সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

সাইটিতে বাংলা ফ্রন্ট কনভার্ট করাকালে অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল শব্দ দৃষ্টিগোচর হতে পারে। সেজন্যে পাঠকের একান্ত সহানুভুতি কামনা করছি।
-সম্পাদক।

 উপদেষ্টামণ্ডলী: প্রকৌ: মো: দেলোয়ার হোসেন, দেওয়ান আবদুল বাসেত, ফতেউল বারী রাজা, সামীম আহমেদ।

    প্রতিষ্ঠাতা, সম্পাদক : মিজানুর রহমান রানা, টেকনিক্যাল সহযোগী: রবিন রায় 

---------------------------------------------------------------------------------

 প্রাণময় বাংলাদেশ: উপলব্দির শিলালিপিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু
 
বাঙালির অহংবোধে চির অমলিন

সামীম আহমেদ

‘‘স্বভূমি থেকে যে আঞ্চলিক ভাষা ঠোঁটস্থ করেছি/বলে রাখি, আমার গর্ব এখানেই এবং আমি আবৃত্তি করি আঞ্চলিক শব্দমালা; হোক তোমার অচেনা।”
উত্তর আয়ারল্যান্ডের অধিবাসী ১৯৯৫-এ সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী কবি সিমাস হিনি’র ‘অচেনা’ কবিতার (দাউদ হায়দার অনুদিত) কয়েকটি লাইন। ‘ডেথ অব ন্যাচারালিস্ট’ কাব্যগ্রন্থে অচেনা কবিতাটি স্থান পেয়েছে। কাব্য ও স্বদেশ জুড়ে যাদের সামান্যতম বিচরণ তাদের কাছে এ নামটি হয়ত কোনো প্রহেলিকার সৃষ্টি করবে না।
বাঙালির প্রবহমান ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। স্বভাষার মর্যাদায় আন্দোলিত নান্দনিক ও শৈল্পিক অবয়বে গড়া একটি মানচিত্রে উদ্ভাসিত দেশ বাংলাদেশ। উভয়ের সপ্রকাশিত দার্শনিক সমগ্রতা এক বিপুলায়তন মহীরূহ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশ নামে মানচিত্রের স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৪৭-এর স্বাধীনতায় ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়। ইসলাম ধর্মের কারণে একীভূত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান। অথচ হাজার মাইলের ব্যবধানে বিচ্ছিন্ন এবং ভাষার দিক থেকেও আলাদা। এমনকি হরফেও ভিন্ন পশ্চিম পাকিস্তানের কথ্যরীতি। এ যেন কেবল খ্রিস্টান ধর্মের দোহাই দিয়ে গ্রিস ও ব্রিটেনকে এক দেশে পরিণত করা।
প্রিয় মাতৃভূমিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার অভিপ্রায়ে ১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
মুক্তিপাগল বাঙালি স্বদেশী ঐতিহ্য নিয়ে জীবন-মৃত্যুর সাথে একাকার হয়ে গেল। এরপর ’৭১-এর ২৫ মার্চ পৃথিবীর ইতিহাসে এক নৃশংসতম কালো রাত্রি। রাত সাড়ে এগারোটায় শুরু হয় ‘অপারেশন সার্চ লাইট।’ জঘণ্যতম গণহত্যা।
নিরপরাধ ঘুমন্ত জাতিকে নির্মূল করার ঘৃণিত হত্যা থেকে রেহাই পায়নি বাঙালি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়। পরিকল্পিত হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি শুরু করে গণধর্ষণ, লুট, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ ও বন্দী নির্যাতন।  মানুষ ছুটছে। নিরুদ্দেশ পথচলা। এ পথের যেন শেষ নেই। গরুর গাড়িতে চেপে ছেঁড়া ছাতা মাথায় দিয়ে চলেছে বৃদ্ধা। আরেক বৃদ্ধাকে সাহায্যে এগিয়ে এসেছে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ। আশ্রয়হীন সহায়-সম্বলহীন সংসারহীন মানুষ। এ যেন পথের মধ্যেই দুঃখের সংসার ছড়িয়ে দিয়ে জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখা। একরত্তি মেয়েটি একমুঠো ভাতের জন্যে তাকিয়ে আছে উনুনে চাপানো হাঁড়ির দিকে। আর সব হারানো জীবনের মর্মান্তিক এ মুহূর্তটুকুর নীরব সাী হয়ে পাশে শুয়ে রয়েছে পথের কুকুরটি।
আহার ও আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষ শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঠাঁই নিয়েছে। জনস্রোত যেন জলস্রোতে পরিণত হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা মেঘালয়ে ভরে গেল শিবিরে শিবিরে। শুধু ক্যাম্প আর ক্যাম্প।
শরণার্থীদের গুরুভার বহন করতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানান সিনেটের এডোয়ার্ড কেনেডি। তাঁর ভাষায়, ‘এসব ত-বিত রক্তাক্ত মানুষকে তাদেরই সহ-শরণার্থীরা সীমান্তের ওপার থেকে বয়ে এনেছে। তারপরও বহুসংখ্যক লোকের বাড়িঘর পাকিস্তানী সেনাদের গোলার শিকার হয়েছে। এছাড়া অকথিত সংখ্যক আহত মানুষ, যাদের গোনা হয়নি যাদের দেখাশুনার কেউ নেই, পূর্ববাংলার গ্রামীণ এলাকায় পড়ে আছে। সমস্যার যে আকৃতি তা’ কল্পনাকেও থমকে দেয় এবং পূর্ব বাংলা থেকে যারা পালিয়ে এসেছে, তাদের কাহিনী হৃদয়কে বিদীর্ণ করে। আজও ট্র্যাজিক অভিজ্ঞতা হচ্ছে নিষ্পাপ ও অশিতি গ্রামবাসীর। তারা নৃশংসতার কথা বলেছে, মানুষ জবাই করার কথা বলেছে, লুট ও অগ্নিকাণ্ডের কথা বলেছে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে হয়রানি ও লাঞ্ছিত হওয়ার কথা বলেছে। বহু শিশু রাস্তায় মারা যাচ্ছে। তাদের মা-বাবা তাদের বাঁচাতে অনুনয় জানাচ্ছে- ভিা চাচ্ছে। পূর্ব বাংলার ট্র্যাজেডি সমগ্র বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্যে ট্র্যাজেডি। এ সঙ্কট নিরসনে বিশ্বসম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।’
একইভাবে মাদার তেরেসা ও সানডে টাইমস্-এর বিখ্যাত সাংবাদিক নিকোলাস টোমালিন এবং প্রখ্যাত ফটোজার্নালিস্ট রোমানো ক্যানিওনি বিশ্বসম্প্রদায়কে বাংলার বীভৎস ও নারকীয় পরিস্থিতির সহযোগিতায় এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান।
নিষ্ঠুর এ বর্বরতার শুদ্ধ জবাব আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে অবশেষে স্বাধীনতার কাঙ্খিত লাল সূর্য উদিত হলো বাংলার আকাশে। কিন্তু মুক্তির অপূর্ণতা রয়ে যায় স্বাধীনতার স্থপতি তখন নির্জন কারাগারে।
১৯৭২-এর ৮ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পান। পিআইয়ের একটি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠানো হয়। লন্ডনে তাঁর হোটেলের সামনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমি আমার জনগণের মাঝে ফিরে যেতে চাই।’ ১০ জানুয়ারি সকালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথের আগ্রহে ব্রিটেনের রাজকীয় বিমান বাহিনীর এক বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু নয়াদিল্লী পৌঁছালে রাষ্ট্রপতি ভি. ভি. গিরি এবং প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয় হয়েছে।’ ঐ দিন বিকেলে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ করেন। লাখো মানুষের জনস্রোতে বাধভাঙ্গা আবেগ অশ্র“সিক্ত জাতির পিতা বলেন, ‘আজ আমার জীবনের স্বাদ পূর্ণ হয়েছে।’
বাঙালি জাতির নবজাগরণের শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসের নবসংস্কৃতি ও মানবতাবাদী জীবনদর্শনের রূপকার বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত এদেশের সোনার বাংলায় সোনাছড়া রৌদ্দুর দিয়ে জড়াতে চেয়েছেন।
ষড়যন্ত্রকারী দেশীয় অনুচররা পেণাস্ত্রের আঘাতে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট রক্তাক্ত  করলো শ্যামল বাংলার সবুজ মাঠ। স্তব্দ বাঙালি। ভুলুণ্ঠিত হলো মানবতাবোধ। আমরা হারালাম হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে।
আত্মপ্রত্যয়বোধে বাংলার নবজাগরণের অর্ন্তশক্তির ধারক হিসেবে শ্রেণী-প্রাচীর ভেঙ্গে ভালোবাসার শক্তিতে জনককে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হিসেবে ধারণ করতে চাই। আমার নিজস্ব কবিতার শব্দাবলী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে আমরণ বোধে জড়িয়ে নেয় এভাবে- ‘তোমার প্রতিকৃতি হে জনক’
তোমার প্রতিকৃতি হে বঙ্গবন্ধু/বাংলার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল দেয়াল জুড়ে/তোমাকে যারা রক্তের ধারায় নদী ও সমুদ্র করেছে/তারা বায়ান্নের ভাষায় কথা বলে/তাদের জুতোর তলায় স্বদেশের সামরিক শব্দ/ তাদের পেছনে ও ডানে সামনে ও বামে/লাল-সবুজের আলো অনন্তকাল জ্বলছে/তারা শ্বেত নয় কৃষ্ণাঙ্গও নয় কিংবা নয় কোনো ধূসর প্রজাতির/ওরা নাকি এই বাংলার বাঙালি/যাদের তুমি দিয়েছ রবীন্দ্রনাথ নজরুল সুকান্ত জীবনানন্দের/শব্দাবলী উচ্চারণ করার উন্নত শির/ইংরেজিতে ওদের কেহ কমান্ড করেনি/ওরা ফিসফাস্ করেছিলো বাংলায় ওদের পিস্তল-কার্তুজ/মর্টারশেল সবই গর্জন করেছিলো এই বাংলার মাটিতে বাংলা বলে বলে/ওরা আমায় চেনেনি আমি ওদের চিনেছি/ওরা আমায় ভুলে গেছে আমি ওদের ভুলিনি/আজও আমি খুঁজে বেড়াই একাকিত্বে অরণ্যে নির্বাসনে/বিপুল জনস্রোতে হলুদ আলোর রাস্তার গলিতে/সুবর্ণ সেই নগরীতেÑ ওরা যে আমার পিতার হন্তারক।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর তর্জনী প্রতিস্থাপনের দৃষ্টান্ত অনুসরণযোগ্য। তাঁর হৃদয়ের প্রবল অনুভূতি অনেক ভাগ্যবিড়ম্বিত ব্যক্তিকেও করুণায় আবর্তিত করেছে। বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব চেতনার প্রতিবিম্ব একটি জাতির ইতিহাসকে মুক্ত করেছে মূল্যবোধহীন সামন্ত প্রথার নাগপাশ থেকে। বাঙালি জাতির জাগ্রত চলমানতা বিশ্ব পরিমণ্ডলে সামগ্রিক আলোড়ন তুলেছে বঙ্গবন্ধুর আপোষহীন ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে। তাই বাঙালি জাতি তার অহংবোধে জীবন ও ধর্মের প্রয়োজনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা, সমাজনীতি ও কল্যাণ বৃত্তি ধারণ করে সত্য ও সুন্দরের এক প্রাণময় বাংলাদেশ গড়বেÑ এটাই প্রত্যাশা।
 লেখক পরিচিতি: সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদ, চাঁদপুর জেলা শাখা, চাঁদপুর।

********************************************************* **********************

         অপসংস্কৃতি                   

জালাল কবির
 
মি এ নিবন্ধে সমাজবিজ্ঞানীদের মতো সংস্কৃতি এবং অপসংস্কৃতির কোনো সংজ্ঞা দিতে যাচ্ছি না। কিন্তু এ সম্বন্ধে অতি সহজ ভাষায় দুটো কথা বলতে চাই। প্রত্যেক জাতির-ই কম-বেশি কিছু নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান, নিজস্ব সামাজিকতার পর্ব ও নিয়ম-কানুন আছে। মানুষ সামাজিক জীব বলে-ই তার বন্ধুত্বের প্রয়োজন আছে, তার আত্মীয়তার প্রয়োজন আছে। ধর্মীয় প্রার্থনা ও অনুষ্ঠানাদি আছে, মনের খোরাক ও আত্মতৃপ্তির জন্যে বিভিন্নপ্রকার উৎসব আছে। এগুলো ছাড়া সে সমাজে অচল। এসমস্ত আচার-অনুষ্ঠান দ্বারা একে অন্যের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়। সাহায্য, বন্ধুত্ব, শান্তি ইত্যাদিও সে উপভোগ করে। এগুলো পৃথিবীর আদিকাল থেকে মানুষের সমাজে, রক্তে, হৃদয়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এসমস্ত ব্যাপার আমরা অবুঝ বয়স থেকেই দেখে আসছি বলে ওইগুলো আমাদের খুব সহজ ও স্বাভাবিক বলে মনে হয়। গভীরভাবে আমরা ওইসব তলিয়ে দেখি না, বুঝবার জন্যেও অতশত চিন্তা করি না। কিন্তু যখন’ই আমরা নিজ সমাজ থেকে দূরে থাকি, কিংবা অন্য সমাজে বসাবস করি তখনই ব্যাপারটা আমাদের কাছে পরিষ্কার ধরা পড়ে। তখন আমাদের আর বুঝিয়ে বলতে হয় না। সমাজের কৃষ্টি বা কালচার হচ্ছে সামগ্রিকভাবে সমাজের একটি বস্ত্র, একটি লেবাস। এই বস্ত্রের পরিবর্তন কেউ পছন্দ করে না, কারণ এতে তার নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে ফেলে, তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারায়। সকল উন্নত জাতি রাষ্ট্রীয় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে নিজের কৃষ্টি-কালচারকে কীভাবে আরও সুন্দর এবং উন্নত করা যায়, অপরাপর জাতির কাছে কীভাবে আকর্ষণীয় করে তোলা যায় সে চেষ্টা সবাই করে। আরও সুন্দরভাবে বলা যায়, আপন আপন সংস্কৃতি প্রত্যেক জাতির একটা মূল্যবান সম্পদ। এ সম্পদ সম্পূর্ণভাবে তার মাতৃভাষার সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ‘সংস্কৃতি’ নামক এ সম্পদটি, এ পরিচয়টি কোনো জাতি হারাতে, খোয়াতে বা নষ্ট করতে চায় না। সবাই জানে, কাক নিজের পালক খসিয়ে ময়ূরের পালক লাগালেও সে ময়ূর হতে পারে না। কিন্তু এ বাঙালি সমাজে মুসলমান এবং হিন্দু বিত্তশালীরা এবং বিশেষ করে আধুনিক নামধারীরা নিজের পালক খসিয়ে ময়ুর হবার খায়েস শুধু দুর্বার নয়, গগনচুম্বীও বটে। তারা এদেশের মানুষকে অমানুষ ভাবে এবং নিজেরাই নিজেদেরকে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে ‘স্মার্ট’ (!) বলে আত্মতৃপ্তিতে অহঙ্কার বোধ করেন। তারা এদেশের মানুষের জীবনকে সুন্দর করে চিনেন না। ইজ্জত চলে যাবার ভয়ে চেনার পরিবেশ থেকে ইচ্ছে করে দূরে থাকেন। বিত্ত, বৈভব আর চলতি যুগের আর্টিফিসিয়েল তথা মেকি পণ্য নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকেন। স্বদেশের অনেককিছুই তারা জানেন না, খোঁজ নেন না। অথচ আমেরিকা, ইউরোপের কৃষ্টি-কালচার, আমোদ-প্রমোদ, খেলাধূলা এসবের চুলচেরা খবর রাখেন। তারা এদেশে বড় হয়েও বিদেশী কৃষ্টিকে বুকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান। বাপ-দাদার মতো নিজেদের মনে আভিজাত্যের গোঁড়ামি ও অহঙ্কার। তারা স্বদেশে বড় হলেও স্বদেশের প্রতি মমত্ত্ববোধ নেই। তাই সুযোগ পেলেই ব্যবসা-বাণিজ্যে কৃত্রিম সংকট ঘটিয়ে মানুষকে কষ্ট দিয়ে পয়সা বানাতে তারা আনন্দবোধ করেন। কালো টাকা পাচার করতে মজা পান এবং রাষ্ট্রীয় তহবিল তছনছ করতে ভালোবাসেন। কারণ এদেশ, এজাতি তাদের চোখে আবর্জনাময়। তাই তারা স্বদেশের মাটিতে বিদেশী ভাষায় কথা বলতে পছন্দ করেন। দেমাক করেই বলেন, ফকিরদের আবার কালচার কি? খাবার নেই যে জাতির, তাদের আবার কালচার!
যুগের তালে তালে এই সম্প্রদায়গুলো বিদেশের কৃষ্টিকে শেষ পর্যন্ত নিজের ঘরে-দুয়ারে জায়গা দেয় এবং স্বদেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতিকে বিদেশের সংস্কৃতি দিয়ে মুগুরপেটা করতে ভালোবাসে। তারা সবাইকে মাইকেল জ্যাকসন বা ম্যাডোনা বানাতে চায়। সবাইকে বিদেশী ফ্যাশনের নামে উগ্রতা ও নির্লজ্জতা শেখাতে চায়। বার্থ ডে পার্টি, ককটেল পাটি, ডিসকো নাচের মধ্যে খোলামেলা যৌনচর্চার পরিবেশ চায়। তারা বোম্বে ফিল্মের ভিলেন অমরেশপুরী হতে চায়। তারা বিদেশী মদ, বিদেশী সিগারেট ফুঁকে কুংফু মাস্টার হবার তীব্র বাসনা প্রকাশ করে। তারা বিদেশী স্টাইলে বিবাহ থেকে শুরু করে শেষ অবধি যা ইচ্ছে তাই করার মানসে, ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে সকল আইন-শৃঙ্খলা নামক বাধা বিপত্তিরও উচ্ছেদ চায়। যে বা যারা নিজের কৃষ্টি- কালচারকে ধ্বংস করে তারা বিবেকের আইনে অপরাধ করে। যারা বিদেশী কালচার স্বদেশে আমদানি করে তারা চোরাচালানি অর্থাৎ স্মাগলিংয়ের থেকেও বেশি অপরাধ করে। আমার কথা হল: এদেশের কালচার যদি তাদের এতই না পছন্দ, তাহলে বাপু যে দেশের কালচার তোমার মনে বাসা বেঁধে আছে, ওই দেশেই চিরতরে চলে যাও। আমরা খুশি হবো। তোমাদের মতো নরাধমকে কেউ প্রয়োজন বোধ করবে না। এই বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলিম দু’টি ধর্মীয় ব্যবধান থাকলেও এরা যুগ যুগ ধরে একত্রে বসবাস করে আসছে। শুধু ব্রিটিশের শেষ যুগে রাজনৈতিক নেতাদের দূরদর্শিতার অভাবে এ দু’টি জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ধর্মীয় জীবনের বাইরে এ দু’টি জাতির আরেকটি আলাদা পরিচয় আছে আর তা’ হল বাঙালি। তাদের একই ভাষা, একই খাবার-দাবার, একই পোশাক-পরিচ্ছেদ। একই নমুনার চামড়া, একই নমুনার মানসিকতা এবং একই প্রাকৃতিক পরিবেশে এদের বসবাস। এক সম্প্রদায় পূর্ব পাকিস্তানি হয়েও তাদের বাঙালিত্বকে বিসর্জন দেয়নি। অপর সম্প্রদায় ভারতীয় হয়েও বাঙালি সত্তাকে ভুলে যায়নি। তাই এ দেশের কালচার আজও নি¯প্রভ হয়ে যায়নি। পৃথিবীতে যেখানে যতই উৎসব হোক, তাতে আমাদের (অর্থাৎ বাঙালির) মন ভরেনি।
কিন্তু যখন বাঙালির পহেলা বৈশাখ, চৈত্র সংক্রান্তি মেলা, নবান্ন উৎসব, বিয়ের উৎসব, বিয়ের গীত, নৌকা বাইচ, ঈদ উৎসব, পূজা উৎসব হয়, তখন মনে হয় এর থেকে মধুরতম পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। এদেশের রাগপ্রধান উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, সেতার, সানাই, বাঁশি বিশ্বের বুকে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। এদেশের বাউল গান, জারি গান, খলিফার গান, মুর্শীদি, মারেফতি গান, বিয়ের গান, ফসলকাটার গান, লালন, হাছন, সীতালঙ, নজরুল, রবীন্দ্র, অতুলপ্রসাদের গান শুধু চিত্তবিনোদন বা আধ্যাত্ত্বিকতায় নয়, বরং জীবনের সাথে যেন একাত্মতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, আধুনিক গান ছাড়াও রয়েছে যাত্রা এবং নাটক, কবিতা আবৃত্তি, বনভোজন, সাপনাচ, আঞ্চলিক শ্লোক, ছড়া, উপজাতিদের নাচ, নববর্ষ, বিবাহ উৎসব, আমাদের সংস্কৃতির মণি-মুক্তা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পরেও রয়েছে হরেকরকমের খেলাধুলা যা ব্যায়ামের’ই অন্তর্ভুক্ত। এসব খেলাধূলাতে আর্থিক খরচও অতি নগণ্য। এসব খেলাধুলায় ছেলে- মেয়ে নির্বিশেষে খেলতে পারে। ডাংগুলি, কাবাডি, দাড়িয়াবাঁধা, কানামাছি, গোল্লাছুট, শ্বাসধরা, কাটি খেলা, হংস শিকার, বেদের নাচ, বিয়ের নাচ, পুতুল নাচ, এযুগের ব্যাডমিন্টন, ফুটবল এসব’ই আমাদের ক্রীড়া সংস্কৃতির মণি-মুক্তা। বাঙালির সংস্কৃতি আছে বলেই একজন আরেকজনকে সামাজিক এবং ধর্মীয় পূণ্যের দৃষ্টিতে, বিপদে আপদে সাহায্য করে। জ্ঞাতি ভাই বলে একজন আরেকজনকে ভালোবাসে। একের আচার-অনুষ্ঠানে অন্যকে আন্তরিক নিমন্ত্রণ করে। এক বাঙালি আরেক বাঙালির বিপদে সাহায্যের হাত বাড়ায়। অসুখ হলে পথ্য নিয়ে যায়, না হয় পথ্য বাতলে দেয়। সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার ও পানীয় নিয়ে যায়। পাশ্চাত্যের মতো লোক দেখানো ফুল না নিয়ে গেলেও বুক ভরে নিয়ে যায় দোয়া, আশির্বাদ, মায়া-মমতা আরও কত কি। সম্প্রীতি আছে বলেই এক বাঙালির গাছে অতিরিক্ত ফল উৎপন্ন হলে সে প্রতিবেশিকে তার ভাগ দেয়। পুকুরের মাছ কিংবা ঘরে ভালো খাবার হলে কিংবা েেতর জমিনে ফসল ভালো হলে সে প্রতিবেশিকে বা আত্মীয় বন্ধুকে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু দিতে পেরে তৃপ্তির হাসি হাসে। বাঙালি সমাজে নিজ হাতে তৈরি কোনো খাদ্য কিংবা দ্রব্যাদি দানের মধ্যে যে তৃপ্তি ও আন্তরিকতা লুকিয়ে থাকে, বাজার থেকে দাম দিয়ে মেকি দ্রব্য দান করে অতটুকু আনন্দ থাকে না। ওখানে মানুষের ভালোবাসার মূল্যায়ন টাকায় নির্ধারিত হয়ে যায়।
দেশে বাস্তবতার নিরিখে যে শিা, সেই শিার অভাবে এবং ধর্মীয় শিার কারণে আজকের বাঙালির ঘরে ঘরে বিবেক বিবেচনাহীনভাবে জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। এই জনসংখ্যার চাপে বাঙালি দিশেহারা। অভাব বাড়ছে তাই সামান্য স্বার্থের কারণে মনোমালিন্যতার বিবাদ বেড়েই চলেছে। বাঙালির ঘরে দু’তিনটে সন্তান আনন্দের ব্যাপার। অথচ অজ্ঞ, শিাবঞ্চিত, বাঙালির ঘরে গণ্ডায় গণ্ডায় সন্তান এ কেমন অভিরুচি ? আবার অনেক বাঙালি শিতি হয়েও ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার তার মন থেকে মোছে না, তাই বাচ-বিচার না করে ক্রমাগত সন্তান উৎপাদন বাড়িয়ে যাচ্ছে। তার বিশ্বাস. অধিক সন্তান তার গৃহের জন্যে মঙ্গলজনক। ভাগ্যলক্ষ্মী ভবিষ্যতে বহু সন্তানের জন্যে তাকে সুখ দেবেন, বেশি অর্থ আসবে। এরকম কত গোঁড়ামির ধারণায় তার মন আচ্ছন্ন। অথচ যখন বেশ কয়েকটি সন্তান হয়ে যায় তখন আর পেছন ফেরার উপায় নেই। এসব বাচ্চার লালন-পালন করতে গিয়ে “ঠেলার নাম বাবাজির” মতো অবস্থা, এখন সর্বদাই তাদের মুখটা থাকে শুকনো আর মনটা থাকে কষা।
বাঙালিকে ধর্মীয় গোঁড়ামি ত্যাগ করে আরও সুশিতি হতে হবে। কেউ যেন আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে বিদেশী সংস্কৃতির মিশ্রণে খিচুড়ি করে না তুলেন। এতটুকু খেয়াল করে চলতে হবে। বাঙালি সংস্কৃতিকে আরও সুন্দর ও উন্নতমানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদেরকে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। পণ্যদ্রব্য যেমন এক্সপোর্ট কোয়ালিটিতে উন্নত করে তা’ দিয়ে ব্যবসা করা যায়, তেমনি নিজ কৃষ্টি-কালচারকে রপ্তানি গুণাগুণে উন্নীত করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। পৃথিবীর বহুদেশ এভাবে বিদেশী পর্যটকদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে নিজেদের কৃষ্টি কালচারকে গবেষণার মাধ্যম এগিয়ে নিয়ে। সুতরাং আমরা পিছিয়ে থাকবো কেন?  

 *******************************************************************

ঘুরে এলাম বদরপুর

 

মুহাম্মদ শেখ সাদী

শুরুতেই বলে নেই পৃথিবীতে সাহিত্যের দুই মতবাদের অনুসারী বিদ্যমান। কেউ বিশ্বাস করেন সাহিত্যের জন্যেই সাহিত্য (শিল্পের  জন্যেই শিল্প)। আরেক দল মানেন জীবনের জন্যে সাহিত্য (শিল্প) আমি দ্বিতীয়প।ে ভাবলাম বৈশাখ নিয়ে লিখব। তারপর মাথায় চিন্তার রায় হল জীবনের জন্য সাহিত্য। অর্থাৎ আজকের বিষয়টা সমাজের জন্য মানুষের জন্য অধিকতর জরুরী। বৈশাখ নিয়ে লেখে অনেকেই এই হল সান্তনা।

গত ১৭ ই চৈত্র দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠে লেংটার মেলার উপর নেতিবাচক বিপোর্ট মনে পাক খেল। সরজমিনে দেখার খুব ইচ্ছা ছিল। তাই করলাম। এবার বর্ণনায় যাওয়া যাক।

মোটর সাইকেলের পিছনে আমার দুই বন্ধু। তখনও মেলা প্রাঙন থেকে প্রায় আধা মাইল দূরে আমাদের মোটরযান। ঢাক ঢোলের আওয়াজ স্পষ্টভাবে কানে এল। লেংটার মাজার বদরপুরের একটি বাড়িতে হলেও বদরপুর গ্রাম ছাড়িয়ে আশেপাশের দুই কিলোমিটারের বেশি জায়গা জুড়ে অবস্থান করেছে মেলার বিস্তৃতি, ফকিরদের আস্তানা। আমাদের পা চলল মাঝার বরাবর! নাকে ভেসে এল তীব্র গন্ধ। বুঝতে দেরী হল না গাঁজার গন্ধ। বাতাসে কি করে গাঁজার গন্ধ ভাসে এই প্রথম অভিজ্ঞতা হল। পায়খান ার গন্ধ গাঁজার সুভাসে ঢাকা পড়েছে। আমি অবাক হয়ে যাই এত পাগল কোথেকে এলো। আমি নিশ্চিত এত পাগলের সমাবেশ আর কোথাও হয় নাঃ। পরনে  ছোট প্যান্ট। কারো কারো শুধু আন্ডারওয়ার শরীরে অবশিষ্ট আছে, রু, জট দাড়ি আর চুল মিলে চেহারা গিলে ফেলেছে। সামনে দিয়ে চলে গেলে নাক বলে দেয় পাঠার গন্ধ।

হাসান সরকার নামের এক ফকিরের আসতানায় আমরা উপস্থিত হলাম। সাইকোলজি জানা থাকার কারণে মানুষের মনের ভিতর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারি। আর লেখালেখির কল্যাণে চেহারায় মাঝে খুজে পাই আসল নকলের পরিচয়। মাথায় টুপি দুপাশে দুটি কোলবালিশ নিয়ে খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা। (খুনি শিকদারের মত চেহারা) আসন গেড়ে বসে আছেন। বামপাশে পুরুষ ডান পাশে মহিলা। সবাই গানের তালে মেতে উঠেছে। কেউ হাততালি আবার  কেউ কেউ দাঁড়িয়ে পুতুলের নাচছে মহিলা পুরুষ সবাই এক সাথে। আধঘণ্টা পর মহিলাদের সাড়ি বাবার হাতে বয়াত গ্রহণ করবে। কাল চামড়ার হ্যাংলা পাতলা গড়নের মহিলাদের তিন মাথায় সামান্য ছোঁয়া দিয়ে বিদায় দিচ্ছেন। আমাদের দৃষ্টি তারপরের সুন্দরী মহিলাদের প্রতি। বাবা আমাদের কানাকানি টের পেয়েছেন। মহিলা আসল। বাবার পায়ে সেজদা দিলেন। বাবা এবার সক্রিয় হলেন চোখ বন্ধ করে। মহিলার ওড়না পিঠ থেকে মাথার উপর পড়তে বাবার হাত সাহায্য করল। এবার বাবা মহিলার স্পর্শকাতর স্থানে হাত বুলাচ্ছেন দীর্ঘণ ধরে। তারপর মুখ উপরে তুলার পর বাবা সন্তানের মুখে আদর দিচ্ছেন। মহিলারা বাবার চরণে ও হাতে চুমু খেতে লাগল। এদিকে আমাদের রক্ত নাচতে শুরু করলে স্থান ত্যাগ করি।

তারপর আসলাম নূরা পাগলার আস্তানায়। আম গাছের তলায় বিশাল আস্তানা। একটি ফটোগ্রাফ দেখে বুঝলাম এটাই নূরা পাগলার ছবি। অর্থাৎ তিনি এখন আর জীবিত নেই। ফটোগ্রাফার ছবির বর্ণনা পরনে নীল আন্ডারওয়ার, হাতে সিগারেট, চুল দাড়ি সমানতালে বুকের উপর পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি একটি চেয়ারের উপর বসে আছেন। ওনার ভক্তরা সবাই শুধু আন্ডারওয়ার পড়েন। সবচেয়ে বৈচিত্র সেটা হল ওনাদের সবার পায়ের উপরের অংশে ছুরি বিদ্য। বিশাল বিশাল ঢোলের শব্দের মাঝে কেউ কেউ বিকির করছে। পিছনে কতগুলো মহিলা বসে আছে। কোনার দিকটায় পুরুষ নারী একত্রে শুয়ে আছে। এখানে একটা চাল বিক্রি হয় ১০ টাকা এবং একটা ভাত বিক্রি হয় ১০০ টাকায়। মূলনীতি হল যে যে নিয়তে খাবে সে নিয়ত পূরণ হবে।

এবার লেংটার মাঝারে আসি। মাঝারের দরজার উপর নেমপ্লেট লেংটার নাম লেখা আর সেখানে লোকজন গোলাপজল ছিটিয়ে দিচ্ছে আর সে স্থানটা মুছে মুছে কপালে মাখছে। ভিতরে নারী পুরুষ সমানে কবর পূজা করছে আর কবরে চুমু দিচ্ছে। পাশে বিশাল টাকার বাক্স। এখানে সবার হাত খুব প্রসারিত।

এবার রাতের সময়। নাচগান চলছে আগের নিয়মে। আস্তানার পাশে বড় বড় হাড়িতে রান্না হচ্ছে। যেসব ফকির দিনের বেলা এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি করে করেছিলেন তারা এখন খুবই ব্যস্ত। অবাধে গাঁজা বিক্রি করছেন। মনে হচ্ছে মাছের বাজার। যথেষ্ট মূল্য পাচ্ছেন বিক্রেতারা। এত প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি এবং সেবন হতে পারে তা দেখলেও অবাক লাগে। এখানে আসেন ঢাকাসহ বহু শহরের শিল্পপতি থেকে শুরু করে নিম্নশ্রেণীর লোক। তাদের সাথে আরও আসে নিশিকন্যারা। পুকুরের পাড়ে আস্তানার ভিতরে রাতের বেলা এ দৃশ্য দেখা যায় অহরহ। দিনের পর দিন এখানে আস্তানার সংখ্যা বাড়ে। তারা এলাকার সহজ-সরল লোকদের ধোঁকা দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বড় অংকের টাকা। সাথে নারীদের ইজ্জত। প্রশাষন সেখানে সরব উপস্থিতি দেখায়। আসলে কোন লাভই হচ্ছে না। বরং দিনে দিনে এই মেলা নামক নরকের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের মূল্যবোধ। সকল ধর্মের লোকদের মিলনমেলা যেন কিছুতেই আর তির কারণ না হয় সে বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।



lNew

রবী ঠাকুরের পদধূলিতে

ধন্য হয়েছিলো বাংলার নির্জন প্রান্তর

 
সাহিত্য আলো স্পেশাল


আসছে ২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ জন্মদিন। তাঁর জন্ম কোলকাতার জোড়াসাঁকোতে হলেও সাহিতকর্ম ও নানা কীর্তির জন্যে তিনি ওতপ্রোতভাবে বাংলাদেশের বেশ কিছু স্থানের সাথে জড়িয়ে আছেন অত্যন্ত গভীরভাবে। রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলোর মধ্যে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ‘কাচারীবাড়ি’ ও কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার শিলাইদহ গ্রামের রবীন্দ্র ‘কুঠিবাড়ি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসকল স্থানে বসেই তিনি একান্ত নির্জনে বসে উৎকৃষ্ট সাহিত্যকর্ম রচনা করেছিলেন।
শাহজাদপুর কাচারীবাড়ি
শাহজাদপুর সিরাজগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী একটি উপজেলা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও সাহিত্যের ভুবনে শাহজাদপুর এক অবিস্মরণীয় নাম। শাহজাদপুরের উন্মুক্ত উদার প্রকৃতির প্রান্তরে এসে নিখিল বিশ্বের সঙ্গে কবি প্রাণের গভীর বন্ধন সূচিত হয়। তাঁর চিত্তে প্রেম ও কর্মবোধের সমন্বয় ঘটেছিলো শাহজাদপুর এসে। শাহজাদপুর থেকে কবিগুরু তার ভ্রাতৃষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে অনেকগুলো চিঠি লিখেছেন, যা ছিন্নপত্রাবলীতে স্থান পেয়েছে। যার একটি চিঠিতে কবি লিখেছেন, “অনেককাল বোটের মধ্যে বাস করে হঠাৎ শাহজাদপুরের বাড়িতে এলে বড় ভালো লাগে। এখানে যেমন আমার মনে লেখবার ভাব এবং ইচ্ছা আসে এমন আর কোথাও না।”
১৯৩৯ সালে শাহজাদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের তদানীন্তন প্রধান শিক নরেশ চক্রবর্তী কবির সাথে সাাত করলে কবি বলেছিলেন, “সময় সময় মনে হয় শাহজাদপুরকে একবার দেখে আসি। কিন্তু দেহ অপটু হয়ে পড়েছে। আর বোধ হয় কোথাও যাওয়া হবে না।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে কবি বলেছিলেন, “আবার যদি এদেশে জন্মগ্রহণ করি তবে হয়তো যাবো।”
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদারদের বাংলাদেশে যে কয়টি বাসভবন ছিলো শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাচারীবাড়ি তারমধ্যে অন্যতম। ১৮৯০ থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬ বছর জমিদারীর তত্ত¡াবধান কাজে কবিগুরু শাহজাদপুর উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্র দারিয়াপুর গ্রামে অবিস্থত কাচারীবাড়িতে অবস্থান ও যাতায়াত করতেন। জমিদারী তদারকির পাশাপাশি এই কাচারীবাড়িতে বসে তিনি রচনা করেছেন সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালী, কল্পনা কাব্যের কবিতা বিশেষ, কয়েকটি বিখ্যাত ছোট গল্প, ছিন্ন পত্রাবলীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পত্র, পত্রভূতের অংশবিশেষ, মেয়েলী ছড়া বিসর্জন নাটক। তাঁর রচিত কবিতা ও ছোট গল্পের মধ্যে দুইপাখি, ব্যর্থ যৌবন, ভরা ভাদরে, কুমার সম্ভরের গান, ইছামতী নদী, তৃণ, মৃত্যু-মাধুরী, স্মৃতি, যাত্রী, পোস্ট মাস্টার, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, ছুটি, ুধিত পাষাণ, অতিথি, তারাপ্রসন্নের কীর্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিন তৌজির অন্তর্গত ডিহি শাহজাদপুরের জমিদারী এক সময় নাটোরের রাণী ভবানীর জমিদারীর অংশ ছিলো। ১৮৪০ সালে শাহজাদপুরের জমিদারী নিলামে উঠলে কবির পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর মাত্র তের টাকা দশ আনায় এ জমিদারী কিনে নেন। জমিদারীর সঙ্গে সঙ্গে শাহজাদপুরের কাচারীপাড়া বাড়িটিও তাদের হাতে আসে। এর আগে এই বাড়ির মালিক ছিলো নীলকর সাহেবরা। দোতলা সুরম্য এই অট্টালিকা ছিলো ঠাকুর জমিদারদের আবাসস্থল। জমিদারী তদারকির উদ্দেশ্যে কবিগুরু তাঁর যৌবনের অনেকগুলো দিন এই কাচারীবাড়িতে অতিবাহিত করেন। কাচারীবাড়ির দোতলায় বসেই তিনি সাহিত্য রচনা করতেন। যৌথ জমিদারী ভাগ হয়ে শাহজাদপুরের অংশ কবির মেজো কাকা গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধরদের হাতে গেলে তখন থেকে কবি শাহজাদপুরে আসা ছেড়ে দেন।
শাহাজাদপুর উপজেলা সদরের বাজারের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া শাখা নদীর উত্তর পাশে কাচারিবাড়িটি অবস্থিত। বর্ষা মৌসুমে কবি বোটে করে এই নদী পথেই কাচারীপাড়া বাড়িতে যাতায়াত করতেন। কিন্তু বর্তমানে নদীটির কোনো চিহ্ন নেই। প্রায় ১০ বিঘা জমির ওপর শাহজাদপুর কাচারীবাড়ি অবস্থিত।  ভবনটিতে বিভিন্ন আকারের ৭টি ক আছে। ভবনটির উত্তর-দণি উভয় দিকে ৩.৬ মিটার চওড়া বারান্দা আছে। ছয়জোড়া স্তম্ভের ওপর নিচের তলায় বারান্দার ছাদ। গোলার জোড়া স্তম্ভের উপরাংশের অলঙ্করণ, বড় মাপের দরজা-জানালা ও ছাদের ওপরে প্যারাপেট দেওয়ালে পোড়ামাটির কাজ বিশেষভাবে ল্যণীয়। ১৯৬৯ সালে প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তর এই ভবনটি সংরতি পুরাকীর্তি হিসেবে অধিগ্রহণ করে। পরে একতলা ও দোতলার ছাদ পুনঃনির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হয়। একতলায় গ্রন্থাগার স্থাপন ও রবীন্দ্র জীবনভিত্তিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং দোতলায় এ বাড়িতে প্রাপ্ত আসবাবপত্র, কবির ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও আলোকচিত্র নিয়ে রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘরে রূপ দেয়া হয়েছে। এছাড়া কাচারীবাড়ি অডিটোরিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে।
শাহজাদপুর কাচারীবাড়িতে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উপলে প্রতি বছর জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচির আলোকে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় তিন দিনের রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উদ্যাপন করা হয়। এ উপলে কাচারীবাড়ি চত্বর রবীন্দ্র ভক্ত ও অনুসারীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। গোটা শাহজাদপুর মেতে ওঠে উৎসবের আনন্দে।
কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি
বাংলাদেশের মানুষের কাছে কুষ্টিয়ার শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি এ কারণেই আলাদা মর্যাদা পেয়েছে যে, বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠতম এই কবির সঙ্গে এদেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি এ স্থানটি। কবিগুরুর এ বাসস্থানটি এদেশের মানুষের কাছে আলাদা মর্যাদাও পেয়েছে সেজন্যে। তিনি এখানে বসে রচনা করেছেন তাঁর জীবনের অনেক উৎকৃষ্ট রচনা। লিখেছেন তাঁর নোবেল বিজয়ী ‘গীতাঞ্জলি’র অংশবিশেষসহ আরো অনেক রচনা।
১৯৭২ সাল থেকে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজনের মাধ্যমে এখানকার মানুষ বিশ্বকবিকে স্মরণ করছে ব্যাপকভাবে। প্রতিবছর কুষ্টিয়াবাসী কবির স্মরণে আয়োজন করেছে রবীন্দ্র মেলার। তখন থেকে চলতে থাকা এ মেলাটি ৭/৮ বছর আগে থেকে আয়োজন শুরু করছে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন। এবারও এখানে মেলা অনুষ্ঠিত হবে। ২৫ ও ২৬ বৈশাখ দু’দিন ধরে চলে ‘রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী মেলা’। কুমারখালী উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমী ও শীলন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল আয়োজন। আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ ও রবীন্দ্রগবেষকগণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকর্মসমূহ নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হৃদয়ে এই শিলাইদহ বিশেষ স্থান দখল করেছিলো অনেকটা সময় ধরে। এখানে বসে তিনি রচনা করেছিলেন অনেক অসাধারণ কবিতা। সময় পেলেই পদ্মাবোটে চেপে কুঠিবাড়িতে ছুটে আসতেন। তাঁর পদচারণা ছিলো বিশ্বব্যাপী, তাঁকে বলা হয় বিশ্বমানব। অনেক জায়গার মতো তাঁর পদধূলি পড়েছিলো এই বাংলাদেশে, বিশেষ করে শাহজাদপুর, নওগাঁর পতিসর এবং কুষ্টিয়ার শিলাইদহে।
নিজের জমিদারীর বদৌলতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদচারণা পদ্মাপাড়ের ছায়া সুনিবিড় শিলাইদহে ছিলো একটি বেশি। তাই কুষ্টিয়াবাসীও পরম মমতা-ভালোবাসায় আগলে রাখছে প্রিয় কবির সকল স্মৃতি। তাই স্বাধীনতার আগ থেকেই কুষ্টিয়াবাসী তাঁর জন্মদিন উপলে আয়োজন করেছে ‘রবীন্দ্রমেলা’। প্রতি বছরই কবির জন্মদিন উপলে নাচে-গানে দু’দিনের অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে পান্টি সংগীত একাডেমী, কিন্নরী সংগীত নিকেতন, কলতান সংগীত একাডেমী, ভেড়ামারা সাংস্কৃতিক একাডেমী, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমী, উদীচী কুষ্টিয়া জেলা সংসদ, শিশু একাডেমী, বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি পরিষদ, জেলা শিল্পকলা একাডেমী, শিলাইদহ রবীন্দ্র সংসদ, কুষ্টিয়া মিউজিক কাব, কুষ্টিয়া আবৃত্তি পরিষদ প্রমুখ সাংস্কৃতিক সংগঠন।
শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির দেয়ালে থাকে নানা ফটোগ্রাফ। কেউ সেখানে ছুঁয়ে দেখেন রবী ঠাকুরের ব্যবহৃত পাল্কি, চেয়ার, সিন্দুক, সেলফসহ নানা আসবাবপত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ছবিগুলোও কম বিস্ময় জাগায় না দর্শকের চোখে। এককালে এই বাড়ির ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যেত পদ্মা নদীর মোহনীয় রূপ। এখানেই বসে কবি মগ্ন থাকতেন কাব্যচর্চায়। একদা এক পূর্ণিমা রাতে কবি রচনা করেন, ‘চাঁদের আলো বাঁধ ভেঙ্গেছে, উছলে পড়ে আলো, ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধসুধা ঢালো...’।
শিলাইদহের এ বাড়ির পাশেই বসে প্রতিবছর গ্রাম্য মেলা। নানা রকমের আসবাবপত্র ও পণ্যের পসরা বসে মেলায়। মেলার একপাশে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় লাঠিখেলা, পুতুল নাচ এবং নাগরদোলার। এভাবেই বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বাঙালির এই কবিকে স্মরণের উদ্যোগ হাজারো দর্শনার্থীর আগমনের মধ্য দিয়ে প্রতিবছরই জাঁকজমকের সাথে পালিত হচ্ছে।
--------------------------------------------------------------------------------------

রবীন্দ্রনাথকে জানতে হলে

এ. এফ. এম. ফতেউল বারী রাজা


বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদান অতুলনীয়। তাঁর সৃষ্টি বিশ্ব সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ। যার সীমা অসীম, পরিমাণ অপরিমেয় এবং গভীরতা অতলান্ত। তাই একে মহাসাগরের সাথে তুলনা করলে অতুক্তি হবে না।  পুরো সৃষ্টিসম্ভার বাদ দিয়ে তাঁর একটি অংশের ওপর যদি কোনো ব্যাক্তি সারাজীবন জ্ঞান অর্জনে কালাতিপাত করেন পেরে উঠবেন কি-না সন্দেহ। তাই ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে রবীন্দ্রনাথের জ্ঞানের গভীরতা সৃষ্টির পরিধি ও পরিমাপ নিরুপণ সহজসাধ্য নয়।
খোদা প্রদত্ত অসাধারণ মেধাশক্তির অধিকারী মা সরস্বতীর বরপ্রাপ্ত বিশ্ববরেণ্যে সর্বকালের, সকল জাতির এবং সকল মানুষের কবি তথা আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কৈশোর বয়সেই রবীন্দ্রনাথকে চিনতে ভুল করেননি। তাঁর লেখা পেলেই পড়েছেন মনোযোগ সহকারে। জ্ঞান সঞ্চয় করে রেখেছেন হৃদয় কুঠুরিতে। প্রতিদিন সকাল-সন্ধা ফুল-ধূপ-চন্দন দিয়ে শ্রদ্ধাঘ্য অর্পণ করেছেন রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে। বহু সংগীতসহ সম্পূর্ণ গীতাঞ্জলি করেছেন হৃদয়ঙ্গম এবং কণ্ঠস্থ। যা কোনো মেধাবী মানুষের পে অদ্যাবধি সম্ভব হয়নি। তাই তিনি খ্যাত হয়েছেন রবীন্দ্র সংগীতের হাফেজ এবং শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্র ভক্ত হিসেবে। তাছাড়া নজরুল তাঁর সৃষ্টিসম্ভারের অনেক জায়গায় রবীন্দ্রনাথের গানের পঙ্ক্তি এবং লেখার অনেক উক্তি উদ্ধৃতি করেছেন।
মধ্যাহ্ন গগণের সূর্য যেমন তেজদীপ্ত রশ্মিতে দশ দিগন্ত করে আলোয় আলোয় আলোকিত, তেমনি সাহিত্য গগনে রবির জ্ঞানের আলোর ছটায় সকল প্রান্ত হয়েছে উদ্ভাসিত। সাহিত্যের এমন কোনো দিক নেই যেথায় তাঁর কলমের যাদুর স্পর্শে জড় বস্তুতে প্রাণের সঞ্চার লাভ করেনি। কোনো পাঠক রাত-দুপুরে একাকী নিভৃতে যদি তাঁর কঙ্কাল প্রবন্ধটি পড়েন, দেখবেন জড় বস্তু কঙ্কাল কেমন করে জীবন্ত হয়ে নড়াচড়া দিয়ে ওঠে। ভয়ে তখন আপনি চুপসে যাবেন। এরপরও কতজন কত কথা কয়, কত মন্তব্য করেন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না- কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও বিজ্ঞানী কোনো জাত-ধর্ম-বর্ণ, গোষ্ঠী বা গোত্রের নয়। এরা সর্বকালের, সকলের এবং মানুষের। এদের সবচেয়ে বড় পরিচয় এরা মানুষ এবং এদের ধর্ম একটি, তা’ হলো মানবধর্ম। এদের কর্মকাণ্ড আবহমান কালধরে সকল মানুষের সর্বময় কল্যাণে। রবীন্দ্রনাথ এই সুন্দর পৃথিবী এবং তার মানুষকে হৃদয় অন্তঃকরণ দিয়ে খুব ভালোবেসে ছিলেন। তাই মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও মরতে চাননি, ধরিত্রীর মায়া ত্যাগ করতে পারেননি, মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। তাই তাঁর লেখায় হৃদয়ের সেই আকুতি মূর্ত হয়ে উঠেছে-
“মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভূবনে
মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।”
রবীন্দ্রনাথকে জানতে হলে তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য ভাণ্ডারের বিশাল জলধিতে জ্ঞান অন্বেষণের একান্ত বাসনা নিয়ে অবগাহন করতে হবে। তা’ না হলে রবীন্দ্র সাহিত্যের বিস্তৃতি এবং গভীরতা কত তা’ উপলব্ধি করা যাবে না।
অজ্ঞানতার ঘন কালো অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে আমাদের জ্ঞান চু অন্ধ হয়ে থাকবে। নজরুল না জানার সেই ভুলটি করেননি। তাই তিনি রবীন্দ্রনাথের আশীতিতম জন্মবার্ষিকীতে অশ্র“-পুষ্পাঞ্জলি কবিতায় অত্যন্ত গর্ব ও ভক্তি সহকারে রবীন্দ্র প্রতিভার গগনস্পর্শিতা সম্পকে বলেছিলেন:
“বিশ্ব-কাব্যলোকে কবি, তব মহদান
কত যে বিপুল, কত যে অপরিমাণ
বিচার করিতে আমি যাব না তাহার,
মৃৎভাণ্ড মাপিবে কি সাগরের জল?
যত দিন রবে রবি রবে সৌর-লোক,
হে সুন্দর ততদিন তব রশ্মি-রেখা
দিব্য- জ্যোতিঃ- পুষ্প গ্রহ-তারকার মতো
অসীম- গগনে রবে নিত্য সমুজ্জ্বল।”
----------------------------------------------------------------------------------------------

আবারও কুম্ভকর্ণের ঘুমে

আচ্ছন্ন হতে যাচ্ছে চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমী

 
সচল করার পদপে একান্ত আবশ্যক


সাহিত্যআলো ডেস্ক :
ঐতিহ্যবাহী চাঁদপুরের আনাচে-কানাচে রয়েছে বিভিন্ন শিা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান বেশিরভাগই সচল ও চালু অবস্থায় চাঁদপুর জেলার জনগণের মধ্যে শিা, সংস্কৃতি, সাহিত্যের আলো নিরবিচ্ছন্নভাবে বিতরণ করে যাচ্ছে অনেককাল ধরে। ফলে নতুন প্রজন্ম এসব প্রতিষ্ঠান থেকে মেধা-মননে চরিত্রগঠনে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছে। সেই সাথে পাচ্ছে জীবন চলার পথের সঠিক দিক নির্দেশনাও। আবার অনেকে ছোটবেলা থেকেই চাঁদপুরের বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে নিজের জীবনকে করছে মানবিক আলোকচ্ছটায় পরিপূর্ণ।
তেমনি ল্য ও উদ্দেশ্যকে হৃদয়ের কোণে লালন করে চাঁদপুরের কিছুসংখ্যক কৃতীসন্তান ও বিজ্ঞজনদের ঘাম ও ত্যাগের বিনিময়ে গড়া হয়েছিলো সাহিত্য একাডেমী, চাঁদপুর। এ একাডেমী প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিলো সাহিত্যের আলো সর্বশ্রেণীর মানুষের মাঝে বিতরণ করে অন্ধকারের মাঝে ডুবে থাকা মানুষদের সঠিক পথ দেখানো এবং কবি-সাহিত্যিক তথা সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে বিকশিত করার মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন সাধন। প্রাথমিক অবস্থায় তা’ সঠিক পথেই এগুচ্ছিলো তৎকালীন গুণীজনদের সার্বণিক সাহচার্যে। দীর্ঘ কয়েক দশক অতিক্রান্ত হবার পর প্রতিষ্ঠাকালীন সেসব বিদগ্ধ গুণীজন যখন কেউ কেউ বিগত হলেন, কেউবা পেশাগত কাজে মনোনিবেশ করলেন তখন ওই সাহিত্য একাডেমী ক্রমশ হয়ে পড়ল অভিভাবকহীন; এতিম। যেন ওই প্রতিষ্ঠানটিকে আর দেখার কেউ রইলো না। বলা যায় প্রায় পরিত্যক্ত ভবনে রূপ নিয়েছিলো সাহিত্য একাডেমী, চাঁদপুর।
এভাবে কয়েক বছর ওই একাডেমীর কার্যক্রম থমকে থাকার পর গত বছর ২০০৯ সালে হঠাৎ করে অত্যন্ত গুণী, বিদ্যোৎসাহী তৎকালীন জেলা প্রশাসক আ. ক. ম. শাহীদুর রহমান সাহেবের একটি উক্তিকে কেন্দ্র করে (‘সাহিত্য একাডেমীকে শিশু একাডেমীতে রূপান্তর করা হবে’) চাঁদপুরের স্বনামধন্য বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন, লেখক-কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও মানবিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তারা তখন চাঁদপুরে একটি নিবিড় আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে বিস্তারিত খবর, প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে একের পর এক। এক পর্যায়ে ওই সংগঠনগুলো জেলা প্রশাসক, চাঁদপুর বরাবর স্মারকলিপি ও দাবি-দাওয়া পেশ করে। সজ্জন জেলা প্রশাসক আ. ক. ম. শাহীদুর রহমান সাহেব তখন তাদেরকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন এবং সাহিত্য একাডেমী আবার সচলকল্পে বিভিন্ন পদপে গ্রহণ করেন অত্যন্ত আন্তরিকভাবেই। প্রায় পরিত্যক্ত সাহিত্য একাডেমীর বন্ধ তালা খুলে দেয়া হয় আবার।
এরপর আবার ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় চাঁদপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের কবি-সাহিত্যিকদের পদচারণায় সাহিত্য একাডেমী সচল হয়ে ওঠে। গুণীজনদের উপস্থিতিতে নিয়মিত সাহিত্য আসর জমতে থাকে সুন্দরভাবে। চাঁদপুর জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও সাহিত্যসেবীরা এখানে এসে জমায়েত হতো প্রতি শনিবার বিকেলে। এভাবেই চলছিলো সাহিত্য একাডেমী অত্যন্ত ভালোভাবেই।
কিন্তু আবার হঠাৎ করেই সাহিত্য একাডেমীর আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা জন্ম নেয়। কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমে আচ্ছন্ন হতে শুরু করে চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমী। বর্তমানে সেটা আবার তালাবন্ধ হয়ে আছে অসহায়ভাবে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সাহিত্য একাডেমীর অভ্যন্তরভাগে বুক শেল্ফে রতি বইগুলো যেন ‘পোকা-মাকড়ের ঘর-বসতি।’ সে বইগুলো যেন ছুঁতেও মানা। দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ থাকায় অত্যন্ত দামী দামী বইগুলো নির্মমভাবে কীটের পেটে চলে যাচ্ছে অনায়াসে। গুণীজনদের শ্রমে-ঘামে গড়া এই প্রতিষ্ঠানটিকে যেন দেখার মতো কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপ বা সচেতন মহল নেই।
দেখা গেছে, ঐতিহ্যবাহী মেঘনা-ডাকাতিয়া বিধৌত চাঁদপুর অঞ্চলের অনেকসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জেলা শিল্পকলা একাডেমীসহ অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই অত্যন্ত সচল ও সফলভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে সামনের পানে এগিয়ে যাচ্ছে তরতর করে। সেসব প্রতিষ্ঠানগুলোর সফল কার্যক্রমসমূহে সাধারণ মানুষের প্রচুর সমাগম হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অথচ যে মাতৃভাষাকে সাবলীল করার ল্েয গঠিত হয়েছে সাহিত্য একাডেমী, যে ভাষাকে রা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে অনেক তাজাপ্রাণ তাদের সেই আত্মদানকে মহিমান্বিত করতে আমরা কি সাহিত্য একাডেমীকে সর্বদা সচল রাখতে পারি না? সাহিত্য একাডেমী, চাঁদপুরের দায়িত্বশীল কর্তৃপরে নিকট এ অঞ্চলের সাহিত্যসেবীদের এটাই আজ ও আগামীর প্রত্যাশা।
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------

কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

মিতা ঘোষ


১২৬৮ বাংলা সনের ২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম। আমাদের বাংলা সাহিত্য, বাংলাভাষাকে বিশ্বের দরবারে সমধিক পরিচিত করে তোলার জন্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান চিরস্মরণীয়। আর তাই রবী ঠাকুরের জন্মদিন ২৫ বৈশাখ বাঙালিদের জন্যে একটা গৌরবের দিন। কবিগুরুর জন্মদিনে কবির প্রতি রইলো আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম।
রবীন্দ্রনাথের জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার আমাদের মানব জীবনের প্রতিটি েেত্রই তাঁর লেখনির মাধ্যমে অনুসরণের জন্যে রেখে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রচিত সংগীত, সাহিত্যের মাধ্যমে স্বদেশী চিন্তা, ধর্ম শিা, সাধারণ শিা, কৃষি উন্নয়ন, সমবায় পদ্ধতি, মানব উপকার, দেশের স্বাধীনতা, মানুষের স্বাধীনতা সকল বিষয়েই তিনি চিন্তা করতেন কীভাবে তার অচলায়তন ভাঙ্গা যায়। তাঁর লেখনীতে আমরা তাই বুঝতে পারি।
রবীন্দ্রনাথ সকল বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করলেও কবি হিসেবেই তিনি বিশেষ পরিচিত। রবীন্দ্রনাথের সকল লেখাই ঐক্যের প্রতীক। সাহিত্য প্রাণের জিনিস। রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখনির মাধ্যমে তাই প্রমাণ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মানবতাবাদী কবি। তাঁর সব লেখার মধ্যেই মানব কল্যাণের চিন্তা স্থান পায়। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখনির বিশেষ অংশ জুড়েও ছিলো সমাজের অবহেলিত, লাঞ্ছিত নারীদের স্থান। নারী অধিকার, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র, নীতিবোধ সবকিছুই তাঁর লেখনীর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। চোখের বালি, নৌকাডুবি, নষ্টনীড় রবীন্দ্রনাথের এ সমস্ত রচনাবলী পড়লে বুঝা যায় যে, তিনি নারীদেরকে নিয়েও অত্যন্ত গভীর চিন্তা-ভাবনা করতেন। দেশের ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, রুচি, সৌন্দর্য যেন অতি সহজে সুন্দরভাবে বিশ্বসমাজে প্রকাশ পায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখার মাধ্যমে সেটি অত্যন্ত সুচারুরূপে ফুটিয়ে তুলেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখার যোগ্যতা বা মতা আমার কোনোটাই নেই। শুধু এটুকু লিখে কবির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করলাম।
---------------------------------------------------------------------------------------

আলো’র গল্প

মুন ইসলাম

নাম তার আলো। প্রকৃত নামটা নাইবা বললাম। সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিলো অনেকটা ঝগড়ার মাধ্যমে। সে ছিলো পাশের বাড়ির তিনতলার ছাদে, বন্ধুবর রবিন ছিলো তাদের একতলার উঠোনে। তিন- চারটি ছেলেবন্ধু নিয়ে আড্ডায় মেতেছিলো আলো। রবিনের কেন যেন সহ্য হলো না। মেয়েটিকে উচ্চ কণ্ঠেই কিছু একটা বললো, আর তাতেই শুরু হলো ঝগড়া। অবশ্য সেটা ছিলো একতরফা; শুধুমাত্র ওর প থেকেই।
কিছুণ চলার পর রবিন রণে ভঙ্গ দিয়ে চলে গেল। বিকেলে রবিনের ছোট বোন দিশা’র কাছে নালিশ করলো তাদেরই বাসায় এসে।
দিশা বললো, “ভাইয়া মঞ্চে অভিনয় করে তো, তাই অভিনয়টা একটু ঝালাই করে নিতে চাইছিলো।”
 কথাটা তার হয়তো মনে ধরলো । দু’দিন পর ছিল ঈদ। আগের দিন বিকেলে দিশা গেল তাদের বাসায়। না-না রবিন কিন্তু পাঠায়নি। সে কেন গিয়েছিলো আজও জানতে পারেনি রবিন। কি জানি হয়তোবা সন্ধি করতে। কিছুণ পর রবিনের চোখ গেল আলোদের ছাদে, দিশা এবং আলো বিচরণ করছে। রবিনের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি মিটিমিটি হাসছে।
আলো বললো, “ঈদ মোবারক। কাল আসবেন কিন্তু।”
বলেই লজ্জায় দৌড়ে পালালো। ঈদের সন্ধ্যাতেই দু’জনার দেখা হলো। চারদিক আলোকিত করেই ফুলটি আসলো। সেই থেকে ভালোলাগা এবং মনে হয় সেটাই ছিলো রবিনের প্রথম ভালোবাসা।
তারপর মাঝে মাঝে যাওয়া-আসা, একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথী হওয়া, কখনওবা মান-অভিমানের পালা। তার কাছে মনে হচ্ছিল সে পৃথিবীতে একমাত্র সুখী মানুষ।
রাতে যখন পড়তে পড়তে প্রায় মধ্যরাত হতো, তখন চলতো আলো-আঁধারির খেলা। মানে আলো’র পড়ার রুমটি রবিনের রুমের মুখোমুখী হওয়াতে দুষ্টুমির ছলে আলো কয়েকবার লাইট নিভিয়ে এবং জ্বালিয়ে রবিনকে ঘুমুবার সংকেত দিত। রবিনও তাকে তদ্রুপ সংকেত দিয়ে ঘুমুতে যেত। এভাবেই  চলছিলো।
তারপর একদিন রবিন চলে এলো ঢাকায়। জগন্নাথে ভর্তি হলো। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো কিছুটা। প্রায় দু’মাস পর খবর পেল আলো অসুস্থ। মূহূর্তেই ছুঁটে গেল তার কাছে। রবিন বুঝলো মানসিকভাবে আলো অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছে।
তার বাবা বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু সে চাচ্ছে সম্পর্কের সফল পরিণতি। অন্য সবার মতো রবিনও তাই চাইছিলো। কিন্তু ওই মুহূর্তে পরিবেশ ও পরিস্থিতি তার অনুক‚লে ছিলো না। অবশেষে  জীবনের হিসেব কষতে লাগলো, কিন্তু সমীকরণ মিললো না তার। এক পর্যায়ে নিয়তিকে উভয়েই মেনে নিল। রবিনের তখন সবেমাত্র মাস্টার্স-এর প্রিলিমিনারি শেষ হয়েছে। আলো’র গায়ে-হলুদ থেকে শুরু করে বিদায়ের আগ পর্যন্ত পরিবেশটাকে নিজের করে নিল রবিন। ফুলে ফুলে সাজিয়ে দিল তার বিয়ের আসর। বিদায় বেলায় শুধু বললো, “না, চোখের জল নয়, বাস্তবতাকে বে ধারণ করে ভালো থেকো।
বিশেষ খবর: ২৫ ফেব্র“য়ারি, ২০১০। আলো, তার বর ও ছোট্ট ফুটফুটে একটি মেয়ের সাথে রবিনের দেখা হলো, কথাও হলো। সে ভালো আছে, সাথে মেয়েটি দেখতে অনেকটা মায়ের মতই, যেন অপ্রস্ফুটিত ফুল।