সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

title

শামসুর রাহমানের গান

‘আমি প্রতিদিন তোমাকেই দেখি’

বাবু রহমান | ২২ december ২০১০ ২:৩১ অপরাহ্ন

shamsur-rahman.jpg
শামসুর রাহমান, ১৭.৮.২০০৫, সন্ধ্যা ৭:৩০, বেঙ্গল গ্যালারি।। ছবি: লুৎফর রহমান নির্ঝর

কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯—১৭ .৮ .২০০৬) রচিত একটি গানের সুরকার ছিলেন সমর দাস (১৯২৫—২০০১)। শ্রদ্ধেয় সমর দাস আমাকে কবির যে গানটি শিখিয়েছিলেন—কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রথমে সেই গানের পুর্ণ বাণী এখানে তুলে দিচ্ছি:

স্বর্ণলতায় ঝর্ণাতলায় দোলন-চাঁপার গাছে॥
আমি প্রতিদিন তোমাকেই দেখি
দেখি হৃদয়ের কাছে॥

স্বদেশ আমার তোমার দু’চোখে
কী মায়া দেখি যে আনন্দ-শোকে
বোঝাতে পারিনা সে ভাষা আমার
চোখের তারায় নাচে॥

যে ফুল ফোটাও ধূসর-ধূলায় প্রাণ মাতে তার গন্ধে
যে নদী বহাও উদ্দাম স্রোতে নেচে উঠি তার ছন্দে।

নিত্য তোমার রূপের ছায়ায়
কত যে কাহিনী কবি খুঁজে পায়
তোমার মাঝে ফসলের ঘ্রাণে
জীবনেরই গান আছে।।

কবি যেমন প্রতিদিন দেশ-মাতৃকাকে দেখেন , আমিও যেন তেমনি প্রতিদিন কবি শামসুর রাহমানকে দেখি হৃদয়ের কাছে। শামসুর রাহমান আপদমস্তক একজন আধুনিক কবি। সাথে রয়েছে দেশপ্রেম। উপরোক্ত গানটিতে কবির ঈষিকায় শব্দের যে বর্ণিল ছটা প্রেম-প্রকৃতি ও নিসর্গ ক্যানভাসে উদ্ভাসিত তা প্রকৃতই মনোহরা। আধুনিক এই কবির পেছনে বিশ্বাস গণমুখী গ্রামীণ ঐতিহ্যে। কিন্তু তাঁর কলম যেখানে সরব সেখানে কবির কবিত্ব পুরোমাত্রায় পূর্ণতা পায়। বাংলা গানের ইতিহাসে শামসুর রাহমান সংখ্যাধিক্যে না হলেও মানের পাল্লায় উৎকর্ষতা ছুঁতে পেরেছে বলেই আমার বিশ্বাস। কবিকে একজন গীতিকার হিসেবে বিচার করতে গেলে বাংলা গানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্যক তুলে ধরা প্রয়োজন। তবেই শামসুর রাহমানের স্থান ও মান নির্ধারিত হবে। সেই সূত্রেই হাজার বছরের সেই গীতকবিদের দিকে একটু ফিরে তাকানো যায়।
(সম্পূর্ণ…)

75

‘গানের মেহবুবা’ আশা ভোঁসলে

আশীষ চক্রবর্ত্তী | ১০ নভেম্বর ২০১০ ১২:২২ অপরাহ্ন

lata_family.jpg………
মঙ্গেশকর পরিবার
………

বড়লোকের আদরের দুলারি বাড়ি ছেড়েছে গরিবের ছেলের হাত ধরে। মেয়ের বাবা-মা সৎ, সাহসী অথচ বেকার ছেলের সঙ্গে প্রেমটাকে মেনে নিলে পালাতে হতো না। যা হোক, পালিয়ে গিয়ে বিয়ে, তারপর স্বাভাবিক নিয়মেই শুরু দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই। অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এমন জীবনের সঙ্গে মেয়েটির প্রথম পরিচয়। প্রেমকে সার্থক করতে সে জীবন হাসিমুখেই বরণ করল সে। তার প্রেরণায় শূন্যহাতে জীবনযুদ্ধে নামল ছেলেটি। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর একসময় প্রতিষ্ঠিতও হলো। বড়লোক শ্বশুর অবশেষে কদর বুঝলেন তার। ব্যস, কাহিনীর মধুরেণ সমাপয়েত।

এমন মুখস্ত কাহিনীর অন্তত কয়েকশ ছবি হয়েছে মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। আশা ভোঁসলের জীবনকাহিনীর শুরু খানিকটা একরকম হলেও বাদবাকি সবকিছু বড় বেশি অন্যরকম। প্রথমত বাবা দীনানাথ মঙ্গেশকরের সুসময়ে ছিটেফোঁটা প্রাচুর্য দেখলেও তাঁর অকাল মৃত্যু পুরো পরিবারকেই ফেলে দেয় ভয়ঙ্কর বিপদে। জীবদ্দশায় বিপর্যয়ের পর বিপর্যয় দেখেছেন দীনানাথ। বিয়ে করেছিলেন মাত্র ২১ বছর বয়সে। স্ত্রী নর্মদার বয়স তখন ১৯। দীনানাথ তাঁকে ভালোবেসে ডাকতেন শ্রীমতি। তো শ্রীমতির এক মেয়ে হলো। মেয়ের নাম রাখা হলো লতিকা। কিন্তু জন্মের কিছুদিন পরই মারা গেল ফুটফুটে মেয়েটি। সন্তান হারানোর দুঃখ সইতে না পেরে শ্রীমতিও পৃথিবীর মায়া ছাড়লেন। দীনানাথ আবার একা! স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় অবস্থা।

তবে বেশিদিন একা থাকেননি। প্রয়াত স্ত্রীর বোন সুধামতিকে বিয়ে করে একাকীত্ব ঘুচালেন। সংসারে একে একে এলো চার মেয়ে লতা, মীনা, আশা, উষা এবং ছেলে হৃদয়নাথ। মূলতঃ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী ও মঞ্চ অভিনেতা দীনানাথ পরে নাটকের গ্রুপ গড়েছেন, প্রযোজনা করেছেন মারাঠি ছবি। বলতে গেলে সবক্ষেত্রেই দেখিয়েছেন অপার সম্ভাবনার ঝলক। অথচ শেষ পর্যন্ত ছবির ব্যবসায়ের ভরাডুবি ঘরে বসালো তাঁকে। সন্তানদের, বিশেষ করে ৪ মেয়েকে গান শেখানোর প্রবল ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আশার গানের প্রতি তেমন ঝোঁক ছিল না। গানে সত্যিকারের টান ছিল বড় মেয়ে লতার। তাকে হাতে ধরেই গান শেখাচ্ছিলেন দীনানাথ। শেখাচ্ছিলেন বড় আশা নিয়ে। একদিন মেয়ে খুব বড় শিল্পী হবে, দিকে দিকে নাম ছড়াবে। খুব বড় মুখ করে কথাটা বলতেনও বন্ধুদের। কিন্তু নিজের ব্যর্থ জীবনের বোঝা বেশিদিন টানতে পারলেন না। হতাশা ভুলতে মদে আসক্ত হলেন, সেই আসক্তি মাত্র ৪২ বছর বয়সে কেড়ে নিলো দীনানাথ মঙ্গেশকরের প্রাণ।

(সম্পূর্ণ…)

62

নজরুলসঙ্গীতের নবজন্মে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা

বাবু রহমান | ২৭ আগস্ট ২০১০ ৮:৪২ অপরাহ্ন

nazrul-112.jpg
নজরুল ইসলাম (২৫/৫/১৮৯৯ - ২৯/৮/১৯৭৬)

ছন্দ ও নবরসের দিক থেকে বাংলা গানের ইতিহাসে সবচে শক্তিশালী, ঋদ্ধ ও ওজঃগুণসম্পন্ন গান কাজী নজরুল ইসলামের। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ-চল্লিশ দশকের এমন কোন শিল্পী নেই যিনি নজরুল সঙ্গীত গাননি। বাংলা গানে প্রাক-নজরুল গীতিকবি ও সুরকার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন ও অতুল প্রসাদ সেন। এঁরা প্রত্যেকেই এক এক জন সার্থক স্রষ্টা। প্রাগুক্ত চারজন স্রষ্টাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন নজরুল। নজরুল গুরু রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। শুধু গানের সংখ্যাধিক্যে নয়।সুরের বাঁধ ভাঙা জোয়ারে ডিস্ক, বেতার (১৯১৯), সবাক চলচ্চিত্র (১৯৩১), মঞ্চ নাটক, পত্র-পত্রিকাসহ গণমাধ্যমকে ভাসিয়ে সয়লাব করে দিয়েছিল তাঁর গান।

—————————————————————-
‘নবযুগ’ পত্রিকায় কবি তখন স্বাক্ষরযুক্ত সম্পাদকীয় লেখেন। এক সংখ্যায় লিখলেন ‘পাকিস্তান না ফাঁকিস্থান?’ আর যায় কোথায়, ভীমরুলের চাকে ঢিল ছোঁড়া ছাড়া আর কী? তরুণ এই পাকিস্তান আন্দোলনকারীরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন।… আক্রমণের পর ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি কবি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তার পিঠে সেই আঘাতের চিহ্ন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কবি বহন করছিলেন। বাংলাদেশে কবির ব্যক্তিগত সহকারী শফি চাকলাদার সেকথা অকপটে স্বীকার করেছেন। ছবি তুলে রেখেছেন, কিন্তু কাউকে দেননি।… লুম্বিনী হাসপাতালে শেকল দিয়ে বেঁধে, লোক-আড়ালে কবিকে নিঃশেষ করে দেয়া হলো।
—————————————————————-
নজরুলের শিষ্য হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন চিত্ত রায়, জগৎ ঘটক, সন্তোষ সেনগুপ্ত, দুর্গা সেন, কমল দাশগুপ্ত, রঞ্জিত রায়, গিরীণ চক্রবর্তীসহ আরও অনেকে। আর এঁদের সেই সৃষ্টিকে ধরে রেখেছিলেন সে সময়ের কণ্ঠশিল্পীবৃন্দ। বিশেষ করে কে. মলিক, আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, ভবানী দাস, কমলা ঝরিয়া, সত্য চৌধুরী, জগন্ময় মিত্র, বীণা চৌধুরী, কমল দাশগুপ্ত, নিতাই ঘটক, সুধীরা সেনগুপ্তা, কানন বালা, পদ্মরানী চ্যাটার্জী, বেচু দত্ত, আব্বাস উদ্দীন, দিলীপ রায়, বরোদা চরণ গুপ্ত, বিজনবালা ঘোষ দস্তিদার, মনোরঞ্জন সেন, উমাপদ ভট্টাচার্য, নীহারবালা, আব্দুল লতিফ, হরিমতী, আশ্চর্যময়ী দাসী, সরযুবালা, ধীরেন দাস, মৃণাল কান্তি ঘোষ, ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র, রথীন ঘোষ, রাধারানী দেবী, রত্নেশ্বর মুখার্জী ও সিদ্ধেশ্বর মুখার্জীসহ অনেকেই তাঁর গান গেয়ে ধন্য হয়েছেন। (সম্পূর্ণ…)

62

সংযোজন

(আমার) রবিভাব… ভাব ও অভাব

মানস চৌধুরী | ৬ জুন ২০১০ ৮:৩০ অপরাহ্ন

পূর্বকথা এবং পূর্বরাগ

“তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী…”

স্কুলে থাকাকালীন, নেহায়েৎ নিজেরই লব্ধানুশীলনে, নানান রকমের বইপত্র ইঁদুরের মতো কামড়ে কামড়ে দেখি যখন, তখন সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনীকিতাব থেকে জানতে পারি যে তিনি কৈশোরে প্রায় শ’ পাঁচেকtagore_mc.jpgরবীন্দ্রসঙ্গীত মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। আমৃত্যু সেই দক্ষতাটা তিনি ধরে রেখেছিলেন। এই ঘটনা জেনে আমার দুটো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আমারই সমবয়সী দূরবর্তী একটা ছেলের অর্জিত দক্ষতা ও রবীন্দ্রপ্রেমে আমি ঈর্ষান্বিত বোধ করি। এবং দ্বিতীয়ত, একটা জিদ দেখা দিয়েছিল ঠিক একই ভাবে রবীন্দ্রপ্রেমের প্রমাণ দিতে। কিন্তু ঘন তদন্তে আবিষ্কার করা সম্ভব, অন্ততঃ এতটা কাল পর যখন অনেক খতিয়ে বিষয়টাকে দেখা যায় বলে আমার মনে হচ্ছে, ওই জিদটা আসলে এক প্রগাঢ় অহংকার এবং অহংকারটা সাংস্কৃতিক উচ্চম্মন্যতার। রবীন্দ্রনাথ সেখানে নিমিত্ত বটে, কারণও বটে। গন্তব্য যেমন, বাহনও তেমনি। এই ঘোরতর পরিস্থিতি বাংলা অঞ্চলের ইতিহাসেই প্রোথিত। কিন্তু আমি সংকল্প করেছি আমি আমার কাহিনীই আজ বলব।


গান করছেন মানস চৌধুরী

পরিস্থিতিটা আরও জটিল হয়ে গেছিল স্থানীয় এক গায়কের কারণে। তাঁর সঙ্গীতসুধা এবং উপস্থিতি আমার জন্য এক অনির্বচনীয় ফলাফল বয়ে আনত। তাঁকে গাইতে শুনলে আমার কণ্ঠনালী ফেঁপে ফেঁপে উঠত, গলা নিশপিশ করত। কোনো মঞ্চে তাঁকে উঠতে দেখলে আমার হাত-পা কেঁপে কেঁপে উঠত। তাঁর দৃষ্টিসুধা কোনোভাবে আমার উপর নিপতিত হলে, এমনকি ডাক্তার না-দেখিয়েই আমি টের পেতাম আমার নাড়ির গতি বেড়ে যেত, আসে যায় না তা সেই দৃষ্টিপাত ইচ্ছাকৃত নাকি অকস্মাৎ ইচ্ছা-নিরপেক্ষ নিপতন। তিনি কোনো কারণে গাণের কোনো চরণ আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে গাইলে আমার ইচ্ছা করত তাঁর চরণ বুকে করে রাখি, শিব যেমনটা রেখেছিলেন। যেহেতু তিনি নারী ছিলেন এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন, খুব জটিলভাবে আমি নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ গাইয়ে হিসেবে স্বপ্নরচনা করতে থাকি—অন্তত ততখানি যতখানি হলে আমাদের বিচরণ-এলাকায় দুজন একই পঙ্‌ক্তিতে উচ্চারিত ও বিবেচিত হই। বড় জটিল সেই কামনা। আমি তাঁকে নারী বলছি বটে, কিন্তু স্থানীয় মুরুব্বিদের বিবেচনায় তিনি বড়জোর কিশোরী ছিলেন। (সম্পূর্ণ…)

75

কাজী নজরুল ইসলাম: এক স্বয়ম্ভর সংগীতসভা

আবদুশ শাকুর | ২ জুন ২০১০ ৬:৪০ অপরাহ্ন

nazrul21.jpg

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে (১৮৬১-১৯৪১) যদি বলি মহাবাগ্মেয়কার, কাজী নজরুল ইসলামকে (১৮৯৯-১৯৭৬) বলতে হয় মহাসংগীতকার। রবীন্দ্রনাথ যদি হন বাংলা গানের প্রাণ, নজরুল তবে বাংলা গানের মন। এভাবে প্রাণ ও মনের দুই প্রতিনিধির ‘প্রাণমন লয়ে’ বাংলা গানের দেহটি গড়ে উঠেছে বলে এ-গানের আলোচনা প্রসঙ্গে দুজনের কথাই এসে পড়ে, যেন এক অনিবার্য পরম্পরাতেই। একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে।

১৯৭৩ সালে পিজি হাসপাতালে অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশনের পরদিন সকালে আমাকে কেবিনে ফিরিয়ে আনার পরেই আমি এপাশ-ওপাশ মাথা খুঁড়ে কর্তব্যরত ডাক্তারের কাছে প্রাণে বাঁচার মিনতি জানাচ্ছিলাম এই বলে:

‘তৃষ্ণায় মরে যাচ্ছি ডক্টর। একটুখানি হলেও পানি দিন আমার কণ্ঠে!’

জবাবে নিশ্চিন্ত ডাক্তার মৃদু হেসে বলেছিলেন:

‘দেহের জলীয় চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনানুযায়ী পানি আমি আপনার ধমনীতে দিচ্ছি, ইন্ট্রাভিনাস ইনফিউশন পদ্ধতিতে। অতএব আপনি নিশ্চিত থাকুন—আপনার কণ্ঠ পানি বিলকুল না-পেলেও প্রাণ পুরোপুরিই পাচ্ছে। সুতরাং পানির অভাবে প্রাণে মরার কোনো কারণ নেই আপনার।’

বললাম:

‘প্রাণে বাঁচলে কি হবে ডাক্তার, তৃষ্ণার জ্বালা তো মিটছে না।’

বললেন:

‘ওটা মস্তিষ্কের তৃষ্ণা-কেন্দ্র দ্বারা সৃষ্ট সংবেদন, সে বেদন মেটাতে আমরা এ-মুহূর্তে পারব না। কতক্ষণে পারব তাও নির্ভর করবে অপারেশনোত্তর অনেক অজানা ফ্যাক্টর জানার ওপর। সুতরাং যত কষ্টই হোক, আজকের মতো সে-জ্বালা আপনাকে সয়েই যেতে হবে।’

পরের দিন সে-জ্বালা প্রথম বারের মতো মেটানোর সময়ে আমার সর্বশরীরে যেন পুলকের লহর বয়ে গেল এবং হঠাৎ মনে হল—কণ্ঠ দিয়ে যে-মধু এখন যাচ্ছে এ হচ্ছে নজরুলসংগীত। আর কাল বিকাল থেকে আজ সকাল পর্যন্ত ধমনি দিয়ে যে-সুধা যাচ্ছিল সে ছিল রবীন্দ্রসংগীত। অন্য কথায়, রবীন্দ্রসংগীতের কাব্যের লীলা প্রাণের পাওনা মেটালেও মনের চাহিদা মেটানোর জন্য নজরুলসংগীতের সুরের খেলা লাগে। কারণ রবীন্দ্রসংগীত প্রাণের আরাম হলে, নজরুলসংগীত মনের ব্যায়াম। দুয়ের মধ্যেকার এই বৈষম্য একেবারে বৈজিক, বরঞ্চ বলা যায় বংশগত। বংশ বলতে বোঝাচ্ছি সংগীতবংশ—ধ্রুপদ ও খেয়ালের।

খেয়াল ধারার নজরুলসংগীতই শুধু বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধের বিষয়বস্তু, ধ্রুপদ ঘরানার রবীন্দ্রসংগীত নয়।

উনিশ শতকের বিশের দশকে কলকাতায় লেখক-গায়কদের দুটি বিখ্যাত আড্ডা ছিল। একটি মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভারতী-অফিসে, ‘ভারতীর আড্ডা’, যেখানে আসতেন—অতুলপ্রসাদ সেন, দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শিশির ভাদুড়ী, হেমেন্দ্রকুমার রায় প্রমুখ। অপরটি গজেন্দ্রচন্দ্র ঘোষের বাড়ির ‘গজেনদার আড্ডা’। এখানে আসতেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উস্তাদ কারামাতুল্লা খাঁ, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, নরেন্দ্রদেব প্রমুখ। দুটি আড্ডাতেই যাতায়াত ছিল নজরুলের। (সম্পূর্ণ…)

62

নজরুলের হারিয়ে যাওয়া গান
“ওরে আশ্রয়হীন শান্তিবিহীন
আছে তোরও ঠাঁই আছে…”

বাবু রহমান | ২৬ মে ২০১০ ১১:১১ অপরাহ্ন

nazrul_babu.jpg

নজরুল রচনার কিয়দংশ এখনো অনাবিষ্কৃত। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তাঁর সৃষ্টির নানা দিক প্রকাশিত হয়। এরপর তা দুষ্প্রাপ্যের খাতায় নাম লেখায়। নজরুলের অবমূল্যায়ন, সাতচল্লিশের দেশবিভাগ নজরুল শিল্পী, গবেষক ও সাহিত্যিকদের হতাশ করে তুলেছিল। কবিবন্ধু কমরেড মুজফ্‌ফর আহমদ এককভাবে নজরুলচর্চা শুরু করেন। বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, পবিত্র মুখোপাধ্যায়, কমল দাশগুপ্ত প্রমুখ ষাটের দশকের প্রথম দিকে নব উদ্যমে কাজ শুরু করেন নজরুল নিয়ে। নবজাতক প্রকাশনীর মাজহারুল ইসলাম, কবি জিয়াদ আলী, নজরুলের আত্মীয় কাজী আব্দুল সালাম এ প্রচেষ্টায় শরীক হন। ঢাকাতে নজরুল একাডেমি প্রাতিষ্ঠানিক কাজ শুরু করে। কবি আবদুল কাদির, খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীনসহ অনেকেই ঢাকায় নতুন করে নজরুলচর্চায় নিয়োজিত হন। তাতে কবির ছড়িয়ে থাকা হারিয়ে যাওয়া অনেক কবিতা, গান, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, নাটক, চলচ্চিত্র, রেকর্ড আবিষ্কৃত হতে থাকে। সেলিনা বাহার জামান, সঙ্গীতজ্ঞ আব্দুস সাত্তার, সঙ্গীতজ্ঞ মফিজুল ইসলাম, কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ কবির হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে।


গান করছেন বাবু রহমান; তবলায় আবদুল কাদের

দুই.
আমি নজরুলের ওপর কাজ করছি দীর্ঘ দিন ধরে। কাজ করতে গিয়ে অনেক নতুন জিনিস পাচ্ছি, তখন আনন্দে উদ্বেলিত হচ্ছি। তো সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগরে আমার এক ছাত্র নির্ঝর অধিকারী সংবাদ দিলো যে পাবনায় একটি নাটক খুঁজে পাওয়া গেছে ১৯৪০ সালে প্রকাশিত, যেখানে নজরুলের কিছু গান আছে। প্রথমে আমি বিষয়টি পাত্তা দেই নি। তারপরে যে ভদ্রলোকের কাছে এই নাটকের বইটি ছিল, তাঁর সঙ্গে আমি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করি। তখন ওই ভদ্রলোককে—তাঁর নাম আবুল কাশেম, তিনি সংগীত শিল্পী—আমি বলি যে, আপনি নাটকটি পাঠিয়ে দিন ফটোকপি করে। উনি বললেন, বইটি বেশ পুরোনো, পাঠানো যাবে কিনা সন্দেহ আছে, আমি গান কয়টি পাঠিয়ে দিচ্ছি আগে।

যাই হোক পরে আমি বইটি পেয়ে গেলাম। নাটকের নাম বিদ্রোহী বাঙ্গালী। রচয়িতা শ্রীযুক্ত রমেশ গোস্বামী। পাবনার সপ্তর্ষী পাঠাগারে এটি রক্ষিত ছিল। (সম্পূর্ণ…)

75

শাহ আবদুল করিমের জীবনসঙ্গীত

সাইমন জাকারিয়া | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ ১১:০০ পূর্বাহ্ন

sak.jpg
শাহ আবদুল করিম (সুনামগঞ্জ ১৫/২/১৯১৬ - সিলেট ১২/১০/২০০৯)

প্রসঙ্গকথা
১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ সকাল ৭ টা ৫৮ মিনিটে দেহ রেখেছেন বাংলাদেশের সুবিখ্যাত সঙ্গীতকার সাধক শিরোমনি শাহ আবদুল করিম। তিনি ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বৃহত্তর সিলেট জেলার সুনামগঞ্জের দিরাই থানার উজানধল গ্রামে তার জন্ম গ্রহণ করেন। সঙ্গীতজীবনের প্রথম দিকে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে মালজোড়া গান গেয়ে ফিরতেন। জীবদ্দশায় রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদকসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর গান গ্রামের সাধারণ থেকে শুরু করে শহুরে আধুনিক ও সাম্প্রতিক সঙ্গীতধারা ব্যান্ডসঙ্গীতের শিল্পীদেরও আকৃষ্ট করেছে এবং বহু শিল্পী তাঁর গান গেয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। বহু জনপ্রিয় গানের বাণীর এই মহান রচক ও সুরস্রষ্টা শাহ আবদুল করিম-এর জীবন, সঙ্গীত ও সময় নিয়ে গত বছর আমি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শাকুর মজিদ-এর জন্য একটি প্রামাণ্যচিত্রের পাণ্ডুলিপি তৈরি করি (উল্লেখ্য, তার আগেই তিনি ভাটির পুরুষ নমে একটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন)। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আমার সেই পাণ্ডুলিপিটি আজও চিত্রভাষ্য অর্জন করতে পারেনি। শাহ আবদুল করিমের দেহগত অনুপস্থিতির সুযোগে আমার পাণ্ডুলিপিটির প্রয়োজনীয় অংশের বর্ণনা (ধারাভাষ্য), সাক্ষাৎকার, গান ইত্যাদি পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হলো।

ভাটির পুরুষের সূচনাকথা

দক্ষিণ এশিয়ার একটি নদীমাতৃক রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বিশাল সমুদ্র উপকূলবর্তী এদেশের মানুষ প্রাণশক্তিতে ভরপুর। তাঁরা নিজের দেশকে ধানের দেশ গানের দেশ ভেবেই আনন্দ খুঁজে ফেরে। তাঁদের গানপাগল কর্মনিষ্ঠ প্রাণশক্তির কাছে বারবার পরাস্ত হয় নানাবিধ প্রাকৃতিক বিপর্যয় বন্যা-খরা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি, এমনকি বিচিত্র রাজনৈতিক সঙ্কটকেও তারা অতিক্রম করে যায় গানের বাণী ও সুরে। ব্যক্তিগত জীবনের প্রেম-বিরহ ইত্যাদি মানবিক জীবনাচারকে তারা মিশিয়ে দিতে জানে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পৌরাণিক চরিত্রের মানবীয় লীলার সঙ্গে।
—————————————————————–
নিজের এলাকার সাধক রাধারমণের গানের সঙ্গে নিজের গানের মিল-অমিল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শাহ আবদুল করিম বলেছিলেন, রাধারমণের গানের সাথে আমার গানের বেশ মিল আছে। ছোট বেলা থেকে তার গান শুনে আসছি। তাঁর অনেক তত্ত্ব গান আছে, যা হিন্দু মুসলমান সবাই পছন্দ করে। তবে, খুব গভীর তত্ত্ব নাই। তাঁর গানের মধ্যে রাধা-কৃষ্ণের ভাবধারার গান বেশি। আর আমি দেহতত্ত্বকে বেশি ভালোবেসেছি। দেহের মাঝেই সবকিছু আছে।
—————————————————————-
আকাশ, মাটি, আলো, হাওয়া, জল সর্বোপরি প্রকৃতির আবেগ নিয়ে এদেশের মানুষ প্রায় দুই হাজার বছর ধরে বাংলা গানের যে ঐতিহ্য প্রবহমাণ রেখেছিলেন তাঁদেরই একজন মহৎ হলেন ভাবসাধক শাহ আবদুল করিম। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বৃহত্তর সিলেট জেলার সুনামগঞ্জের দিরাই থানার উজানধল গ্রামে তার জন্ম।

তিনি শুধু নিজেই গান লেখেননি তাঁর জীবদ্দশাতে তাঁকে নিয়েও রচিত হয়েছে গান:

“যুগের বাউল আব্দুল করিম
জন্ম নিলেন উজানধল।
তোমার গানে কতজন পাগল…॥”

বৃহত্তর সিলেট জেলার অনেক শিল্পীই সুগভীর ভক্তিতে নিত্যই তাঁর নামে এ ধরনের বন্দনা গেয়ে ফেরেন।(সম্পূর্ণ…)

75

বাংলা সিনেমার নজরুল

আহমাদ মাযহার | ২৮ আগস্ট ২০০৯ ৩:৫৫ পূর্বাহ্ন

narod_nazrul.jpg……
ধ্রুব (১৯৩৪)ছবিতে নবীন নারদের ভূমিকায় কাজী নজরুল ইসলাম
……
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন নানাদিক-অভিমুখী সৃষ্টিমাতাল এক মানুষ। ভারতবর্ষের সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক চাঞ্চল্যের এমন এক যুগে তাঁর জন্ম যখন এ-অঞ্চলের মানুষের মধ্যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা সবে জেগে উঠতে শুরু করেছে। ইহজাগতিকতা ও মানবিকতার বোধ, অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা, তীব্র আত্মজাগরণাকাঙ্ক্ষা ও সিসৃক্ষার উদ্দীপনা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য তখন বাংলাদেশের বেশ কিছু মানুষের মধ্যেই স্ফুরিত হয়েছিল। সকলেই হয়তো স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিভার তুঙ্গকে স্পর্শ করতে পারেন নি, জীবনের সামগ্রিক সংগ্রামের চিহ্নও হয়তো উজ্জ্বলিত হতে পারে নি তাঁদের কারও কারও
—————————————————————–
রবীন্দ্রনাথের গান সঠিক সুরে গাওয়া হয়নি এই মর্মে বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রসঙ্গীত অনুমোদন বোর্ড গোরা (১৯৩৮) ছবিটি সম্পর্কে আপত্তি জানিয়েছিল। ফলে ছবি মুক্তির ব্যপারে সৃষ্টি হয়েছিল জটিলতা।… নজরুল কিছুমাত্র চিন্তা না করে ছবির ফিল্ম এবং প্রজেক্টর নিয়ে সোজা বিশ্বভারতীতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করেন। সব শুনে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কী-কাণ্ড বল তো? তুমি শিখিয়েছ আমার গান আর ওরা কোন্‌ আক্কেলে তার দোষ ধরে। তোমার চেয়েও আমার গান কি তারা বেশি বুঝবে? আমার গানে মর্যাদা কি ওরা বেশি দিতে পারবে?’ নজরুল তখন রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে একটি খসড়া অনুমোদনপত্রে সই করিয়ে নিয়েছিলেন।
—————————————————————-
জীবনে। কিন্তু স্বীকার করতে হবে যে এই অঞ্চলের বেশ কিছু ব্যক্তিমানুষের মধ্যে উপর্যুক্ত মানবিক বোধসমূহের জাগরণ দেদীপ্যমান হয়ে উঠেছিল। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সেইসব মানুষদের মধ্যেও অগ্রগণ্য। বাংলার রেনেসাঁসের উপর্যুক্ত প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো বিপুলভাবে সমাহৃত হয়েছিল নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবনে। সামগ্রিকভাবে নজরুল সম্পর্কে এ-কথা মনে রাখলে আমাদের পক্ষে অনুভব করতে সুবিধা হবে চলচ্চিত্রের মতো নতুনতর শিল্পমাধ্যমে তাঁর যুক্ত হবার সূত্রকে। (সম্পূর্ণ…)

75

নজরুলের গজলগান

আবদুল মান্নান সৈয়দ | ২৯ আগস্ট ২০০৮ ৬:৫৫ অপরাহ্ন

shundarban.jpg
ইন্ডিয়ার সুন্দরপুরে বন্ধুদের সঙ্গে নজরুল

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়কর লেখক। রবীন্দ্রনাথের পর এত বিচিত্রকর্মী লেখক দেখা যায়নি আর। জন্ম ১৮৯৯-এ — সাহিত্যে প্রবেশ ১৯১৯-এ — নিরবতা ১৯৪২-এ — আর মৃত্যু ১৯৭৬-এ। ৭৭ বছরের দীর্ঘ জীবনে সক্রিয় ছিলেন মাত্র ৪৩/৪৪ বছর — তার মধ্যে তাঁর শিল্পজীবন মাত্র ২৩/২৪ বছরের। তাঁর জীবন ও মৃত্যু তাঁর সৃষ্টিকর্মের মতোই আশ্চর্য — বর্ধমানের এক নামহীন পাড়াগাঁয়ে জন্ম, চুরুলিয়া, যে-নামটি আমরা জানি তাঁর জন্যেই — কলকাতায় নীরব হয়ে যান — আর ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।

gazal_age1.jpg
গজল লেখার সময়ে নজরুল, ১৯৩০

তাঁর জন্ম, জীবন ও নীরবতা, আর তাঁর মৃত্যু — এ সময়ের মতোই অস্থির পর্যটন যেন তাঁর শিল্পস্বভাব। এরই মধ্যে, তাঁর অজস্র পরিচয়ের মধ্যে প্রধানতম দুটি পরিচয় — তিনি কবি আর তিনি সঙ্গীতকার। এরকম সমগ্র সঙ্গীতকার বাঙালির মধ্যে জন্মগ্রহণ করেননি আর। একই সঙ্গে তিনি গীতিকার, সুরকার, স্বরলিপিকার, গায়ক, বাদক, সঙ্গীতশিক্ষক, সঙ্গীতগবেষক। আবার নাটকে ও সিনেমায় সঙ্গীত-পরিচালক হিশেবেও তাঁকে দেখা গেছে। বিশের দশকে নজরুল বাংলা কবিতার সম্রাট, তিরিশের দশকে বাংলা সঙ্গীতের সম্রাট। এখানে তাঁর বিশাল সঙ্গীতভাণ্ডারের একটি অংশেরও অংশের পরিচয় নেবো আমরা — তাঁর গজলগান। (সম্পূর্ণ…)

75

শান্তিশর্মা: এক গান্ধর্বীর কথা

দিঠি হাসনাত | ১৪ জুন ২০০৮ ১:৪৬ অপরাহ্ন

কখনও ভাবিনি আমার শান্তিদিদিকে নিয়ে এভাবে লিখতে বসব। শ্রীরাম ভারতীয় কলাকেন্দ্রের নাম আমার স্কলারশিপ ফর্মে আমি লিখেছিলাম শুধু তাঁরই জন্য।

তখন ক্লাস নাইনে পড়ি, ছায়ানটের ছাত্রী। একদিন সন্‌জীদা খালামনি এসে shanti-sarma.jpgবললেন, “আজকে তোরা কেউ ক্লাসের পর বাড়ি যাবি না। গুণী এক শিল্পীর গান শুনে যাবি।” ক্লাশ শেষে সবাই ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের বড় হলরুমে গেলাম। শিল্পী এসে বসলেন। দুপুর ১২টায় ভৈরব গাওয়া শুরু করলেন তিনি। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তখন কিছুই বুঝি না। কিন্তু ভাল লাগতে শুরু করল। শিল্পী ভোরের পবিত্র আবহ তৈরি করলেন সুরের জাল বিস্তার করে। তখন থেকেই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, দিদি এবং দিদির ব্যক্তিত্ব আমাকে খুব আকৃষ্ট করল। এরপর তিনি ২০০৩ সালে বেঙ্গলের ওয়ার্কশপে এলেন। তখনও ভীষণ ইচ্ছা ছিল তাঁর ক্লাসগুলোতে অংশগ্রহণ করার। কিন্তু সুযোগ হয়নি।

তারপর আরও দুটো বছর কেটে গেছে। অনেক কিছু করে যাচ্ছি — মাস্টার্সের পড়াশোনা, স্কুলে পড়ানো — কিন্তু কোনো কিছুই যেন করা হচ্ছে না ঠিকভাবে, তাই অস্থির লাগে। ঠিক করলাম, এভাবে না, গানটা আরও ভালভাবে করা দরকার। অনেক দিনের ইচ্ছা, সব ছেড়ে সবার থেকে দূরে গিয়ে গান করার চেষ্টা করব ঠিকভাবে। কীভাবে তা জানি না। তারপর দিদির কারণেই স্কলারশিপ ফর্মে ডিগ্রী বেছে নিলাম, বেছে নিলাম শ্রীরাম ভারতীয় কলাকেন্দ্র। (সম্পূর্ণ…)

62

লা জওয়াব রফি সাহাব!

আশীষ চক্রবর্ত্তী | ৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ ৩:২৩ পূর্বাহ্ন

লাহোর কান পেতে আছে। আজ কুন্দন লাল সায়গল গান গাইবেন! সায়গল, যার চেহারা আর গানের জন্য সবাই দিওয়ানা। গানের আসরের জায়গাটা rafi.jpg………
মোহাম্মদ রফি (১৯২৪-১৯৮০)
………
লোকে গিজগিজ করছে। হিন্দি ছবির নায়ক-গায়ককে কাছ থেকে দেখতে, তার গান শুনতে ১২/১৩ বছরের এক কিশোরও এসেছে বড় ভাইয়ের হাত ধরে। সবার মাঝে অপেক্ষার উৎকণ্ঠা। শুরু হবে কখন? ‘এক্ষুনি শুরু হচ্ছে অনুষ্ঠান’–ঘোষণাটা যখন এই এলো বলে, সেই মুহূর্তেই বিপত্তি। বিদ্যুৎ বিভ্রাট! মাইক অচল। অনুষ্ঠান পণ্ড হওয়ার উপক্রম। হাজার অনুরোধ-উপরোধেও সায়গল গাইছেন না। অগত্যা লোকজনকে বসিয়ে রাখার জন্য ডাক পড়ল শ্রোতাদের ভিড়ে উপস্থিত স্থানীয় শিল্পীদের। সুযোগ পেয়ে ছুটে গেল সেই কিশোর। কয়েকটি গান গেয়ে দিলো নির্ভয়ে। সায়গল সস্নেহে কাছে ডেকে জানতে চাইলেন, ‘তোমার নাম কী?’ ছেলেটি বলল, ‘মোহাম্মদ রফি।’
sd-burman-with-rafi-sahab.jpg
শচীন দেব বর্মনের সঙ্গে মোহাম্মদ রফি

লাহোরের মানুষের কাছে রফি সেদিন থেকেই তারকা। ২৪ ডিসেম্বর, ১৯২৪ সালে পাঞ্জাবের অমৃতসরের কোটলা সুলতানপুর গ্রামে জন্ম নেয়া যে ছেলেটির দিকে এতদিন কেউ ফিরে তাকাননি, সেদিন থেকে সাহেবেরাও তাকে সমাদর করে নিজেকেই সমাদৃত মনে করেন। অথচ তখনো উস্তাদ আব্দুল ওয়াহিদ খান আর বড়ে গোলাম আলী খানের কাছে ক্লাসিক্যালের তালিম শেষ করতে অনেক বাকি। বড় হওয়ার আগেই কোথাও কোথাও বড় শিল্পীর মর্যাদা পেতে শুরু করায় রফির ভালো তো লাগতোই, লজ্জাও লাগতো ভীষণ।(সম্পূর্ণ…)

62

গানের ‘কত্তা’ শচীন দেব বর্মন

আশীষ চক্রবর্ত্তী | ১ নভেম্বর ২০০৭ ১১:১৯ পূর্বাহ্ন

শচীন দেব বর্মন
সদ্য সুর করা গান গাইছেন তরুণ সঙ্গীতপরিচালক। সুরের সমস্ত লালিত্য ঢেলে গান শেষ করলেন, তাকালেন আসরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রোতা, ফিল্মিস্তানের কর্ণধার এস. মুখার্জীর দিকে। এস. মুখার্জী শুধু শ্রোতা নন, বিচারকও। কেননা তার রায় পেলেই মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে একটা হিল্লে হয়ে যেতে পারে কোলকাতা থেকে আসা সঙ্গীত পরিচালকের। কিন্তু এস মুখার্জী গান শুনলে তো! তিনি তো নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছেন!

পরের দিন আবার হারমোনিয়াম নিয়ে বসা হলো। শুরু হলো গান। শেষও হলো। গায়ক তার কাজ শেষ করে যথারীতি তাকালেন শ্রোতাদের দিকে। সেই লোক রীতিমতো হুইসেল বাজিয়ে ঘুমাচ্ছেন। এভাবে চললো পাক্কা দু’মাস। প্রযোজকের গান শোনা হয়না, মুম্বাইতে (তখনকার বোম্বে) কাজও শুরু করা হয় না সঙ্গীত পরিচালকের। তো একদিন রুটিনমাফিক গান শেষ করে হতাশ গায়ক ভাবছেন, ‘এখানে আর নয়। ফিরে যাবো কোলকাতায়। যা হয় হবে…।’(সম্পূর্ণ…)

 

New

Click to add text, images, and other content

title

কবিতার মোনালিসা


ডাঃ পীযূষ কান্তি বড়য়া

দ্য ভিঞ্চির অমর চিত্রকর্ম মোনালিসা। যদিও আঁকা ছবি, তবুও কিংবদন্তী। বাংলা কবিতায় এ’রকম কিংবদন্তী কম নয়। যে কয়টি কবিতা বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ উল্লেখযোগ্য। এ’সবকে ছাপিয়ে আজও রহস্যে অবগুণ্ঠিত, জননন্দিত হয়ে আছে জীবনানন্দ দাসের ‘বনলতা সেন’। হাজার বছরের বাংলা কাব্যে ‘বনলতা সেন’ যেনো কবিতার ‘মোনালিসা’।
‘বনলতা সেন’ প্রতিটি ছয় চরণের তিন স্তবকে পূর্ণতা পাওয়া অনিন্দ্য কাব্য প্রতিমা। কবিতার প্রথম স্তবকে আমরা পাই এক পথিকের পরিচয়। পথিক আর কেউ নয়, কবি স্বয়ং। জীবনের অভিজ্ঞতায় কবি এতো ঋদ্ধ, কালের কল্লোলের পরিক্রমায় কবি এতো ক্লান্ত যেনো হাজার বছর ধরে তিনি পৃথিবীর পথে এক বাউন্ডুলে। কবি হেঁটেছেন '' ঞরসব ুড়ঁ ড়ষফ মুঢ়ংু সধহ'' এর মতো। কবির এই যাত্রা, এই পরিব্রাজন দশরীরে নয়। কবি যেনো ঘুরে বেরিয়েছেন তার মনোভূমে, মনো-শকটে। কারণ - ‘‘মনং পূব্বং গম্মা, মনোসেট্ঠা মনোমায়া’’। - মন পূর্বগামী। মনের চেয়ে গতিময় অন্যকিছু নয়। কবি মনের শকটে চড়ে সমুদ্রের চলিষ্ণু জলরাশি পেরিয়ে উপনীত হন অতীতের ফেলে আসা নগরে। কবি পৌঁছেন সিদ্ধার্থ গৌতমের স্মৃতিধন্য রাজা বিম্বিসার আর সম্রাট অশোকের রাজত্বে - যেখানে অহিংসা আর মৈত্রীয় আহ্বানে বেজে ওঠে মঙ্গলধ্বনি। অতীত হওয়া সেই জগতেও কবি ছিলেন। যেমনটি কবি ছুটে চলেন ভবিষ্যতের অনাগত কালের অন্ধকার জঠরে ঘুমিয়ে থাকা নগরেও। অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের পরতে পরতে ঘুরতে ঘুরতে কবি যেনো ক্লান্ত প্রাণ। মনের শকট যখন বাস্তবতার নাদ-নিন্দিত সময়ে সম্বিৎ ফিরে পায়, কবি নিজেকে খুঁজে পান জীবনের উত্তাল সমুদ্রের দুগ্ধ ফেননিভ জলরাশিতে। কঠিন জীবন বাস্তবতার কষাঘাত কবির পরিব্রাজক মনকে করে বেদনামথিত। এই সব বিষাদ-সিন্ধুর গর্জন এড়িয়ে কবি খুঁজে পান তার আত্মার আত্মীয়াকে। কবির এই মনো-মানসী কবিকে এনে দেয় দু’দন্ড শান্তি।
কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে পাই কবির মনো-মানসীর পরিচয়। যদিও প্রথম স্তবকে জানা যায়- কবির দয়িতার নাম বনলতা সেন - যার নিবাস নাটোরে। দ্বিতীয় স্তবকের শুরুতেই আমরা পাই এক কেশবতী কন্যার পরিচয়। কেশবতী বনলতার চুল এত ঘন, এত কালো আর এতো লম্বা - যেনো কোন্ অন্ধকার এসে দিশা হারিয়ে দেয়। প্রণয়- প্রহৃত কবির কাছে এই বিদিশা যেনো নেশার ঘোর। কবি এই ঘোর লাগা নিশাকে প্রতিনিয়ত কামনা করেন। কবির দয়িতা যেনো ইতিহাসের প্রসিদ্ধ নগরীর কারুকার্য মন্ডিত মুখশ্রীর অধিকারী। বৌদ্ধ সভ্যতার এক ঐতিহাসকি নগরী শ্রাবস্তী। শ্রাবস্তীর জনপদ কল্যাণীদের খ্যাতি - বৌদ্ধ জাতকে বহুল বর্ণিত। কবি তার দয়িতার মুখশ্রীকে শ্রাবস্তী নগরীর কারুকার্য্যে খচিত মনে করেন। কবির কাছে তার মনো-মানসী যেনো বাতিঘর, আশার-আলো। অতিদূর সমুদ্রের বুকে দিশা হারা নাবিক যেমন সবুজ দ্বীপ দেখে খুঁজে পায় জীবনের আহ্বান তেমনি কঠিন বাস্তবতায় পর্যুদস্ত কবিও তার দয়িতাকে দেখলে আশান্বিত হন। কষাঘাতে জর্জরিত জীবনে পাখির নীড়ের মতো অনিন্দ্য চোখের বনলতা যেন কবিকে বাঁচার প্রেরণা দেয়। কবি আশায় বুক বাঁধেন যখন কবির দয়িতা কবিকে শুধায় - ‘‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’’
কবিতার  শেষ স্তবকে কবির বেদনা ও প্রণয়ের পরিণাম খুঁজে পাই। ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে’। সন্ধ্যা হলো মিলন। দিনকে মিলিয়ে দেয় রাতের সাথে। কবির প্রতীক্ষা অতঃপর নিঃশেষ হতে চায় দয়িতার সাথে যুগল-বন্দিতে। যেভাবে নিশির শিশির পড়ে, কেউ আলাপ পায় না এই শিশির পতনের তেমনি বিকেলের তেজ হারা তপন কিভাবে সন্ধ্যার আলো- আঁধারি পেরিয়ে রাতের তমসায় মিশে যায় তা-ও বুঝা যায় না। এমনই নিঃশব্দ সন্ধ্যার মোহ-মায়াজাল ছাপিয়ে কবি তার দয়িতার প্রতীক্ষায় রাতের বাসরে প্রবেশের ক্ষণ গোনেন। এক সময় পৃথিবীর সকল আলো নিভে গিয়ে নিটোল নিশিথিনী বিছিয়ে দেয় রহস্যের চাদর। এ'যেনো পূর্বকল্পিত কোনো নাট্যের পান্ডুলিপি। দয়িত মিলবে দয়িতার সাথে, কান্ত কান্তিমান হবে কান্তা সমারোহে। কবির মনে আশার রং জোনাকির আলো হয়ে হাজার তারা জ্বালে। জীবনের সায়াহ্নে, যখন সকল লেনদেন চুকে -বুকে পার্থিব বেদনার বিলয় ঘটে কবি একাকী সামনে পান তার প্রিয়াকে। জীবনের অন্তিম আঁধারে কবি তার প্রেয়সী প্রিয়দর্শিনীকে নির্বেদন নিঃসঙ্গতায় নিঃশ্বাস-নিবিড় নৈকট্যে আপন করে উপলব্ধি করেন।  
শুধু শব্দ সজ্জা কিংবা শব্দ বিন্যাস ‘বনলতা সেন’ কে নির্মাণ করতে পারেনি। কবির মনে উদ্বোধিত চেতনা কল্পনার কিরণে ফুটেছে শতদলে। সেই শতদলের অপরূপ বিভাই ‘বনলতা সেন’ এর সাফল্য। ১৯৫৩ সালে ‘নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন’ নামক উৎসবে ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থখানি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের পুরস্কার অর্জন করেছিলো। কবি হিসেবে কবি জীবনানন্দ দাশের এটাই একমাত্র জীবদ্দশায় পাওয়া পুরস্কার।
মহাগোধুলীর কবি, জীবনানন্দের কবি- কল্পনায় ১৩৪২ বঙ্গাব্দে জন্ম নেওয়া বনলতা সেন আজও মানুষকে টানে। নাড়িয়ে দেয় মানুষের বোধ ও কল্পনার গহীন স্তরকে। অনেক বনলতা সেন হয়তো আজও এই রূপসী বাংলার কাননে-কান্তারে বিরাজমান। কিন্তু নাটোরের সেই বনলতা সেন কেবল একজন। ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’র হাসির রহস্য যেমন আজও গবেষণার বিষয় তেমনি পাখির নীড়ের মতো চোখ নিয়ে বনলতা সেন আজও ছড়িয়ে দেয় জীবনানন্দ- ঘ্রাণ পাঠকের অন্তরে অন্তরে।

বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারঃ বর্তমান ও ভবিষ্যত

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (Information and Communication Technology; ICT)

বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে একদিনের ক্রিকেট চলছে। আর মাত্র এক ওভার বাকি। ব্যাট হাতে সাকিব। আর বল হাতে ব্রেট লি। বাংলাদেশ দলের জয়ের জন্য রান দরকার ৫। আর উইকেট আছে মাত্র এক! দর্শকদের মুখে কোন কথা নেই। টেলিভিশনের সামনে বসে মাসুম এতক্ষণ অনেক কিছু বলছিলো। সেও দেখি চুপ! কেন? কারণ কি হয় না হয় কিছুই এখন বলা যাচ্ছে না।

আমার তো তখন ক্লাসে বসে সিগনাল প্রসেসিং নিয়ে লেকচার দিতে হচ্ছে। যাই হোক, এক ওভার শেষ হতে তো আর অত সময় লাগে না। হঠাত ক্লাসের এক ছাত্র বলে উঠলো, “স্যার, বাংলাদেশ জিতে গেছে”! অন্য সব ছাত্র তো পারলে লাফিয়ে উঠে। আমিও ক্লাসে কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ না হয় আনন্দ করুক ছেলেরা।

এখন আসা যাক ক্লাসের সেই ছেলেটার কথায় যে আমাদেরকে বাংলাদেশের বিজয়ের কথাটা জানালো। কিভাবে ক্লাসের মাঝে সে খেলার কথা জানলো? ব্যাপারটা এমন কিছুই না। সে মোবাইলে ইন্টারনেটে ঢু মেরে খেলার খবর জেনে নিচ্ছিলো। ছেলেটা পড়ায় ফাঁকি দিয়েছে বটে, কিন্তু একটা অজানা ব্যাপারে আমাদের জানিয়ে দিয়ে আনন্দও দিয়েছে। এই অজানা ব্যাপারটাকেই দূর-যোগাযোগ প্রযুক্তির ভাষায় তথ্য বলা হয়। মোবাইল হলো যোগাযোগ প্রযুক্তির একটা উদাহরণ। তথ্য আদান-প্রদানের একটা অন্যতম মাধ্যম এই মোবাইল আর ইন্টারনেট।

আমাদের অজানা বিষয়গুলো জানতেই আমরা এই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করি।

বাংলাদেশের বর্তমান ICT ব্যবহার

এই যে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করার কথা বললাম – এটি ছাড়াও আরো কত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার যে এই দেশে আছে তা লিখে শেষ করা এই কয়েক পাতায় অসম্ভব।

শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার করে অনেক কিছুই করা যাচ্ছে। যেমন ই-মেইলের মাধ্যমে এই পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মানুষের সাথে তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব। সুদূর আমেরিকায় বসে আমাদের দেশের যে কাউকে ই-মেইল করে তার খবরাখবর জানতে কয়েক সেকন্ডের বেশি লাগে না যদি দু’জন-ই ই-মেইলে একই সময়ে লগ-ইন করে থাকে। একই সময়ে না হলেও যখন ইচ্ছে তখন বসে ই-মেইল চেক করা যায়। অথচ এই ই-মেইল হলো আমাদের হাতে লেখা চিঠির মত তথ্য আদান-প্রদান। পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারছেন – হাতে লেখা চিঠি আজকাল তেমন দেখি না কেন?

ইন্সট্যান্ট মেসেজ বা তাতক্ষনিক বার্তার মাধ্যমে অনেক দুরের দুই প্রান্তের দুই ব্যক্তি পরস্পরের সাথে পাশে বসে কথা বলার মতই লিখিত আলাপ করতে পারে। এই পদ্ধতিতে ভয়েস চ্যাট, ভিডিও চ্যাট ইত্যাদি চ্যাটিং এর সাহায্যে দুইজন যত দূরেই থাকুক না কেন পরস্পরের সাথে একেবারে পাশাপাশি কথা বলা আর দেখাদেখির মত তথ্য, ভাব ইত্যাদির আদান-প্রদান সম্ভব। আবার গ্রুপ চ্যাটের মাধ্যমে অনেকজন একসাথে বসে আলাপ করতে পারে – যে যেই জায়গাতেই থাকুক না কেন।

ভিডিও কনফারেন্স এমন একটা প্রযুক্তিগত ব্যবহার যার মাধ্যমে আমেরিকা, জাপান, বাংলাদেশ – যে কোন দেশের অনেক মানুষ এক জায়গায় বসে আমাদের পরিচিত সভা-সমিতির মিটিং করার মত কথা বলতে পারছে। পারছে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে। ঘরে বসেই বিশ্বের কত মানুষের সাথেই না আড্ডা দিচ্ছে বাংলাদেশের মানুষেরা।

মোবাইলের কথায় আসি। আমরা এই প্রিয় দেশটিতে গত দশ বছর আগে যা অসম্ভব ভাবতাম, তা এখন কতই না সহজ হয়ে গেছে। এর অনেক কিছুই শুধু মোবাইলের কারণেই হয়েছে। আগে বিদ্যুত বিল দিতে গিয়ে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে সরকারি ব্যাঙ্কের দৈন্যদশা উপলব্ধি করতে হত। আর এখন তো ঘরে বসেই অনেকে মোবাইলে বিদ্যুত বিল দিয়ে দিচ্ছে। পাশের দোকানেও কিনা দেওয়া যায় এই বিদ্যুত বিল।

মোবাইলে কথা রেকর্ড করে পাঠিয়ে দিচ্ছে অনেকেই যার নাম হয়েছে ভয়েস মেসেজ (কন্ঠ-বার্তা)। প্রিয়জনের কন্ঠস্বর কার না ভালো লাগে! কাউকে মোবাইলে না পেয়ে জরুরি কথা জানাতে এই ধরনের তথ্য-বার্তা আদান-প্রদান এখন হরহামেশাই হচ্ছে। অন্যদিকে যিনি কোন প্রয়োজনে মোবাইল বন্ধ রেখেছিলেন, তিনি মোবাইল খুলতেই জেনে জাচ্ছেন কে, কখন, কতবার তাকে কল করার চেষ্টা করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এবারের ভর্তি ফরম পাওয়া, পূরণ করে জমা দেওয়া যে মোবাইলেই সম্ভব হচ্ছে, তা অনেকেরই অজানা নয়। তবে এই ফরম আর আট-দশটা ফরমের মত হাতে লিখে পুরণ করে পাঠানোর প্রয়োজন হচ্ছে না। একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি. সহ আরো কিছু ব্যাপারে তথ্য মোবাইলের মাধ্যমে মেসেজে লিখে কোন একটা নির্দিষ্ট নাম্বারে মেসেজটা পাঠিয়ে দিলেই হচ্ছে।

এই মোবাইল আর ইন্টারনেটের সম্মিলিত ব্যবহারে যে বিষয়টি এখন পুরো বিশ্বের মত এই সবুজ দেশটিতেও জোর সাড়া জাগিয়েছে তা হলো বিভিন্ন সামাজিক নেটওয়ার্ক (social network)। আমরা সমাজে যেমন এক বন্ধু থেকে আরেক বন্ধু হয়ে অনেক বন্ধুর একটা জাল বানিয়ে চলি, ঠিক তেমনি এই ইন্টারনেটের সামাজিক নেটওয়ার্কের ওয়েব-সাইটে পুরো পৃথিবীকেই বানানো হয়েছে একটা ছোট পাড়ার মত। কিরে রমিজ, কোরিয়াই এখন গরম না শীত? তুই কোরিয়া থেকে কবে আসবি? Hi Andrew, do you like to visit my country, Bangladesh? – এই ধরনের কথাবার্তা অজানা অচেনা দুই প্রান্তের দুই ব্যক্তির মাঝে যে হচ্ছে তা বুঝার উপায়-ই নেই। কারণ এরা পরস্পর বাস্তবে বন্ধু না হলেও Facebook, Twitter ইত্যাদির কারণে তারা হয়ে গেছে আশারিরিক উপস্থিতির বন্ধু (virtual friend)। এখানে মোবাইলের কথাটা আনার কারণ হলো, আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই মোবাইলেই এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে বেশি। এক জায়গায় একটা কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকতে কিংবা একটা লেপটপ বহন করে চলতে তারা অনেকেই চায় না। অথচ পকেটের ছোট্ট একটা জায়গা জুড়ে থাকা মোবাইল তাদের কাঙ্খিত কাজের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই এই সব বন্ধুত্বের জন্য তারা মোবাইলকেই বানিয়েছে সবেধন নীলমণি।

উইকি (wiki) আর ব্লগ (blog) – এই দুই ধরনের সাইটের মাধ্যমে মানুষের জানা-অজানা সব এক জায়গায় চলে আসছে। মানুষ মন খুলে তার নিজের কথা বলছে। বলছে অপরকে জানানোর কথাও। আবার কেউ কেউ সৃষ্টি করছে অক্ষর-নির্ভর বিতর্ক। ‘কলমের জোর’ শব্দটা বুঝি এখন ‘কি-বোর্ডের জোর’ শব্দে রূপান্তরিত হতে চলেছে।

ভিডিও স্ট্রিমিং (video streaming) এই নামের একটা প্রযুক্তি দিয়েই আমি নিজে অফিসে বসে টেলিভিশন ছাড়াই বিশ্বকাপ ফুটবলের কিছু খেলা দেখেছি। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর অনেক কিছুই এখন এই পদ্ধতিতে দেখা সম্ভব হচ্ছে।

ই-বিজ (e-biz) মাধ্যমে বাংলাদেশের অনেকেই নতুন-পুরনো জিনিষ কেনা-বেচা করছে। পত্রিকাও এখন চলে এসেছে ইন্টারনেট সংস্করণে।

তথ্য-প্রযিক্তির বর্তমান হালচাল বাংলাদেশে যে কতটুকু চলে এসেছে – তা উপরের কথার মাধ্যমে বুঝতে নিশ্চয় অসুবিধা হচ্ছে না। বর্তমানের কথা আজকে না হয় এতটুকুতেই থাক। আরো কত ব্যাপার নিয়ে কতজন লিখবে কিংবা পাঠক নিজেও যে কত কিছু দেখে জানবেন – তার ইয়ত্তা নেই। তাই খুব প্রয়োজনীয় কিছু ব্যবহার দিলাম।

আগামী দিনের বাংলাদেশে ICT-এর ব্যবহার

পৃথিবীটা এখন ঘরে রাখা কম্পিউটারের মাউস নামক যন্ত্রে যেন বন্দি। বাংলাদেশ নামক চির-সবুজ দেশটি কিন্তু ICT ব্যবহারে আর পিছিয়ে নেই। ভবিষ্যতে ICT বলতে যা বোঝাবে, বাংলাদেশ যে খুব দ্রুত তার সেবা পাবে – এটা বলতে তেমন কোন দ্বিধা নেই। তো দেখা যাক, এই ক্ষেত্রে ভবিষ্যত চিত্রটা কেমন দাঁড়ায়।

রায়হান সাহেব সকালে উঠেছেন মোবাইল তার শরীরে একটা সিগনাল পাঠানোর পর। বিছানায় বসতেই তার সামনের বিশাল ডিসপ্লেতে দেখে নিলেন খবরের কাগজের হেডিং। এবার বিছানার পাশের একটা সুইচ টিপতেই তার বিছানা তাকে গাড়ির মত বহন করে নিয়ে গেল ফ্রেস রুমে। দাঁত ব্রাশ করলেন একটা ইলেক্ট্রনিক ব্রাশ দিয়ে। অদ্ভুত এই ব্রাশ। তার আর কোন জায়গায় ব্রাশ করতে হবে সেটা সে একটা বীপ দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে। একেক বীপের একেক অর্থ যা রায়হান সাহেব বুঝেন।

রায়হান সাহেবের গিন্নি কোথায় তা জানার জন্য তিনি এবার হাতের ঘড়িতে একটা সুইচ টিপলেন আর অমনি ঘড়িতে তার গিন্নির চেহারা দেখা গেল।

“কি নাস্তা তৈরি?” রায়হান সাহেব বললেন। গিন্নি বললেন, “কেন, মোবাইলে দেখতে পার না নাস্তার টেবিলের কি অবস্থা? আলসেমি করছো কেন?”। আসলে রায়হান সাহেব চাইলে মোবাইলে তার খাওয়ার রুমের পুরো ছবি দেখে নিতে পারেন। ঐ রুমের ওয়েব ক্যামের ক্ষমতা অনেক। প্রায় পুরো রুমটাই পরিস্কার দেখা যায়। কিন্তু গিন্নির মুখ থেকে নাস্তার কথা শুনতে তার বেশ লাগে। তাই তো এই আলসেমি।

নাস্তা খেয়ে তিনি নিচে নেমে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইলে আবার কি যেন করলেন আর তার বুড়ো আঙ্গুল মোবাইলের স্ক্রিনে রাখলেন। খুলে গেল গাড়ির দরজা। তিনি উঠলেন। গাড়িতে ড্রাইভার বসে ছিল আগে থেকেই। কিন্তু তার সাথে কোন কথা বললেন না। কোথায় যেতে হবে তা তাকে জানালেন শুধুমাত্র তার সিটের পাশের একটা স্ক্রিনে রাখা ম্যাপে হাত নেড়ে।

অফিসে রুমে বসে রায়হান সাহেব প্রথমেই ল্যাপটপে নিজের সাইট ব্রাউজ করে জেনে নিলেন ব্যবসার কি খবর। কিসের দাম কত, কোথায় কোন জিনিস ভাল বিক্রি হচ্ছে – এই সব আর কি। এরপর শুরু করলেন কি বোর্ডে বসে নানা তথ্য খুঁজে বিশ্লেষণ করা। তার পরবর্তী ব্যবসার ক্ষেত্র কি হবে তা সফটওয়ার ঘেঁটেই তো জানা যায়। একটা ব্যাপার বলে রাখি, এই ল্যাপটপ কিন্তু একটা কলমের মত যন্ত্র যেখান থেকে কিছু আলোক রশ্নি বের হয়ে আমাদের পরিচিত কম্পিউটারের একটা ছবি দেখায়। মাউস, কি-বোর্ড বলতে এখন আলাদা কিছু নেই। এই ছবিতেই সব কিছু দেখা যায়। আর মানুষ যেন হাওয়ায় হাত নেড়ে কি-বোর্ড, মাউসের কাজ করে।

ড়ায়হান সাহেবের গিন্নি এখন কি করছেন দেখা যাক। হা, তার গিন্নি ঘরের আজকের বাজার কি কি লাগবে তা মোবাইলে লিখে একটা নাম্বারে পাঠিয়ে দিলেন। ব্যাস, আধা ঘন্টার মধ্যেই গাড়ি এসে দিয়ে গেল তার দিনের তাজা বাজার। এখন যে কোন কিছুই তাজা না হয়ে যায় না। এত দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা – ক্ষেত থেকেই বাজার তুলে আনলে বিক্রি হতে দুই-এক ঘন্টাই লাগে না। আর বাজার মানে তো একটা বাসায় গুদামে রাখা কিছু পণ্য আর অনেকগুলো ল্যাপটপের সামনে কিছু মানুষ। কেউ এখানে কিনতে আসে না। মোবাইলে যারা মেসেজ পাঠায়, তাদের কাছে এরাই পাঠিয়ে দেয় প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র। আর টাকা দেওয়া-নেওয়া? অনলাইন ব্যাঙ্কিং এর যুগে টাকা এখন যেন হাওয়ায় আদান-প্রদান হয়।

রায়হান সাহবের ছেলেরা কি স্কুলে যায়? আশ্চর্য ব্যাপার হলো তারা সবাই পড়ে, হোম-ওয়ার্ক করে কিন্তু স্কুলে যায় না। তারা অনলাইন স্কুলের ছাত্র। ঘরে বসেই স্যারের লেকচার ল্যাপটপে দেখে ক্লাস করে! এমনকি কয়েক বন্ধু মিলে ভিডিও কনফারেন্স করে পড়ে। অনেক জটিল পড়াও তারা এখন খুব সহযে ইন্টারনেটে বসেই পড়ে। পরীক্ষার দিন তারা নেট অন করে একটা ওয়েবে ঢুকে পরীক্ষা দেয়। আর পরীক্ষার সময় শেষ হতে না হতেই তাদের নাম্বার উঠে যায় ওয়েব সাইটে। ভাল করলেও যে একটু আনন্দ করবে – সেই সময়টাও এদের হাতে নেই। কত কিছু সার্চ যে এদের করতে হয়। রাজ্যের সব কাজ নেটে বসে খুঁজে বের করে। পড়ে আবার টাকাও কামায় এই নেটে বসেই! বাবার কাছে হাত-খরচ খোঁজা এখন লজ্জার ব্যাপার।

এই যুগের মানুষের কাছে এখন সময়টা যেন খুব সঙ্কীর্ণ। কাজ অনেক, কিন্তু সময় কই? আফসোস করারও সময় যে নেই!

নাহ এই যুগ নিয়ে আর লিখা যায় না। যন্ত্রের মত মানুষদের নিয়ে লিখে কি লাভ? স্নেহ, মায়া-মমতা – এসব এখন ব্যবসার পণ্য। দোকানে গেলে এই স্নেহও এখন মিনিটে হিসেব করে বিক্রি হয়! হায়রে মানুষের প্রযুক্তিগত জীবন!

পাঠক, আপনি হয়তো ভাববেন – এই ধরনের কিছু ঘটা আসলে আমার মত কিছু মানুষের কল্পনা। হা, আপনার সাথে এই মুহুর্তে আমি দ্বিমত করে ঠিক করবো না। কিন্তু দেখবেন আপনার পরবর্তী কোন প্রজন্মের মানুষ আমাদের ঠিক এই ধরনের লেখা পড়ে “পুরনো যুগের লেখকেরা প্রযুক্তি কি তাই তো দেখি ঠিকমত বুঝতো না!” – এই মন্তব্যই করবে। কারন, আমরা আজ যা কল্পনা করছি, এক সময় তা হবে নির্মম বাস্তব। আর মানুষ এগিয়ে যাবে আমাদের কল্পনারও অনেক দূরে। ভাগ্যিস (অথবা দূর্ভাগ্যিস!) আমরা তখন থাকবোনা।

লেখকঃ আব্দুল্লাহ আল মাসুদ লেকচারার, ইলেক্ট্রনিক এন্ড টেলিকমিউনিকেশনস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম

ICT consultant and IT freelancer Personal Web:: http://sites.google.com/site/iammasudsite

title

নজরুলের ইরানী ফুল নার্গিসকে পাওয়ার নেপথ্যে


জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল

নজরুল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৭ সালে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে নৌশেরার ট্রেনিং শেষে ১৯১৯ সালের দিকে করাচিতে অবস্থান করছিলেন। সম্ভবত তখনই দৌলতপুরের আলী আকবর খানের সাথে নজরুলের পরিচয় ঘটে।

দৌলতপুর খাঁ ও মুন্সি বাড়ি
তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের বরদাখাত পরগনার বিখ্যাত জমিদার আগাসাদেক’র মেয়ের জামাতা মীর আশ্রাফ আলীর জমিদারী স্টেটের প্রজাহিতৈষী জমিদার রায় বাহাদুর রূপেন্দ্র লোচন মজুমদারের জমিদারী এলাকার অন্তর্ভুক্ত এক গ্রাম “দৌলতপুর”। এই গ্রামের  দুটি সম্ভ্রান্ত বাড়ি মুন্সী বাড়ি ও খাঁন বাড়ি। আÍীয়তার সুবাদে মুন্সী বাড়ি ও খাঁন বাড়ির মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক তখন থেকেই। খাঁন পরিবার আফগানিস্তান বংশোদ্ভুত। বংশীয় ও সামাজিক মর্যাদার উচ্চতায় দু’টি বাড়ির অবস্থান কাঁধে কাঁধে মিললেও আথির্ক বিবেচনায় মুন্সীবাড়ির অবস্থান ছিলো ওপরে।

আলীআকবর খাঁন
দৌলতপুরের সম্ভ্রান্ত খাঁন পরিবারের ছেলে আলী আকবর খাঁন। খ্রিস্টিয় ১৮৮৯ সালে খাঁন পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন একসময়ের বহুল আলোচিত এই আলী আকবর খাঁন। আলতাফ আলী খাঁন, ওয়ারেশ আলী খাঁন, নেজবত আলী খাঁন তাদেরই কনিষ্ঠ ভাই আলী আকবর খাঁন। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া আলী আকবর খাঁন ছিলেন মেধাবী। দারিদ্র্যকে উপেক্ষা করেই শেষ পর্যন্ত তিনি কৃতিত্বের সাথে বি. এ. পাস করেন। শিক্ষা জীবন শেষে প্রথমে চাঁদা সাহেবের গৃহ শিক্ষক, পরে সৈনিকের চাকুরীতে যোগদেন। সৈনিক জীবনে এক পর্যায়ে তিনি ক্যাপ্টেন পদমর্যাদায় উন্নীত হন। একজন নাট্যকার (লেখক) হিসেবেও তাঁর পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর লেখা হিন্দুস্থানের ইতিহাস, মোসলেম চরিত, আদর্শ মহিলা প্রভৃতি গ্রন্থ এবং ভিশতি বাদশাহ ও বাবর প্রভুতি নাটক উল্লেখযোগ্য। সৈনিক জীবন শেষে রূপসা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থেকে এক পর্যায়ে পু¯ক ব্যবসার সাথে জড়িত হন। বাংলা বাজার ও কোলকাতায় ভারতীয়া লাইব্রেরী নামে বইয়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন।
আলী আকবর-নজরুলের বন্দ্বুত্ব
প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ কমরেড মোজাফর ও শিক্ষানুরাগী ক্যাপ্টেন ডা. নরেন্দ্রনাথ দত্ত এ দু’জন ব্যক্তি আলী আকবর খাঁনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এক সময় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথেও তাঁর স¤ক্সর্ক গড়ে ওঠে।
নজরুলের সৈনিক পদমর্যাদা তখন ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার, আলী আকবর ছিলেন ক্যাপ্টেন।
নজরুলের দৌলতপুর আসা
১৯২০ সালের জানুয়ারি মাসে নজরুল দেশে ফেরেন। এক পর্যায়ে মার্চ মাসে বাঙ্গালী পল্টন ভেঙ্গে দেওয়ার খবর পান। পরে ১৯২১ সালে (বাংলা ২৩ চৈত্র ১৩২৭) আলী আকবরের সাথে নজরুল কুমিল্লা হয়ে মুরাদনগরের দৌলতপুরে আসেন। তবে আলী আকবর খাঁনের সাথে নজরুলের দৌলতপুরে আসার বিষয়টি নিয়ে খানঁ পরিবার ও মুন্সী পরিবারে মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। স¤ক্স্রতিকালে এ দুই পরিবারের কাছ থেকে পর¯ক্সর বিরোধী বক্তব্যও পাওয়া যায়। মুন্সী বাড়ির বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান মুন্সী ওরফে রওশন মুন্সীর (নার্গিসের ভ্রাত®ক্সুত্র) দাবি, তার চাচা অর্থাৎ নার্গিসের বড় ভাই আব্দুস সোবহান প্রথম মহাযুদ্ধের সৈনিক ছিলেন। নজরুল তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ স¤ক্সর্কের সুত্র ধরেই দৌলতপুরে আসা।
তবে নজরুল কার হাত ধরে দৌলতপুর এসেছিলেন এসব বিতর্কের উবের্ধ হচ্ছে, নজরুল এসেছিলেন এবং আসার কারণেই নজরুল জীবনে এক নতুন মাত্রা ও নতুন অধ্যায় সুচিত হয়।
নজরুল-নর্গিসের পরিচয়
দৌলতপুরে অবস্থান কালেই একজন বিদ্রোহী নজরুলের মাঝে আবির্ভত হয় প্রেমিক নজরুলের। খাঁন বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার উত্তরে মুন্সী বাড়িতে বিয়ে দেন আলী আকবর খাঁনের বোন আসমতের নেসাকে। বাবার বাড়ি একই গ্রামে হওয়ায় আসমতের নেসা প্রায়সই বাবার বাড়ি থাকতেন, সেই সাথে তাঁর মেয়ে সৈয়দা খাতুনও।
এক পর্যায়ে সৈয়দা খাতুনের বড় ভাই জব্বার মুন্সীর সাথে মামা নেজাবত আলী খানের মেয়ে আম্বিয়া খাঁনমের বিয়ের দিন স্থির হয় ১৯২১ সালের ৫মে (বাংলা ২২বৈশাখ)। সেই বিয়েতে যোগদেন নজরুল। জনশ্র“তি আছে এবং ঐতিহাসিকদের মতেও ওই দিনই যুবক নজরুলের প্রথম দেখা হয় ভাইয়ের বিয়েতে আসা ষোড়শী সৈয়দা খাতুনের সাথে। ধীরে ধীরে গড়েওঠে সখ্যতা। নজরুল ইরানী ফুলের নামে তাঁর নাম রাখেন নার্গিস আসার খানম। নার্গিসের রোপ মাধুরী ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে দৌলতপুরে দীর্ঘ ৭১ দিন অবস্থান করেন নজরুল।
নজরুল-নার্গিসের প্রেম-বিয়ে
দৌলতপুরে একটানা থাকাকালে সৃষ্টি হয় নজরুল-নার্গিসের পে্েরমর স¤ক্সর্ক। নার্গিস নজরুলকে কতখানি আলোড়িত করেছিলেন এর সাক্ষর রয়েছে “হিংসাতুর” কবিতা এবং ১৯৩৭সালের ১ফেব্র“য়ারী নার্গিসকে লিখা নজরুলের একটি চিঠিতে-“...আমার অšর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কী অসীম বেদনা !”
এক পর্যায়ে আলী আকবর ভাগ্নি নার্গিসকে নজরুলের সাথে ঢাকঢোল বাজিয়ে বিয়ে দেন। বিয়েতে জমিদার রায় বাহাদুর উপেন্দ্র লোচন মজুমদারসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন বলেও জানা যায়  (আলী আকবর খানের ভাই ওয়ারেশ আলী খাঁনের নাতি আব্দুল করিম ও তার ছেলে জুয়েলর দেয়া তথ্যানুযায়ী)।
দৌলতপুরে নজরুলের ৭১দিন
এসময় এলাকার অনেক স্থানই নজরুলের পদচারণায় ধন্য হয়েছে। পার্শ্ববর্তী প্রাচীন বিদ্যালয় বাঙ্গরা ওমালোচন উচ্চ বিদ্যালয়েও গিয়েছেন এবং সেখানে নজরুলকে সংবর্ধনা দেয়ার কথাও শোনা যায়। বাঙ্গরা স্কুলের শিক্ষক আব্দুর রহমান ভুইয়া জানান, স্কুলের সামনে একটি বকুল গাছের নিচে নজরুল বাঁশি বাজাতেন। সেই স্মৃতিবিজড়িত গাছটিও কেটে ফেলা হয়েছে বছর কয়েক আগে। এ যাবৎ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী নজরুল দৌলতপুরে বসেই ১৬০টি গান এবং ১২০টি কবিতা রচনা করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য কবিতা গুলোর মধ্যে- ’বেদনা-অভিমান’, ’অ-বেলা’, ’অনাদৃতা’, ’পথিক প্রিয়া’, ’বিদায় বেলা’ প্রভুতি।দৌলতপুর অবস্থান কালে সুর সম্রাট উ¯াদ আলাউদ্দিন খাঁ দৌলতপুরে এলে নজরুল তাকে কদমবুচি (সালাম) করে সম্মান জানান।
নজরুলের দৌলতপুর ত্যাগ
যত দুর জানা যায় বাংলা ১৩২৮ সালের ৪ আষাঢ় নজরুল অজ্ঞাত কারণে বিয়ের রাতেই দৌলতপুর ছেড়ে গোপনে চলে যান। এ আকস্মিক চলেযাবার পর নজরুল কুমিল্লায় এলেও আর দৌলতপুর আসেননি। চলে যাবার কারনটি এখনো রহস্যাবৃত। এই ব্যার্থ বিয়ের বছর দুয়েক পর কুমিল্লায় ইন্দ্র কুমার সেন গুপ্তের বিধবা বোন গিরিবালা দেবীর একমাত্র কন্যা আশালতা সেনকে (প্রমীলা) বিয়ে করেন নজরুল।
নজরুল জীবনে নার্গিসের প্রভাব
বলাযায় নার্গিসিই একমাত্র নারী, যার কল্যাণে পৃথিবীতে নজরুলের মতো একজন বিখ্যাত কবির সৃষ্টি হয়েছিলো। একথা নজরুল স্বীকার করে গেছেন “হিংসাতুর” কবিতায় ্্্এবং - “...তুমি এই আগুনের পরশ মানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতামনা- আমি ’ধুমকেতুর’ বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতামনা...” “...আমার অšর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কী অসীম বেদনা !” ( নার্গিসিকে লিখা নজরুলের চিঠির অংশবিশেষ)।
নার্গিসের অপেক্ষা ও বিয়ে
নজরুল চলে যাবার পরও নার্গিস তাঁর জন্য ১৬ বছর পর্যš অপেক্ষা করেছিলেন। এক পর্যায়ে মামাতো ভাই নোয়াজ্জস আলী টুক্কু খাঁন (তৎকালীন  ইউপি ভাইস প্রেসিডেন্ট) কোলকাতায় গিয়ে নজরুলের কাছ থেকে এক প্রকার জোর পর্বকই বিয়ের তালাক নামায় স্বাক্ষর আনেন (১৯৩৭ সালে)। অত:পর জোর করেই নার্গিসকে বিয়ে দেন ঢাকার হাসানবাদের ছেলেন কবি আজিজুল হাকিমের সাথে। তাঁদের ঘর আলোকিত করে জš§ নেয় এক মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে ডা. আজাদ ফিরোজ ইউরোপের মেঞ্চেস্টারে চিকিৎসক এবং মেয়ে শাহানারা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
আলী আকবর ও নার্গিসের মৃত্যু
আলী আকবর খাঁন ১৯৭৭ সালে পরলোকগমন করেন। নার্গিস ও ১৯৮৫সালে পরলোক গমন করেন, তাঁকে সমাহিত করাহয় মেঞ্চেস্টার শহরে। আজ নজরুল, নার্গিস, আলী আকবর এদের কেউ নেই। আছে শুধু একটি অমর প্রেম কাহিনী আর কিছু স্মৃতি চিহ্ন।
দৌলতপুর ১৯২১-১৯৭১
১৯২১সাল থেকে১৯৭১ সাল পর্যš দৌলতপুরের নজরুল অধ্যায়টি অনেকটাই আড়াঁল ছিলো। যতদুর জানা যায়, যে আলী আকবরের হাত ধরেই নজরুলের দৌলতপুর আসা, আবার এক সময় সেই আলী আকবরই নজরুলের নামটি পর্যš শুনতে পারতেন না এবং তারই হাতে নজরুলের লেখা সংবলিত অনেক কাগজ পত্রাদি ধ্বংশ হয়েছে। খাঁন পরিবার আজীবন “নজরুল–নার্গিস” অধ্যায়টিকে একটি কলঙ্কিত  ইতিহাস বলে মনে করতেন ( খাঁন বাড়ির বর্তমান প্রজš§ তেমনটি মনে করেন না)।
দৌলতপুরে নজরুল চর্চার গোড়াপত্তন
নার্গিসের সšানেরাও দৌলতপুর আসেন না। খাঁন বাড়ির অনিহায়-অবহেলায় নজরুলের দৌলতপুর অধ্যায়টি দীর্ঘদিনে অকেটাই আঁড়াল হয়ে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে দৌলতপুরের আবুল কাশেম বুলবুল ইসলামসহ কিছু উৎসাহী ব্যক্তির কল্যাণে লুপ্তপ্রায় ইতিহাস উদঘটিত হয়। স্বাধীনতার পর শুরু হয় দৌলতপুরে নজরুলের র্চচা। ১৯৭২ সালের ২৩ জুলাই দৌলতপুর “নজরুলের স্মৃতি স্মরণী সংসদ” গঠিত হয়। যা ১৯৮৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সৈয়দ আমিনুর রহমান নজরুল নিকেতনে রূপ দেন]।
কবিতীর্থ দৌলতপুরে নজরুলপ্রেমীদের দাবি
নজরুলের  চুরুলিয়া গ্রামে ১৯৫৮ সালেই নজরুল একাডেমী স্থাপিত হলেও সুধীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী পর দৌলতপুরে স্থাপিত হয়েছে নজরুল মঞ্চ, যা শুধুমাত্র বছরের বিশেষ কোন দিবস, বিশেষ কোন প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার হয় না। ২০০৪ সালে নার্গিসের ভাইয়ের ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভু-তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল হক দৌলতপুর মুন্সী বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন “নার্গিস-নজরুল বিদ্যা নিকেতন” নামে একটি বালিকা বিদ্যালয়। স্কুলটিরও দরবস্থা। “নজরুল স্মৃতি স্মরণী সংসদ” গঠনের মধ্যদিয়ে দৌলতপুরে স্থানীয় পর্যায়ে নজরুল র্চচা ও স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সাবেক জেলা প্রশাসক সৈয়দ আমিনুর রহমানের প্রচেষ্টায় দৌলতপুর নজরুল অধ্যায়টি জাতীয় পর্যায় আলোচনায় উঠে আসে। সৈয়দ আমীনুর রহমান “নজরুল স্মৃতি স্মরনী সংসদ’কে নজরুল নিকেতনে রূপদেন। যার লক্ষ ও উদ্দেশ্য ছিলো দৌলতপুরে নার্গিসের নামে একটি বালিকা বিদ্যালয়, মহিলা কলেজ স্থাপন, অডিটরিয়াম, উšে§াক্ত মঞ্চ নির্মাণ, সমৃদ্ধ পাঠাগার, ও যাদুঘর স্থাপন পর্যটকদের সুবিধার্থে একটি রেস্ট হাউজ নির্মাণ. এবং সংগীত ও নৃত্য নাটক প্রশিক্ষণের জন্য শিল্পকলা একাডেমী স্থাপন প্রভুতি। দৌলতপুরকে রাষ্ট্রীয় ভাবে কবিতীর্থে রূপদান এবং প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় ভাবে তিনদিন ব্যাপী নজরুল মেলার প্রচলন শুরু হলেও বুলবুল ইসলামের মৃত্যুর পর ( ১৯৯৮ সালে) কবিতীর্থ দৌলতপুরে নজরুল র্চচা অনেকটাই থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু পরবর্তীতে সংসদ সদস্য দিলারা হারুন নজরুল স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলোতে স্মৃতি ফলক লাগালেও যথাযথ পরিচর্যার অভাবে এখন সবই ধ্বংশের দ্বার প্রাšে। যে আম গাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতে সেটি মরে গেছে। বাসর ঘরটিও আগের অবস্থায় নেই, স্মৃতিময় খাটটিও ধ্বংসের দিকে।
আলীআকবর খাঁন ছিলেন চিরকুমার। তাঁর ভাইয়ের উত্তরসুরীদের ইচ্ছে থাকলেও আর্থিক অস্বচ্ছলতার দরুন তাদের দ্বারা এ ইতিহাস ঐতিহ্যের যথাযথ সংরক্ষণ করা অসম্ভব। আলী আকবর খাঁনের বংশধর বাবলু আলী খাঁন বলেন, প্রতি বছরই নানা উন্নয়ন মলক কর্মকান্ডের বুলি আউড়িয়ে বক্তৃতা দিয়ে যান সরকারী কর্মর্তা এবং নেতারা, কিন্তু বা¯বতা শুন্য। নজরুলের কুমিল্লা স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারের সা¤ক্স্রতিক উদ্যোগকে স্বাগত জানান নজরুল প্রেমীরা। তবে, ২০০৭ সালে কমিল্লা জেলাপরিষদের মাধ্যমে ১ কোটি ২২ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্র¯াবনা প্রেরণের প্রেক্ষিতে স্থনীয় সরকার মšলায়ের তৎকালীণ যুগ্ম-সচিব ড. কামাল আবুল নাছের চৌধরীর নেতৃত্তে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল দৌলতপুর পরিদর্শণ করলেও উন্নয়ণ প্র¯াবনার কোনো হদিস না থাকায় দুঃখ প্রকাশ করেন। নজরুল জাদুঘর স্থাপনের জন্য প্র¯াবিত “আলী আকবর খাঁন মেমোরিয়াল” ভবনটিও ধ্বংশের দ্বার প্রাšে, এটি সংস্কার ও সংরক্ষণ সময়ের দাবি। এটি ব্যবাহারকারীরা জানান, যথাযথ পুর্নবাসনের ব্যবস্থা না করা হ’লে বড়িটি তারা ছাড়বেন না। এ বড়িটির বিষয়ে আশু সিদ্বাš নেয়া প্রয়োজন বলে সবাই মনে করেছেন। জতীয় নজরুল পদক প্রাপ্ত শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব গোলাম কিবরিয়া সরকারসহ নজরুল প্রেমীদের দাবি, পুর্ণাঙ্গ নজরুল নিকেতনের বা¯বতাবায়ন করে স্মৃতি গুলো যথাযথ সংরক্ষণ, একটি নজরুল যাদুঘর স্থাপনের পাশাপাশি নজরুল-নার্গিস বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ ্এবং মুরাদনগর উপজেলাকে ভেঙ্গে যে নতুন উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, তা যেন নজরুল উপজেলা নাম করণ করা হয়।
লেখক পরিচিতি : মুরাদ নগর প্রতিনিধি, দৈনিক আমাদের কুমিল্লা।