সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

                                                                                           জীবনের গল্প- মানুষের গল্প:

সেই ভোর সেই রাত

কিছুদিন থেকে আযানের সময় ঘুম ভাঙছে খালেদের। আযানের কারণে ঘুম ভাঙছে নাকি ঘুম ভাঙার কারণে আযানের ধ্বনি শুনছে তা’ ঠিক নিশ্চিত নয় খালেদ। তবে ঘুম ভাঙছে এটা নিশ্চিত। কারণ শুয়ে শুয়ে সে আযানের আহ্বান শোনে। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে আবার একসময় ঘুমিয়েও পড়ে। পরের বার ঘুম ভাঙে মায়ের ডাকে। সেই ডাকে হুশিয়ারী থাকে- ‘এখনই যদি না উঠিস্, তাহলে ইউনিভার্সিটি শাটল পাবি না। আর যদি শাটল ট্রেন ধরতে না পারিস তাহলে দৌঁড়াতে হবে কিন্তু চকবাজার মুরাদপুর নাজিরহাটের বাস, রাঙ্গামাটির বাস , যতো সব ঝক্কিঝামেলা। এখন উঠলে উঠ্, না উঠলে নাই।’ খালেদকে সাথে সাথেই উঠতে হয়। শাটলে ইউনিভার্সিটি যাবার মজাই আলাদা। বাসে অতো মজা নেই। তাছাড়া জামালখান থেকে শহর এলাকার বাসে মুরাদপুর গিয়ে তারপর উঠতে হয় রাঙ্গামাটি অথবা নাজিরহাটের বাসে। অনেক ঝক্কি-ঝামেলা এতে। তারচে’ বটতলি স্টেশনে গিয়ে শাটল ধরাই অনেক ভালো। যতণ পথ ততণই মজা। গানে গানে পৌঁছা যায় বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন পর্যন্ত।

আযন শেষ হওয়ার সাথে সাথেই খালেদ ঘুমিয়ে পড়তে না। আবার ঘুমিয়ে পড়তে কিছুণ সময় লেগে যায়। এই সময়ের মধ্যেই কে যেন বারান্দার গ্রিলে টোকা দিয়ে খালেদকে নাম ধরে ডাকতে থাকে- খালেদ, খালেদ, এই খালেদ, খালেদ... । চেনা চেনা কণ্ঠস্বরে লোকটাকে চিনতে চেষ্টা করে খালেদ। চিনতে পারছে, পারছে না এরকম অবস্থায় দরজা খুলে বারান্দায় আসে খালেদ। বাইরের অন্ধকার হালকা হয়ে আসছে, গ্রিলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে আবছা দেখা যাচ্ছে। মান্নান ভাই। ছাত্র ইউনিয়নের মহানগর কমিটির সেক্রেটারি।
কি ব্যাপার মান্নান ভাই ? এত ভোরে কোত্থেকে এলেন ?
খবর আছে , খারাপ খবর। রাতে রুমমেট খুন করেছে শাহদাতকে।
কোন শাহদাত?
আরে.. আমাদের ইউনিয়ন কর্মি শাহদাত। ফর্সা, সুন্দর, ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র শাহদাত। সোহরাওয়ার্দি ছাত্রাবাসের শাহদাত। দোতালায় কর্ণারে রুমে যে থাকতো।
ও, আচ্ছা আচ্ছা চিনতে পারছি। ও তো নিরহ টাইপের,ওকে আবার হত্যা করলো কে ?
খালেদ, তুমিও যে কি, বললাম না তার রুমমেট খুন করেছে।
ওর রুমমেটটা কে ঠিক মনে করতে পারছিনা।
মিজান, ইসলামী ধারার ছাত্র কর্মী।
কিভাবে মারলো ? রুমের ছেলেরা টের পায়নি ?
মশারি পেঁছিয়ে ঘুমের মধ্যে জবাই করে দিয়েছে। তারপর ভেগে গেছে নাকি দোতলা থেকে লাফ দিয়ে। ও পলাতক। যাহোক, তাড়াতাড়ি চলে এসো কলেজে। আজ আর ইউনিভার্সিটি যাবার দরকার নেই।
মান্নান ভাই তাড়াহুড়ো করে চলে যায়। এরপর কার কাছে যাবে তা’আর বলে যায়নি। যাবে হয়তো কারো কাছে। মান্নান ভাইকে এভাবে যেতে হবে আরো অনেকের কাছে।  
খালেদ বিছানায় এসে আর শুয়ে পড়ে না। বসে থাকে। মাথাটা ঝিম ধরে আসছে। বারান্দার বাতাস কিছুটা ঠান্ডা ছিল। খালেদ আবার বারান্দায় চলে আসে। পায়াচারি করতে থাকে। মনে হচ্ছে বাইরে ঘুরে এলে ভালো লাগতে পারে। কতদিন যে ভোরে বাইরে হাঁটা হয় না। খালেদ দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে পড়ে। মর্নিং ওয়াক করলে মন কিছুটা হালকা হতে পারে। এত ভোরে এরকম একটা খারাপ সংবাদে ঘুম ভাঙবে সেটা কল্পনায়ও ছিল না খালেদের। আসলে মানুষের কল্পনায় সবকিছু থাকে না। কল্পনার বাইরেও ঘটনা ঘটে। ঘটতে পারে।
রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া তেমন নেই। ভোরে যাদের হাঁটার অভ্যেস আছে তারা ছাড়া তেমন কোন লোকজনও নেই। আর যারা নামায পড়ে বেড়িয়েছে তারা হাঁটছে দল বেঁধে। স্বাভাবিক, সবকিছু স্বাভাবিক। কোনকিছুই বেমানান ঠেকছে না যেন। শুধু অস্বভাবিক হয়ে আছে খালেদের সকাল, খালেদের ভোর। একটা নতুন দিন শুরু করছে এই শহর আর শহরের মানুষেরা। তারা এখনো বুঝতে পারছে না, এই শহরের একটা হত্যাকান্ডের দায় তাদের নিতে হবে একটু পরই। রাতে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার সংবাদ খুব ভোরে শহরের মানুষ পাবেই বা কি করে। পায় না।  এতো লোকের কেউই জানে না, অথবা কেউ কেউ জানে একজন ছাত্র ভোর রাতে খুন হয়ে গেছে কলেজের ছাত্রাবাসে। জানে না বলেই হয়তো নির্বিকার। জানলেও নির্বিকার থাকতে পারে। হতে পারে অভ্যেস বশত:। হত্যাকান্ড শহরের কোন নতুন ঘটনা নয়। দেশেরও কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা নয়। রাজনৈতিক অরাজনৈতিক হত্যাকান্ড দিন দিন বাড়ছেই। বাড়ছেই। মতাসীনরা নিজেদের মতা স্থায়ী করার জন্য নিজেদের মধ্যে ঘটিয়ে যাচ্ছে প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য হত্যাকান্ড। প্রতিপরে সাথে প্রতিপরে হত্যাকান্ডে দিচ্ছে উৎসাহ। জনগন যাদের নির্বাচিত করে না, তাদের প্রতি জনগনেরও দায় নেই, আর সরকারেরও কোন প্রকার দায় থাকে না জনগনের কোন কর্মকান্ডে। এরকম দেশে কেউ যেন কারো নয়। সরকার যেখানে জনগনের নয়, জনগনও সেখানে সরকারের নয়।  দেশ তাই চলছে , খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে। কতদিন চলে দেখা যাবে।
 অথচ এত এত মৃত্যুর ঘটনার দেশে, একটা হত্যাকান্ডের সংবাদ খালেদকে একা করে ফেলেছে শহরের অনেক অনেক লোক থেকে। হতে পারে একজন পরিচিত ছাত্রের মৃত্যু বলে। খালেদের কাছে এই শহর, এই শহরের ভোর অন্যরকম ঠেকছে। মনে হচ্ছে মানুষের জীবন বড়ো বেশি ছন্নছাড়া। মানুষেরা বড়ো বেশি স্বার্থপর।     
খালেদ রহমতগন্জ সি এন্ড বি অফিস পার হয়ে গুডস হিলের দিকে উঠতে থাকে। এই হিলের পশ্চিম পাশের খোলা স্থান একাত্তুরের বধ্যভূমির একটি। এখানে স্বাধীনতার পরপর মানুষের হাড়গোড় নাকি দেখা গেছে। এই রাস্তা দিয়ে গেলেই খালেদের এসব মনে পড়ে। আজ আরও বেশি করে মনে পড়ছে। একাত্তুরের ওরা মরেছে রাজাকার আর পাকিস্তানীদের হাতে, আর আজকের প্রজন্ম মরছে ওদের বংশধরদের হাতে। কোথায় যেন মিল আছে এসব মৃত্যুর। তাহলে কি যুদ্ধের হার-জিতের মধ্যেই মৃত্যুর বিষয়টা শেষ হয়ে যায়নি ? হয়তো যায়নি। হিসেব চুকে গেলে তো আজ শাহদাতকে আবার নতুন করে মরে শাহদাত হতে হতো না।
একাত্তুরের হিসেব নিকেশ এর সময় খালেদ অনেক ছোট ছিল। সেই হিসেব নিকেশের কোথাও হয়তো ভুল ছিল। তা’ না হলে ওরা এখনো শাহদাতদের মারছে কিভাবে। মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার মতায় থাকতেই বা ওরা এতো বাড়ল কিভাবে ? দেশে অনেক কথাই শোনা যায়। শত্র“র সাথে গলাগলি করেই নাকি ঠিকে ছিল জেনারেল। মতার লোভ লালসা একজন মুক্তিযোদ্ধাকেও যে কতো নিচু মনের মানুষ বানিয়ে দিতে পারে তার আর এরচেয়ে ভালো নজির কী হতে পারে । কিন্তু পরিণতি কী ? অশুভ। অশুভর আগমন শুভতে শেষ হয় না, হতে পারে না। হয়নি। এক অশুভের পর আরেক অশুভের কাল চলছে।
গনি বেকারির মোড়ে পৌঁছালে খালেদকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় একটা দ্রুত গতির ট্রাক। ভোরের ট্রাকেরা খুব দ্রুত গতির হয়। পাশ কেটে যাওয়া ট্রাকের পেছনে তাকাতেই ট্রাকের বডিতে লেখা উপদেশ খালেদের চোখে পড়ে- ‘‘ মীর জাফরী ভাল নয়’’। ট্রাকটার পেইন্টারের প্রতি মনে মনে শ্রদ্ধা জানায় খালেদ। এই ছোট্ট সত্য কথাটা অল্প শিতি পেইন্টারও জানে, অথচ জানা ছিল না আমাদের সেক্টর কমান্ডারের ! সত্যি সেলুকাস আমাদের এই দেশ।
খালেদ যখন স্কুলে পড়তো তখন প্রতিদিন ভোরেই মনির্ং ওয়াক করতো। কলেজে পড়ার সময় এ অভ্যেস আর থাকেনি। আজ অনেকদিন পর ভোরে রাস্তায় বের হওয়া। ভীষণ ভালো লাগছে ভোরের এই শহর, ভোরের ঠান্ডা-শীতল হাওয়া, বাকলিয়ার আকাশের হালকা তাপের সূর্য। ভালো লাগছে সবই। তবে শাহদতের কথা মনে হচ্ছে মাঝে মধ্যে আর কেটে যাচ্ছে ভালো লাগার আমেজ।
এভাবে কেউ খুন হতে পারে ! এভাবে বন্ধু বন্ধুকে খুন করতে পারে ?
নিশ্চয় পারে, না পারলে খুন হলো কিভাবে ? ছাত্র রাজনীতি বিষয়ে একেবারে বিষিয়ে ওঠে মন।
যে রাজনীতি মানুষ খুন করতে শেখায়, বন্ধু খুন করতে শেখায়, ছাত্ররা কেন সেই রাজনীতি করবে ? যে রাজনীতি রুমমেট বন্ধুকে শত্র“ বানায় ছাত্ররা কেন সেই রাজনীতি করবে ? এসময় ওসব দলের নেতাদের মুখচ্ছবি মনে ভেসে উঠলে সেসব মুখচ্ছবিতে থু-থু ছিটিয়ে দিতে ইচ্ছে হয় খালেদের। এ জঘন্য দেশে মানুষ বাঁচবে কি করে ?

খালেদ হাঁটতে হাঁটতে চিটাগাং কলেজের সামনে এসে পড়ে। এখন ভেতরে ঢুকলেই দেখা যাবে শাহাদাতের লাশ। সারাদেহে রক্ত মাখা একটা লাশ, দেখে মনে হতে পারে মাতৃগর্ভ হতে এই মাত্র প্রসব হওয়া কোন মানব সন্তান যেন। শুধু কেঁদে উঠতে পারছে না অজ্ঞাত কোন জুজুর ভয়ে। অথবা ঘৃনায়। যেদেশে রাজাকারের সাথে মুক্তিযোদ্ধা হাত মেলায় মতার লোভে , রাজ সিংহাসনের লোভে, সে দেশের শাসক, দেশের মানুষ, সেদেশের মানুষের ভালোবাসার প্রতি ঘৃণা থাকতেও পারে। খালেদের ইচ্ছে করছে না ভেতরে ঢুকতে। এখন নিশ্চয় পুলিশটুলিশের কারবার চলছে। হত্যার ঘটনায় পুলিশতো আসবেই।
চিটাগাং কলেজের গেটে দাঁড়ালে লিচু তলা দেখা যায়। এই লিচু তলায় কলেজে নতুন ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের নবীন বরণ হয়। শাহদাতদেরও হয়েছিল। শাহদাত রাজনীতির লেজুড় ছাত্র সংঘটনগুলোর এসব নবীন বরণের ধান্ধাবাজি একদম পছন্দ করতো না। খালেদ ইউনিয়নের নবীন বরণের দিন শাহদাতকে ডাকতে গেলে সে এক কথায় নাকচ করে দিয়েছিল যে, এসব ধান্ধাবাজির নবীন বরণ তার পছন্দ নয়। এতো নবীণ বরণ নয়, সাধারণ ছাত্রদের রাজনীতিতে ডেকে আনার ফাঁদ পাতার খেলা। মনে পড়ে তার মোড়ামুড়িতেই শাহদাত এসেছিল সেদিনের সেই অনুষ্ঠানে। আর আজ তাকে পড়তে হয়েছে ছাত্র রাজনীতির ফাঁদে। মৃত্যুর ফাঁদে। এখন নিজেকে বড়োবেশি দোষী মনে হচ্ছে খালেদের। সমাজতন্ত্র কায়েমের পথে একজন সহযোদ্ধার মৃত্যু কাহিল করে ফেলছে তাকে। পাশপাশি জাগছে ধর্মীয় রাজনীতির প্রতি ঘৃণা এবং প্রতিশোধ স্পৃহাও। জাগছে ঘৃণা রাষ্ট্রের প্রতিও। ধর্মের লেবাসধারী একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র থেকে বের হয়ে আসার সংগ্রামে ল প্রানের বিনিময়ে যে রাষ্ট্র, দশ বছর না পেরুতেই সেই রাষ্ট্র যখন পড়ে যায় আবার ধর্মীয় লেবাসধারীদের হাতে তখন ল প্রাণের বলিদানের হিসাব মেলাতে মন চাইতেই পারে। হিসাব মেলে না। কিছুতেই মেলে না। মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডারের স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে হাত মেলানোর হিসাব মেলাতে পারে না খালেদ। তেলে জলে মিশ খাওয়ার গল্পতো অতো সোজা হতে পারে না।
খালেদ চিটাগাং কলেজের গেটে কতন দাঁড়িয়ে ছিল বুঝতে পারে না। মহসিন কলেজের মাঠে যারা  ফুটবল খেলছিল, তারা কেউ এখন আর মাঠে নেই। ওরা ফিরে গেছে হয়তো অনেকণ আগে। এখন খালেদেরও বাসায় ফিরে যাওয়া দরকার। বাসায় ফিরে তার ইউনিভার্সিটি যাওয়ার জন্য রেডি হতে হবে, আর না হয় কলেজ মাঠে জানাযায় আসতে হবে। আগে বাসায় যাওয়া দরকার, তারপর ঠিক করা যাবে কী করা যায়।
কলজের ভেতর থেকে মিছিলের শব্দ শোনা যাচ্ছে।‘ স্বাধীনতার শত্র“রা হুশিয়ার সাবধান ’। ‘শাহদাতের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’। শ্লোগানের শব্দ ভসে আসছে লেডিস কমন রুমের দিক থেকে। হতে পারে ছাত্র ইউনিয়ন, হতে পারে ছাত্রলীগ- ছাত্র ইউনিয়ন এক সাথে মিছিল বের করেছে। বছর খানেক আগে ছাত্রলীগের তবারককে দিনে দুপুরে হত্যা করা হয়েছিল জবাই করে। জবাই পদ্ধতিটা কেন যেন খুব পছন্দ তাদের। হতে পারে এজন্যে যে, হত্যাকান্ড জঘন্য পদ্ধতির হলে প্যনিক সৃষ্টি করা যায় বেশি। ফলাফল- সাধারণ ছাত্ররা রাজনীতি বিমুখ হবে বেশি হারে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের যেহেতু কোন সমর্থন থাকে না ধর্মীয় রাজনীতির প্রতি, তাই ওরা রাজনীতি বিমুখ হলে তেমন কিছুই যায় আসে না ওদের। সাধারণেরা রাজনীতিতে আসলে সেটই ওদের সমস্যা। সমস্যা উপড়ে ফেলতে কে না চায়। সেই সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজছে ওরা শাহদাতদের হত্যার পথে। মিছিল লিচু তলা হয়ে ঢুকে গেছে মেইন বিল্ডিং এ। থমথমে হয়ে আছে কলেজের পরিবেশ। নয়টার দিকে ছাত্র-ছাত্রীরা এসে পড়লে বাড়তে থাকবে উত্তেজনা। মনের ভেতর এসব নানা ভাবনা নিয়ে বাসার পথে পা বাড়ায় খালেদ।
মিছিল-শ্লোগানে শাহদাত হত্যার কোন সমাধান হবে কি ? এ হত্যার বিচারই বা কি ? হত্যার বদলে হত্যা ? তাতেও কি শাহদাতের মা-বাবা ফিরে পাবে তাদের শাহদাতকে ? পাবে না। তাহলে শাহদাতরা কি শুধুৃ মরতেই থাকবে ? ভীত, চঞ্চল আর অস্থির হয়ে উঠছে খালেদের মন। বাসার পথে হাঁপতে হাঁটতে আবার গুডস্ হিল পেরুতে হয় খালেদকে। একাত্তুরের পর থেকেই যে এদেশের মানুষ রাজাকারের টিলা ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে যাচ্ছে। সেই পথ যেন আর শেষই হচ্ছে না। রাজাকার মরে, রাজাকারের মৃত্যু আছে। কিন্তু রাজাকারের টিলা আর মরে না, রাজাকারের টিলার মৃত্যু নেই।             
খালেদ ইউনিভার্সিটি যাবার জন্য বের হয়ে চলে আসে আবার কলেজ মাঠে। ইউনিভার্সিটি যাবার জন্য মন চাইছে না কোন ভাবেই। মাঠের এদিক সেদিক জড়ো হয়ে আছে অনেক ছেলে-পেলে। তবে শাহদাতের লাশ আর কলেজে নেই। পুলিশ নিয়ে গেছে। পোষ্টমর্টেম এর পর আবার ফিরিয়ে দিবে। শাহদাতের লাশ আর কলেজে আসবে কিনা সে বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ তবারকের লাশ পোষ্ট মর্টেম এর জন্য নিয়ে পুলিশ আর কলেজে ফিরিয়ে দেয়নি। কলেজ কর্তৃপও সেটা চায়নি। মর্গ থেকে লাশ সারাসরি পৌঁছে দেয়া হয়েছিল তবারকের বাড়িতে। তাতে কলেজ আর কলেজ কর্তৃপ বেশ নিশ্চিন্ত হয়, নিরাপদ বোধ করে। ছাত্রের চেয়ে কর্তৃপরে নিরাপত্তা অধিক জরুরী অনন্ত এই আধা গনতান্ত্রিক দেশে !  সেই নিরাপত্তা তারা নিশ্চিত করবে না কেন ? করছে।
এরই মধ্যে কলেজ মাঠের পূর্ব ও পশ্চিম গেটে দু’ ট্রাক পুলিশ এসে অবস্থান নিয়েছে। সাধারণ কোন পুলিশ নয়, হাতে ঢাল আর মাথায় হেলমট পরা পুলিশ। দেখতে একটু গর্জিয়াস টাইপের। এদের দেখে সাইফুল ভাইয়ের তীè প্রশ্ন- কিরে, শালারা আসামী ধরতে এসেছে, নাকি আমাদের ঠেকাতে এসেছে ? ভীড়ের মধ্যে কে যেন জবাব দেয়- কিছুই বোধগম্য নয়। সরকারের কাজ কারবার সব ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা। বামের বাচ্চারা মরলেইতো ওরা খুশি। তাই না ? তাদের  আবার আসামী ধরার কাজ কি ?
কলেজ মাঠে বন্ধুহারা একদল সর্তীথ, কলেজ গেটে রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলার অতন্দ্র দুই দল প্রহরী, কলেজের অভ্যন্তরে হয়তো কোন সভায় আছে মানুষ গড়ার কারিগর শিকবৃন্দ, আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে হত্যাকারীরা, হাসপাতাল মর্গে কাটাছেঁড়া চলছে শাহদাতের দেহ। মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের এছাড়া আর কোন পথ নেই। শাহদাতর মা হয়তো নিজ গ্রামের পথে, অথবা নিজের গ্রামে পাড়া প্রতিবেশী বেষ্টিত হয়ে পড়ে আছে অজ্ঞান, কোন শয্যায়। আর বাবা মনে মনে সঞ্চয় করছেন শক্তি, ছেলের লাশতো তাকে কাঁধে নিতেই হবে। একাত্তুরে অনেক সহযোদ্ধার লাশ তাকে কাঁধে নিতে হয়েছিল। লাশ কাঁধে নেবার শক্তি তার আছে। তখন আপনজনের লাশ দাফন করে তারা দ্বিগুন শক্তিতে ঝাপিয়ে পড়তো শত্র“পরে বিরুদ্ধে। তখন তারা দলে ছিলেন। আর আজ ? আজ তারা সবাই একা একা ।  আজ যদি ছেলের লাশ দাফন করে মন চায় শত্র“র বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে, তাহলে সাথে আর কেউ থাকবে কি ? এখন আর অতটুকু নিশ্চিত নয় শাহদাতের বাবা। রাষ্ট্রের হাল ধরে আছে বৈরী শক্তি। শাহদাতের বাবা মনের জোর আর কোথায় পাবে ?
এরই মধ্যে কলেজ মাঠে খবর আসে শাহদাতের লাশ আর কলেজে আসছে না। পুলিশ প্রহরায় যাবে গ্রামের বাড়িতে।
২৪-০১-০৯, দাগনভূঞা, ফেণী।

**********************************************************************************************************************

আলো

 

মুন ইসলাম

নাম তার আলো। প্রকৃত নামটা নাই বা বললাম । সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিল অনেকটা ঝগড়ার মাধ্যমে। ও ছিল পাশের বাড়ির তিন তলার ছাদে, বন্ধ্বুবর রবিন ছিল তাদের এক তলার উঠোনে। তিন চারটি ছেলে বন্ব্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মেতে ছিল আলো। রবিনের কেন যেন সহ্য হলো না । মেয়েটিকে উচ্চ কন্ঠেই কিছু একটা বললো আর তাতেই শুরু হলো ঝগড়া । অবশ্য সেটা ছিল এক তরফা শুধু মাত্র ওর পক্ষ থেকেই । কিছুক্ষন চলার পর রবিন রণে ভঙ্গ দিয়ে চলে গেল। বিকেলে রবিনের ছোট বোন দিশার কাছে নালিশ করলো তাদেরই বাসায় এসে। দিশা বললো,’ভাইয়া মঞ্চে অভিনয় করেতো তাই অভিনয়টা একটু ঝালাই করে নিতে চাইছিল’। কথাটা তার হয়তো মনে ধরলো । দু’দিন পর ছিল ঈদ। আগের দিন বিকেলে দিশা গেল তাদের বাসায়। না-না রবিন কিন্তু পাঠায় নি। সে কেন গিয়েছিল আজও জানতে পারেনি রবিন। কি জানি হয়তো বা সন্ধি করতে । কিছুক্ষন পর রবিনের চোখ গেল আলোদের ছাদে, দিশা এবং আলো বিচরণ করছে। রবিনের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি মিটিমিটি হাসছে। বললো-‘ঈদ মোবারক। কাল আসবেন কিন্তু’। বলেই লজ্জায় দৌড়ে পালালো। ঈদের সন্ধ্যাতেই দু’জনার দেখা হলো। চারদিক আলোকিত করেই ফুলটি আসলো। সেই থেকে ভাল লাগা এবং মনে হয় সেটাই ছিল রবিনেন প্রথম ভালবাসা। তারপর মাঝে মাঝে যাওয়া-আসা, একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথী হওয়া, কখনও বা মান-অভিমানের পালা। তার কাছে মনে হচ্ছিল সে পৃথিবীতে একমাত্র সূখী মানুষ। রাতে যখন পড়তে পড়তে প্রায় মধ্য রাত হতো তখন চলতো আলো-আধাঁরীর খেলা । মানে আলোর পড়ার রুমটি রবিনের রুমের মুখোমুখী হওয়াতে দুষ্টুমির ছলে আলো কয়েকবার লাইট নিভিয়ে এবং জ্বালিয়ে রবিনকে ঘুমুবার সংকেত দিত রবিনও তাকে তদ্রুপ সংকেত দিয়ে ঘুমুতে যেত, এ ভাবেই  চলছিল। তারপর একদিন রবিন চলে আসলো ঢাকায় । জগন্নাথে ভর্তি হলো। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো কিছুটা। প্রায় দু’মাস পর খবর পেল আলো অসুস্থ । মূহূর্তেই ছুটে গেল তার কাছে। রবিন বুঝলো মানষিক ভাবে আলো অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছে। তার বাবা বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু সে চাচ্ছে সম্পর্কের সফল পরিনতি। অন্য সবার মত রবিনও তাই চাইছিল । কিন্তু ঐ মূহূর্তে পরিবেশ পরিস্থিতি তার অনুকুলে ছিল না। অবশেষে  জীবনের হিসেব কষতে লাগলো । কিন্তু সমীকরণ মিললো না।  এক পর্যায়ে নিয়তিকে উভয়েই মেনে নিল। রবিনের তখন সবে মাত্র মাষ্টার্স এর প্রিলিমিনারী শেষ হয়েছে। আলোর গায়ে-হলুদ থেকে শুরু করে বিদায়ের আগ পর্যন্ত পরিবেশটাকে নিজের করে নিল রবিন। ফুলে ফুলে সাজিয়ে দিল তার বিয়ের আসর। বিদায় বেলায় শুধু বললো-না, চোখের জল নয়, বাস্তবতাকে বক্ষে ধারণ করে ভাল থেকো।

বিশেষ খবর- ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১০ আলো, তার বর ও ছোট্ট ফুটফুটে একটি মেয়ের সাথে রবিনের দেখা হলো, কথাও হলো। সে ভাল আছে, সাথে মেয়েটি দেখতে অনেকটা মায়ের মতই, যেন অপ্রস্ফুটিত ফুল।  Moon.islam@ymail.com 

*********************************************************************************************************************

 একটি লোকগল্প 

স র কা র মা সু দ 

সে অনেকদিন আগের ঘটনা। কতকাল আগের ঘটনা তা কেউ আর এখন বলতে পারে না। কিন্তু তবকপুর গ্রামের মানুষ এখনও সেই গল্প করে। লোকেরা নানা আশ্চর্য ঘটনার পাশাপাশি ওই ঘটনাটিও বিবৃত করে আসছে বহু বছর ধরে। বরং বলা চলে, তাদের অনেকেই ওই গল্পটি বয়ান করতে বেশি ভালোবাসে। কেন বেশি ভালোবাসে, তার বিশেষ কারণ আছে।
ব্রাহ্মণপাড়ার বেশিরভাগ মানুষ ঘুম থেকে উঠেছে। সকালের সূর্য গাছপালার মাথা ছুঁই ছুঁই করছে। কাজিবাড়ির লোকেরা তখনও বিছানা ছাড়েনি। তার কারণ, গতদিন বাড়িতে উৎসব ছিল। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিল সবাই। বাড়ির কর্ত্রী রোমেনা খাতুনের অবশ্য ভোরে ওঠা অভ্যাস। যত রাতেই বিছানায় যাক, ফজরের সময় তার ঘুম ভাঙবেই। বাথরুম সেরে এসে রোমেনা প্রথমেই বরাবরের মতো মুরগির ঘরের দরজা খুলে দেয়। কক্... কক্ কক্ কক্ ক...ক্...কক... করে বন্যার স্রোতের মতো নেমে যেতে থাকে মুরগির দল। কিন্তু কাজি গিনি্ন অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করে, পাখিদের দলটা নেমে আসার অল্প একটু পরে যে প্রাণীটা হেলে-দুলে নামছে তার শব্দ কক্-কক্ কক্-কক্ নয়, প্যাঁক-প্যাঁক... প্যাঁক প্যাঁক! অবাক হওয়ার কারণ, কাজিদের কোনো হাঁস নেই। তারা হাঁস পোষে না। আশপাশের কিংবা অল্প দূরের কোনো বাড়িতেও কেউ হাঁস পোষে না। গ্রামের একেবারে শেষ মাথায়, মরা ইছামতির বাঁকে, প্রায় বিচ্ছিন্ন একটা কুটির আছে। বক্কর মাঝির বাড়ি। সেই মাঝির বউ অবশ্য কয়েকটি হাঁস পালে। কিন্তু বক্করের বউ সন্ধ্যাবেলা হাঁসগুলো ঘরে তোলার সময় গুনে রাখে, এতটাই সতর্ক। কাজেই ওপাড়ার হাঁস মুরগির দলের সঙ্গে এপাড়ার খোঁয়াড়ে এসে ঢুকেছে, এটা প্রায় অসম্ভব। কেননা তাহলে তো কাল সন্ধ্যাবেলাতেই খোঁজ পড়ে যেত। যা হোক, এক পাল মুরগির সঙ্গে একটা মাত্র হাঁস! ঘটনা কী? কাজি গিনি্ন অভিভূত। আল্লা! এইডা কেমুন তামাশা! সে একটু ভয়ও পায়। বিস্ময় এবং ভয় একই সঙ্গে তাকে দখল করে নেয় যখন গুনে দ্যাখে, পালের একটা মুরগি কম আর তার জায়গায় ওই ধূসর রঙের হাঁস। বাড়ির বউ-বাচ্চারা ততক্ষণে উঠানের প্রান্তে মুরগির ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এক মিনিটের ভেতর রোমেনার মনে পড়ে ১৫-২০ দিন আগে সোলেমান ফকির এসেছিল। তাবিজ-তুবিজ দিয়ে নাশতা-পানি খেয়ে ফিরে যাওয়ার আগে বলে গেছে, 'অল্প কয়দিনের মইদ্দে একটা আইশ্চর্য গটনা গইটবো।' সেই 'আইশ্চর্য গটনা' কেমন তা অবশ্য ফকির বলে যায়নি। কাজির স্ত্রী ভাবে, তাইলে কি এইডাই সেই আজিব ঘটনা? মা'বুদ, দুনিয়া গারদ অইতে আর বেশি দেরি নাই মনে অয়! দশ মিনিটের ভেতর সারা গ্রামে প্রচার হয়ে গেল, কাজিগো মুরগি আঁস অইয়া গ্যাছে গোওও... দেইক্কা যান। সকালের কাজ ফেলে দলে দলে মানুষ আসতে থাকে। মহাউৎসুক মানুষ তখন কাজিবাড়ির দিকে ধাবমান। তারা এসে ভাঙা চেয়ারের পায়ের সঙ্গে বেঁধে রাখা মহাবিব্রত, বিষণ্ন একটা পাতিহাঁস দেখতে পায়। তারা নানারকম মন্তব্য করে। এসব মন্তব্যের ভেতর আল্লার কুদরতের কথাও ব্যক্ত হয় দু'চারবার।
ছেলেদের দলের মধ্যে বেশি সাহসী সলিম আর জামাল। ওদের সঙ্গে গিয়েছিল আরও একজন। তার নাম রশিদ। রশিদ ঘটনাস্থল থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। আসলে সে ছিল পাহারাদার। কথা ছিল ধারে-কাছে কারও উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্র সে পাখির ডাকের মতো শব্দ করবে। ঘুটঘুটে আঁধার রাত। একটা-দেড়টার কম হবে না। রাতপোকার শব্দ হচ্ছে বিরতি দিয়ে দিয়ে। মাঝে মধ্যে দু'একটা পাতা অথবা শুকনা চিকন ডাল পড়ছে গাছ থেকে। আর কোনো শব্দ নেই চারপাশে। চরাচর একদম নিস্তব্ধ। পা টিপে টিপে এগোয় সলিম, সঙ্গে জামাল। চোরের সতর্ক দৃষ্টি মেলে রেখে ওরা একটা বাড়িতে গিয়ে ওঠে। এ বাড়িতে তিনটি টিনের ঘর। বেড়া মুলিবাঁশের। ওরা প্রত্যেকটি ঘরের বেড়ায় কান পেতে প্রথমে বুঝতে চেষ্টা করে কেউ জেগে আছে কি-না। শ্বাস-প্রশ্বাস ওঠানামার গাঢ় শব্দ শোনা যাচ্ছে। না, সবাই গভীর ঘুমে। অল্প একটু উঠানের ওইপারে বাড়িওয়ালার মুরগির ঘর। ঘরটা বেশ বড়। বোঝা যায় অনেক মুরগি আছে। মুরগির ঘরের পেছন দিকে উঠানের ঢাল। একদিকে কোনো ঘরটর নেই। বেশ খানিকটা জায়গা খোলা। সলিম ভাবে, বিপদ দেখলে ওইপথেও পালানো যাবে। মুরগির বাসার একদম কাছে এসে জামালের ভয় ভয় করে। একটা বাদুড় ওদের মাথার ওপর দিয়ে খুব ধীরে সাঁতার কেটে চলে যায়। না, খোঁয়াড়ের দরজায় তালা ছিল না। ছিটকিনিটা এক টুকরা দড়ি দিয়ে বাঁধা। সামান্য চেষ্টাতেই দড়ির গিঁটটা খুলে গেল। দরজা খোলার পরও মুরগিগুলো টুঁ শব্দ করেনি। কারণ চারপাশে ঘন অন্ধকার। আলো ঢুকলে হয়তো ওরা কক্-কক্ করে উঠত। কিন্তু এখন ওইপথে আরও এক পশলা অন্ধকার ঢুকেছে। 'অয় খেয়াল রাহিছ' ফিসফিস করে জামালের উদ্দেশে কথা ক'টা বলেই সলিম খোঁয়াড়ের ভেতর ওর লম্বা হাত ঢুকিয়ে দেয়। কয়েক সেকেন্ড পরেই মুরগিগুলো একসঙ্গে কক্-কক্ করে ওঠে। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ওদের ঘরের ভেতর ঠিক কী ঘটছে, প্রাণীসব তা বুঝে উঠতে না উঠতেই সলিমের হাত দ্রুত বের করে নিয়ে আসে গোটা তিনেক পাখি। তারপর চোখের পলকে ওরা উঠান ত্যাগ করে। মুরগিগুলোর গলা চেপে ধরায় তারা পরে আর শব্দ করতে পারেনি। নিরাপদ দূরত্বে চলে আসার পর রশিদ শিকারগুলোর গায়ে একবার টর্চ মারে। মুরগির সাইজ দেখে তারা খুশি হয়। কী ভেবে দ্বিতীয়বার টর্চ জ্বালে রশিদ; জ্বেলে অবাক হয়, ও আল্লা! এইডা কী করছোস? টর্চটা অনেকক্ষণ জ্বালিয়ে রাখলে বাকি দু'জনও বিষয়টি সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়। দুটি মুরগির সঙ্গে একটা হাঁস! জামাল বলে, হায় হায়! ঠিকই তো! কিরে সলিম, কেমুন অইল কামডা?
সলিম নির্বিকারভাবে বলে, অইলে কী করুম! আন্দারের মইদ্দে কিছু বুজা যায় কোন্ডা মুরগি, কোনডা আঁস?
জঙ্গলঘেরা মেঠোপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রশিদ বলে, ফিরোজ-রমজান অরা তো আঁস খায় না। তাইলে কি দুই জায়গায় মাংস রান্না অইব? সলিম ধমক দেয়, তর মাথা অইবো! চুপ থাক!
জামালের মনের ভেতরটা তখন হাসিতে ভরে গেছে। শুধু মুখ ফুটে হাসতে পারছে না। সে এখন বলে, দুই জায়গায় পাক করন লাগবো না, একটা বুদ্ধি আছে। খালি আর একবার একটু সাঅস করতে অইবো, ব্যস!
হ্যাঁ, আরও একবার সাহস তারা করেছিল বটে। পশ্চিমপাড়ার শেষ মাথায় যে প্রায় বিচ্ছিন্ন বাড়িটি তারা টার্গেট করেছিল সেখানে সুবিধা করতে না পেরে অবশেষে ব্রাহ্মণপাড়ার ওই কাজিবাড়ির উঠানে গিয়ে ওঠে। কাজিদের খোঁয়াড় থেকে একটি মাত্র মুরগি নিয়েছিল তারা। ফলে খুব তাড়াতাড়ি কাজটা সারতে পেরেছিল। জামাল এর আগে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে নানারকম দুষ্টুমিতে অংশ নিয়েছে; কিন্তু নিজ হাতে মুরগি চুরির মতো অপকর্ম করেনি, এটা ঠিক। নিজেদের আস্তানায় ফিরে আসতে আসতে ভাবনামনস্ক, কিঞ্চিৎ অনুতপ্ত জামাল তাই মনে মনে বলে, যাউক, গেরস্তের ক্ষতি তো আর করি নাই! একটা মুরগি আনছি ঠিকই; তার বদলে একটা আঁস দিয়া আইছি। এভাবে সে নিজের অপরাধবোধকে হালকা করতে চায়।
আ! সামান্য পয়সায় দুষ্টু ছেলেদের মহাভোজ হয়েছিল পরদিন। তবকপুর গ্রামে এক আশ্চর্য ঘটনাও ঘটেছিল পরদিন সকালে। সেই অভাবিত, অপ্রত্যাশিত ঘটনার পেছনের ঘটনাটি উদঘাটনের কোনো চেষ্টা না করে গ্রামবাসী বছরের পর বছর গল্পটি বলেই চলেছে! তারা গল্পটি উপভোগ করেই চলেছে! 

*************************************************************************************************************************

 জোছনা রাতের ভালবাসা


মিজানুর রহমান রানা

কলেজ থেকে ফিরে মনটা বিষণœ হয়ে গিয়েছিল বলে শুয়ে পড়ছিল তিতি। ঘুম থেকে উঠে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হল, ‘উহ্ রাত দশটা।’ উঠে বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো। পরিপূর্ণ চাঁদ ভালবাসার জোছনা পৃথিবীর প্রান্তরে বিছিয়ে দিয়েছে। দুরে তাকালে মনে হয় যেন জোছনার গভীর সমুদ্র।
চাঁদের পরিপূর্ণ অপূর্ব শোভা তিতি আজই উপলব্ধি করল। সুন্দর কোনো কিছু মনের গহীন কোণে প্রতিফলন ঘটাতে হলে সুন্দর মনে অবগাহন করতে হয়। পরিপূর্ণ জোছনা রূপী ভালবাসায় সে মনের অজান্তে বলে উঠল, ‘আহ্ কী  সুন্দর দৃশ্য!’
‘আপু কী হয়েছে রে!’  ছোট বোন তিরনা পাশে এলো।
‘ত্ইু কার সাথে কথা বলছিস আপু?’
‘চাঁদের জোছনার সাথে।’
‘ধুৎ! জোছনাতো কতোই দেখেছি, এটা দেখার কিছু আছে?’
ব্যথিত হলোনা তিতি। বলল, ‘শোন তিরনা, মাথায় সুন্দর আইডিয়া এসেছে। জোছনার রূপের সাগরে সাঁতার কাটব। যাবি আমার সাথে?’
তাকিয়ে আছে তিরনা। ভাবছে  তার বড় বোনটা কী পাগল হয়ে গেল?
‘জোছনার রূপের সাগরে সাঁতার কাটবি? মহিলা হিমু নাকি? ’
“হিমু-টিমু নয়। প্লাবণের সাথে আমার বন্ধুত্বের অবসান হয়েছে। ও আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। তাই দুঃখ ভুলতে জোছনার প্লাবণে ভাসবো। সূর্য থেকে ধার করে চাঁদ ভালবাসায় পৃথিবীর প্রান্তরে ভালবাসার জ্যোতি ছড়ায়। সেই ভালবাসাকে আঁকড়ে সাঁতার কাটবো জোছনা নদীতে। যেখানে কোনো স্বার্থপরতা। যাবি সাথে?
দু'বোন নেমে এলো দো’তলা থেকে মায়ের চুপিসারে। রাস্তায় মানুষ-জন নেই। নিরিবিলি পরিবেশ চারদিকে। ওরা হাঁটছে রাস্তায়। পাশে বিরাট মাঠ, অদূরে একটা বটগাছ। সেখানে মানুষ-জন বসার বেঞ্চি আছে।
‘আপু এই রাত-বিরেতে যদি পাড়ার সেই বখাটে মাস্তানগুলো আমাদের কোনো অঘটন ঘটিয়ে দেয়?’’ তিরনা ভয় পাচ্ছে।
‘বখাটে ছেলেরা আমাদের মতো জোছনার রূপে পাগল হয় না। ওরা জোছনার এই রাতে ঘর থেকে বের-ই হবে না। চল্।”
দু'বোন প্রায় বটগাছটার কাছাকাছি চলে এসেছে। গুনগুনিয়ে গান গাইছে তিতি। এমন সময় একি! বটগাছটার ওপাশ হতে অস্পষ্ট তিনটি ছায়ামূর্তি অবয়ব ভেসে উঠল। ওরা ক্রমশঃ এদিকেই আসছে।
ভয় পেল তিরনা। পিছু হটতে লাগলো। খপ্ করে ওর হাত ধরে ফেলল তিতি। ‘ভয় পাবি না, যারা এমন একটি পবিত্র রাতে ঘুরে বেড়ায় ওরা তি করবে না ।’
তিন যুবকের চেহারা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হলো। তিতি ও তিরনা ওদের চিনতে পারলো। শাওন, কবির ও অনাবিল। সবাই ওদের ভয় পায়।
ওরা এক এক করে দু'বোনের সামনে হিন্দী ছবির নায়কের মতো পা-দু'টো ফাঁক করে বুকের জমিনে হাত রেখে দাঁড়াল।
তিরনা চলে যেতে চাইল, কিন্তু বাধা দিল শাওন। ‘কোথায় যাচছ তোমরা?’
‘জোছনার সাগরে সাঁতার কাটতে। যাবেন?’
হতবাক ওরা। বলে কী মেয়েটা! রাতে নির্জন মাঠে একটি মেয়ে এভাবে কথা বলতে পারে? ওর মনে কোনো ভয় নেই?
‘তুমি কী জানো কী বলছ?’
‘জানি। চলুন না আমাদের সাথে ওই নদীটার পাড়ে। পাথরের উপর বসে জোছনা ভরা পানিতে পা’ছড়িয়ে বসে জোছনার অপূর্ব সুধা উপভোগ করবো।’
‘তুমি কী আমাদের চিন না? আমরা এ পাড়ার বখাটে ছেলে।’
‘আপনার গায়ে লেখা আছে?’
তিরনার কথায় উচ্চস্বরে হেঁসে উঠে ছেলেরা, বলে, ‘ঠিক আছে, তোমরা কোথায় যাচ্ছো কোন্ রূপের নদীতে?
মেঘনার পাড়ে এসে থামল ওরা। পাথরের ব্লক ফেলা হয়েছে ভাঙ্গন রোধে। সবাই ব্লকের ওপর বসে পড়ল। এর মধ্যে শাওন একদম পানির কিনারে ব্লকের ওপর বসল নদীর পানির উপর মুখ রেখে। সে গান গাইছে-
“আমায় যদি গো ভালবাস তুমি প্রেম দিও জোছনা রাতে......তার দু’চোখ দিয়ে অশ্র“ গড়িয়ে পড়ছে পানিতে; চাঁদের রূপালী আলোয়  অশ্র“ফোঁটাগুলো মুক্তোর মত ঝিকমিক করে জ্বলতে জ্বলতে যেন পড়ছে নদীর বুকে।
শাওনের কাছে এসে বসল তিরনা। বলল, তোমার মনে কী খুব দুঃখ?
শাওন পকেট হাতড়ে একটি চিরকুট বের করল। তাতে লেখা আছে-‘যদি ভালবাস’।
তিরনা বলল, অবশ্যই। এমন জোছনা রাতে শুধু ভালবাসাই মানায়, দুঃখ নয়। সে শাওনের দু'চোখের অশ্র“বিন্দু মুূেছ দিল।
 
লেখক পরিচিতি: পরিচালক, মদিনা কমপিউটার সিস্টেমস্, স্ট্যান্ড রোড, চাঁদপুর
*************************************************************************************************************************