সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

কিশোর গল্প

এক মুচি ও দুই বামন ভূত

দেওয়ান আবদুল বাসেত

গল্পটি শোনে তোমাদের আজব মনে হতে পারে। আসলে কী জানো দ’ুজন বামন ভূত একজন ছিগরীব মুচিকে ঐভাবেই সেই শহরে যশী এবং ধনী বানিয়ে দিয়েছিলো। এ গল্পে এটাই প্রমানিত হয় সময় মানুষের সব সময় এক যায় না। কখনও তার দু:খ থাকবে, কখনও সুখ। তাই বলতে হয় সুখ এবং দু:খ কোনটাই মানুষের জীবনে স্থায়ী হয়ে বসে থাকে না। দিনের আলো গিয়ে যেমন রাতের অন্ধকার আসে, তেমনি রাত পোহালে আবার আলো ফিরে আসে। এটাই পৃথিবীর নিয়ম। কথা না বাড়িয়ে এবার তাহলে গল্পটি বলি। একটি সুন্দর শহরের এক অসুন্দর গলিতে থাকতো এক মুচি। মানে যে নাকি পুরানা জুতা সেলাই করতো এবং কিছু নতুন জুতাও তৈরী করতো। তবে সে কাজ করতো খুবই মনযোগ দিয়ে। সে জন্যে তার কাজগুলো শহরের অনেকেই পছন্দ করতো। এবং বার বার সবাই তার কাছেই আসতো। আর এই সামান্য আয়ের উপরই চলছিলো তাদের দু’জনের সংসার। মানে তারা সন্তানহীন স্বামী-স্ত্রী দু’জন। সে লো খুবই পরিশ্রমী। সে জানতো যারা পরিশ্রমী, যারা কষ্ট করতে জানে
তারা কখনও কষ্টে থাকে না। তারা কষ্টকে জয় করেই সুখ ছিনিয়ে আনে। এতো কষ্ট এবং পরিশ্রমের পরও সময়ে সেই মুচি পরিবারটি গরীব থেকে আরো গরীব হতে থাকে। মানে বছরের পর বছরতো আর একই ডিজাইনের জুতা মানুষ পছন্দ করে না। জাঁকজমকপূর্ণ সে শহরের লোকজনও আর পুরানা জুতা ব্যবহার করছে না। তাদের সবাই নতুন জুতাই ব্যবহার করছে। কেননা পুরানা জুতা সেলাই করতে যে পয়সা খরচ হয়, তাতে নতুন জুতাই কেনা যায়। তাই দিন দিনই মানুষের রুচীর পরিবর্তন, পছন্দের পরিবর্তন হতে থাকে। যারা নতুন নতুন ডিজাইন বানাতে পারতো মানুষ তাদের কাছে ছুটতো। বড় কথা সেই যশী মুচিকে অন্যসব মুচিরা খুবই হিংসা করতো। তার নামে বদনাম ছড়াতো। তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা দিয়ে আরো ভালো ডিজাইনের জুতা তারা তৈরী করতো। যাতে লোকজন তাদের ছাড়া আর ঐ বুড়ো মুচির কাছে না যায়। সেই বুড়ো মুচিরও এমন কোন সম্বল ছিলো না যে বেশী চামড়া খরিদ করে ভালো ভালো জুতা তৈরী করে। সে মাত্র তিন চার জোড়া জুতার উপযোগী
চামড়া কিনতে পারতো। আর তা দিয়েই নতুন জুতা বানাতো রাত জেগে জেগে। তাই দিয়েই চলতো তার ঘর-সংসার। তাও শেষে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়ালো যে সে একজোড়া জুতার চামড়ার বেশী খরিদ করতে পারছে না। বুড়ো মুচি এবং তার স্ত্রী এবার ভয়ংকর চিন্তার মধ্যে পড়লো। এক রাতে এসব চিন্তা করতে করতেই সে তার কেনা একজোড়া জুতা হবে এমন চামড়াটুকু কেটে তার জুতা তৈরীর টেবিলের উপর রেখে ঘরের উপর তলায় ঘুমাতে গেলো। ঘুমানো আগে সে তার স্ত্রীর সঙ্গে খুবই কষ্টভরা মনে আলাপ করছে সে একজোড়া জুতা কাল তৈরী করে বিক্রি করলে যে টাকা পাওয়া যাবে তাতে দু’জনের খানা-খাদ্যেই চলে
যাবে। আর তাতে তাদের আর কোন টাকাই থাকবে না নতুন জুতা বানাবার চামড়া কিনতে। কাল থেকে
তাদের কী উপায় হবে?
- তুমি দেখো গড্ একটা ব্যবস্থা করবেই। গড কাউকেই এভাবে মারে না। গডের উপর ভরসা রাখো, সে একটা ব্যবস্থা করবেই....এভাবেই মুচির স্ত্রী মুচিকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবতার এই পৃথিবীতে মুচি হতাশায় পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। তবুও ঘুমাবার আগে সে বলে - ওহ্ গড্ হেল্ফ মি.... হেল্ফ মি..।
পরদিন সকালে মুচি যখন নিচতলায় তার জুতা তৈরীর টেবিলের কাছে যায় তখনই সে অবাক হয়। যেখানে সে একজোড়া জুতা তৈরীর চামড়া কেটে রেখে গিয়েছিলো। সেখানে সেই চামড়া নেই তবে সেখানে অতি সুন্দর নতুন ডিজাইনের একজোড়া জুতা কে বা কারা রেখে গেছে। সে বিস্মিত হয়ে তার স্ত্রীকে ডাকলো- দেখো দেখো এমন সুন্দর জুতা এবং ডিজাইন আমি আমার জীবনেও দেখিনি। কে বা কারা এ কাজটি করলো? তার স্ত্রীও মুগ্ধ-বিস্ময়ে তা দেখলো এবং মুখে বললো- গড নউজ ভেরি
ওয়েল..।
এরপরই তারা জুতাজোড়া বিক্রির জন্যে জানালার কাছে রাখলো। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে শহরের এক মস্ত ধনী সে পথে যাচ্ছিলো। জুতাজোড়া তার নজরে এলে সে চমৎকৃত হলো তার ডিজাইন দেখে। ধনী ব্যক্তিটি সেই জুতার মূল্য অন্যান্য সাধারণ জুতার কয়েকগুন বেশী দিয়ে কিনে নিয়ে গেলো।
বুড়ো মুচি সে টাকা থেকে দুজোড়া জুতার চামড়া খরিদ করলো এবং তার সংসারের জন্য যাবতীয় খাবারের জিনিসপত্র কিনে নিয়ে এলো। আগের মতোই রাতে দুজোড়া জুতা হবে এমন নতুন চামড়াটুকু কেটে সেই টেবিলের উপর রেখে বুড়ো মুচি উইলী ঘুমাতে গেলো। পরদিন সকালে এসে দেখে তার সেই টেবিলের উপর কাটা চামড়ার জায়গায় দুজোড়া অতীব সুন্দর জুতা বসে আছে। সে গতকালের চেয়ে আরো বেশী বিস্মিত এবং আনন্দিত হয়। সে ভেবে পায় না কে তার জন্যে এমন কাজটি করছে অতি
নীরবে এবং অতি গোপনে। সে এতো সুক্ষ্ম সুঁচের কাজ আর কখনো দেখেনি।
বুড়ো উইলী সে দুজোড়া জুতা বিক্রি করে যা টাকা পেলো। তা দিয়ে ঘরের জন্যে একমাসের খানা-খাদ্য কিনে নেয়। ১৫/২০ জোড়া জুতা হবে এমন পরিমান নতুন চামড়া খরিদ করেও তার কাছে আরো টাকা থেকে যায়। সে এবার চার, আট এবং পরে ষোল জোড়া জুতা হবে এমন পরিমান চামড়া কেটে প্রতি রাতে টেবিলের উপর রেখে আসে। সকালে সেই একই দৃশ্য তার চোখে পড়ে। নতুন নতুন ডিজাইনের সব সুন্দর তৈরী জুতা। আর তা বিক্রি করে সেই উইলী অল্প সময়ের মধ্যে বেশ ধনী হয়ে উঠলো। তার অভাব বলতে আর কিছুই থাকলো না। তারা দুজনেই সীমাহীন খুশি। তবে তাদের মনে যে কৌতুহল আছে তা
মেটানোর জন্যে তারা মানসিকভাবে তৈরী হয়। তাদের জন্যে কে বা কারা রাতের অন্ধকারে এভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তা দেখতেই হবে। তাদের একটি ধন্যবাদ দিতে হবে।
একরাতে উইলীর স্ত্রী তাকে বললো- চলো আজ রাতে না ঘুমায়ে আমরা লুকিয়ে দেখার চেষ্টা করি কারা আমাদের জন্যে এ কাজগুলো করে যাচ্ছে। তাদেরকে একটা থেন্ক্স দেবার রাস্তা চলো খুঁজে বের করি। তার স্ত্রীর পরামর্শে উইলী রাজী হয়ে সে রাতে তারা পর্দার আড়ালে অপেক্ষা করতে থাকলো সে দৃশ্য দেখার জন্যে। রাত তখন গভীর। হঠাৎ করে তাদের জানালায় একটি কটমট আওয়াজ হলো। জানালাটি একটু ফাঁক হলো। আর সে ফাঁক দিয়ে দুজন বামন ভূত (যাদের উচ্চতা হবে দেড় ফুট) প্রবেশ করলো।
অন্ধকার সেই রুমে তারা প্রবেশ করেই তাদের নিজস্ব কী যেন একটি আলো জালালো। তাদের নিজেদের নিয়ে আসা যন্ত্রপাতির ছোট্ট ব্যাগ থেকে তারা সমস্ত যন্ত্রপাতি বের করেই কাজে মনযোগ দিলো। তারা এমন দক্ষ এবং প্রফেশনাল কারিগরের মতো দ্রুত কাজ করতে লাগলো। যা উইলী এবং তার স্ত্রী নিজ চোখে দেখেও নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। মাত্র কিছু সময়ের মধ্যেই সেই দুবামন ভূত প্রায় পনের বিশজোড়া জুতা তৈরী করে সেই জানালার ফাঁক গলিয়ে বের হয়ে গেলো। উইলী এবং তার স্ত্রীর মন কৃতজ্ঞতায় ভরে গেলো। কিন্তু তারা খুঁজে পাচ্ছে না কীভাবে তারা দুই বামন ভূতকে ধন্যবাদ দেবে।
শত ব্যস্ততার মাঝে চলে এলো তাদের ধর্মীয় বড় উৎসব। যীশু খৃষ্টের জন্মদিন। মানে ২৫ডিসেম্বরের বড়ো দিন। তারা দুজনেই ভাবলো যদি তারা সরাসরি বামন ভূতের সঙ্গে কথা বলতে যায় হয়তো তারা দুঃখ পাবে কিংবা সরাসরি কথা বললে তারা মাইন্ড করবে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলো তাদের এই ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে সেই দুই বামনের জন্যে তারা বিশেষ উপহার দেবে। সে উপহারটি হবে তাদের দেহের মাপ অনুযায়ী তাদের জন্যে একটি বিশেষ পোষাক। এবং হতে হবে সুন্দর চামড়ার। উইলী এবং তার স্ত্রী তাই করলো। পুত্রতুল্য সেই দুজন বামন ভূতের জন্যে তারা মাথার হেট, কোট, ট্রাউজার, সক এবং দুজোড়া
জুতা তৈরী করলো। রাতে একটি বড়ো পেটে করে উইলীর স্ত্রীর তৈরী করা একটি কেক, দুই গাস ওয়াইন এবং বামন ভূতদের জন্যে বিশেষভাবে তৈরী পোষাকগুলো সেই টেবিলে রেখে দিলো। তারা দুজনে গোপনে পর্দার আড়ালে অপেক্ষা করতে লাগলো ঘটনা দেখার জন্যে।
গভীর রাতে বামন ভূত দু’জন এলো। তারা আলো জ্বালালো। তাদের জন্যে পোষাক দেখে এবং পেটে কেক ও গাস ভর্তি ওয়াইন দেখে তারা আনন্দে নাচতে লাগলো। তারপর তারা পোষাকগুলো পরলো।
কেক খেলো এবং ওয়াইন ভর্তি গাস হাতে নিয়ে এক চুমুক দিয়েই গান ধরলো দু’জনে। সে রাতে তাদের জন্যে কোন চামড়া রাখা হয়নি জুতা বানানোর জন্যে। তাই তারা দুজনে সারারাত নাচলো গাইলো।
আনন্দ-উলাস করে ভোররাতে জানালার ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে গেলো। তারা উইলী এবং তার স্ত্রীর সেই কৃতজ্ঞতা দেখেই খুশি হয়ে ফিরে গেলো তাদের জগতে। তারা আর ফিরে আসেনি বটে তবে উইলী যাদের কাজেই বিখ্যাত হলো তাতেই তার দোকানে কাষ্টমারের ভিড় লেগেই থাকলো। যদিও সে সেই বামনভূতদের মতো জুতার নতুন নতুন ডিজাইন এবং কারুকাজ করতে জানতো না। তবুও তার যে যশের সৃষ্টি হয়েছিলো, তাতেই সে এবং তার স্ত্রী হয়েছিলো সে শহরের সবচে’ বড় ধনী এবং সুখি পরিবার।
তারা আর কখনোই গরীব হয়নি।

দেওয়ান আবদুল বাসেত, ম্পাদক, মরুপলাশ

 -----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

মাটি ও মানুষের পরম মমতায় মিশে আছেন পল্লী কবি জসীম উদ্দীন

মিজানুর রহমান রানা

 


পল্লী কবি জসীম উদ্দীন ১৯০৩ সালের ০১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব জীবন কাটে অম্বিকাপুর গ্রামের পৈত্রিক বাড়িতে। পিতা আনসার উদ্দীন একজন সফল স্কুল শিক ছিলেন। কবির মাতা রাঙ্গাছোটু ছিলেন গৃহবধূ।
কবি জসীম উদ্দীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভের পর তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত পণ্ডিত ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের সান্নিধ্যে এবং নিগূঢ় তত্ত্বাবধানে রিসার্চ ফেলো পদে কর্মরত ছিলেন। ড. দীনেশ সেন সে সময়কালে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত ও পল্লী এলাকার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে গীত-পঠিত পুঁথি সংগ্রহ ও গবেষণায় ব্রতী ছিলেন। এক সময় ড. সেন তাঁর শিষ্য জসীম উদ্দীনকে বাংলার জেলাগুলোর বিশেষ করে ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ জেলার ওইসব পুঁথি (কাব্য-লোকগাঁথা) সংগ্রহ করার গুরুদায়িত্ব প্রদান করেন। পরবর্তীতে জসীম উদ্দীন গ্রামীণ সেসব পুঁথি সংগ্রহকালে গ্রামীণ জনপদের আনন্দ-বেদনার নানা রঙের, নানা ভাবের কাব্যগাঁথার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। মানুষের প্রতি আবেগ ও ভালোবাসায় তিনি একজন খাঁটি মানবদরদী হয়ে ওঠেন। কবি সে সময় গাজীর গান, জারী, পালাগান ও গ্রামীণ জনপদের লোকগীতির আসরে যেতেন। উপভোগ করতেন মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ। অন্যদিকে নিজের বাড়িতেও মাঝে মধ্যে লোকসঙ্গীতের জমজমাট আসরের আয়োজন করতেন। জসীম উদ্দীন সে সময় বেশ কিছু লোকগীতিতে সুরারোপ করেন। তিনি তৎকালীন অনেক বিশিষ্ট শিল্পীদের গান শেখান। পরবর্তীকালে তিনি বেশ কিছুকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। কবি জসীম উদ্দীন তাঁর জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার জন্যে পৃথিবীর বহুদেশ ভ্রমণ করেছেন এবং সেসব দেশের লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান প্রত্যভাবে দর্শন করেন।
কবি জসীম উদ্দীন লোক-সাহিত্য, নাটক, উপন্যাস, কাব্যোপন্যাস, প্রবন্ধ, গ্রন্থ, কাব্যগ্রন্থ, গবেষণা গ্রন্থ, গানের বই, ভ্রমণ কাহিনী, আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথাসহ পঞ্চাশেরও অধিক বই রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে: রাখালী (১৯৭২), নক্শী কাঁথার মাঠ (কাহিনী কাব্য) (১৯২৯), সোজন বাদিয়ার ঘাট (কাহিনী কাব্য) (১৯৩৩), রঙিলা নায়ের মাঝি (গানের সংকলন) (১৯৩৫), মাটির কান্না (কবিতা সংকলন) (১৯৫১), সুচয়নী (১৯৬১), পদ্মা নদীর দেশে (১৯৬৯), ভয়াবহ সে দিনগুলি (১৯৬২), পদ্মাপাড় (১৯৫০), বেদের মেয়ে (লোকনাট্য) (১৯৫১), পল্লী বধূ (১৯৫৬), গ্রামের মায়া (১৯৬৯), ঠাকুর বাড়ির আঙিনা (১৯৬১), জার্মানীর শহরে-বন্দরে (১৯৭৫), মধুমালা (লোকনাট্য), বাঙালির হাসির গল্প, বোবা কাহিনী (উপন্যাস) (১৯৬৪), বউ টুবানীর ফুল (উপন্যাস), এক পয়সার বাঁশি (শিশু সাহিত্য), ডালিম কুমার (শিশু সাহিত্য) ইত্যাদি।
কবির সাহিত্য-সৃষ্টি কর্মের প্রতি নজর দিলে দেখা যায়, এ দেশের মাটি ও সাধারণ মানুষের সাথে ছিলো তাঁর পরম মিতালী। তাই বলা যায়, যে মানুষটি দেশের মাটি ও মানুষকে নিয়েই বেশি ভেবেছেন তিনিই হলেন পল্লী কবি জসীম উদ্দীন। তিনি ছিলেন একজন আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক কবি। লোকজ উপাদানকে হৃদয়ে ধারণ করে অত্যন্ত সাবলীলভাবে প্রাণস্পর্শী করে সাজিয়েছেন একের পর এক অপরূপ ও অসাধারণ কবিতামালা। চিত্রকল্প বা রূপকল্প, উপমা-উৎপ্রো সর্বত্র তাঁর সেই যুৎসই পরম আধুনিকতার অপরূপ ছোঁয়া লেগেছে। পল্লীর সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের আসা-যাওয়া, কথামালা, বুকের গহীনে লুকিয়ে থাকা ভাবনাগুলো তিনি দিব্যি মানসচোখে, হৃদয়পটে অংকিত করে পদ্যের আকারে সাজিয়েছেন একের পর এক অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী করে। নক্শী কাঁথার মাঠ কবিতার দিকে ল্য করলে আমরা তা-ই দেখতে পাই:
‘এক গাঁয়ের এক রাখাল ছেলে লম্বা মাথার চুল,
কালো মুখের কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল।
কাঁচা ধানের পাতার মত কচি মুখের মায়া,
তার সাথে কে মাখিয়ে দিছে নবীন তৃণের ছায়া।
জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দু’খান সরু,
গা-খানি তার শাওন মাসের যেমন তমাল তরু।’
কবি জসীম উদ্দীন বাংলার রাখাল, কালো ভ্রমর, রঙিন ফুল, কাঁচা ধানের পাতা, তৃণের ছায়া, জালি লাউয়ের ডগা, তমাল তরু, গাছপালা, খাল-বিল, নদী, হাওড়-বাঁওড়, পাখ-পাখালি প্রভৃতি অনুষঙ্গ তাঁর কবিতায় অত্যন্ত সাবলীলভাবে ব্যবহার করেছেন। একদম জীবন্ত, প্রাণবন্ত এসব চিত্র তিনি পল্লীর নিবিড় প্রকৃতি থেকে আহরণ করেছেন। বাংলার আনাচে-কানাচে, সবখানেই এর দেখা মেলে। তাই বলা যায়, একজন বড় মাপের আধুনিক কবির পইে এসব অনুষঙ্গ শিল্পী মনের গভীরতায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়। তাই এ প্রসঙ্গে কবির রচিত ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতার কিছু অংশ তুলে ধরছি:
“তুমি যাবে ভাইÑ যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী মনের বায়,
মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি
মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,
মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভাইয়ের স্নেহের ছায়,
তুমি যাবে ভাইÑ যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
ছোট গাঁওখানিÑ ছোট নদী চলে, তারি একপাশ দিয়া,
কালো জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চু নিয়া;”
কবি জসীম উদ্দীন লেখার বিষয় নির্বাচন করেছেন পল্লীকে নিয়ে। কিন্তু তিনি কবি হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক মনের অধিকারী। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন মণিকাঞ্চন সংগ্রাহক। বাংলা সাহিত্যের অনুষঙ্গ হিসেবে তিনি গ্রামীণ জনপদের কিষাণ-কিষাণী, যুবক-যুবতীদের জীবন-জীবকা আর প্রেম উপাখ্যানের কাহিনীকে জলজ্যান্ত ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন পাঠকের সামনে। এছাড়াও তিনি আমাদের সামনে কবিতা লেখার এমন অনেক অনুষঙ্গ এনেছেন যা পূর্বাপর কোনো কবিও ব্যবহার করেছেন বলে মনে হয় না। আসুন আমরা একটু দেখি কবি জসীম উদ্দীন রচিত ‘কবর’ কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি। তাহলেই বোঝা যাবে তিনি কী ধরনের আশ্চর্যজনক উপমা, ভিন্ন অনুষঙ্গ এবং চিত্রকল্প কবিতায় স্থান দিয়েছেন:
“এই খানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,
সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা।
সোনালী ঊষায় সোনামুখে তার আমার নয়ন ভরি,
লাঙ্গল লইয়া েেত ছুটিতাম গাঁয়ের ও-পথ ধরি।
যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত,
এ কথা লইয়া ভাবি-সাব মোর তামাশা করিত শত।”
কবি জসীম উদ্দীনের বিখ্যাত একটি কবিতার নাম ‘কবর।’ কবিতাটি অত্যন্ত দীর্ঘ। এই কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। কবিতাটির রয়েছে এক জাদুকরী প্রভাব। কবিতাটি জসীম উদ্দীনকে আধুনিক এবং অমর এক কবির খ্যাতি দান করেছে বলা যায়। লেখক মোশাররফ হোসেন খান কবিতাটিকে ‘একক, অসাধারণ, অমর ও কালজয়ী এক কবিতা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেন, ‘‘শুধু বাংলায় কেন, বিশ্ব সাহিত্যেও এটা একটি দৃষ্টান্তহীন কবিতা বলে মনে করি।’’
কবি জসীম উদ্দীন প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু তাই বলেছেন, “আরেকজন কবির কথা এখানে উল্লেখ করবো, রবীন্দ্রনাথের প্রভাব যাঁকে কখনও স্পর্শ করতে পারেনি। কবি জসীম উদ্দীন পল্লী নিবাসী, বাংলার পল্লীগীতির মেঠো সুর তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তাই তার বীণাও তিনি সেই সুরেই বেঁধেছেন। পল্লী প্রকৃতির যে সৌন্দর্যে তাঁর ঘোর লেগেছে, সেই সৌন্দর্য অসীম স্নেহের সঙ্গে তিনি এঁকেছেন। তাই তাঁর কবিতাতেও সেই সৌন্দর্যই আমাদের মনকে নাড়া দেয়। কবি জসীম উদ্দীনের যে গুণটি সবার আগে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সে হচ্ছে তাঁর টহংড়ঢ়যরংঃরপধঃবফ পযধৎস।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি জসীম উদ্দীনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “যে আছে মাটির কাছাকাছি, আমি সে কবির জন্যে কান পেতে আছি।” কবি জসীম উদ্দীন প্রসঙ্গে কবি আশরাফ আলী বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, তারাশংকর বন্দ্যোপধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ড. দীনেশ চন্দ্র সেনরা কবি জসীম উদ্দীনের কবিতা পড়েছেন এবং মুগ্ধ হয়েছেন। ড. দীনেশ চন্দ্র সেন ‘কবর’ কবিতা পড়ে কেঁদেছেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং গগনেন্দ্র নাথ ঠাকুর তাঁরা দু’জনই কবি জসীম উদ্দীনকে সাহিত্য জগতে সাহচর্য জুগিয়েছেন। ‘নক্শী কাঁথার মাঠ’-এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন অবনীন্দ্র নাথ ঠাকুর। ড. দীনেশ চন্দ্র সেন যখন কবি জসীম উদ্দীনের লেখার প্রশংসা করেন, বুদ্ধদেব বসু এবং জীবনানন্দ দাশরা তখনো কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাননি।”
অচিন্ত্যকুমার সেন তাঁর ‘কল্লোল যুগ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “কবিতায় জসীম উদ্দীনই প্রথম গ্রামের দিকে সংকেত দেন। তাঁর চাষাভূষা, তাঁর তে-খামার, তাঁর নদী-নালার দিকে। যে দুঃখ সর্বহারার হয়েও সর্বসময়। তাঁর অসাধারণ সাধারণতার দিকে। যে দৃশ্য অপজাত হয়েও উঁচু জাতের। কোনো কারুকলার কৃত্রিমতা নেই। নেই কোনো প্রসাধনের পরিপাট্য।”
কবি জসীম উদ্দীন ১৯৫৪ সালে তাঁর অসাধারণ দতা ও সৃষ্টিকর্মের জন্যে প্রেসিডেন্টস্ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে রবীন্দ্র ভারতী ইউনিভার্সিটি তাঁকে ‘ডি-লিট’ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৭৮ সালে তাঁকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়।
কবি জসীম উদ্দীন ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ পরলোকগমন করেন। তিনি পরলোকে চলে গেছেন কিন্তু আমাদের জন্যে রেখে গেছেন বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার। এ ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে আমরা বিশ্বসাহিত্যের দুয়ারে উপস্থাপিত করতে পারি কবির মহান কীর্তি ও সৃষ্টকর্মকে। তাহলে যেমন উজ্জ্বল হবে দেশের মুখ, তেমনিভাবে বাঙালি জাতি হিসেবে আমরাও হবো গৌরবান্বিত। কারণ বাংলার এই গর্বিত ‘তুলনারহিত এক রাখাল সম্রাট’ কবিকে জীবিত অবস্থায় অথবা মরণোত্তর উল্লেখযোগ্য তেমন মূল্যায়ন করা হয়নি অথবা সরকারি-বেসরকারিভাবে আজ পর্যন্ত কোনো গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি, যা কি-না আগামী দিনে নতুন প্রজন্মের কাছে পল্লী কবি জসীম উদ্দীনকে পরিচয় করিতে দিতে পারে। তাঁকে তাঁর অপূর্ব, অতুলনীয়, মৌলিক ও স্বতন্ত্র ধারার সৃষ্টকর্মের জন্যে সঠিক মূল্যায়নের সময় এসেছে। স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে কবিকে যথার্থ মূল্যায়ন করার গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হোকÑ এটাই আমাদের দাবি।
তথ্য সূত্র : মোশাররফ হোসেন খান (কবি জসীম উদ্দীন স্মরণে), মাসুম হামীদ (আবেগ আর অনুভূতির কবি),
বিমল গুহ (ইন্টারনেট)।

---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

স্বমহিমায় কর্মের মাঝে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন

চারণ কবি সামছুল হক মোল্লা

 

অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান

১৯৫১ সালে ১ম স্ত্রী লজ্জাতুন নেছার অকাল মৃত্যুর পর ২য় বিবাহ করে ঘরে তোলেন সামছুন নাহার বেগমকে। সেই সামছুন নাহার বেগমকে কবি আদর করে ‘বেবী’ বলে ডাকতেন। মনে পড়ে আমাদের সাথে আলাপচারিতার এক ফাঁকে কবি তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীকে ডেকে বললেন, বেবী চাঁদপুর থেকে আমার নাতিরা এসেছে, ভালো করে রান্না করো, ওদেরকে নিয়ে দুপুরে এক সাথে খাবো। পরম আতিথেয়তায় চারণ কবি সেদিন আমাদের খাওয়ালেন, নিজেও খেলেন। আগামী ১২ মার্চ ‘দৃষ্টি’র প থেকে চাঁদপুর টাউন হলে অনুষ্ঠিত হবে ৫ গুণী শিকের সংবর্ধনা। ৫ গুণীর একজন এই মহান সাধক কবিকে অবশ্যই অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়ে অবশেষে আমরা দু’বন্ধু চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। কবি পরম স্নেহে আমাদেরকে বিদায় দিলেন।
নির্দিষ্ট দিন ১২ মার্চ দুপুর বেলায় কবি আমার চাঁদপুরের স্ট্র্যান্ড রোডের বাসায় এসে উঠলেন। সন্ধ্যার পর পর অনুষ্ঠান। এক এক করে সংবর্ধিত ৫ জন গুণী অবসরপ্রাপ্ত শিক অনুষ্ঠান স্থলে এসে পৌঁছলেন। মানুষে মানুষে টইটম্বুর টাউন হল মিলনায়তন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি তৎকালীন চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (বর্তমানে অবঃ সচিব) আলহাজ্ব এস. এম. শামসুল আলম, বিশেষ অতিথি তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আলহাজ্ব আফজাল হোসেন এবং চাঁদপুর সরকারি কলেজের তৎকালীন অধ্য প্রফেসর এডব্লিউএম তোয়াহা মিয়া।’ ‘দৃষ্টি’র সভাপতি তৎকালীন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বন্ধু এসএম আনোয়ার হোসেনের (বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী) সভাপতিত্বে ৫ গুণীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হলো। ৫ গুণীর সংপ্তি জীবনী পাঠ করে শোনানো হলো। গুণীদের বক্তব্য এবং অতিথিদের বক্তব্য শোনা হলো। মনে পড়ে সেদিন বিপুল করতালির মধ্যে চারণ কবি সামছুল হক মোল্লা তাঁর স্বরচিত কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করলেন। ‘দৃষ্টি’র প থেকে আমি এবং বন্ধু সেলিম আকবরের (বর্তমানে অ্যাডভোকেট) যৌথ সম্পাদনায় ‘শিােেত্র বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ’ এই ৫ গুণী শিকের সংপ্তি জীবনী সহকারে ‘দৃষ্টিপাত’ নামক একটি সুন্দর স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়। প্রাণবন্ত এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠনের কথা আমার জীবনে এক সুখকর স্মৃতি হয়ে থাকবে আজীবন। সেদিন এ অনুষ্ঠানের আয়োজক আমরা সবাই ছাত্র ছিলাম। তারপরেও চেষ্টার কোনো ত্র“টি করিনি অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য বাড়াতে। অতিথিবৃন্দসহ সেদিনের উপস্থিতির প্রায় সকলেই আমাদের এই সুন্দর আয়োজনের প্রশংসা করেছিলেন। সেদিনের আয়োজক বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই বৃহত্তর কর্মের তাগিদে আজ দেশ-বিদেশে অবস্থান করছেন। প্রত্যেকেই আজ স্ব স্ব েেত্র প্রতিষ্ঠিত। যেমন- অ্যাড. সেলিম আকবর, অ্যাড. কামাল উদ্দিন আহমেদ, ডা. মঈনুল ইসলাম মানিক, প্রকৌ. এসএম আনোয়ার হোসেন (অস্ট্রেলিয়া), প্রকৌ. সামছুল হক ভূঁইয়া (কানাডা), মাকসুদুর রহমান পাটওয়ারী (ডি. সি. টাঙ্গাইল), প্রকৌশলী এমএ কাশেম, অধ্যাপক শাহজাহান সিদ্দিকী, কৃষিবিদ মিজানুর রহমান শামীম, প্রকৌ. মোশাররফ হোসেন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী যথাক্রমে রেজাউর রহমান, আমিনুর রহমান বাবুল, স্বপন কুমার সাহা, স্বর্গীয় শঙ্কর চন্দ্র দাস, একেএম ছলিম উল্যাহ, জয়নাল আবেদীন, মোবারক হোসেন, নাজমুল আহসান লিটু, ডা. ইকবাল হোসেন চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম (পিআরও যোগাযোগ মন্ত্রী) ড. আক্তার হোসেন চৌধুরী (শিক, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ), ড. হোসেন কবির (শিক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়), অধ্যাপক সুরাইয়া ইয়াছমিন স্বপ্না, অধ্যাপক ফেরদৌসি বেগম আলো, বিশিষ্ট লেখক মোরশেদা খানম বেবী প্রমুখ। আমি তাঁদের প্রত্যেককেই স্মরণ করছি। আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি তাঁদের, যাঁদের অনুপ্রেরণায় আমরা ‘দৃষ্টি’ নামক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলাম। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন চাঁদপুর সরকারি কলেজের প্রাক্তন শিক যথাক্রমে অধ্যাপক এএম হুমায়ুন আযাদ, মরহুম অধ্যাপক এবিএম ওয়ালিউল্যাহ্, অধ্যাপক মোহাম্মদ হোসেন খান, মরহুম অ্যাড. আবুল ফজল, মরহুম ডা. নূরুর রহমান, মরহুম প্রধান শিক আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জনাব জাহাঙ্গীর আখন্দ সেলিম প্রমুখ। আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সেই ৫ গুণী শিককে, যাঁদের আমরা সংবর্ধিত করেছি, যাঁরা আজ কেউই বেঁচে নেই। তাঁদের কর্মে তাঁরা বেঁচে থাকবেন আপন মহিমায় অনাদিকাল পর্যন্ত। আমি তাদের সকলের আত্মার শান্তি কামনা করছি।
চারণ কবি সামছুল হক মোল্লা যতদিন সুস্থ ছিলেন ততদিন তাঁর সাথে যোগাযোগ রা করে চলেছি। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর বিগত কয়েক বছর যাবৎ ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। সেজন্যে নিজেকে বড়ই অপরাধী মনে করছি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থেকে কবিকে বিপুলভাবে সম্মানিত করা হয়েছে কিন্তু রাষ্ট্রের প থেকে কখনো কবিকে মূল্যায়ন করা হয়নি। কিংবা কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি।
১৯৮১ সালে চাঁদপুরের ‘সুরুচি সংঘ’ এবং ঢাকার ‘লেলিহান সাহিত্যগোষ্ঠী’ একই বছর চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমদের পরিচালনায় ইংরেজি বিভাগ, ১৯৮২ সালে কুমিল্লা ফাউন্ডেশন, ১৯৬৮ সালে চাঁদপুর ফাউন্ডেশন, ২০০২ সালে দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠসহ আরো নাম না জানা বহু প্রতিষ্ঠান থেকে কবিকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
দারিদ্র্যের চরম কষাঘাতে থেকেও এই সব্যসাচী কবি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লিখে গেছেন। এ সমাজকে প্রস্ফুটিত করে গেছেন। প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অর্থাভাবে তাঁর বহু রচনা প্রকাশ করতে পারেননি। তারপরেও থেমে থাকেননিÑ কলমযুদ্ধ চালিয়ে গেছেন নিরন্তর। এ সমাজকে, এ দেশকে তিনি দিয়েছেন অনেক কিন্তু তার কিয়দংশ মূল্যায়নও পাননি। তাঁর কবিতা, তাঁর গান আমাদের বার বার দোলা দেয়। রাষ্ট্রের প থেকে এ দেশের বহু লেখক কবি, সাহিত্যিককে মরণোত্তর পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। চারণ কবি সামছুল হক মোল্লাকেও যেন স্বীকৃতি দেয়া হয়Ñ সরকারের প্রতি অনুরোধ রইলো।
গণমানুষের কবি, এদেশের অন্যতম চারণ কবি, সব্যসাচী কবি, একজন সফল শিক সামছুল হক মোল্লা জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছেন দুঃখী ও নির্যাতিত মানুষের পে কবিতা লিখে, পড়ে এবং পড়িয়ে। গত বছর ৪ মার্চ, ২০০৯ বুধবার প্রিয়তমা স্ত্রী সামছুন নাহার বেগমের মৃত্যুর মাত্র দুই মাস একদিনের মাথায় বার্ধক্যজনিত কারণে ৮৬ বছর বয়সে তাঁর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারালো। তাঁর মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত। আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি। মহান আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।
জীবদ্দশায় যে মানুষটি তাঁর লেখা ও কথায় সবাইকে অতি আপন করে নিতেন, সেই মানুষটি চলে গেছেন সবাইকে ছেড়ে চিরদিনের জন্যে। রাষ্ট্রপ থেকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চারণ কবিকে সমাহিত করা হয়। চারণ কবি চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন তাঁর প্রিয় ফুলছোঁয়া গ্রামের মোল্লা বাড়ির আঙ্গিনায় সুশীতল ছায়াঘেরা স্থানে, পুষ্পসজ্জিত কবরস্থানে। যেখান থেকে আর কখনো তিনি ফিরে আসবেন না। তবে তাঁর অসংখ্য ভক্ত ও শুভার্থী আমরা তাঁর নীতি, আদর্শ ও শিা বহন করে চলবো অনাদিকাল। যতদিন বেঁচে থাকবো, আমাদের হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দিয়ে স্মরণ করবো এই শ্রদ্ধেয় মানুষটিকে। (সমাপ্ত)
লেখক: সাবেক এপিপি, জজ কোর্ট, চাঁদপুর।

********************************************************************************************************

পরপারে চলে গেলেন

প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ মফিজুল ইসলাম

এ. এফ. এম. ফতেউল বারী রাজা

‘আজো মধুর বাঁশরী বাজে’ নজরুলের গানটি ১৯৫৫ সালে মফিজুল ইসলাম চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘পঞ্চজন্য’ ও ‘জয়শ্রী’ পত্রিকা থেকে উদ্ধার করেন। তারপর এর সুরারোপ করে স্বরলিপি প্রকাশসহ গানটি রচনার ঐতিহাসিক প্রোপট আলোচনা করেন। ১৯৫৬ সালে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সাথে ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’তে মফিজুল ইসলাম সাাৎ করেন। ১৯৫৮ সালে ‘দৈনিক ইনসাফ’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক (সংবাদ) পদে যোগদান করেন এবং ‘হরফুন মাওলা’ ছদ্মনামে পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি কবিতা, গানসহ ‘নীলচক্র’ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড রহস্যোপন্যাস সিরিজ, ‘মাকড়সার জাল’, ‘কত বিচিত্র মা’ ইত্যাদি গ্রন্থ লিখেছেন। তাছাড়া মফিজুল ইসলাম ও পণ্ডিত বারীণ মজুমদার যৌথভাবে ‘সংগীতকলি’ নামে ঢাকা বোর্ডের অষ্টম শ্রেণীর এবং ফেরদৌসি রহমানের সাথে যৌথভাবে ‘গীতলহরী’ নামে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন।
‘‘১৯৫০ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত নজরুলসংগীত-এর রাজ্য সম্পূর্ণ কৃষ্ণবিবরে। নজরুলের সত্যিকার বন্ধুরা দু’চারজন স্মৃতিকথা লিখে শুধু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন যে, নজরুল সাধারণ নন, অসাধারণ।” ১৯৬২ সালে কোলকাতায় রবীন্দ্র সদনে প্রথম কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদ, কবির ভ্রাতুষ্পুত্র কাজী আবদুস্ সালাম, আবৃত্তিকার প্রদীপ ঘোষ, প্রকাশক মজহারুল ইসলাম, সাংবাদিক কল্পতরু সেনগুপ্ত, বিচারপতি মাসুদ, কমল দাসগুপ্ত, ফিরোজা বেগমসহ অনেকে নজরুলের জন্ম দিবস পালনের মধ্য দিয়ে নজরুল চর্চার সূত্রপাত ঘটান। প্রায় একই সময় কোলকাতার সাথে বাংলাদেশে আমির হোসেন চৌধুরী ও নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দিন আহামদ এখানে নজরুল চর্চার প্রাথমিক সূত্রপাত ঘটান। অবশ্য আমির হোসেন চৌধুরী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হাতে নিহত হন। কিন্তু এ সময় যারা নজরুলসংগীতের ধারক ও বাহক তাদের এক পা ছিলো মৃত্যুর দুয়ারে। এদের মধ্যে শৈলেশ দত্ত গুপ্ত, নলিনী কান্ত সরকার, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, ধীরেন দাস, জগৎ ঘটক, চিত্ত রায়, গীরিন চক্রবর্তী, প্রফেসর বিমল গুপ্ত, আঙ্গুর বালা, কমল দাসগুপ্ত, ইন্দুবালা, কমলা ঝরিয়া প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। আবার এদের মধ্যে কেউ কেউ প্রয়াতও হয়েছেন।
হারানোর সেই বিশাল ঝড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাঁরা ফুল কুড়িয়েছেন তাঁদের মধ্যে প্রয়াত আবদুল আজিজ আল আমান (হরফ প্রকাশনী), শ্রী ব্রহ্মমোহন ঠাকুর, নিতাই ঘটক উল্লেখযোগ্য। আর বাংলাদেশে সর্বজনাব মফিজুল ইসলাম (সদ্য প্রয়াত), আসাদুল হক, প্রয়াত শেখ লুৎফুর রহমান, আবদুস্ সাত্তার, জুলহাস উদ্দিন, প্রয়াত লায়লা আর্জুমান্দ বানু প্রমুখ।
১৯৬৪ সালে কবি তালিম হোসেন তাঁর বন্ধু অ্যাড. এ. কে. এম. নূরুল ইসলাম (পরবর্তীতে বিচারপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতি)কে সঙ্গে নিয়ে ‘নজরুল একাডেমী’ প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এ বছরই সাংগঠনিক পর্যায়ে নূরুল ইসলামের ১১ র‌্যাংকিন স্ট্রিটের বাসভবনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে একাডেমীর প্রথম নজরুল জন্মবার্ষিকী উদ্যাপিত হয়েছিলো। আর সেই অনুষ্ঠানেই নজরুল একাডেমী প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় এবং এই জন্য একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন আবুল কালাম সামছুদ্দিন (সভাপতি), কবি তালিম হোসেন (সম্পাদক), এ. কে. এম. নূরুল ইসলাম (কোষাধ্য) এবং সদস্য হিসেবে ইব্রাহিম খান, মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন, সুফিয়া কামাল, সিরাজউদ্দিন হোসেন, কাজী আবুল কাশেম, মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ, জাহানারা আরজু, মাফরুহা চৌধুরী প্রমুখ। এ বছরই মফিজুল ইসলাম পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প থেকে উচ্চাঙ্গ সংগীতে গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। আর ট্রেনার জাতীয় পুনঃগঠন দপ্তর মাধ্যমিক শিা বোর্ডের সিলেবাস কমিটির সদস্যপদ লাভ এবং সাংস্কৃতিক প্রতিনিধির সদস্য হয়ে বার্মা ভ্রমণ করেন।
এদিকে ‘নজরুল একাডেমী’তে নজরুলসংগীত প্রশিক হলেন এক সময়ের সাড়া-জাগানো পল্লীগীতি শিল্পী সোহরাব হোসেন ও রবীন্দ্র-গানের সাধক সুধীন দাস। কবি তালিম হোসেনের উৎসাহ, অনুপ্রেরণা এবং আন্তরিক সহযোগিতায় সুধীন দাস এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে নজরুল একাডেমী ‘নজরুল সুরলিপি’ নাম দিয়ে ২৫টি গানের স্বরলিপি প্রথম খণ্ড প্রকাশ করে। এভাবে প্রতি খণ্ডে ২৫টি গানের স্বরলিপি বেরুতে থাকে। প্রথম দিকে প্রকাশিত কোনো কোনো স্বরলিপি খণ্ডে দেখা গেল স্বরলিপিকারের নাম নেইÑ শুধু একাডেমীর সাধারণ সম্পাদকের ভূমিকা জ্বলজ্বল করছে। পরবর্তী খণ্ডগুলোতে স্বরলিপিকারের নাম প্রকাশের পর ধীরে ধীরে জানা গেল রবীন্দ্র গায়ক সুধীন দাস, তাঁর ছাত্র রশিদুন্ নবী এবং এস. এম. আহসান মুর্শেদ এই মহান কাজে ব্রতী হয়েছেন। মফিজুল ইসলামের মতো নজরুলসংগীত বিশারদ স্থান পেলেন না এখানে। ১৯৬৭ সালে মফিজুল ইসলাম ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর ভ্রমণ করলেন। ১৯৬৮ সালে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন উচ্চতর সংগীত পরিচালক। ঐ বছর জুন মাসের ২৩ তারিখে মীর মুজাফফার আলীর ছাত্রী কুষ্টিয়া নিবাসী রাজশাহী বেতারের পল্লীগীতি ও নজরুলসংগীতের গায়িকা সুরাইয়া খলিল ‘নজরুল সুরসুধা’ (১ম খণ্ড, ইসলামিক) নাম দিয়ে ১১টি গানের স্বরলিপি প্রকাশ করেন। উক্ত স্বরলিপি গ্রন্থের কল্পিত সুর ও ভুল বাণী মফিজুল ইসলামকে ুব্ধ করে। তিনি সুরাইয়া খলিলের স্বামীর আহ্বানে তাঁর স্ত্রীর কৃত স্বরলিপির ত্র“টিগুলো উল্লেখ করেন। এতে মি. খলিল রাগান্বিত হয়ে তাঁকে স্মরলিপি করতে বলেন। মফিজুল ইসলাম এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন। এদিকে সুরাইয়া খলিল জুলাই মাসে ‘নজরুল সুরসুধা’ (২য় খণ্ড, কাব্যগীতি ও দেশের) ১৯টি গানের স্বরলিপি এবং এ বছরই ‘নজরুল সুরসুধা’ (৩য় খণ্ড, জনপ্রিয়) ৩২ টি গানের স্বরলিপি প্রকাশ করেন। আর মফিজুল ইসলাম সুরাইয়া খলিলের ‘নজরুল সুরসুধা’-প্রথম খণ্ড প্রকাশের মাত্র ৫ মাস যেতে না যেতেই তিনি ‘হিন্দোল’ রাগের শিরোনামে স্বরলিপির আকর গ্রন্থ প্রথম খণ্ড ৩৬টি নজরুলসংগীত স্বরলিপিসহ ১৯৬৮ সালে (আষাঢ়, ১৩৭৬) প্রকাশ করেন। স্বরলিপি তৈরিকরণে তাঁর একমাত্র ভিত্তি ও অবলম্বন ছিলো আদি গ্রামোফোন রেকর্ড আর ওই আমলে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত গান ও স্বরলিপি। প্রথম খণ্ডে ‘আমার কথা’-তে তিনি বলেছেন, “সমস্ত সাহিত্যকর্মকে বাদ দিয়ে শুধু গীতিকার হিসেবেই নজরুল চিরদিন বেঁচে থাকার অধিকার অর্জন করেছেন।..... ১৯৪৪-৪৫ এবং ’৪৬ সালে যে সব গান চিত্ত রায় ও অন্যান্যের কণ্ঠে শুনেছি, আজ সেগুলো বিকৃত সুরে গাওয়া হচ্ছে দেখে ুব্ধ হয়েছি। ১৯/২০ বছর আগে ধারাবাহিকভাবে ‘মাসিক মোহাম্মদী’তে যে সকল নজরুলসংগীতের স্বরলিপি প্রকাশ করেছিলাম সেগুলোর বিকৃত রূপ দেখে আজ মর্মাহত হচ্ছি। আজকাল কথা পাল্টে স্বরচিত নজরুলসংগীত অনেকে গাইতে শুরু করেছেন। নানাদিক ভেবে নিজেই তাই নজরুলের গান স্বরলিপি সহকারে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশনার দায়িত্ব নিলাম। এ দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে আমার নিজস্ব। কোনো প্রতিষ্ঠান, দল বা জোটের এতে কোনো সংস্রব নেই। বিশেষ করে দল বা জোটে আমি বিশ্বাসীও নই। তাই ভবিষ্যতে আমার স্বরলিপিগুলোর দায়িত্ব আমার নিজের হাতেই থাকবে।” (হিন্দোল-১)
তিনি ভূমিকায় তাঁর সুরারোপিত চারটি গানের উল্লেখ করেছেন: কিন্তু আমার মনে হয় তিনি আরও অনেক গান সুর করেছেন। অনেক গানের মূল সুর খুঁজে না পেয়ে নিজেই সুরারোপ করেছেন। পুরোনো রেকর্ডের অস্পষ্ট কথা না বুঝতে পেরে নতুন কথাও লিপিবদ্ধও করেছেন। যা পরবর্তীতে কারো কারো এসব গবেষণার বিষয় হবে। যদি ওই সময় তিনি এ কাজ করার দুঃসাহস না দেখাতেন তাহলে নজরুলের গান আজ এত প্রচারিত হতো কি-না সন্দেহ এবং আজ তাই আদি সুরের সাথে আমরা তুলনা করতে পারছি। ‘কে দুরন্ত বাজাও ঝড়ের ব্যাকুল বাঁশী।’ (হিন্দোল ত্রিতাল), ‘এলো ঐ বনান্তে পাগল বসন্ত’ (পরজ-বসন্ত ত্রিতাল) ‘রুমু রুমু ঝুম, রুমু ঝুমু বাজে নূপুর’ (বেহাগ-খাম্বাজ-কাহরবা), ‘আজো মধুর বাঁশরী বাজে (ভীম পলশ্রী-ত্রিতাল), ‘বনপথে কে যায়’ (চন্দ্রোকোশ-ত্রিতাল) স্বরলিপির ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য: স্বরলিপিতে অতি জটিল আনুষঙ্গিক ুদ্র স্বরের স্পর্শন থেকে আমি বিরত রয়েছি। এর ফলে সহজেই কণ্ঠে সুর উঠে আসবে। গানের কাঠামো তোলা হয়ে গেলে আনুষঙ্গিক স্বরগুলো তখন আপনা থেকেই ধরা পড়বে। (হিন্দোল-১) উল্লেখিত স্বরলিপির প্রথম খণ্ড ৮ মাসের মধ্যেই সকল কপি শেষ হয়ে যায়। ৭ বছর পর এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন স্বরলিপিকার। দ্বিতীয় খণ্ড ৪৪ নজরুলসংগীত স্বরলিপিসহ ১৯৬৯ সালে (কার্তিক, ১৩৭৬) প্রকাশ করেন। ৩য় খণ্ড ৪০ নজরুলসংগীত স্বরলিপিসহ ১৯৭৩ সালে (শ্রাবণ, ১৩৮০) প্রকাশ করেন। এই খণ্ডের ভূমিকার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে বুঝা যায় মফিজুল ইসলাম আত্মপ্রত্যয়ী। তাই ‘হিন্দোল’ ৩য় খণ্ডে ‘আমার কথা’য় এক জায়গায় বলেছেন, “যতদিন যাচ্ছে, নজরুলগীতি ততই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে... আগামী কয়েক বছর পর নজরুলগীতির সমাদর বিপুলভাবে বেড়ে যাবে। এখানে আমাদের উচিত যার যা স্টক আছে প্রকাশ করে দেয়া। এ জন্য নজরুলের আত্মীয়-স্বজনদের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। কারণ তারাই অনেকে নজরুলগীতি জানেন না; আবার এমন সব গানকে নজরুলগীতি বলে জানেন সেগুলো আদৌ নজরুলের নয়।” (হিন্দোল-৩)
স্বরলিপি গ্রন্থের ভূমিকায় (১৯৭৩) বেতারের তৎকালীন আঞ্চলিক পরিচালক আহমদ-উদ-জামান মফিজুল ইসলাম সম্বন্ধে মূল্যায়ন করেন “মফিজুল ইসলাম একজন সুকণ্ঠ শিল্পী। তাঁর শিল্পী সত্তা ছাড়া তিনি একজন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও শিল্পী সমালোচক। প্রাসঙ্গিক বিষয়ে তাঁর যোগ্যতা সম্পর্কে বিচারের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।” (হিন্দোল-৩)
১৯৭৬ সালে মফিজুল ইসলাম সংগীত মহাবিদ্যালয়ে নজরুলসংগীত ও নন্দন তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ৪র্থ খণ্ড ২৬টি নজরুলসংগীত স্বরলিপিসহ ১৯৭৭ সালে (আশ্বিন, ১৩৮৪) প্রকাশ করেন।
৪র্থ খণ্ড ‘হিন্দোল’-এ ‘আমার কথা’য় বলেছেন, “অনেক নূতন অর্থাৎ অপ্রচলিত গানের স্বরলিপি এতে আছে। যা এ পর্যন্ত কোনো স্বরলিপির বইয়ে বের হয়নি... আজকাল কিছু সংখ্যক টেপ রেকর্ডার শিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছে। তারা টেপ-এ ধরে রাখা গান কণ্ঠস্থ করে নাক উঁচিয়ে রেডিও-টেলিভিশনে পরিবেশন করেন। এতে নজরুলগীতি তার মূল সুর থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছে। এ সম্পর্কিত আমার বহু লেখা বিভিন্ন কাগজে প্রকাশিত হয়েছে এবং কাগজে ও বেতারে সমালোচনার ঝড় ওঠেছে। মনে রাখতে হবে, স্বরলিপি একটি চিরন্তন ব্যবস্থা। গায়কীর তারতম্য ঘটবে কিন্তু সুদ শিল্পী স্বরলিপি হতেই সত্যিকারের সুরকে আহরণ করবেন, তাতে মূল সুরের এতটুকুও ব্যতিক্রম ঘটবে না।” (হিন্দোল-৪)
স্বরলিপি ও নজরুলের গান সম্বন্ধে এমন মন্তব্য একজন নির্মাতা একজন দ স্রষ্টার পইে সম্ভব। মফিজুল ইসলাম এমন একজন শিল্পী যিনি প্রতিষ্ঠান চ্যালেঞ্জ করে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। তাছাড়া মফিজুল ইসলামের ‘হিন্দোল’ নজরুল প্রেমীদের বিপুল সাড়া জাগিয়েছে এবং বাজারে এর যথেষ্ট চাহিদা আছে। আর এই গ্রন্থটি বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে সংগীত পিপাসুদের কাছে অদ্যাবধি একক আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে আসছে। (চলবে)
লেখক পরিচিতি: এএফএম ফতেউল বারী রাজা, বিশিষ্ট নজরুল গবেষক।

********************************************************************************************************