সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

                                                                     কবিতা (Poem)

 

ভালোবাসি তবুও তোমাকে
প্রকৌঃ মোঃ দেলোয়ার হোসেন

ভালোবাসি তবুও নিজেকে গুটিয়ে রাখি নিজের ভেতর
কীভাবে বলব বলো ভালোবাসার কথা কান্না নিশিভর
ডুবে যায় রাতের নদী নদীর দেহে নিয়ে সন্ধ্যা বিষণœতার
চলে যায় জ্যোৎস্না চাঁদের দেশে বাগানময় সৌরভ নিশিগন্ধার
আজ জীবন ঘিরে রয়েছে যাদুকর জাহাজ, দূরতমা নগর

অটবি অরণ্য টেনে আনছে অপ্রত্যাবর্তনীয় অন্ধকার
আজ নিশিতে এইখানে কামনা এক অধরা পরীর
হৃদয় যাচে সোঁদা ঘ্রাণ, খাদ্যপ্রাণ, গোপন প্রস্তাব প্রিয়ার
দীামন্ত্র খুঁটে খায় অতিরঞ্জিত উপদেশ যা শোনা যায় নিরন্তর

অরণ্যকে সামনে রেখে বসে আছি আমি উন্মুক্ত হৃদয়
অনেক পেছনে ফেলে এসেছি নাগরিক ভষ্মকণা রক্তচু ওদের
আমার খামারবাড়ি টিপসইয়ের মতো অরহীন নয় প্রিয়
আউশ-আমনের গন্ধ, কলাইফুল, পানধোয়া জল আছে জুড়ে পূর্ণ হৃদয়
তারপরও বলি ভালোবাসে শুধু তোমাকে আগুনে পোড়া দগ্ধ হৃদয়

প্রণয়
প্রকৌঃ মোঃ দেলোয়ার হোসেন

খোলা অলিন্দে দাঁড়িয়ে একজোড়া মসৃণহাত শশী স্পর্শ করে
সুদূর নত্র শরীর ঘেঁটে দেখে সে, জ্যোৎস্নার রূপ দেখে মুগ্ধ নয়নে
সুবিশাল জলমগ্ন নীলিমা বিকেলের রোদ-সবুজ পাতাযুক্ত ভালোবাসার ফ্রেম
দেয়ালাবদ্ধ রঙিন রমণীয় সমুদ্রের জলেÑ বিলাসী জাহাজ ভালোবাসার পোট্রেট
মরুময় ধরা সবুজ ঘাস আর খেজুর বৃ নিয়ে হৃদয় ছোঁয় তার
বিষণœ গাংচিল স্বপ্নদুপুর, জ্যোৎস্নারাতেরা দোলে হৃদয়ে প্রিয়ার
রূপকথার গল্প হয়ে অঝোর ধারায় শ্রাবণের বৃষ্টি নামে ঘরের চালে
নদীর জোয়ারে ভেসে যায় শুকনো খাল বিল উপনদী সোনালী প্রান্তর
কোনো একদিন কেঁদেছিল গহীন নিশীথে শ্যাম পুড়েছিল মন রাধার
কেঁদে যায় আজ অন্য সুখেরা কৃষ্ণের বাঁশির সুরে আমার প্রিয়া তোলে সুর

মনে পড়ে এক পদ্মফোঁটা ভোরে বেদনাকে দিয়েছিলাম ছুটি
সেই ণে আমি হয়েছিলাম তোমার কান্নায় তোমারই আঁচলবন্দী
আজ কান্নায় ভেজে বুকের জমিন বাড়ে তৃষ্ণা পিপাসা জীবনভর
ঠোঁট দিয়ে ছুঁই মৃত্যুর সুধা বিকালো না প্রেম প্রণয় আমার

--------------------------------------------------------------------

ভালোবাসার অন্যত্র নীড় বাঁধা
সামীম আহমেদ
(রিমি মুনাকে)

দীর্ঘ রজনী পর কালরাত সারারাত মধ্যরাত্রির স্মৃতির
আঙ্গিনায় আমার মাটির শরীরে খানিকটা অসুখ ছুঁয়েছে
তোমার বর্ণহীন ভালোবাসার মিনারে প্রদীপ জ্বালিয়ে
আমার যৌবনমন্দিরে স্বর্গের তানপুরা বাদক
তোমার কবিতার শরীরে আমার ওষ্ঠ ছোঁয়াল
তুমি বললেÑ
“ভালোবাসার কবিতা হয়ে ধ্বনিত হতে চাই তোমার কণ্ঠ বিহ্বলে
স্পর্শ হয়ে ছুঁয়ে দেখতে চাই তোমার অধর-অম্বর
বারিধারা হয়ে ভিজাতে চাই তোমার তপ্ত তনু-মন
পুষ্প হয়ে সুরভিত করতে চাই তোমার প্রেম কানন
অনুরাগে বাঁধতে তোমায় কোমল বাহুলতায় আজ এমনও দিনে”
ওগো নীলকণ্ঠী একটুকরো রোদ্দুরের আকাঙ্খা দু'চোখে নিয়ে
ডুবেছিলাম তোমার তৃষ্ণার্ত বৃষ্টিহীন সরোবরে
ধানসিঁড়িতে কফি হাউসে রাজপথে এলোমেলো আড়ালে
বিবর্ণ স্মৃতিগুলো আজ অক্টোপাস ঘিরে
ফণিমন্সার বুকে প্রজাপতি হারিয়েছে হীরক পালক
শব্দহীন দ্বীপের বুকে আজ অনন্ত মধ্যাহ্নের শূন্যতা
শান্ত মন্থর সন্ধ্যায় জীবনের শেষ গল্পটা আমি
নিরবতার কথোপকথন দিয়ে সাজিয়েছি শোনাবো বলে
ঝরাপাতার বৈষম্য পেরিয়ে তুমি এসো পরানীয়া-এসো অন্তরনীয়া
হে পলাতকাÑ এ শব্দাবলীর লজ্জা থেকে আমাকে তুলে নিয়ে
তোমার গল্পের মাঠে বেঁধে রেখো
তোমার জ্যোস্না নদীর সবটুকু জলে ভিজতে দিলে
শুধু গভীর ঢেউয়ে ডুবে যেতে দিলে না
হৃদরঙিনী সোনালী রোদ্দুরে আমি এসেছি সূর্যাস্ত দেখবো বলে নয়
অথচ তুমি এখন ভালোবাসার আরেক বন্দরে আমার বিশ্বাসের সীমানা ছেড়ে
মোহময় অরণ্যে গোলাপের সুবর্ণ এ শহরে।

মাত্রাহীন যাত্রাপথে তোমার ছায়া
সামীম আহমেদ

শেকল ছেড়া তোমার বড় শখ
সে হোক লোহা কিংবা সোনা বা রূপা হোক হিরে
তুমি নিঃশ্বাসের ছোঁবলে পাথর ভেঙ্গেছ
ফোঁটা ফোঁটা অশ্র“ দিয়ে মৃত্তিকাকে করেছ ঋণী
আমার জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে তোমার মুঠো মুঠো স্মৃতি
বিত্তের বৃত্ত ভেঙ্গে রাতের লুকানো রাজপথে বাসন্তি দেবতার রক্তে
কপালে রোদের আভা লাগালে
আমি তো যৌবনের দস্যুতা দিয়ে তোমার রক্ত-পলাশ গুহার প্রহরী হতে চাইনি
চাইনি তোমার যান্ত্রিক অনুরাগের কলকব্জাগুলোকে
মাকড়সার জালে বেঁধে অতৃপ্ত ঝর্ণাধারায় তৃপ্ত হতে
একজন নাস্তিক মোমের আলোতে কখনোই ঈশ্বরকে
খুঁজে পাবার আনন্দে মরুদ্যানে হাটুগেঁড়ে বসে না
কবিতার শরীর চুষে গল্পের রাখাল বালক সেজে আমি
এতকাল এতদিন মরা প্রজাপতির সঙ্গে গোপনে চুপচাপ বেঁচেছিলাম
আমার আরাধনা আমার জেগে থাকা তোমার শিয়রে-পাশে
সবকিছুই আজ সন্ধ্যেবেলার আধো আলোর
ছায়া কাঁপা রূপান্তরের মেঘলা আকাশ
তাহলে আমি কী করে তোমায় আমার আকাঙ্খার
ইমারতে ইট-পাথর করে রাখি?

------------------------------------------------------------------
স্ফুলিঙ্গ
মিজানুর রহমান রানা

অথর্ব বিচ্ছিন্ন সমাজের ঘুণেধরা সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতিতে যখন
বিষাক্ত হাওয়ায় ধরেছিলো অনিরাময়যোগ্য পঁচন,
কর্কশ আওয়াজে, কটর-মটর শব্দে কামড়াচ্ছিলো ঘুণপোকা
সঙ্গীদের নিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে জেগে ওঠেছিলাম তখন একা।

আত্মপ্রচারে মগ্ন কিছু রাশভারী প্রাণি; আত্ম-অহংকারের বশে
কুয়োর ব্যাঙের মতো আষ্ফালন শুধুই অন্ধকার খুপড়িতে বসে
নিষ্ফল আওয়াজে মূল্যবোধ, মানবতা ভূলুণ্ঠিত করেছিলো তখন
উচ্চকণ্ঠরা সহসা দ্বিধাভুলে মেরেছিলো সুতীক্ষ্ম সাহসের বাণ।

কী কবিতায়-প্রবন্ধে, সাহিত্যে সৃষ্টির অপূর্ব এক ঝলকানিতে,
অস্ত্রোপচার পরশ্রীকাতর ও পরস্ত্রীকাতরদের তন্ত্রীতে-ধমনীতে
বর্ণচোরারা অদৃশ্য চোখ, মস্তিস্কে, মননে, হতাশায়-অপমানে
গতিশীলতায় স্তিমিত হয়ে পড়ে শতাব্দীর নব উদ্ভাসিত বিশ্বায়নে।

েেপ ওঠলো ওরা- অন্যের উদ্ভাবিত সৃজনে; পাগলের মতো
বিষ নিঃশ্বাসে বলে প্রগতিশীলদের, ব্যাটা বেয়াদব কতো!
তবু সামন্তবাদের অবশেষসমূহ ভোগ করে ওরা প্রতিনিয়ত
আমলা-মুৎসুদ্দী ধ্যান-ধারণার বিকাশে তৎপর অবিরত।

শুনেছিলাম মাও সেতুং বলেছিলেন একদা স্পষ্টাকারে,
‘একটি মাত্র স্ফুলিঙ্গ দাবানল সৃষ্টি করতে পারে’
অথর্ব ঘুণেধরা সমাজে; লেখনিতে যাদের স্ফুলিঙ্গের অবয়ব
পরশ্রীকাতরদের চোখে সে হয়ে যায় চরম এক বেয়াদব!

রচনাকাল: ২১ ফেব্র“য়ারি ২০০৯ খ্রিঃ
 
শেষ চিঠি
মিজানুর রহমান রানা

কোনো এক গভীর রাত্রিতে নত্রের তলে বসে
গভীর ধ্যানে লিখছি এ চিঠি চন্দ্রমল্লিকার পাশে
প্রকৃতির নতজানু পরিবেশÑ ওরা পড়তে চায় লেখা
মোমের আলো নেই মনের আলোয়ই লিখছি একা

কোনো মাছরাঙা শালিখ হলদে পাখি আসেনি এখনো
প্রকৃতির শ্মশানের নীরবতা ওরা সক্রিয় নয় কেনো?
একাকী বসে রচি তোমাদের প্রতি শেষ উপহার
অবিচ্ছিন্ন নিমগ্নতায় ভরপুর এ ঘূর্ণমান জগত সংসার

নির্জন নিরালায় বসে শুধু কলমের আশ্রয় আজ
কাগজের বুকে খসখস শব্দ অস্পষ্ট ধোঁয়াশার কারুকাজ
তবুও লিখছি কারণ কাল ভোরে যখন তুমি
বকুলতলে আসবে তখন দেখবে আমার নি®প্রাণ শবদেহখানি

তারপর চলে যাবে ঘৃণাভরেÑ চন্দনের কাঠ অপচয়
চলে যাওয়া-আসা অনুজ্জ্বল প্রাণের সুবিশাল য়
দেহ থেকে আত্মা চিরশান্তির পরশে মেঘের ওপারে
পেয়েছে খোঁজ অনন্তেরÑ পায়নি পৃথিবীর ময়দান-সমরে

এরপর চলে যাবে পৃথিবীর কতশত হাজার বছর
আমাদের এই মন-প্রেম-স্মৃতি-বিচ্ছিন্নতার খবর
যাদুঘরে সযতেœ চিঠিখানা দেখবে উত্তরসূরী আগ্রহী নবসন্তানরা
হয়তো ভালোবাসার অশ্র“ নির্গমণে মেতে উঠবে তারা

পূর্বপুরুষ আমরা- হে দূর-ভবিষ্যত প্রজন্মের সন্তানরা
পাবে কি পৃথিবী আমাদেরÑ অবিকৃত আকাশ গ্রহ-তারা?
পাবে কি সংযম প্রেম-বিরহ পিপাসার ােভ অমলিন
চাঁদিনীতে জেগে কেটেছিলো যেভাবে এই আমাদের দিন

রেখে গেলাম হৃদয় কংকাল শীতল প্রবহমান দীর্ঘশ্বাস
তবুও শেষ চিঠি- ভালবেসে তোমাদের লিখি আজ।
-------------------------------------------------------------------

মৌনিতাপস হৃদয় কথন
নূরুন্নাহার (মুন্নি)

দুঃখ ব্যথা যন্ত্রণায় আর কতো
সিক্ত করতে চাও তুমি আমায়?
হতাশার প্লাবণে নিশ্চিহ্ন করতে চাওÑ
আমার বিদগ্ধ অনলর্স্পশী ভালোবাসা?
আমায় আকর্ষী করে স্রষ্টা তোমায়-
কী এমন শুদ্ধতার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছেন
জানি না।
কোন্ পবিত্রতার ছায়ায় তোমার ভেতরটা উজ্জ্বল-
চাকচিক্যতায় সাজিয়েছেন মনের মাধুরী দিয়ে!
যা আমায় করেছে মৌনিতাপস, পরিতৃপ্ত।
তোমার এ কোন্ টানে আজ আমি-
ভালোবাসি তোমায় একাগ্রচিত্তে,
জানি না।
তুমি যে কেমন দেখতে, তাও আমি জানি না।
যেমনি হও না কেন,
ঠিক যে আমার অদেখা ভুবনরাজ্যে ঘুরে বেড়ানো-
সদ্য সজ্জ্বিত বরের মতো মানবীয়,
তা’ আমি উপলব্ধি করি বেশ।
বড় কষ্ট আর সুুপ্ত আর্তচিৎকারে-
ব্যথিত হয় আমার হৃদপিণ্ড।
রুদ্ধশ্বাসে কখনও বেড়ে যায় আমার
শিরা-ধমনীর সর্ব স্পন্দন।
কিন্তু এভাবে আর কতোকাল?
তোমার সান্নিধ্যলাভের প্রত্যাশায়-
নাইবা হলো আমার জীবনের সূর্যোদয়।
তবুও ভালো থাক তুমি বেলা-অবেলায়।
বিষণœ বর্ষার আমন্ত্রণে তুমি-
মেঘ-স্ফুলিঙ্গ বারিধারা।
যদি ভুল করে ওই নীলাম্ভর থেকে ঝরতে তুমি,
তবে দেখতেÑ
কতোটা দহন আজ হলো নিভারণ।
ঝরনি তুমি, জানি ঝরবেওনা কোনোদিন।
আমার জীবন আকাশটা আজ বড্ড মেঘমুক্ত,
সুনির্মল পবন আমার তনু শীতল করে যায়,
আর বলে, মেঘের স্পর্শবাহনে অবগাহন করা-
সে অতি দীর্ঘ পথ-পাণে যেন অপলক নেত্রে-
শুধুই আমার তাকিয়ে থাকা।
তবুও যে ভালোলাগে তোমায়,
ভালোবাসি তোমায়।
নীলকণ্ঠ পাখির মতোই-
নিত্য নব আয়োজনে ডাকি তোমায়।
ডাকি চিত্তচতুরঙ্গের ডায়াস সাজিয়ে।
অপরিচিত তোমার অবয়ব মাঝে মাঝে-
তাড়িত করে আমায়।
তখনই ছুটি ওই মনের বিহঙ্গলতায়।

-----------------------------------------------------------------

ক্ষুধিত মানুষ

বিষন্ন সুমন 


কোন একদিন ভালবাসা চেয়েছিলে।

হৃদয়ের এক কোণে
সামান্যতম আশ্রয় নিলে।
একসময় কি যে হলো
সমস্ত বুক জুড়ে
একরাশ যন্ত্রণার মত এল ভালবাসা।

ভালবাসাই যদি নেবে
তবে দূরে থেক।
অক্লান্ত অনুভবের ভীড়ে
আমায় জড়িয়ে রেখ।

আমার বিশ্বাসটুকু গুড়িয়ে দিতে
তুমি কাছে এলে।
বুকের বাম দিকে এঁকে দিলে
দুঃসহ ক্ষতচিহ্ন।

ধীরে ধীরে
কেড়ে নিলে
ভালবাসার সুখ
লজ্জার আবরণ
নারীত্বের সততা
আমার সবকিছু।

তবুও তোমার
ক্ষিধে মেটেনি।
নেবেই যদি
তবে এই নাও আমার জীবন।

----------------------------------------------------------

“মায়াময় হাতছানি”
By: জায়েদ বিন জাকির (শাওন)

বহুদুরের পথ পাড়ি দিয়ে! মনে পড়ে; আমার ছোট্ট ঘরে,
চাঁদ-সুরুজের আলো তো নয় যেন সোনা রূপা ঝরে।
মা কে আমি কতদিন দেখি না; এই প্রবাস জীবনে এসে-
‘ভাত খেয়ে নে খোকা!’ কই কেউ তো বলেনা হেসে!
দেশের জন্য মন কাঁদে! কেউ তো দেখায় না আলো,
কেউ তো এসে বলে না, ‘কি রে! কেমন আছিস? ভাল?’
চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে যাই; মেলে না একটু ছায়া-
এতদিন পরেও ভুলতে পারি না, আমার দেশের মায়া।
এদিক ওদিক চাই; কেউ কারো নয়! কেউ দেখে না ফিরে,
কত বছর পার হল! যেতে পারলাম কই মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে?
যত কিছু থাকুক না কেন, প্রবাস মানেই তো পর!
শত জনমেও মেলে না সেথা, নিজের ঘরের আদর।
কপাল থেকে ঝরায়ে ফেলি রাস্তায়, ক’ফোটা ঘাম-
দুঃখে যেথা সান্ত্বনা নেই, কষ্টের পরে নেই আরাম!
পথে পথে হাঁটার মাঝে যদি কভু শুনি বাংলা ভাষা-
খরাতপ্ত মরু জীবনে জেগে ওঠে এক টুকরো আশা।
সবকিছু ছেড়ে দিয়ে মনে হয় উড়াল দিয়ে যাই দেশে,
সোনার মাটি ছেড়ে কেন বেঁচে থাকা কাঙ্গালের বেশে?
কি যে মায়া ছড়ায়ে রয়েছে আমার দেশেরই পথের বাঁকে-
হাতছানি দিয়ে মনের গভীরে আমায় সদাই যেন ডাকে।

---------------------------------------------------------

 

 

কাজী নজরুল ইসলাম-এর কবিতা

----------------------------------------------------------------

 

  1. অ-কেজোর গান [ ছায়ানট ]
  2. অ-নামিকা [ সিন্ধু-হিন্দোল ]
  3. অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত [ ফণি-মনসা ]
  4. অবেলার ডাক [ দোলনচাঁপা ]
  5. অভিশাপ [ দোলনচাঁপা ]
  6. আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে [ দোলনচাঁপা ]
  7. আপন-পিয়াসী [ ছায়ানট ]
  8. আমার কৈফিয়ৎ [ সর্বহারা ]
  9. আশা [ ছায়ানট ]
  10. ঈশ্বর [ সাম্যবাদী ]
  11. কবি-রাণী [ দোলনচাঁপা ]
  12. কমল-কাঁটা [ ছায়ানট ]
  13. কাণ্ডারী হুশিয়ার! [ সর্বহারা ]
  14. কুলি-মজুর [ সর্বহারা ]
  15. গোকুল নাগ [ সর্বহারা ]
  16. গোপন-প্রিয়া [ সিন্ধু-হিন্দোল ]
  17. চিরশিশু [ ছায়ানট ]
  18. চৈতী হাওয়া [ ছায়ানট ]
  19. ছাত্রদলের গান [ সর্বহারা ]
  20. দারিদ্র্য [ সিন্ধু-হিন্দোল ]
  21. দূরের বন্ধু [ ছায়ানট ]
  22. দ্বীপান্তরের বন্দিনী [ ফণি-মনসা ]
  23. নারী [ সাম্যবাদী ]
  24. পউষ [ দোলনচাঁপা ]
  25. পথহারা [ দোলনচাঁপা ]
  26. পথের দিশা [ ফণি-মনসা ]
  27. পলাতকা [ ছায়ানট ]
  28. পাপ [ সাম্যবাদী ]
  29. পিছু-ডাক [ দোলনচাঁপা ]
  30. পূজারিণী [ দোলনচাঁপা ]
  31. ফরিয়াদ [ সর্বহারা ]
  32. ফাল্গুনী [ সিন্ধু-হিন্দোল ]
  33. বারাঙ্গনা [ সাম্যবাদী ]
  34. বিজয়িনী [ ছায়ানট ]
  35. বিদায়-বেলায় [ ছায়ানট ]
  36. বিদায়-স্মরণে [ সিন্ধু-হিন্দোল ]
  37. বিদ্রোহী [ অগ্নিবীণা ]
  38. ব্যথা-নিশীথ [ ছায়ানট ]
  39. মা (বিরজাসুন্দরী দেবী)-র শ্রীচরণারবিন্দে [ সর্বহারা ]
  40. মানুষ [ সাম্যবাদী ]
  41. লিচু চোর [ ঝিঙেফুল ]
  42. শায়ক-বেঁধা পাখী [ ছায়ানট ]
  43. সত্য-কবি [ ফণি-মনসা ]
  44. সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি [ ফণি-মনসা ]
  45. সন্ধ্যাতারা [ ছায়ানট ]
  46. সব্যসাচী [ ফণি-মনসা ]
  47. সর্বহারা [ সর্বহারা ]
  48. সাম্যবাদী [ সাম্যবাদী ]
  49. সিন্ধু [ সিন্ধু-হিন্দোল ]
  50. হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ [ ফণি-মনসা ]

 

------------------------------------------------------

 

 

সিন্ধু


 -প্রথম তরঙ্গ-

    হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর, হে চির-বিরহী,
     হে অতৃপ্ত! রহি’ রহি’
      কোন্‌ বেদনায়
     উদ্বেলিয়া ওঠ তুমি কানায় কানায়?
কি কথা শুনাতে চাও, কারে কি কহিবে বন্ধু তুমি?
প্রতীক্ষায় চেয়ে আছে উর্ধ্বে নীলা নিম্নে বেলা-ভুমি!
     কথা কও, হে দুরন্ত, বল,
তব বুকে কেন এত ঢেউ জাগে, এত কলকল?
     কিসের এ অশান্ত গর্জন?
     দিবা নাই রাত্রি নাই, অনন্ত ক্রন্দন
      থামিল না, বন্ধু, তব!
কোথা তব ব্যথা বাজে! মোরে কও, কা’রে নাহি ক’ব!
     কা’রে তুমি হারালে কখন্‌?
    কোন্‌ মায়া-মণিকার হেরিছ স্বপন?
     কে সে বালা? কোথা তার ঘর?
    কবে দেখেছিলে তারে? কেন হ’ল পর
     যারে এত বাসিয়াছ ভালো!
    কেন সে আসিল, এসে কেন সে লুকালো?
     অভিমান ক’রেছে সে?
    মানিনী ঝেপেছে মুখ নিশীথিনী-কেশে?
    ঘুমায়েছে একাকিনী জোছনা-বিছানে?
    চাঁদের চাঁদিনী বুঝি তাই এত টানে
    তোমার সাগর-প্রাণ, জাগায় জোয়ার?
    কী রহস্য আছে চাঁদে লুকানো তোমার?
      বল, বন্ধু বল,
   ও কি গান? ওকি কাঁদা? ঐ মত্ত জল-ছলছল-
      ও কি হুহুঙ্কার?
     ঐ চাঁদ ঐ সে কি প্রেয়সী তোমার?
     টানিয়া সে মেঘের আড়াল
    সুদূরিকা সুদূরেই থাকে চিরকাল?
চাঁদের কলঙ্ক ঐ, ও কি তব ক্ষুধাতুর চুম্বনের দাগ?
দূরে থাকে কলঙ্কিনী, ও কি রাগ? ও কি অনুরাগ?
     জান না কি, তাই
   তরঙ্গে আছাড়ি’ মর আক্রোশে বৃথাই?….
    মনে লাগে তুমি যেন অনন্ত পুরুষ
    আপনার স্বপ্নে ছিলে আপনি বেহুঁশ!
     অশান্ত! প্রশান্ত ছিলে
      এ-নিখিলে
     জানিতে না আপনারে ছাড়া।
তরঙ্গ ছিল না বুকে, তখনো দোলানী এসে দেয়নি ক’ নাড়া!
    বিপুল আরশি-সম ছিলে স্বচ্ছ, ছিলে স্থির,
     তব মুখে মুখ রেখে ঘুমাইত তীর।–

      তপস্বী! ধেয়ানী!
    তারপর চাঁদ এলো-কবে, নাহি জানি
     তুমি যেন উঠিলে শিহরি’।
    হে মৌনী, কহিলে কথা-“মরি মরি,
      সুন্দর সুন্দর!”
    “সুন্দর সুন্দর” গাহি’ জাগিয়া উঠিল চরাচর!
    সেই সে আদিম শব্দ, সেই আদি কথা,
    সেই বুঝি নির্জনের সৃজনের ব্যথা,
     সেই বুঝি বুঝিলে রাজন্‌
    একা সে সুন্দর হয়  হইলে দু’জন!…
    কোথা সে উঠিল চাঁদ হৃদয়ে না নভে
সে-কথা জানে না কেউ, জানিবে না,  চিরকাল নাহি-জানা র’বে।
এতদিনে ভার হ’ল আপনারে নিয়া একা থাকা,
    কেন যেন মনে হয়-ফাঁকা, সব ফাঁকা
    কে যেন চাহিছে মোরে, কে যেন কী নাই,
    যারে পাই তারে যেন আরো পেতে চাই!
    
    জাগিল আনন্দ-ব্যথা, জাগিল জোয়ার,
    লাগিল তরঙ্গে দোলা, ভাঙিল দুয়ার,
     মাতিয়া উঠিলে তুমি!
    কাঁপিয়া উঠিল কেঁদে নিদ্রাতুরা ভূমি!
    বাতাসে উঠিল ব্যেপে তব হতাশ্বাস,
    জাগিল অন্তত শূন্যে নীলিমা-উছাস!
    রোমাঞ্চিত হ’ল ধরা,
     বুক চিরে এল তার তৃণ-ফুল-ফল।
    এল আলো, এল বায়ু, এল তেজ প্রাণ,
   জানা ও অজানা ব্যেপে ওঠে সে কি অভিনব গান!
    এ কি মাতামাতি ওগো এ কি উতরোল!
    এত বুক ছিল হেথা, ছিল এত কোন!
    শাখা ও শাখীতে যেন কত জানাশোনা,
   হাওয়া এসে দোলা দেয়, সেও যেন ছিল জানা
      কত সে আপনা!
     জলে জলে ছলাছলি চলমান বেগে,
   ফুলে হুলে চুমোচুমি-চরাচরে বেলা ওঠে জেগে!
     আনন্দ-বিহ্বল
সব আজ কথা কহে, গাহে গান, করে কোলাহল!
বন্ধু ওগো সিন্ধুরাজ! স্বপ্নে চাঁদ-মুখ
হেরিয়া উঠিলে জাগি’,  ব্যথা ক’রে উঠিল ও-বুক।
কী যেন সে ক্ষুধা জাগে, কী যেন সে পীড়া,
গ’লে যায় সারা হিয়া, ছিঁড়ে যায় যত স্নায়ু শিরা!
    নিয়া নেশা, নিয়া ব্যথা-সুখ
    দুলিয়া উঠিলে সিন্ধু উৎসুক উন্মুখ!
    কোন্‌ প্রিয়-বিরহের সুগভীর ছায়া
   তোমাতে পড়িল যেন, নীল হ’ল তব স্বচ্ছ কায়া!
     সিন্ধু, ওগো বন্ধু মোর!
     গর্জিয়া উঠিল ঘোর
      আর্ত হুহুঙ্কারে!
      বারে বারে
   বাসনা-তরঙ্গে তব পড়ে ছায়া তব প্রেয়সীর,
ছায়া সে তরঙ্গে ভাঙে, হানে মায়া, উর্ধ্ব প্রিয়া স্থির!
     ঘুচিল না অনন্ত আড়াল,
    তুমি কাঁদ, আমি কাঁদি, কাঁদি সাথে কাল!
     কাঁদে গ্রীষ্ম, কাঁদে বর্ষা, বসন্ত ও শীত,
     নিশিদিন শুনি বন্ধু ঐ এক ক্রন্দনের গীত,
     নিখিল বিরহী কাঁদে সিন্ধু তব সাথে,
    তুমি কাঁদ, আমি কাঁদি, কাঁদে প্রিয়া রাতে!
     সেই অশ্রু-সেই লোনা জল
তব চক্ষে — হে বিরহী বন্ধু মোরা — করে টলমল!
     এক জ্বালা এক ব্যথা নিয়া
তুমি কাঁদ, আমি কাঁদি, কাঁদে মোর প্রিয়া।
 
-দ্বিতীয় তরঙ্গ-

    হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর
     হে মোর বিদ্রোহী!
      রহি’ রহি’
     কোন্‌ বেদনায়
    তরঙ্গ-বিভঙ্গে মাতো উদ্দাম লীলায়!
     হে উন্মত্ত, কেন এ নর্তন?
    নিষ্ফল আক্রোশে কেন কর আস্ফালন
     বেলাভূমে পড়ো আছাড়িয়া!
    সর্বগ্রাসী! গ্রাসিতেছ মৃত্যু-ক্ষুধা নিয়া
     ধরণীরে তিলে-তিলে!
    হে অস্থির! স্থির নাহি হ’তে দিলে
     পৃথিবীরে! ওগো নৃত্য-ভোলা,
    ধরারে দোলায় শূন্যে তোমার হিন্দোলা!
      হে চঞ্চল,
    বারে বারে টানিতেছ দিগন্তিকা-বন্ধুর অঞ্চল!
কৌতুকী গো! তোমার এ-কৌতুকের অন্ত যেন নাই।-
      কী যেন বৃথাই
     খুঁজিতেছ কূলে কূলে
কার যেন পদরেখা!-কে নিশীথে এসেছিল ভুলে
    তব তীরে, গর্বিতা সে নারী,
    যত বারি আছে চোখে তব
     সব দিলে পদে তার ঢালি’,
     সে শুধু হাসিল উপক্ষায়!
তুমি গেলে করিতে চুম্বন, সে ফিরালো কঙ্কণের ঘায়!
      –গেল চ’লে নারী!
    সন্ধান করিয়া ফের, হে সন্ধানী, তারি
     দিকে দিকে তরণীর দুরাশা লইয়া,
    গর্জনে গর্জনে কাঁদ–“পিয়া, মোর পিয়া!’’

বলো বন্ধু, বুকে তব কেন এত বেগ, এত জ্বালা?
কে দিল না প্রতিদিন? কে ছিঁড়িল মালা?
কে সে গরবিনী বালা? কার এত রূপ এত প্রাণ,
   হে সাগর, করিল তোমার অপমান!
   হে মজনু, কোন্‌ সে লায়লীর
    প্রণয়ে উন্মাদ তুমি?-বিরহ-অথির
    করিয়াছে বিদ্রোহ ঘোষণা, সিন্ধুরাজ,
   কোন্‌ রাজকুমারীর লাগি’? কারে আজ
    পরাজিত করি’ রণে, তব প্রিয়া রাজ-দুহিতারে
    আনিবে হরণ করি?-সারে সারে
    দলে দলে চলে তব তরঙ্গের সেনা,
    উষ্ণীষ তাদের শিরে শোভে শুভ্র ফেনা!
     ঝটিকা তোমার সেনাপতি
আদেশ হানিয়া চলে উর্ধ্বে অগ্রগতি।
     উড়ে চলে মেঘের বেলুন,
‘মাইন্‌’ তোমার চোরা পর্বত নিপুণ!
হাঙ্গর কুম্ভীর তিমি চলে ‘সাবমেরিন’,
নৌ-সেনা চলিছে নীচে মীন!
   সিন্ধু-ঘোটকেতে চড়ি’ চলিয়াছ বীর
      উদ্দাম অস্থির!
কখন আনিবে জয় করি’-কবে সে আসিবে তব প্রিয়া,
      সেই আশা নিয়া
      মুক্তা-বুকে মালা রচি’ নীচে!
     তোমার হেরেম্‌-বাঁদী শত শুক্তি-বধূ অপেক্ষিছে।
     প্রবাল গাঁথিছে রক্ত-হার-
     হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর-তোমার প্রিয়ার!
      বধূ তব দীপাম্বীতা আসিবে কখন?
     রচিতেছে নব নব দ্বীপ তারি প্রমোদ-কানন।
      বক্ষে তব চলে সিন্ধু-পোত
     ওরা তব যেন পোষা কপোতী-কপোত।
     নাচায়ে আদর করে পাখীরে তোমার
     ঢেউ-এর দোলায়, ওগো কোমল দুর্বার!
      উচ্ছ্বাসে তোমার জল উলসিয়া উঠে,
      ও বুঝি চুম্বর তব তা’র চঞ্চুপুটে?
     আশা তব ওড়ে লুব্ধ সাগর-শকুন,
     তটভূমি টেনে চলে তব আশা-তারকার গুণ!
     উড়ে যায় নাম-নাহি-জানা কত পাখী,
     ও যেন স্বপন তব!-কী তুমি একাকী
      ভাব কভু আনমনে যেন,
       সহসা লুকাতে চাও আপনারে কেন!
     ফিরে চলো ভাঁটি-টানে কোন্‌ অন্তরালে,
     যেন তুমি বেঁচে যাও নিজেরে লুকালে!-
      শ্রান্ত মাঝি গাহে গান ভাটিয়ালী সুরে,
     ভেসে যেতে চায় প্রাণ দূরে-আরো দূরে।
      সীমাহীন নিরুদ্দেশ পথে,
     মাঝি ভাসে, তুমি ভাস, আমি ভাসি স্রোতে।
     
     নিরুদ্দেশ! শুনে কোন্‌ আড়ালীর ডাক
     ভাটিয়ালী পথে চলো একাকী নির্বাক?
      অন্তরের তলা হ’তে শোন কি আহবান?
     কোন্‌ অন্তরিকা কাঁদে অন্তরালে থাকি’ যেন,
        চাহে তব প্রাণ!
     বাহিরে না পেয়ে তারে ফের তুমি অন্তরের পানে
      লজ্জায়-ব্যথায়-অপমানে!
      তারপর, বিরাট পুরুষ! বোঝা নিজ ভুল
     জোয়ারে উচ্ছ্বসি’ ওঠো, ভেঙে চল কূল
      দিকে দিকে প্লাবনের বাজায়ে বিষাণ
     বলো, ‘ প্রেম করে না দুর্বল ওরে করে মহীয়ান্‌!’
বারণী সাকীরে কহ, ‘ আনো সখি সুরার পেয়ালা!’
আনন্দে নাচিয়া ওঠো দুখের নেশায় বীর, ভোল সব জ্বালা!
  অন্তরের নিষ্পেষিত ব্যথার ক্রন্দন
  ফেনা হ’য়ে ওঠে মুখে বিষর মতন।
  হে শিব, পাগল!
তব কন্ঠে ধরি’ রাখো সেই জ্বালা-সেই হলাহল!
   হে বন্ধু, হে সখা,
এতদিনে দেখা হ’ল, মোরা দুই বন্ধু পলাতকা।

কত কথা আছে-কত গান আছে শোনাবার,
কত ব্যথা জানাবার আছে-সিন্ধু, বন্ধু গো আমার!
  এসো বন্ধু, মুখোমুখি বসি,
অথবা টানিয়া লহ তরঙ্গের আলিঙ্গন দিয়া, দুঁহু পশি
  ঢেউ নাই যেথা-শুধু নিতল সুনীল!-
 তিমির কহিয়া দাও-সে যেন খোলে না খিল
   থাকে দ্বারে বসি’,
  সেইখানে ক’ব কথা। যেন রবি-শশী
   নাহি পশে সেথা।
   তুমি র’বে-আমি র’ব-আর র’বে ব্যথা!
  সেথা শুধু ডুবে র’বে কথা নাহি কহি’,-
   যদি কই,-
  নাই সেথা দু’টি কথা বই,
 আমিও বিরহী, বন্ধু, তুমিও বিরহী!’
-তৃতীয় তরঙ্গ-
হে ক্ষুধিত বন্ধু মোর, তৃষিত জলধি,
এত জল বুকে তব, তবু নাহি তৃষার অবধি!
 এত নদী উপনদী তব পদে করে আত্মদান,
  বুভুক্ষু! তবু কি তব ভরলি না প্রাণ?
  দুরন্ত গো, মহাবাহু
   ওগো রাহু,
 তিন ভাগ গ্রাসিয়াছ-এক ভাগ বাকী!
 সুরা নাই-পাত্র-হাতে কাঁপিতেছে সাকী!
 
 হে দুর্গম! খোলো খোলো খোলো দ্বার।
সারি সারি গিরি-দরী দাঁড়ায়ে দুয়ারে করে প্রতীক্ষা তোমার।
 শস্য-শ্যামা বসুমতী ফুলে-ফলে ভরিয়া অঞ্জলি
   করিছে বন্দনা তব, বলী!
 তুমি আছ নিয়া নিজ দুরন্ত কল্লোল
   আপনাতে আপনি বিভোল!
পাশে না শ্রবণে তব ধরণীতে শত দুঃখ-গীত;
দেখিতেছ বর্তমান, দেখেছ অতীত,
 দেখিবে সুদূরে ভবিষ্যৎ-
মৃত্যুঞ্জয়ী দ্রষ্টা, ঋষি, উদাসীনবৎ!
ওঠে ভাঙে তব বুকে তরঙ্গের মতো
জন্ম-মৃত্যু দুঃখ-সুখ, ভূমানন্দে হেরিছ সতত!

হে পবিত্র! আজিও সুন্দর ধরা, আজিও অম্লান
সদ্য-ফোটা পুষ্পসম, তোমাতে করিয়া নিতি স্নান!
 জগতের যত পাপ গ্লানি
হে দরদী, নিঃশেষে মুছিয়া লয় তব স্নেহ-পাণি!
 ধরা তব আদরিনী মেয়ে,
তাহারে দেখিতে তুমি আস’ মেঘ বেয়ে!
হেসে ওঠে তৃণে-শস্যে দুলালী তোমার,
কালো চোখ বেয়ে ঝরে হিম-কণা আনন্দাশ্রু-ভরা!
জলধারা হ’য়ে নামো, দাও কত রঙিন যৌতুক,
  ভাঙ’ গড়’ দোলা দাও,-
 কন্যারে লইয়া তব অনন্ত কৌতুক!
 হে বিরাট, নাহি তব ক্ষয়,
নিত্য নব নব দানে ক্ষয়েরে ক’রেছ তুমি জয়!

হে সুন্দর! জলবাহু দিয়া
 ধরণীর কটিতট আছো আঁকড়িয়া
ইন্দ্রানীলকান্তমণি মেখলার সম,
মেদিনীর নিতম্ব সাথে দোল’ অনুপম!
 বন্ধু, তব অনন্ত যৌবন
 তরঙ্গে ফেনায়ে ওঠে সুরার মতন!
কত মৎস্য-কুমারীরা নিত্য তোমা’ যাচে,
কত জল-দেবীদের শুষ্ক মালা প’ড়ে তব চরণের কাছে,
 চেয়ে নাহি দেখ, উদাসীন!
কার যেন স্বপ্নে তুমি মত্ত নিশিদিন!
 
 মন্থর-মন্দার দিয়া দস্যু সুরাসুর
মথিয়া লুন্ঠিয়া গেছে তব রত্ন-পুর,
হরিয়াছে উচ্চেঃশ্রবা, তব লক্ষ্মী, তব শশী-প্রিয়া
তার সব আছে আজ সুখে স্বর্গে গিয়া!
 ক’রেছে লুন্ঠন
তোমার অমৃত-সুধা-তোমার জীবন!
সব গেছে, আছে শুধু ক্রন্দন-কল্লোল,
আছে জ্বালা, আছে স্মৃতি, ব্যথা-উতরোল
উর্ধ্বে শূন্য, নিম্নে শূন্য,-শূন্য চারিধার,
মধ্যে কাঁদে বারিধার, সীমাহীন রিক্ত হাহাকার!

 হে মহান! হে চির-বিরহী!
হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর, হে মোর বিদ্রোহী,
 সুন্দর আমার!
   নমস্কার!
   নমস্কার লহ!
তুমি কাঁদ,-আমি কাঁদি,-কাঁদে মোর প্রিয়া অহরহ।
 হে দুস্তর, আছে তব পার, আছে কূল,
এ অনন্ত বিরহের নাহি পার–নাহি কূল–শুধু স্বপ্ন, ভুল।
 মাগিব বিদায় যবে, নাহি র’ব আর,
তব কল্লোলের মাঝে বাজে যেন ক্রন্দন আমার!
 বৃথাই খুঁজিবে যবে প্রিয়
উত্তরিও বন্ধু ওগো সিন্ধু মোর, তুমি গরজিয়া!
তুমি শূন্য, আমি শূন্য, শূন্য চারিধার,
মধ্যে কাঁদে বারিধার, সীমাহীন রিক্ত হাহাকার।

----------------------------------------------------------

দারিদ্র্য (সিন্ধু হিন্দোল)

হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান্‌।
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান
কন্টক-মুকুট শোভা।-দিয়াছ, তাপস,
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;
উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি, বাণী ক্ষুরধার,
বীণা মোর শাপে তব হ’ল তরবার!
দুঃসহ দাহনে তব হে দর্পী তাপস,
অম্লান স্বর্ণেরে মোর করিলে বিরস,
অকালে শুকালে মোর রূপ রস প্রাণ!
শীর্ণ করপুট ভরি’ সুন্দরের দান
যতবার নিতে যাই-হে বুভুক্ষু তুমি
অগ্রে আসি’ কর পান! শূন্য মরুভূমি
হেরি মম কল্পলোক। আমার নয়ন
আমারি সুন্দরে করে অগ্নি বরিষণ!

বেদনা-হলুদ-বৃন্ত কামনা আমার
শেফালির মত শুভ্র সুরভি-বিথার
বিকশি’ উঠিতে চাহে, তুমি হে নির্মম,
দলবৃন্ত ভাঙ শাখা কাঠুরিয়া সম!
আশ্বিনের প্রভাতের মত ছলছল
ক’রে ওঠে সারা হিয়া, শিশির সজল

টলটল ধরণীর মত করুণায়!
তুমি রবি, তব তাপে শুকাইয়া যায়
করুণা-নীহার-বিন্দু! ম্লান হ’য়ে উঠি
ধরণীর ছায়াঞ্চলে! স্বপ্ন যায় টুটি’
সুন্দরের, কল্যাণের। তরল গরল
কন্ঠে ঢালি’ তুমি বল, ‘অমৃতে কি ফল?
জ্বালা নাই, নেশা নাই. নাই উন্মাদনা,-
রে দুর্বল, অমরার অমৃত-সাধনা
এ দুঃখের পৃথিবীতে তোর ব্রত নহে,
তুই নাগ, জন্ম তোর বেদনার দহে।
কাঁটা-কুঞ্জে বসি’ তুই গাঁথিবি মালিকা,
দিয়া গেনু ভালে তোর বেদনার টিকা!….
গাহি গান, গাঁথি মালা, কন্ঠ করে জ্বালা,
দংশিল সর্বাঙ্গে মোর নাগ-নাগবালা!….

ভিক্ষা-ঝুলি নিয়া ফের’ দ্বারে দ্বারে ঋষি
ক্ষমাহীন হে দুর্বাসা! যাপিতেছে নিশি
সুখে রব-বধূ যথা-সেখানে কখন,
হে কঠোর-কন্ঠ, গিয়া ডাক-‘মূঢ়, শোন্‌,
ধরণী বিলাস-কুঞ্জ নহে নহে কারো,
অভাব বিরহ আছে, আছে দুঃখ আরো,
আছে কাঁটা শয্যাতলে বাহুতে প্রিয়ার,
তাই এবে কর্‌ ভোগ!-পড়ে হাহাকার
নিমেষে সে সুখ-স্বর্গে, নিবে যায় বাতি,
কাটিতে চাহে না যেন আর কাল-রাতি!
চল-পথে অনশন-ক্লিষ্ট ক্ষীণ তনু,
কী দেখি’ বাঁকিয়া ওঠে সহসা ভ্রূ-ধনু,
দু’নয়ন ভরি’ রুদ্র হানো অগ্নি-বাণ,
আসে রাজ্যে মহামারী দুর্ভিক্ষ তুফান,
প্রমোদ-কানন পুড়ে, উড়ে অট্টালিকা,-
তোমার আইনে শুধু মৃত্যু-দন্ড লিখা!

বিনয়ের ব্যভিচার নাহি তব পাশ,
তুমি চান নগ্নতার উলঙ্গ প্রকাশ।
সঙ্কোচ শরম বলি’ জান না ক’ কিছু,
উন্নত করিছ শির যার মাথা নীচু।
মৃত্যু-পথ-যাত্রীদল তোমার ইঙ্গিতে
গলায় পরিছে ফাঁসি হাসিতে হাসিতে!
নিত্য অভাবের কুন্ড জ্বালাইয়া বুকে
সাধিতেছ মৃত্যু-যজ্ঞ পৈশাচিক সুখে!
লক্ষ্মীর কিরীটি ধরি, ফেলিতেছ টানি’
ধূলিতলে। বীণা-তারে করাঘাত হানি’
সারদার, কী সুর বাজাতে চাহ গুণী?
যত সুর আর্তনাদ হ’য়ে ওঠে শুনি!
প্রভাতে উঠিয়া কালি শুনিনু, সানাই
বাজিছে করুণ সুরে! যেন আসে নাই
আজো কা’রা ঘরে ফিরে! কাঁদিয়া কাঁদিয়া
ডাকিছে তাদেরে যেন ঘরে ‘সানাইয়া’!
বধূদের প্রাণ আজ সানা’য়ের সুরে
ভেসে যায় যথা আজ প্রিয়তম দূরে
আসি আসি করিতেছে! সখী বলে, ‘বল্‌
মুছিলি কেন লা আঁখি, মুছিলি কাজল?….

শুনিতেছি আজো আমি প্রাতে উঠিয়াই
‘ আয় আয়’ কাঁদিতেছে তেমনি সানাই।
ম্লানমুখী শেফালিকা পড়িতেছে ঝরি’
বিধবার হাসি সম-স্নিগ্ধ গন্ধে ভরি’!
নেচে ফেরে প্রজাপতি চঞ্চল পাখায়
দুরন্ত নেশায় আজি, পুষ্প-প্রগল্‌ভায়
চুম্বনে বিবশ করি’! ভোমোরার পাখা
পরাগে হলুদ আজি, অঙ্গে মধু মাখা।

উছলি’ উঠিছে যেন দিকে দিকে প্রাণ!
আপনার অগোচরে গেয়ে উঠি গান
আগমনী আনন্দের! অকারণে আঁখি
পু’রে আসে অশ্রু-জলে! মিলনের রাখী
কে যেন বাঁধিয়া দেয় ধরণীর সাথে!
পুষ্পঞ্জলি ভরি’ দু’টি মাটি মাখা হাতে
ধরণী এগিয়ে আসে, দেয় উপহার।
ও যেন কনিষ্ঠা মেয়ে দুলালী আমার!-
সহসা চমকি’ উঠি! হায় মোর শিশু
জাগিয়া কাঁদিছ ঘরে, খাওনি ক’ কিছু
কালি হ’তে সারাদিন তাপস নিষ্ঠুর,
কাঁদ’ মোর ঘরে নিত্য তুমি ক্ষুধাতুর!

পারি নাই বাছা মোর, হে প্রিয় আমার,
দুই বিন্দু দুগ্ধ দিতে!-মোর অধিকার
আনন্দের নাহি নাহি! দারিদ্র্য অসহ
পুত্র হ’য়ে জায়া হয়ে কাঁদে অহরহ
আমার দুয়ার ধরি! কে বাজাবে বাঁশি?
কোথা পাব আনন্দিত সুন্দরের হাসি?
কোথা পাব পুষ্পাসব?-ধুতুরা-গেলাস
ভরিয়া করেছি পান নয়ন-নির্যাস!….
আজো শুনি আগমনী গাহিছে সানাই,
ও যেন কাঁদিছে শুধু-নাই কিছু নাই!

---------------------------------------------------

 

 

 
 
-------------------------------------------------------------
 
স্বাধীনতা এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো
নির্মলেন্দু গুণ


একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপোর উত্তেজনা নিয়ে
ল ল উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা ব'সে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতেÑ
‘কখন আসবে কবি?’ ‘কখন আসবে কবি?’

এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না,
এই বৃে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,
এই তন্দ্রাচ্ছন্ন, বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না।
তাহলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?
তাহলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চেÑবৃে ফুলের বাগানে
ঢেকে দেয়াএই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি?
জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত কালো হাত।
তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ
কবির বিরুদ্ধে কবি,
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,
মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ...।
হে অনাগত শিশু হে আগামী দিনের কবি,
শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি
একদিন সব জানতে পারবেÑ আমি তোমাদের কথা ভেবে
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।

সেদিন এই উদ্যানের রুপ ছিল ভিন্নতর।
না পার্ক না ফুলের বাগানÑ এসবের কিছুই ছিল না,
শুধু একখন্ড অখন্ড আকাশ যেরকম, সেরকম দিগন্ত প্লাবিত
ধু-ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়।
আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল
এই ধু ধু মাঠের সবুজে।

কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে এই মাঠে ছুটে এসেছিল
কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,
লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেধে উলঙ্গ কৃষক,
পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক,
হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,
তোমাদের মতো শিশু পাতা কুড়ানীরা দল বেঁধে।

একটা কবিতা পড়া হবে তার জন্য সে কী ব্যাকুল প্রতীা মানুষের
‘কখন আসবে কবি?’ ‘কখন আসবে কবি?’

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা,
জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা-
কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চে কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি ঃ
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সেই থেকে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আমাদের।

--------------------------------------------------------------------- 

দি ল ও য়া র


হঠাৎ আলোর স্মরণ


মাঝে মাঝে বিদ্যাপীঠকেন্দ্রিক বিভিন্ন স্মৃতি আমাকে তাড়া করে
আমার মধ্যে তখন এক ধ্যানমগ্ন নীরবতা নেমে আসে,
দূর অতীতে ফেলে আসা প্রাজ্ঞ শিক্ষকদের, হাসি-খুশি ছাত্রছাত্রীদের
ফাল্গুনী মুখগুলি স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে।

এই মুহূর্তে আমি স্মরণ করছি একজন শিক্ষকের কথা
আমি দেখতে পাচ্ছি তার বলিষ্ঠ শরীর ও সংলাপ,
একদিন ক্লাসে তিনি লজিক পড়াতে গিয়ে বলেছিলেন
কীভাবে একজন মেধাবী ছাত্র পরীক্ষায় তার হাতে গোল্লা পেয়েছিল।

তিনি জানিয়েছিলেন, চমৎকার ইংরেজিতে লেখা প্রশ্নোত্তরে
সেই মেধাবী ছাত্র কাঙ্ক্ষিত উত্তরের চারদিকে শব্দের তারকা
খচিত করে গেছে, অথচ উত্তরের নাভিকেন্দ্রে তার যাওয়া অনিবার্য ছিল,
অগত্যা বিপদগ্রস্ত শিক্ষক ছোট্ট এক শ্বাস ফেলে
তাকে দিয়েছিলেন জিরো।

শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আমাদেরকে সতর্ক করে বলেছিলেন
মেধা যতই উন্নতমানের হোক না কেন
লক্ষ্যভেদে অসমর্থ হলে
সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে
শুধু বিদ্যালয়ের পরীক্ষার খাতা নয়
জীবনের খাতাও শূন্যতায় হাহাকার করে।
-----------------------------------------------------------------

গো লা ম কি ব রি য়া পি নু


সর্বনাশ


নিজের হাত নিজের কাছে নেই
মাথাটা কি আছে?
নিজের হাত পরের কাছে !

স্পর্শ করা যায় না রাগপুষ্প
কিংবা শ্বেতজবা
দ্রাক্ষালতা ছুঁয়ে দেখার অনুভবও
হারিয়ে ফেলে বোধও কানা!
নিজের নদী বইছে দেখি _
তবে নদীর জলবিন্দু উষ্ণ নাকি শীতল
যায় না জানা!

প্রস্টম্ফুটন উৎসমূলে ভিত্তিমূলে
ছড়িয়ে দেওয়া আর হবে কি?
নিজের হাতে নিজের বাঁধন খুলে?

নিজের হাত নিজের কাছে নেই যে কেন
সে প্রশ্নটা শিকেয় তোলা!
ক্ষোভ বা রাগ কিচ্ছু নেই _
সংবেদনে দেয় না দোলা?

হাতের নাশ ! ঝাড়েবংশে কোন্ সর্বনাশ !
-------------------------------------------------------------------

চৌ ধু রী ফে র দৌ স


তুই কী করে ফিরে এলি বাঁকাজল


হারানোর পর বুঝি সবকিছু ফেরে! তুইও ফিরেছিস পোড়াগন্ধ-ঝুলকালি... মুখে। চলে গেলি পায়ে ঠেলে বর্ণরেণু, জগদ্দল_ যে রকম সন্ধ্যার বাদুড় টালমাটাল যায় অস্তাচলে। হারালেই মানুষ বুঝি অন্ধ হয়! শুনেছি, অন্ধরা কখনও ফেরে না_ তুই কী করে ফিরে এলি বাঁকাজল? এখন আমার অন্ধ হওয়ার পালা_ জগৎ-বাঁশি আয় তুই বুকে। তোকে আর ফেরানো গেল না।
----------------------------------------------------------------

সো হ রা ব পা শা


বিকেলের গল্প


একার জীবন নিয়ে আসা
ডেকে ডেকে যায় বেলা
ভিড় করে পাশে ভুল মানুষেরা
ভুল কণ্ঠস্বর;

দুপুর ঘুমিয়ে পড়ে
সন্ধের অলস বারান্দায়
আঁধারের ধুলো হয়ে যায়।


সু হি তা সু ল তা না
দহন

চোখের ভেতর আগুন নদী
কোথায় সেই মগ্ন দীঘি?
কেন বারবার জীবন ঘষে
আগুন তুলে আনো?
সেই তো ছিল ভালো
মেঘলা দিনে একলা দুপুর
হুহু করে কান্নার জল
চুইয়ে পড়ছে মনের ওপর
ভাঙা কপালজুড়ে দুঃখের
ছলছল কান্না আর সহ্য
হয় না আমার মেঘে মেঘে
ঢাকা পড়ে গেছে চাঁদ
কোথায় তুমি আধভাঙা
পাতার মর্মর হয়ে জেগে আছ
দেখতে আমি পাইনি
নেই কোনো স্তব কোনো ক্রন্দন
যার জন্য অপেক্ষা আমার
সে নিতান্তই মূর্খ, নির্বোধ আর বহু বর্ণ
লোভীও বটে! বারবার মন শশব্যস্ত
যার জন্য সে তো মন বোঝে না
পুড়ে যাচ্ছে গৃহ চোখের উপভূমি
অপেক্ষার ওপর দিয়ে ঘৃণার
নদী বয়ে যায়, বনস্থলী আর মেঘের আড়ালে
চুপিসারে বিরোধ লুকিয়ে রাখে
শেষ দৃশ্য অবলোকনের সময়
কোনো মনস্কাম নেই
---------------------------------------------------------------
অ থি র শে র পা

দেহ ও লালসূর্যঘড়ি

মানুষের চোখে শৈশবের টেরাকোটা_ যদিও পলেস্তরার মতো গেছে ঝরে
অনেক মুহূর্ত ও চোখের পলক! দেহের ভেতর জ্বলছে লালসূর্যঘড়ি
যতোই শৈশবের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে উঠছে মিটারের মতো
আঙুল আর হাতে চাবুকের মতো ফুটে থাকা রেখাগুলো এক একটি
অথৈ পুরাকীর্তি

শৈশবে ডুবে যাওয়া কণ্ঠের স্বরলিপির খোঁজে
আমি এখনো প্রত্নতাত্তি্বকের মতো কান পেতে রাখি
সিংহ আঁকা কোনো অদৃশ্য দরোজায়...
যে সিংহ কখনো ঘুমোয় না!

০২.
দ্রোহ আর সৌন্দর্যের সোনা চুরি করে উড়ে আসে যে
সেই-ই ফিনিক্স, তার ঠোঁট থেকে চুম্বনের কবিতা ঝরে পড়ে...
লাল থেকে সবুজ, সবুজ থেকে নীল আফ্রোদিতি কতো প্রকারে
হাজির। চুলের চিকন সর্পিনীরা ঢুকে পড়ে দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে
দেহ তো দেহগানেই ভরা, চোখে চোখে জেগে যাচ্ছে
অজস্র আয়ুর চর!

----------------------------------------------------------------