প্রদানের গণতান্ত্রিক অধিকার’ ভোগ করে এবং কখনো কখনো তা-ও ছিনতাই হয়ে যায় (অতীতে তা অনেকবার এদেশের মানুষ দেখেছে)। এদেশে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থাও অনেকটা ধনীক শ্রেণীর জন্য। এখানের একজন অর্থবান ব্যক্তি অর্থ দিয়ে তার পক্ষে বড় ও বিখ্যাত ‘বিলাত-ফেরত’ আইনজীবীদের নিয়োগ করতে পারলেও, একজন ভূমিহীন কৃষক তা পারেনা, যে কারনে অর্থবানের পক্ষে রায় চয়ে যায় যৌক্তিক কারনেই। এদেশের গণতান্ত্রিক আইনে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিচার করে ফাঁসি কার্যকর করতেও প্রায় ৩০/৩৫ বছর চলে যায়। অনেক চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ বর্ণিত বড় বড় আইনজীবী নিয়োগ করে, তাদের প্রদত্ত শাস্তি উচ্চ আদালতে রহিত করতে সমর্থ হন (নিকট অতীতে যা আমরা দেখেছি), ‘দুদক’ ব্যর্থ আস্ফালন করে ক্লান্ত হয়, কিন্তু দুর্নীতি সংক্রামক রোগের মত মহামারী আকার ধারণ করে। বহুদলীয় অবাধ গণতন্ত্রের জন্যেই এদেশে হু-হু করে জনসংখ্যা বেড়ে গিয়ে দেশকে ‘কার্যত অচল’ করে দিলেও, তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়না ‘জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারে’র কারনে, আবার সাংবিধানিকভাবে নারী-পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃত হলেও, কোন ধর্মীয় কারনে অনেক নারী সম্পদে অর্ধেক অধিকার, আবার অন্য ধর্মাবলম্বী নারীরা সম্পদে ভাগ পায় পুরুষের তুলনায় ০%। কিন্তু একদলীয় শাসনে শাসিত চীনে এ সমস্যা নেই বরং সর্বত্র নারী পুরুষের অধিকার সমান। চীনের মানুষকে ‘রুটি-রুজির’ জন্যে ‘পতিতাবৃত্তি’ বা ‘ভিক্ষাবৃত্তির’ মত পেশা গ্রহণ করতে হয় না, যা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক প্রায় সকল দেশে বিদ্যমান। তাই সেখানের নারীরা (এবং পুরুষেরাও) আমাদের বহুদলীয় গণতন্ত্রের চেয়ে স্বাধীন নয় কি? কারন স্বাধীনতা মানে হচ্ছে মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান, একটি সুন্দর ভবিষ্যত, যা ‘বাকশাল’হীন শাসনে থেকেও এদেশের কোটি কোটি মানুষ এখনো পায়নি, পক্ষান্তরে চীনের মানুষ পেয়েছে ‘একদলীয়’ অনেকটা বাকশালী কায়দার শাসনে।  
এক্ষেত্রে এটি বলা যাবে না, যে একদলীয় হলেই শাসন ব্যবস্থা ‘খারাপ’ হবে এবং বহুদলীয় হলেই ‘ভাল’ হবে। আসলে আধুনিক বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্যে অনকুল দেশগুলো হচ্ছে ইউরোপ, কানাডা, নিউজিল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মত শিক্ষিত, সচেতন, উন্নত এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলো। তা ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় ৮০% মানুষ গ্রামে বাস করে, গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী ৮০% মানুষের জীবন-মান উন্নয়নের জন্যে উন্নয়ন কর্মকান্ডের মূল ভিত্তি হওয়ার কথা গ্রাম কিন্তু বাস্তবে কি তা হচ্ছে? তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ‘সংখ্যাধিক্যের গণতন্ত্রের’ নামে এদেশে ধনতান্ত্রিক সুবিধাবাদীর গণতন্ত্রই চলছে। আমাদের দেশেও বহুদলীয় গণতন্ত্র কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, যখন আমরা বর্ণিত দেশগুলোর মত শিক্ষিত-সচেতন-উন্নত হব, গণতন্ত্রকে ভালভাবে বুঝতে পারবো। বাংলাদেশের মত নানাবিধ সমস্যায় আকীর্ণ দেশের জন্যে আপাতত ‘সীমিত গণতন্ত্র’ই দেশের জন্যে কল্যাণকর হতে পারে। বাকশালে গণতন্ত্রকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তাকে ‘সীমিত’ করার কথা বলা হয়েছিল, যার সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞানেরও দ্বিমত নেই। আমরা এখন অক্টোপাসের মত নানাবিধ সমস্যা তথা জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, বিদ্যুৎ, পানি, দুর্নীতি, ঘুষ, যৌতুক ইত্যাদি বহুপদী সমস্যায় আক্রান্ত তা থেকে প্রচলিত গণতন্ত্র আমাদের উদ্ধার করতে পারছে না। এ থেকে উদ্ধারের জন্যে দেশে দরকার প্রচলিত ‘রিল্যাক্স’ আইনের পরিবর্তে ‘কঠোর আইন’। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশকে বাঁচানোর জন্যে কঠোর আইনের বিকল্প নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়. পরীক্ষা হলে একজন পরিদর্শকের হাতে থাকে ‘অসীম ক্ষমতা’। সে যেকোন পরীক্ষার্থীকে নকল করা, কথা বলা বা দেখাদেখি, এমনকি পরিদর্শকের সঙ্গে অসদাচরণের জন্যে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কার, পরীক্ষা বাতিল বা পুলিশের কাছে সোপর্দ করতে পারে, এ জন্যে তাকে বা অন্য কাউকে দিয়ে তদন্ত, অভিযোগ গঠন, আলামত, স্বাক্ষী ইত্যাদি জোগারের প্রয়োজন হয়না। যে কারনে পাবলিক পরীক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোও অত্যন্ত শৃঙখলার সঙ্গে কক্ষ পরিদর্শকগণ পরিচালনা করতে পারেন এবং তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাউকে অন্যায়ভাবে বর্ণিত শাস্তি প্রদান করেছেন বলে শোনা যায়নি। অপর পক্ষে ‘গণতান্ত্রিক ট্রাফিক আইন’ হচ্ছে, গাড়ির একজন চালক রাস্তা বন্ধ করে ‘হাজারো’ মানুষকে কষ্ট দিলেও, পুলিশ কেবল তার নামে একটি সাধারণ ‘মামলা’ দিতে পারে, যে মামলাটি আদালতে স্বাক্ষী-প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করা খুব একটা সম্ভব হয়না বলে, চালকরা প্রতিনিয়ত পুলিশের চোখের সামনেই একই অপরাধ বার বার করে যাচ্ছে। যে কারনে সিঙ্গাপুরের মত আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশেও ‘বেত-মারার’ মধ্যযুগীয় আইন বহাল করা হয়েছে বৃহত্তর জনস্বার্থে। আর  বাকশালের চিন্তা চেতনায় ছিল অবাধ গণতন্ত্রের বদলে ঐরূপ ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ মানে পরীক্ষা সংক্রান্ত আইনটির মত, রাস্তায় গাড়ি চলাচলের আইনটির মত ‘রিল্যাক্স’ নয়। এখন এদেশের মানুষই বিবেচনা করুক, আমাদের সুন্দরভাবে ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচার জন্যে ‘বহুদলীয় বর্তমান অবাধ গণতন্ত্র’ (বাংলাদেশ স্টাইল) আমাদের কল্যাণ করেছে, নাকি একদলীয় ‘বাকশাল’ করতে পারতো ? সময় হয়তো একদিন বাকশালের পক্ষেই কথা বলবে।  
**************************************************************

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের স্বরূপ 
                                                 
মিলন আহমেদ
 বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং উপযোগি শাসন পদ্ধতি হচ্ছে গণতন্ত্র । পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্রই তাদের শাসন ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বলে দাবী করছে । বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ৩৯ বছরের সকল সরকারই তাদের শাসন প্রক্রিয়াকে গণতান্ত্রিক বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। একটি রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা কতটুকু গণতান্ত্রিক তা পরিমাপের যন্ত্র না থাকলেও একেবারেই যে উপলদ্ধি করা যায় না তা নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে মনেকরি, গণতন্ত্র আসলে পরিমানের বিষয় এবং সে কারণে তা আপেক্ষিকও বটে। বিষয়টি নির্ভর করে কোন রাষ্ট্রের শাসন কাঠামোতে কতটুকু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা সন্নিবেশিত হয়েছে এবং তা কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে তার উপর। রাষ্ট্রীয় বাবস্থাপনায় গণতন্ত্রের উপাদান সমূহের সন্নিবেশ ঘটলে তাকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র বলি। অর্থাৎ গণতন্ত্র যদি কোন রাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে তখন সরকার পরিবর্তনের সাথে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশংকা থাকে না । তবে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের অনেকগুলি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য থাকা জরুরী। যেমনঃ ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ, স্বায়ত্বশাসিত স্থানীয় সরকার, নর-নারীর সম অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা , স্বাধীন মত প্রকাশের ব্যবস্থা ইত্যাদি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি বাস্তবায়নে কিছুটা অগ্রগতি হয়তো লক্ষ্য করা যায় এবং গণমাধ্যমগুলো কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করে একথা সত্যি , কিন্তু গণতন্ত্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় পুরোপুরিই অনুপস্থিত।
        বাংলাদেশে স্থানীয় স্বায়ত্বশাসিত সরকারের কোন অস্তিত্ব নেই বললেই চলে বরং যে সমস্ত স্থানীয় সরকার দেখা যায় তা সম্পুর্র্ণভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্ট। এখানে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন তা হল ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশন সমূহের চেয়ারম্যানগন জনগনের ভোটে নির্বাচিত হচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেন ঐ প্রতিষ্ঠানসমূহ  স্ব-শাসিত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় সরকারের উক্ত ইউনিট সমূহে কোন স্ব-শাসন নেই । সম্প্রতি সরকারের পক্ষ হতে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার কথা বলা হচ্ছে কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্ট হিসেবে ক্ষমতায়ন হলে আমার মনে হয় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকতা পাবে না। গণতন্ত্র্রের জন্য প্রয়োজন স্থানীয় সরকার গুলির স্ব-শাসন ও গণতন্ত্রায়ন। স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন হচ্ছে গণতান্ত্রি¿ক শাসন ব্যবস্থার ভিত্তিমূল, কারণ স্থানীয় পর্যায় থেকেই গণতন্ত্রের শুভ জয়যাত্রা শুরু হয়- যা বাংলাদেশে অনুপস্থিত। গণতন্ত্রের  আর একটি শর্ত ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতার অবস্থা এখানে কী তা সবাই জানে। ৭৫ এর পট-পরিবর্তনের পর এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান ঘটে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে বিদায় দেওয়া হয়েছে এবং ১৯৮৮ সালে “রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম” করার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িকতার আলখেল্লা পরানো হয়েছে। সম্প্রতি উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী সরকার পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করার যে প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে যাচ্ছে তা এদেশে গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক একটি দিক। এরপর আমরা আসতে পারি নর-নারীর সম অধিকারের বিষয়টিতে। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র্র হচ্ছে রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান। অধ্যাপক লিন্ডসের ভাষায় “ উবসড়পৎধপু রং ধ ঃযবড়ৎু ড়ভ ংড়পরবঃু ধং বিষষ ধং ধ ঃযবড়ৎু ড়ভ মড়াবৎহসবহঃ.” প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতে, (ডেমোক্রেসি ইজ এ গর্ভাণমেন্ট অব দ্যা পিপোল, বাই দ্যা পিপোল, এ- ফর দ্যা পিপোল) “ উবসড়পৎধপু রং ধ মড়াবৎহসবহঃ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, নু ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ধহফ ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব.”লিন্ডস তার ংড়পরবঃু (সোসাইটি) দ্বারা শুধু পুরুষ বা শুধু নারী যেমন বোঝাননি তেমনি আব্রাহাম লিংকন ঢ়বড়ঢ়ষব (পিপোল) শব্দটি দ্বারা নারী এবং পুরুষ উভয়কেই বুঝিয়েছেন নিশ্চয়ই। কাজেই ধর্ম,বর্ণ লিঙ্গভেদে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা গণতন্ত্রের  প্রধান পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের সংবিধানে ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে বটে,কিন্তু তা শুধু সংবিধানের সৌন্দর্য বিধান করেছে। পরিবারের আওতায় সমানাধিকারের বিধানগুলোর ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করে নারী অধিকার চরমভাবে হরণ করা হয়েছে এবং গণতন্ত্রকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। একই কারনে নারীরা রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক,সামাজিক সব দিক দিয়ে বঞ্চিত, অবহেলিত, নির্যাতিত। রাষ্ট্র নিজে যেহেতু নারীর সাথে প্রতারণা করছে, সেক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ নারীকে দিচ্ছে সীমাহীন অত্যাচার এবং নির্যাতন। নারী আজ যৌতুকের বলি হচ্ছে, স্বামী এবং স্বামীর বাড়ির লোকদের হাতে চরমভাবে নির্যাতিত হচ্ছে এবং প্রেমিকের দ্বারা নিষ্ঠুরভাবে প্রতারিত হচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী এ দেশে গড়ে প্রতিদিন ১.৬৩ জন অর্থাৎ প্রতিমাসে ৪৯ জন নারী নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করে। এই হিসাবটি গত ৭ বছরের গড়।আমার মনে হয় বর্তমান সময়ের হিসাবে নারীদের আত্মহত্যার সংখ্যা আরও অনেক বেশি। পিতার সম্পত্তিতে পূত্র ও কন্যার অধিকার সমান না হলে এবং স্বামী বা স্ত্রীর সম্পত্তিতে একে অপরের অধিকার সমান না হলে গণতন্ত্রের স্বরূপ কেমন হয় তা সবারই বোঝা ঊচিত। লিঙ্গ ভেদে দুই ধরনের অধিকারকে গণতন্ত্র হিসাবে কোন আধুনিক     রাষ্ট্র-চিন্তাবিদ সমর্থন করেন কি না তা আমার জানা নেই। আমাদের পুরুষতন্ত্রের পতাকাবাহী রাজনীতিবিদরা ঠিকই মুখে গণতন্ত্রের কথা বলছেন কিন্তু অর্ধেক জনগোষ্ঠিকে বঞ্চিত রেখে তারা গোটা জাতিকে ধোকা দিচ্ছেন। পুষতান্ত্রিক গণতন্ত্র বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কিছু নেই - সেটা আমি আবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। রাষ্ট্রের এই অগণতান্ত্রিক চরিত্রের কারণেই যে কিশোরী আত্মহত্যা ভয়ানক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ধর্ষণের মাত্রাও অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন সবচেয়ে বেশী। সম্প্রতি সন্তানকে সাথে নিয়ে বিষ খেয়ে অথবা আগুনে পুড়ে আতœহত্যার ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  
 বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ হচ্ছে পুরুষ ও মহিলা একে  অপরের পরিপূরক,তাদের মধ্যে বৈষম্য থাকবে না, থাকবে বৈচিত্রতা। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠনিক রূপ দিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যেমন জরুরী তেমনি নর-নারীর সমান ভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কোন বিকল্প নাই। তবে নারী রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতায়িত হলে অবশ্যই তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতার দুয়ার খুলে যাবে।
লেখক ঃ প্রভাষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), খিদিরপুর ডিগ্রী কলেজ, পাবনা।ই-মেইলঃ milon.ahmed8@gmail.com