সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

                                                                                                                  লালন-

ভাবজগতের গানের রাজা বাউলের শিরোমণি লালন সাঁই

মিজানুর রহমান রানা

 


বাউল সাধক লালন ফকির (১৭৭৪-১৮৯০) ছিলেন ভাবজগতের গানের রাজা, বাউলের শিরোমণি। বাউল সাধক ও বাউল সঙ্গীত রচয়িতাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে বলা যায় তার স্থান সবার শীর্ষে। তিনি ছিলেন হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে সমানভাবে আদৃত।
গবেষকদের ধারণা, লালন ফকির জন্মসূত্রে হিন্দু কায়স্থ পরিবারের সন্তান এবং তাঁর জন্ম ১৭৭৪ সালে বর্তমান কুষ্টিয়া (তৎকালীন নদীয়া) জেলার অধীন কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের ভাঁড়ারা গ্রামে। লালন ছিলেন একাধারে ভাববাদী, যুক্তিবাদী ও স্রষ্টার প্রতি আনুগত্যমনা একজন পরিপূর্ণ মানুষ। তিনি ছিলেন ফকিরি মতবাদে বিশ্বাসী। তার পদাবলির ভণিতায় এ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। তাঁর গানে দেহবিচার, মিথুনাত্মক যোগসাধনা, গুরুবাদ, মানুষতত্ত্ব- বাউলসাধনার প্রসঙ্গ চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা তাঁর গানগুলো শুনলেই বুঝতে পারি তা’ অনায়াসে।
লালনের উচ্চকণ্ঠে সর্বদা উচ্চারিত হতো একটি পঙক্তি: ‘জাত হাতে পেলে পোড়াতাম আগুন দিয়ে।’ এ সম্পর্কে যা অনুমিত হয়, লালন একবার তীর্থযাত্রা থেকে বাড়ি ফেরার পথে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে নদীর তীরে মৃতবৎ অবস্থায় পড়েছিলেন। তাকে তুলে নিয়ে এক মুসলমান রমণী নিজ গৃহে রেখে সেবা শুশ্রƒষা দিয়ে রোগমুক্ত করেন। সেখান হতে রোগমুক্ত হয়ে লালন তার বাড়ি ফিরলে প্রকাশিত হয়, তিনি মুসলমানের ঘরে অন্ন্গ্রহণ করেছেন। ফলে অন্যজাতের মানুষের হাতে অন্নগ্রহণের অপরাধ চিহ্নিত করে গোঁড়া, ধর্মান্ধরা তাকে এ অপরাধে সামাজিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। বরং সে প্রায়ান্ধ, অজ্ঞ সমাজ সে সময়ে লালনকে সমাজচ্যুত করে। মানুষ হয়েও মানুষের প্রতি এ ধরনের অমানবিক আচরণ লালন ফকির মেনে নিতে পারেননি। ফলে লালন বৃদ্ধা মা আর স্ত্রীকে চিরকালের জন্যে পরিত্যাগ করে মনের মাঝে এক প্রকার অভিমান নিয়ে গৃহত্যাগ করেন। তিনি মায়ের স্নেহ এবং স্ত্রী থেকে বঞ্চিত হন। মনের মাঝে অপ্রকাশিত এ যন্ত্রণা লালন ফকিরকে দগ্ধ করেছিলো সারাজীবনভর। তাঁর জন্যে যদি স্বাভাবিক জীবন বয়ে যেত তাহলে তিনি হয়তো আর লালন ফকির হতে পারতেন না। অপ্রত্যাশিত এ মর্মান্তিক ঘটনাটাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় বাউলসাধনার দিকে। লালন ফকির পরবর্তীতে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় এসে বসবাস করেন। ফকিরি মতে তিনি সিরাজ সাঁইয়ের কাছে দীা নিয়েছিলেন। কারণ, তার পদাবলির ভণিতায় গুরু সিরাজ সাঁইয়ের নাম তিনি স্মরণ করেছেন বার বার।
আমরা দেখতে পাই যে, দেহ জরিপ ও গুরুবন্দনাই বাউল সাধনার মূলকেন্দ্র। বাউলের সাধনা হচ্ছে দেহকেন্দ্রিক। কারণ দেহের মধ্য লুকিয়ে আছে মানুষের পরমাত্মার এক গুপ্ত অবস্থান। দেহ ছাড়া আত্মা অচল। আত্মাকে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট দেহ কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করতে হয়। তাই দেখা যায়, কোনো মানুষের দেহ কলুষিত হলে আত্মাও কলুষিত হতে থাকে। দেহ বিচারের মাধ্যমে আত্মস্বরূপ নির্ণয় করতে পারলেই সেই পরম আরাধ্য মানুষের প্রত্যাশিত মনের সন্ধান লাভ সম্ভব। দেখা যায়, লালন ফকির তার গানে মানবদেহকে কখনো ‘খাঁচা’, কখনো ‘ঘর’, ‘আরশিনগর’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করেছেন। যেমন: ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়?’। এখানে ‘খাঁচা’ হচ্ছে দেহ, আর ‘অচিন পাখি’ হচ্ছে মানুষের আত্মা। আবার তিনি যখন বলেন, ‘আমার ঘরের চাবি পরের হাতে/কেমনে খুলিয়ে সে ধন দেব চেেত?’ এখানেও ‘ঘর’ বলতে তিনি ‘দেহকেই বুঝিয়েছেন।
লালন সাঁই মনে এক ধরনের গুরুবাদ পোষণ করতেন। বাউল সাধনা গুরুবাদী লৌকিক ধর্ম। কারণ গুরু বিনা সর্বপ্রকার সাধন-ভজন বৃথা। তাই আমরা দেখতে পাই যে, সর্বদা লালন ফকিরের গানে বাউল সাধনার এই অনুসঙ্গটি অত্যন্ত প্রকট হয়েছে। লালন বলেন, ‘ভবে মানুষ-গুরু নিষ্ঠা যার/সর্ব-সাধন সিদ্ধ হয় তার।’
লালন ফকিরি মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এর প্রমাণ তার পদাবলির ভণিতায় তা’ স্পষ্টভাবেই উচ্চারিত হয়েছে। তিনি তার আত্মপরিচয়ের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন ফকির এবং দরবেশ এ দু’টি শব্দ দ্বারা। তাই তার মানস-ভুবনকে বুঝার জন্যে তার সমসাময়িক কালের একজন মানবতাবাদী মনীষীর সঙ্গে তার অবস্থানগত দিক সম্পর্কে তুলনা করা যায়। তিনি হলেন রাজা রামমোহন রায়। লালন তার গানে, ধ্যানে যেমন সমাজ সংস্কার, মানুষের মনের কুটিলতা, রূঢ়তা ইত্যাদি সংস্কারে বিশ্বাসী ছিলেন ঠিক তেমনি রাজা রামমোহন রায়ও ছিলেন একজন মানবতাবাদী সমাজ সংস্কারক। রাজা রামমোহন রায় হিন্দু সমাজে তৎকালীন সময়ে প্রচলিত নানা কুসংস্কার, অমানবিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন হয়ে এর বিরুদ্ধে নানা পদপে গ্রহণ করেছিলেন। সতীদাহ প্রথা এর মধ্যে অন্যতম। একে তিনি আন্দোলনের দ্বারা পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকারকে দিয়ে তা আইনে পরিণত করিয়ে এই অমানবিক প্রথা রোধ করেছিলেন।
লালন ফকিরের আলোচনা প্রসঙ্গে কেন রাজা রামমোহন রায় প্রসঙ্গের অবতারণা? এ প্রসঙ্গে বলা যায়, উভয়ের অবস্থান আলাদা হলেও তাঁরা উভয়েই ছিলেন একাধারে ভাববাদী, যুক্তিবাদী এবং উভয়ের জন্মও বেশ কাছাকাছি। তবে উভয়ের ভাববাদ ও যুক্তিবাদ একই উৎস থেকে আসেনি। রামমোহন রায় ছিলেন তৎকালীন আধুনিক শিায় শিতি মানুষ। পান্তরে লালন ফকিরের জ্ঞান আহরণের উৎস ছিলো লোকায়তিকদের থেকে প্রাপ্ত, নিজস্ব মেধা-মনন ও সর্বোপরি নিরবচ্ছিন্ন ভাববাদের অভীষ্ট ল্য থেকে।
লালনের বাউল সাধনার মূল বিষয় বা অনুসঙ্গ ছিলো মানুষ। মানুষকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে তার সাধনা। কারণ, মানুষের ভেতরই বসবাস করে অন্য এক অদৃশ্য ‘আরশি নগরের পরশী’ যা কি-না লালনের ‘মনের মানুষ’ এবং লালন তাকেই বলেছেন ‘অলখ সাঁই’ এবং লালন এই সাঁইকেই বলেছেন ‘সাঁই নিরঞ্জন।’ মানুষকে এবং মানুষের মধ্যে সুপ্ত মনুষ্যত্বকে কেন্দ্র করে লালন পেতে চেয়েছেন সৃষ্টিকর্তাকে এবং সেই অদৃশ্য স্রষ্টাকে মানুষের মাঝে চিনিয়ে দিতে চেয়েছেন। সেই সত্যকে অন্তরে ধারণ করেই তিনি বলেন:
“মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে
সে কি অন্য তত্ত্ব মানে ॥”
লালনের গান যেহেতু আধ্যাত্মবাদের ওপর ভিত্তি করে রচিত এবং মানুষের পরম আপনজনকে পাওয়ার ল্েয উদ্ভাসিত সে জন্যে লালনের গান একাধারে সাধনাসঙ্গীত, শিল্পশোভিত কাব্যবাণী ও দর্শনকথা। লালনের গানগুলোতে আকর্ষণীয় ও শ্রীমণ্ডিত যে শব্দের সংমিশ্রণ পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় যে, প্রায় নিরর লালনের শব্দ-চেতনা, শব্দ ভাণ্ডার ও ভাষাশৈলী অনেক পরিশীলিত ও সমৃদ্ধ ছিলো। লালনের গানের এই শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য, উচ্চাঙ্গের দর্শন এবং মানুষের জন্যে মানবিকতাবোধের জন্যে এদেশে রবীন্দ্রনাথ, অন্নদাশঙ্কর রায় ও বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত অনেক সমালোচক লালনের এই ভাববাদী গানের প্রশংসা করেছেন।
লালনের গানে হিন্দু-মুসলিম বা কোনো জাতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়নি। লালন সংসারে কী জাত ছিলেন বা লালন কোন্ সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করতেন সেটাও বিবেচ্য বিষয় নয়। বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে লালন নিরাকার এক ‘অচিন পাখি’র সন্ধান করতেন। সেই অচিন পাখি কোন্ দেশের, কোন্ জাতের সেটার কোনো ইঙ্গিত তিনি দেননি। অপরদিকে লালনের গান কোনোপ্রকার সাম্প্রদায়িকতার দোষেও দুষ্ট নয়। বরং তাই এ প্রসঙ্গে কবি জসীমউদ্দীনের একট কথা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ‘লালনের খৎনা হয়েছে কি-না তাতে কী এসে যায়? বাংলাদেশে কয়েক কোটি মানুষেরই তো খৎনা হয়েছে, কই, আরেকটি লালন কি আর পয়দা হয়েছে?’
লালনের গান আজ আমাদের দেশের পরম সম্পদ। কারণ তাঁর গান দেশের গণ্ডি ছড়িয়ে বিদেশের মানুষের মনেও করেছে গভীর রেখাপাত। লালনকে তাই আমাদের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে হৃদয়ে লালন করতে হবে। তাঁর গানগুলোকে চর্চা করে কিংবদন্তীতুল্য লালনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে চিরকাল। তাতে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভাণ্ডার হবে পরিপূর্ণ। আমরাও হবো গৌরবদীপ্ত, পরিপূর্ণ হবে আমাদের জাতীয় সম্পদ।

                                                                                                                      লালন- ০2

লালন শাহ অভিজাত ও লোকায়তের সেতুবন্ধ
 
সুধীর চক্রবর্তী
 
বনে আছে দ্বন্দ্বের বিন্যাস, নাগরিকতার সঙ্গে লৌকিক জীবনের। কোনো মানুষই ঠিক সে-অর্থে অখণ্ড নয়, প্রত্যেকের মধ্যে আছে অপূর্ণতা। আমরা যারা নিজেদের খুব নাগরিক বলে মনে করি, elite বলে মনে করি, metropolitan মন আমাদের যাদের আছে বলে মনে করি শহরে থাকার কারণে, তাদের কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনুস্যূত রয়ে গেছে একটা গ্রামীণ মন। তুলসীমঞ্চে জল দেওয়া, বৈশাখ মাসে জলের ঝারি তৈরি করা, কার্তিক মাসে আকাশে প্রদীপ জ্বালানো, গো-পালন, নবান্ন - অনেক প্রচ্ছন্ন গ্রামীণ সংস্কৃতি আমাদের নাগরিক জীবনেও রয়ে যায়। খোদ কলকাতায় দু-তিনশো বছর আছেন এমন পরিবারের মানুষও কিন' মনে মনে গ্রামের স্মৃতি বয়ে চলেছেন তাঁর লোকাচার, তাঁর সংস্কৃতিতে। কাজেই গ্রামীণ সংস্কৃতি বলে তেমন বিচ্ছিন্ন কোনো সংস্কৃতি নেই। আমরা সকলেই আধা-গ্রামীণ আধা-নাগরিক। এভাবেই ভাবা ভালো।
লালনের গানকেই কিন' অগ্রাধিকার দিতে হবে, তাঁর তত্ত্বকে নয়। কালিদাস না জন্মালে তো মল্লিনাথ জন্মান না। ভাষ্য হয় পরে, সৃষ্টি হয় আগে। লালনের গানটাই হলো মুখ্য। আমরা যারা লালনের গানকে ঘিরে কথা বলতে চাইছি তারা গৌণ। কিন্তু আমাদের ভূমিকা অনেক সময়ে মুখ্য হয়ে ওঠে এজন্য যে, পুজোর সময়ে যেমন পুরোহিত লাগে, তেমন লালনকে বোঝার জন্য যদি মাঝখানে দু-একজন থাকেন তবে খারাপ হয় না। আমরা যে লালনকে পুরোপুরি বুঝেছি, তা কিন্তু নয়। কারণ লালন একটা খুব অধিগম্য করার মতো পুরো বস্তু নয়। কঠিন ব্যক্তিত্ব। কিন্তু বোঝার একটা চেষ্টা করা দরকার, মরমি চেষ্টা। অনেকে মনে করতে পারেন যে, কোনো সাধক, কোনো কবি, কোনো মহাপুরুষকে একক মনে করি, নিঃসঙ্গ মনে করি। আমরা ভাবি, তিনি বোধহয় নিজেই তৈরি হয়েছেন - কিন্তু তা নয়; যে-কোনো মানুষকে পেরিয়ে আসতে হয় অতীতকে, তাঁর সমকালকে এবং তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত থাকে ভবিষ্যতের দিকে। আমাদের দেশের কবিকে বলা হয়েছে ক্রান্তদর্শী, ক্রান্তপ্রজ্ঞা - ভবিষ্যতের দিকে যাঁর চোখ রয়েছে, ভবিষ্যতের প্রজ্ঞা যাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে তিনিই কবি। সেই প্রজ্ঞাকে যিনি প্রকাশ করতে পারেন তিনি কবি। কবির একটা মস্তবড় সংজ্ঞা হচ্ছে যিনি কূজন করতে পারেন। অর্থাৎ নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন। লালন যে-উচ্চারণ তাঁর জীবনে করে গেছেন, সে-উচ্চারণের যে-মহত্ত্ব, তার যে-নির্জনতা এবং তাঁর ভাবনাচিন্তার দর্শনের এবং তাঁর রচনার যে-নিজস্বতা সেটা নিশ্চিত তাঁর নিজস্ব অর্জন - এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু পরম্পরার বাইরে কোনো মানুষ জন্মায় না। একটা মরুভূমিতে আমরা কি আমগাছ তৈরি করতে পারি? একটা ঠান্ডার দেশে, ধরা যাক কাশ্মিরে গিয়ে কোনো আমগাছ তৈরি করতে পারব? কাজেই দেশ, কাল, মাটির একটা শুশ্রূষা প্রত্যেকের জীবনে লাগে। লালন যে বিশেষভাবে আমাদের দেশেই জন্মেছিলেন, বিশেষভাবে নদিয়া জেলার একটি বিশেষ অংশে জন্মেছিলেন, এর পেছনে অনেকগুলি সমাপতন আছে বলে মনে হয়। তাঁর বিতর্কিত জন্মসালটি হলো ১৭৭৪। বিতর্কিত বলছি এজন্যে যে, তাঁর জন্মসাল সম্বন্ধে আমরা সুনিশ্চিত হতে পারিনি। যদি ধরে নিই ১৭৭৪ না হলেও ’৮০-৮৫-তে আসি, তাহলেও কিন্তু একটা কথা স্পষ্ট হয় যে, তিনি রাজা রামমোহনের সমকালীন। কাজেই আমাদের নাগরিক সংস্কৃতি এবং রেনেসাঁস, আধুনিক রেনেসাঁস যাকে বলি আমরা, সেই আধুনিক রেনেসাঁসের এক প্রাণপুরুষ যদি হন রামমোহন, তাহলে লোকসংস্কৃতির যে-রেনেসাঁস বা নবজাগরণ তার প্রাণপুরুষ হচ্ছেন লালন। কিন্তু দুজনের মধ্যে সংযোগসূত্র আমরা খুঁজে পাই না। আমরা যারা নাগরিক রেনেসাঁসে বিশ্বাস করি তারা একথাও বিশ্বাস করি, ইংরেজের কাছ থেকে এর অনেকটা আমরা পেয়েছি। ইংরেজরা এদেশে এসেছিল বলে তাদের জ্ঞানমার্গ, চিন্তামার্গ এবং বিদেশি চিন্তানায়কদের অনেক চিন্তাভাবনা আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমাদের দেশে ‘রেনেসাঁস ম্যান’ যাঁরা, তাঁরা নবজাগরণের আলো টেনে এনেছিলেন, রামমোহনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিদ্যাসাগরের কথাও বলব। এঁদের যদি তাত্ত্বিক বা জ্ঞানী বলে মনে রাখি তাহলে বিজয়কৃষ্ণ, রামকৃষ্ণের কথা মনে রাখব ভক্তিমার্গের লোক হিসেবে। জীবনের সবচেয়ে বড় যে-সার্থকতা, ভারতীয় দর্শনের যে-সার্বিক বোধ, তাতে জ্ঞান, ভক্তি এবং কর্ম, এই তিনটির প্রধান স্থান আছে। জ্ঞান, ভক্তি এবং কর্মের সমন্বয়ই হচ্ছে ভারতীয় দর্শনের মূলকথা। সেক্ষেত্রে রামমোহনকে যদি বলি জ্ঞানী, বিদ্যাসাগরকে কর্মী, তবে রামকৃষ্ণকে বলব ভক্তিমার্গের পথিক। তবে একদিক থেকে রামকৃষ্ণ এবং বিবেকানন্দকে ধরা উচিত কর্মী হিসেবেও। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ মিলে যদি একটা বৃত্ত ধরা যায় তাহলে এটা বলা যায় যে, এঁরা একটা বিশেষ ভারতীয় চেতনাকে আমাদের মধ্যে জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের মধ্যে দিয়ে এবং জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের সমন্বয় দিয়ে আমাদের সামনে, জাতীয় জীবনের সামনে এমন একটা ফর্ম, এমন একটা আদর্শ তৈরি করে দিয়ে গেছেন যে তার থেকে ভ্রষ্ট হওয়া বেশ কঠিন। আমরা এই ভয়ংকর দুর্যোগের দিনেও এঁদের কথা মনে রাখি, এঁদের কথা ভাবি। এঁদের শতবার্ষিক, দ্বিশতবার্ষিক করার পেছনে একটাই কাজ - আমরা এই মানুষগুলোকে বুঝবার চেষ্টা করি, যেন আমরা এঁদের আদর্শ থেকে স্খলিত না হই। কোনো সি'রজীবনে কোনো ধ্রুব আদর্শের প্রতীক হয়ে আছেন এঁরা। তা যদি হয় তাহলে গ্রামবাংলায় ঘুরলে আমরা দেখব এবং গ্রামীণ জীবনে, লোকায়ত জীবনে আমরা দেখব যে, লালনের মান্যতা ঠিক অতটাই। যেসব বাউল, বৈরাগী, ফকিরের মধ্যে আমরা কাজ করি তাঁরা লালনকে বলেন ‘মহাজন’। তাঁর গান অসামান্য গান এবং তাঁরা বলেন যে, লালনের গান হলো অকাট্য। অকাট্য কথার মানে হচ্ছে লালনের গানের যে-তত্ত্ব সেই তত্ত্ব অন্য কোনো গান দিয়ে কাটানো যায় না - এত কঠিন সেই তত্ত্ব, অকাট্য। গায়ক তাঁর গান গাইলে তারপরে আর গান গাওয়া যায় না। অন্য কোনো গীতিকারই তাঁর ধারেকাছে আসার ক্ষমতা রাখেন না। একটা মানুষের জীবনে যদি দর্শনের এতটা সারাৎসার আমরা পাই, তাহলে বুঝতে হয় যে, ব্যক্তি হিসেবে তিনি খুবই উচ্চমার্গের ছিলেন। তাঁর অনুভূতিলোক, তাঁর কল্পনার জগৎ, তাঁর জীবন-বেদনা, জীবন-আচরণ, জীবন-সত্য সবকিছুই প্রতিটি পদে পদে প্রত্যহের কুশাঙ্কুরের মধ্যে দিয়ে উপলব্যথিত জীবন। তাঁর জীবনের সব কথাই তিনি গানে লিখে গেছেন।
তিনি যে কোনো সমপ্রদায় তৈরি করে গেছেন একথা বলা যায় না - যদিও লালনপন্থী লোক অনেক আছেন। তিনি কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি। তিনি খুব বড় বড় কোনো আপ্তবাক্য আমাদের কাছে রেখে যাননি, তাঁর কোনো বিগ্রহ নেই, আমাদের কাছে তাঁর কোনো মন্দির নেই, কোনো উপাসনাগৃহ নেই। যা আছে তা হলো তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর সমাধিক্ষেত্র। তা প্রথমে ছিল একটা কুঁড়েঘর, তার পরে একটি পাকাবাড়ি, এখন একটা মাজার। পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ) সরকারের অনুগ্রহে একটা মস্ত বড় মসজিদের মতো মাজার তৈরি হয়েছে কুষ্টিয়ার ‘ছেউড়িয়া’তে - সেটা লালনের জীবনের সঙ্গে তেমন মানানসই হয়নি। মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটার পর একটা বাড়ি তৈরি করতেন এবং বাস করতেন - কোনো বাড়িতেই তিনি বেশিদিন থাকতেন না। এইভাবে তৈরি হয় ‘উদয়ন’, ‘উত্তরায়ণ’, ‘পুনশ্চ’, ‘কোনার্ক’ এবং শেষে ‘শ্যামলী’। শান্তিনিকেতনে গেলে দেখা যাবে এখনো সেই বাড়িটা আছে, মাটির তৈরি কুঁড়েঘর - এবং রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আমার শেষ বেলাকার বাড়ির নাম দিয়ে যাব ‘শ্যামলী’ - এ যখন ভেঙে পড়বে/ সে হবে ঘুমিয়ে পড়ার মতো/ মাটির কোলে মিশবে মাটি।’ মানুষ তার জীবনের শেষ চিহ্ন, যে শেষ অভিলাষটাকে রাখতে চায় তা হলো মাটির সঙ্গে মিশে মাটি হয়ে যাওয়া - যেখান থেকে আমাদের জন্ম। তা যদি সত্যি হয় তাহলে লালনের সমাধিটা হওয়া উচিত ছিল মাটির, তার জায়গায় একটা বিশাল ইসলামি স্থাপত্যের মাজার করাটা ঠিক হয়নি। কিন্তু এই যে মাজার করা হয়েছে তার পেছনে আমাদের যে-দুর্ঘট, আমাদের জীবন-চেতনার যে-ভ্রান্তি তা ধরা পড়েছে। আমরা লালনকে মুসলমান বলার চেষ্টা করেছি। পূর্ব পাকিস্তান সরকার চেষ্টা করেছিলেন এটা প্রমাণ করতে যে, তিনি একজন মুসলমান। এটা প্রমাণিত হলে কী ঘটত আমাদের জানা নেই, তিনি মুসলমানও নন, হিন্দুও নন। মৃত্যুর পর তাঁকে দাহ করা হয়নি বা কবর দেওয়া হয়নি, আখড়ার মাটির তলায় শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি একজন মানুষ। তিনি একজন স্রষ্টা, তিনি একজন শিল্পী এবং তাঁর গান আমাদের মনের মধ্যে একটা আন্দোলন তৈরি করে দেয়। সেই গানের দ্বারা আমরা এত তাড়িত বোধ করি যে, আমাদের নাগরিক মন কিছুতেই তার থেকে সরাতে পারি না। আমরা অনবরতই রেডিওতে, টিভিতে লোকসংগীত শুনি। সিনথেটিক গান অনেক বেরিয়েছে; কিন' যখন একটা মানুষ সত্যিকারের গান গেয়ে ওঠে, তখন আমাদের মনের ভেতরে গিয়ে ধাক্কা দেয় এজন্য যে, আমাদের প্রত্যেকেরই নাগরিক মনের পেছনে প্রচ্ছন্ন রয়েছে এক গ্রামীণ মন। এবং আমাদের উচ্চসংস্কৃতির ভিতর ভিতর বয়ে চলেছে লোকসংস্কৃতির অন্তশীল প্রবাহ। লালন ফকির মানুষটি সম্পর্কে খুব বেশি জীবনতথ্য নেই - তাঁর জীবন সম্পর্কে যা আছে তা হলো জনশ্রুতি বা মিথ, কতগুলো বানিয়ে বলা গল্প। আমাদের দেশে কোনো বিখ্যাত লোককে বিখ্যাত করতে গেলে, বিশেষ করে যাঁরা ধর্মের পথে আছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ধর্মের বিভূতিকে বড় করে দেখানো হয়। মানুষটির ধর্মবোধ বা উপলব্ধির থেকেও বড় করে দেখানো হয় মানুষটির ‘অলৌকিকত্ব’ কতটা ছিল; যেমন ঘোষপাড়ার কর্তাভজা সমপ্রদায়ের স্রষ্টা আউলচাঁদ, তাঁর সম্পর্কে ঘোষপাড়ার সতীমার মেলাতে যাঁরা যান তাঁরা শুনবেন এমন একটা গল্প যে - আউলচাঁদ ত্রিবেণীর দিক থেকে গঙ্গার ধারে এসে দাঁড়ালেন তিনি ঘোষপাড়ায় যাবেন, সামনে গঙ্গা কী করে পার হবেন? তা ভক্তশিষ্যরা বলেছেন যে, খেয়ানৌকা নেই তাও গঙ্গা পার হতে হবে - তা তিনি করলেন কী, হাতে যে-কমণ্ডলু ছিল, তিনি কমণ্ডলুর মধ্যে গঙ্গাকে নিয়ে পার হয়ে চলে গেলেন। এই গল্পটা শুনলে অনেক লোক খুবই উদ্বেলিত বোধ করেন। তবে আমরা করি না, কারণ মিথ সত্যকে প্রায়ই প্রচ্ছন্ন করে দেয়। লালন ফকির হিন্দুর ঘরে জন্মেছিলেন, তাঁর বসন- হয়েছিল, তাঁকে পরিত্যাগ করে লোকে চলে এসেছিল, তিনি ভেসে ভেসে চলে এসেছিলেন, তাঁকে পালন করেছিলেন এক মুসলমান পরিবার, তারপর তিনি তাঁর হিন্দুবাড়িতে ফিরে গেলে তাঁকে আশ্রয় দেওয়া হয়নি - তিনি তখন রাগে-ক্ষোভে ‘ফকির’ হয়ে গিয়েছিলেন, এটা হচ্ছে একটা মিথ। এর কোনো ভিত্তি নেই, কারণ লালন ফকিরের জন্মস্থান সম্পর্কে কোনো সুনিশ্চিত তথ্য আমাদের হাতে আসেনি - তাঁর জন্মভিটা আমরা দেখতে পাইনি। সমাজবিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে আমরা যেভাবে গবেষণা করি তাতে একটা মানুষকে তাঁর বাস', তাঁর প্রতিবেশী, তাঁর দলিল, তাঁর জমির দাগ নং এসব দিয়ে তাঁকে নির্ণয় করা যায়। আমাদের দেশে লৌকিক ধর্মের যে-সমস্ত সাধক জন্মেছেন দু-আড়াইশো বছর আগে, তাঁদের প্রত্যেকেরই বাস'গত পরিচিতি আমাদের হাতে আছে। আমরা ঘোষপাড়ায় গেলে রামশরণ পাল, দুলালচাঁদের অস্তিত্ব পাই - তাঁরা আছেন, তাঁদের জমি আছে, তাঁদের দলিল আছে। আমরা বৃত্তিহুদা গ্রামে গেলে সাহেবধনী সমপ্রদায়ের কুবির গোঁসাই ও চরণ পালের ভিটে এখনো দেখতে পাই। মেহেরপুরে গেলে বলরাম হাড়ির সমস্ত জিনিস আমরা দেখতে পাই - এমনকি তাঁর ব্যবহৃত জিনিসগুলোও আছে। লালন ফকিরের ক্ষেত্রে আছে শুধু একটি সমাধি, তাঁর ব্যবহৃত দু-একটি জিনিস, মৃত্যুকালের - তাঁর জীবিতকালের খুব কম চিহ্নই আছে। কিন্তু একটা বড় জিনিস রয়ে গেছে - সেটা হচ্ছে গান। গানের পরম্পরা। সেই গান ভালোবেসে মানুষ তার গলার মধ্যে নিয়ে নিয়েছে, স্মৃতিতে জাগিয়ে রেখেছে। সেই গান দুশো বছরের ওপরে আমরা গাইছি। সেই পরম্পরাটা খুব সত্য। লালনকে যদি আমাদের ভালো বলতে হয় তবে সেই পরম্পরার জন্যেই তাঁকে ভালোবাসতে হবে। লালনের কী আছে? এ-কথা যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে তাহলে বলব, প্রবলভাবে আছে তাঁর গান। কিন্তু নেই তাঁর সুর, কারণ যে-সময়ে লালন গান গাইতেন সেই সময়ে আমাদের স্বরলিপির পদ্ধতি উদ্ভাবন হয়নি, ফলে তাঁর গানের যে-ধাঁচ, গানের যে-নিজস্ব কৌশল, সুরগত যে-বিন্যাস তা আমরা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারি না লালনের সুর বলে। কিন্তু ১৩০৫ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ প্রায় একশ বছর আগে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীকে দিয়ে লালনের দুটি গানের স্বরলিপি করিয়েছিলেন। বীণাবাদিনী পত্রিকায় সেই স্বরলিপি দুটো আমরা পাই। সেই পত্রিকা থেকে স্বরলিপি দুটো পেয়ে যদি আমরা লালনের গানের সুরের ধাঁচটা অনুধাবন করতে পারি অন্তত তাহলে একশ বছর আগেকার সুরটা পাওয়া গেল। তার থেকে লালনের গানের ধাঁচ একটা হয়তো পাওয়া গেল; কিন' বৈচিত্র্যটা আমরা পাই না। তাঁর গানের নিশ্চয় আরো অনেকরকম বৈচিত্র্য ছিল সুরের - আমাদের কাছে এখন আর তা এসে পৌঁছায় না। যে-জিনিসটা সুরবাহিত হয়ে আসেনি আমাদের কাছে, সে-জিনিসটা ভাববাহিত হয়ে এসেছে। আমরা লালনের গানকে বাণীর মধ্যে দিয়ে পেয়েছি - সুরের মধ্যে দিয়ে পাইনি - সেটা আমাদের দুর্ভাগ্য। যদি পেতাম তাহলে লালনের গান নিয়ে এত পণ্ডিতি আলোচনা না-করে গানগুলোই গাইতাম, সেই গানে আমরা সমৃদ্ধ হতাম। আমরা নিজেও গাইতাম - গাইতে গাইতে তার থেকে একটা নতুন পরম্পরা সৃষ্টি হয়ে একটা সমপ্রদায় তৈরি হতো - লালনের গান গাইতে পারা যেত রবীন্দ্রনাথের গান গাইবার মতো করেই।
লালনের কথা বলতে গিয়ে এত কথা এটা বোঝাতে যে, মানুষটা ভুঁইফোঁড় ছিলেন না, হঠাৎ এদেশে জন্মাননি। কোনো লোকায়ত সাধক হঠাৎ জন্মান না কোনো দেশে। সবকিছুরই একটা পুরনো ঐতিহ্য বা ইতিহাস থাকে। আমাদের দেশের ইতিহাস ভালো করে পড়লে দেখা যাবে যে, রাজা-রাজড়াদের ইতিহাসই ইংরেজরা লিখে গেছে, সম্রাটদের কথা, নবাবদের কথা লিখে গেছে, যুদ্ধের কথা লিখে গেছে - কিন্তু সাধারণ মানুষের কথা লিখে যায়নি তারা। আজকে আমরা চেষ্টা করছি সাধারণ মানুষের ইতিহাস লিখতে। সে-চেষ্টা করতে গিয়ে প্রচুর বাধা পাচ্ছি, উপাদানের অভাব আছে - অনুমান দিয়ে ভরাতে হচ্ছে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে সমস্ত ভারতবর্ষে এক ভক্তি-আন্দোলন হয়েছিল। ভক্তি-আন্দোলনের মূল কথাটা ছিল এই যে, জ্ঞানকে শাস্ত্রের মধ্যে থেকে সরিয়ে এনে মানুষের মধ্যে মুক্ত করে দিতে হবে। ‘চন্দ্রচূড় জটাজালে আছিলা যেমতি জাহ্নবী’ যেমন মাইকেল বলেছিলেন - মহাদেবের জটাজালে যেভাবে জাহ্নবী আটকে ছিলেন - তাকে যেভাবে কাশীরাম দাস আমাদের মহাভারত লিখে দিয়েছেন, কৃত্তিবাস যেভাবে রামায়ণ লিখে দিয়েছেন, সংস্কৃতের মধ্যে যেটা আবদ্ধ ছিল, ধূপের ধোঁয়া এবং দীপের আলো দিয়ে যাকে প্রচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছিল, সেই শাস্ত্রবাণীকে মানুষের মনের কাছে এনে দেওয়ার যে-প্রয়াস তারই নাম ভক্তি-আন্দোলন। এই ভক্তি-আন্দোলন হয়েছিল পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে, করেছিলেন যাঁরা তাঁরা হচ্ছেন তুলসীদাস, কবীর, নানক, রজ্জব, দাদু, নামদেব, শঙ্করদেব, আমাদের শ্রীচৈতন্য, কৃত্তিবাস, কাশীরাম দাস প্রমুখ। সমস্ত দেশ, পূর্বভারত থেকে মধ্যভারত পর্যন্ত এবং দক্ষিণ ভারত তো বটেই (কারণ ভক্তি-আন্দোলনের মূল সূচনা হচ্ছে দক্ষিণ ভারত) - এই দক্ষিণ ভারত থেকে মধ্যভারত সমস্ত পূর্বাঞ্চল মিলিয়ে আমাদের সমগ্র ভারতবর্ষের একটা অংশ যে ভক্তি-আন্দোলনে জেগে উঠেছিল তার কারণ একটাই - মানুষের কাছে মুক্তির বার্তা পৌঁছে দিতে হবে, মানুষের কাছে ধর্মের সত্যকে পৌঁছে দিতে হবে তার নিজস্ব ভাষায়। সংস্কৃতে নয় - হিন্দিতে, খড়িবলিতে, অসমিয়াতে, বাংলায়, বিশুদ্ধ বাংলায়। শাস্ত্রকে মানুষের কাছে এভাবে লোকগম্য করে দেওয়া, এরই নাম ভক্তি-আন্দোলন। সমুদ্র বহে যায়, নদী বহে যায়, সেই বহতা নদীর একটু জল আমাদের দেখতে ইচ্ছে করে - আমরা পুরীতে গিয়ে সমুদ্র দেখে আসি - কিন্তু সবাই তো যেতে পারে না। আমাদের গঙ্গা নদী দেখার খুব ইচ্ছে, কিন্তু সবাই তো গঙ্গার ধারে থাকে না। পূর্ববঙ্গের মানুষ যখন নবদ্বীপে আসতেন - আগেকার দিনে অখণ্ড বাংলায় এসে বলতেন, ‘গৌর গঙ্গার দেশ’ - অর্থাৎ নবদ্বীপ শুধু গৌরাঙ্গের দেশ নয়, গঙ্গারও দেশ। এই গৌর আর গঙ্গাকে এক করে ফেলার যে-চেতনা, সেটাই নদীমাতৃক আমাদের সংস্কৃতি। আমরা সমুদ্রকে স্পর্শ করতে চাই, নদীকে স্পর্শ করতে চাই; কিন্তু সেখানে সমুদ্র নেই, নদী নেই, যাঁরা সেখানে যেতে পারেন না, তাঁরা কী করবেন? তাঁদের জন্য আছে বিল, বাঁওড়, দিঘি, পুকুর, - ছোট ছোট আয়োজন - সবই তো জল - জলের মধ্যে দিয়েই সেই মহাজলকে বোঝার একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। লোকধর্ম হচ্ছে আসলে সেটাই - সমুদ্রও নয়, নদীও নয়, কিন্তু সমুদ্র ও নদীর স্মারক এবং প্রতীক। অভিজাতধর্মের যেটা লক্ষণ, যদি একজন হিন্দু বিপন্ন হয়ে পড়ে, হিন্দুধর্ম তার পেছনে দাঁড়াবে। মুসলিম যদি একজন বিপন্ন হয়ে পড়ে ইসলাম তার পেছনে আছে। একজন খ্রিষ্টানের পেছনে পুরো খ্রিষ্টধর্ম আছে। একজন মুসলমানের পেছনে পুরো মুসলিম বিশ্ব আছে। একজন হিন্দুর পেছনে একটা বিশ্ব আছে। কিন্তু যারা তার মধ্যে স্থান পায়নি, লোকায়ত মানুষ যারা, যাদের আমরা অন্তযজ বলি, ব্রাত্য বলি, তারা কোন ধর্মের মধ্যে আছেন, যাদের আমরা এতদিন অস্পৃশ্য বলে সরিয়ে রেখেছি - যাদের দিয়ে শুধুমাত্র কিছু কায়িক পরিশ্রম করানো হয়? ব্রাহ্মণের সঙ্গে শূদ্রের পার্থক্য কী? একজন মেথর বা মুচি, অথবা মুদ্দফরাস, একজন পালকি-বেহারা, একজন চাষি এরকম করতে করতে আমরা যদি দেখি, দেখব যে তারা প্রত্যেকে কায়িক শ্রম করে আর উচ্চবর্গের মানুষ কোনো কায়িক শ্রম করে না। উচ্চবর্গের মানুষের মূল ছকটাই হচ্ছে যে, কায়িক শ্রম যারা করে তারা বেঁচে থাকে অস্পৃশ্য হয়ে। তারা থাক, আমিও থাকব, তাদের দিয়ে কাজ করাব; কিন্তু তাদের ছায়া যেন আমাদের গায়ে না পড়ে। এই যে অভিজাতজীবন এবং নিম্নবর্গের জীবন আমাদের দেশে বহুদিন চলেছে, ইংরেজরা এর পোষকতা করে গেছে দীর্ঘদিন। তারা উরারফব ধহফ ৎঁষব-এ বিশ্বাস করত, তাই নিম্নবর্গ এবং উচ্চবর্গকে তারা বাঁচিয়ে রেখেছিল তাদের নিজেদের শাসনব্যবস্থার স্বার্থে। লক্ষ করে দেখা যায় যে, নিম্নবর্গ হচ্ছে তারাই যারা শারীরিক শ্রম করে, আর উচ্চবর্গ হচ্ছে তারাই যাদের সঙ্গে শারীরিক শ্রমের কোনো সম্পর্ক নেই - তারা শুধু বুদ্ধির কাজটাই করে, বিদ্যার কাজটাই করে। বিদ্যা আর বুদ্ধি যারা একবার আয়ত্ত করেছে তারা তো কায়িক-মানুষের হাতে সেটা দেবে না - সেজন্য শ্রমজীবী মানুষের কাছে বুদ্ধিজীবী মানুষ কক্ষনো কিছু দেয়নি। এখন দেওয়া হচ্ছে, বলা হচ্ছে ‘তোমরা ওঠো, জাগো, শিক্ষিত হও, তোমরা বুঝে নাও তোমাদের দায়িত্ব, শ্রেণিবোধ জেগে উঠুক তোমাদের মধ্যে’ - তবু তার মধ্যে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। কিন' উচ্চবর্গের সঙ্গে নিম্নবর্গের ফারাক অর্থনৈতিক ততটা নয় যতটা শ্রেণিগত ফারাক ‘আমি উঁচু ক্লাস - তুমি নিচু ক্লাস’ এই বোধ। এই বোধটাই হচ্ছে বিপন্নতার বোধ। লালন ফকির জন্মেছিলেন কোথায় আমরা জানি না; কিন্তু সবার পিছে, সবার নিচে, সবহারাদের মাঝে - যেথায় থাকে সবার অধম, দীনের থেকে দীন - সেখানে তিনি বাসাটা বেঁধেছিলেন। ছেউড়িয়াতে তাঁর চারপাশে যে-মানুষগুলো ছিল, তারা কারিগর, সমপ্রদায়ের, তাঁত বুনত, জাতে জোলা - নিম্নবর্গের মানুষ, অন্তযজ। লালন সেখানে গিয়েই যে তাঁর আস্তানা পেতেছিলেন। তাতে বোঝা যায় যে, লালনের সাধনা ছিল নিম্নবর্গের সাধনা। নিম্নবর্গের কাছে সমুদ্রের বার্তা আনতে চেয়েছিলেন তিনি, গঙ্গার খবর আনতে চেয়েছিলেন। মানুষ যখন নিজেই ধর্ম তৈরি করে তাকেই বলে লোকধর্ম - এবং এই লোকধর্মের গল্প অনেক আছে। অনেকগুলো গল্প বলে লাভ নেই। একটা বলি : বাংলাদেশের মেহেরপুরে বলরাম হাজরা বলে একটা লোক ছিল। ভালো তীরন্দাজ, জাতে হাড়ি, অন্তযজ অস্পৃশ্য। মেহেরপুরের জমিদার মল্লিকবাড়িতে সে ছিল দারোয়ান। সেই বাড়িতে কৃষ্ণের বিগ্রহ ছিল এবং তার গায়ে অনেক অলংকার ছিল। একদিন সেই অলংকার চুরি হয়ে গেল। সন্দেহ গিয়ে পড়ল বলরামের ওপর - বলরামই চুরি করেছে। বলরামকে একটি গাছে বেঁধে প্রহার করা হলো। লজ্জায়-ঘৃণায় সে গ্রাম ত্যাগ করে চলে গেল। দীর্ঘদিন বাদে বলরাম যখন ফিরল তখন তার লম্বা দাড়ি-গোঁফ জন্মেছে - সে তখন একটা অন্য মানুষ। ফিরে এসে গ্রামের মধ্যে সে একটা সমপ্রদায় তৈরি করল - এই সমপ্রদায়ের নাম হচ্ছে ‘বলাহাড়ি সমপ্রদায়’। সেই সমপ্রদায়ের প্রথম নিয়ম ছিল - তাতে কোনো উচ্চবর্ণের মানুষ থাকবে না। কোনো দেবতা থাকবে না, কাউকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা হবে না। কোনো শাস্ত্র নেই, কোনো মন্ত্র নেই, কোনো দীক্ষা নেই, এই বলরাম হাড়ির বিশ হাজার শিষ্য হয়েছিল। যারা শিষ্য হয়েছিল তাদের বংশ এখনো আছে নদিয়ার মেহেরপুরে, তেহট্ট থানার নিশ্চিন্দিপুরে। আমি তাদের কাছে গেছি। অন্তযজ মানুষ তারা, আমাদের কোনো দেবতাকে পুজো করে না। তারা কোনো ব্রাহ্মণকে মানে না - বলাহাড়িকে মানে। তারা জানে, বলরামই হচ্ছে তাদের দেবতা এবং বলরামকে এমনই তারা মানে যে, একবার এক জমিদারের বাড়ির সামনে দিয়ে বলাহাড়ির একজন প্রজা যাচ্ছিল; জমিদারের নায়েব জমিদারকে বলল যে, ‘বলার চেলা যাচ্ছে’। ‘বলাহাড়ির চেলা, এ কিন্তু আপনাকে প্রণাম করবে না, আপনি জমিদার হলেও নয়।’ জমিদার বলল যে, ‘আমাকে প্রণাম করো।’ সে বলল, ‘আমি তো বলরামকে প্রণাম করি, তোমাকে আর করতে পারব না।’ জমিদার বলল, ‘তোমাকে প্রণাম করতেই হবে।’ প্রজা বলল, ‘করবো না।’ তখন তাকে প্রহার করা হলো। প্রহার করতে করতে এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেল যখন আর প্রহার করা যায় না - ছেড়ে দেওয়া হলো। সে তখন এসে বলরামকে বলল, ‘দেখুন, আমি ইচ্ছে করলে ওই জমিদারের মুন্ডুটা কেটে আপনার কাছে আনতে পারতাম, কিন্তু আমি আনিনি আপনার কথা ভেবে। আমাকে এইভাবে মারা হয়েছে এর কি কোনো প্রতিকার নেই?’ উত্তরে বলরাম বলেছিলেন, অসাধারণ উত্তর, ‘আজকে বাঘ যদি তোমাকে জঙ্গলে কামড়াত তাহলে তুমি কি আমাকে এসে প্রতিবাদ করতে? অভিযোগ করতে?’ এই যে বাঘের সঙ্গে জমিদারের তুলনা এর থেকে নিম্নবর্গের দৃষ্টির দিকটা বোঝা যায়। বাঘ যেমন জঙ্গলে থাকে এবং হিংস্র আমরা সবাই জানি, জমিদার তেমনি হিংস্র, সে কামড়ে দেয় - তার আবার প্রতিকার কী? প্রতিকার নেই। প্রতিকার হচ্ছে লাঠি, দল তৈরি করা, সংগঠন করা। বলরাম সেই সংগঠনটা করেছিলেন। আমরা তাকে লোকধর্ম বলছি। লোকধর্ম কী? লোকধর্ম হচ্ছে মানুষের একটা আশ্রয়, বাঁচার একটা প্রতীক, হিন্দু যাকে স্থান দেয়নি, মুসলমান যাকে স্থান দেয়নি, খ্রিষ্টান যাকে স্খান দেয়নি, সে বাঁচবে কী নিয়ে? সে ‘মানুষ’ নিয়ে বাঁচবে এবং সেই বাঁচার নামই হচ্ছে লোকধর্মের জন্য বাঁচা, লোকায়ত জীবন। লালন হচ্ছেন সেই লোকায়ত জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। কিন্তু তিনি একক নন এই জীবনে। ভুঁইফোঁড় নন এইজন্য যে, তাঁর আশপাশের সমকালের অনেকগুলো মানুষের নাম, অনেকগুলো ধর্ম-সমপ্রদায়ের নাম আমরা দেখতে পাই। মধ্যযুগে যারা সন--সাধক ছিলেন আমাদের দেশে, দেখুন লক্ষ করে, ভক্ত কবীর ছিলেন জাতে জোলা, রুইদাস ছিলেন চর্মকার, শুক্লহংস ছিলেন জাতে রজক (ধোপা), দাদু ছিলেন ধুনকর মানে তিনি তুলা ধুনতেন, রজ্জব ছিলেন কলাল মানে মদ্য-বিক্রেতা, নামদেব ছিলেন ছিপি অর্থাৎ কাপড়ে রং লাগাতেন। এই মানুষগুলিই ছিলেন আমাদের মস্ত সাধক। এঁদের গান আমরা গাই, এঁদের গানের মধ্যে আমরা প্রথম মানবিক মহিমা পাই পঞ্চদশ শতাব্দীতে। লক্ষ করে দেখুন, লালন ফকির থাকতেন জোলাদের মধ্যে, তাঁতিদের মধ্যে, গগন ছিলেন ডাক হরকরা, লালনের গুরু সিরাজ সাঁই ছিলেন পালকিবাহক, পাগলা কানাই ধুয়োজারি করে গান করে বেড়াতেন।
এই মানুষগুলো কিন্তু কায়াবাদী মানুষ, অন্তযজ মানুষ, কাজের মানুষ - কেউ ভাবের মানুষ নন। মাটিতে এঁদের পা দুটি প্রোথিত থাকত, জীবনে স্বপ্ন থাকত ওপরের দিকে - এই জীবনকে তাঁরা ভোগ করে গেছেন, জীবনের বিচিত্র ওঠাপড়া দ্বন্দ্বে-ছন্দে থাকা ইতিহাস তাঁরা ভোগ করেছেন। পাগলা কানাই মারা গেলে এক মুসলমান মৌলভিকে ডাকা হয়েছিল তাঁকে কবর দেওয়া ও জানাজা নামাজ পড়বার জন্য। উনি তা অস্বীকার করেছিলেন কারণ পাগলা কানাই সেই অর্থে মুসলমান ছিলেন না, উনি নাকি ভ্রষ্ট, উনি ফকির! মৌলভি আসেননি কিন' অনেক মানুষ এসেছিলেন। পাগলা কানাইয়ের গান ভালোবাসতেন সকলে, যশোর, নদিয়া, পাবনা সমস্ত জায়গা পাগলা কানাইয়ের নামে মুখরিত ছিল সেকালে। লালন ফকিরের তুল্যমূল্য বিখ্যাত গীতিকার ছিলেন পাগলা কানাই। তাঁর গান সংগৃহীত হয়েছে - কিন্তু তা আর গাওয়া হয় না; কারণ গাইবে কে? গায়ক-সমপ্রদায় তৈরি হয়নি। পাগলা কানাইয়ের গান আর গাওয়া যায় না তেমন করে। তাহলে লোকধর্ম তাঁদেরই আশ্রয় করে এগিয়ে যাচ্ছে, যাঁরা দেবতার মূর্তি তৈরি করেননি, মন্দির তৈরি করেননি, মসজিদ তৈরি করেননি, শাস্ত্র তৈরি করেননি; কিন্তু যাঁরা গান তৈরি করেছেন। কবীরেরও গান আছে, দাদুরও গান আছে, রজ্জবের গান আছে, তুলসীদাসের গান আছে, আমাদের চণ্ডীদাসের গান আছে, বিদ্যাপতির গান আছে, রামপ্রসাদের গান আছে, আমাদের লালন ফকিরের গান আছে, কর্তাভজার গান আছে, লালশশীর গান, পাগলা কানাইয়ের গান আছে, সাহেবধনীদের, কুবির গোঁসাইয়ের গান আছে, যাদুবিন্দু গোঁসাইয়ের গান আছে - গানের পরম্পরায় আমাদের দেশ ভরতি - গানের মধ্যে সমুদ্রের স্বাদ আছে। সমুদ্র তাঁরা কেউ দেখেননি জীবনে; বিল, বাঁওড়, পুকুরের মতন তাঁদের জীবন, ছোট ছোট ডোবার মতন তাঁদের জীবন সংকীর্ণ, সংক্ষিপ্ত, দেশ-কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ কতকগুলো মানুষ - তবু জীবনের সত্যের প্রতিফলন, সূর্যের সমস্ত প্রতিফলন তার মধ্যে ধরেছিল। রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা আছে -
‘হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কেবা।’
সূর্য সম্বন্ধে কবিতা। সূর্য - ওই গগন ছাড়া তোমাকে কে ধরবে?
‘হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কেবা।
ওগো তপন তোমার স্বপন দেখিয়ে করিতে পারিনে সেবা॥’
শিশির কহিল কাঁদিয়া
‘তোমারে রাখি যে বাঁধিয়া,
হে রবি আমার নাহি তো এমন বল।
তোমা বিনা তাই ক্ষুদ্র জীবন কেবলই অশ্রুজল।’
হে সূর্য তুমি এত বড় তোমাকে ধারণ করতে পারি না, শুধু গগনই তোমাকে ধারণ করতে পারে। এবার সূর্য তার উত্তরে বলছে -
‘আমি বিপুল কিরণে ভুবন করি যে আলো
তবু শিশিরটুকুরে ধরা দিতে পারি
বাসিতে পারি যে ভালো।’
সূর্যের মহত্ত্ব হচ্ছে এখানেই। বিপুল কিরণে পৃথিবীকে তিনি আলোকিত করে দেন, কিন্তু শিশিরবিন্দুর মধ্যেও তার একটা প্রতিফলন গিয়ে পড়ে। একটা ছোট্ট শিশিরবিন্দুর মধ্যে সূর্যকে আমরা পুরো দেখতে পাই। আমাদের লোকায়ত ধর্ম হচ্ছে শিশিরবিন্দুর মতো যা সূর্যসমুজ্জ্বল, তার মধ্যে যে-সত্য আছে তা আমাদের অভিজাত জীবনের সত্যের চেয়ে কিছুমাত্র কম নয় এবং এই সত্যের কারণ হচ্ছে তাঁদের জীবনের যাপনগত সত্য। তাঁরা কেউ ধর্মব্যবসা করবার জন্য এই পৃথিবীতে আসেননি। তাঁরা এসেছিলেন ত্রাণের জন্য। আমাদের ত্রাণের জন্য নয়। নামদেব, রজ্জব, দাদু, কবীর, নানক - কেউ কিন্তু অভিজাত মানুষের জন্য আসেননি। সবার অধম দীনের হতে দীন যাঁরা, তাঁদের জন্য এসেছিলেন। লালন ফকির আমাদের দেশের সেরকম একজন মানুষ, যিনি সাধারণ মানুষের কাছে জীবনের সত্যকে দিতে এসেছিলেন। এই দেবার প্রয়োজনটা কী ছিল সেটাই এবার বলা যাক। আমাদের ধর্মে এবং দর্শনে দুটো পরিষ্কার রাস্তা আছে। একটা রাস্তাকে বলা হয় অনুমানের পথ আর একটা বর্তমানের পথ। অনুমানের পথ কী রকম? না ব্রজ বলে একটা জায়গা ছিল, বৃন্দাবন বলে একটা জায়গা ছিল, কৃষ্ণ বলে একজন ছিলেন, রাধা বলে একজন ছিলেন। তাঁদের একটা লীলা হয়েছিল। কৃষ্ণ, রাধা, ললিতা, বিশাখা, চন্দ্রাবলী আরো অনেক পৌরাণিক চরিত্র। গোলোক, বৃন্দাবন কিছুই তো আমরা দেখিনি, সবই তো অনুমান। মুক্তি দেখিয়ে বলা হচ্ছে - এইটা মুক্তি, এর মধ্যেই ঈশ্বর আছেন - এটা তো অনুমান। মন্দিরে আছেন হিন্দুর দেবতা, মসজিদে আছেন আল্লাহ্‌ - এগুলো সবই অনুমান। যাঁরা কায়াসাধনা করেন এবং যাঁরা লোকধর্মের মানুষ - লোকায়ত মানুষ তাঁরা অনুমানে বিশ্বাস করেন না, ‘শুনতে নাই আন্দাজি কথা, বর্তমানে হেরো হেথা’ - এই হচ্ছে তাঁদের জীবনের থিসিস। ‘যাহা দেখিনি নয়নে, তাহা ভজিব কেমনে?’ - আর একটা থিসিস। ‘চোখে যা দেখিনি তা কী করে ভজনা করবো?’ একজন ফকিরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন তা মুসলমান ধর্ম ছেড়ে ফকির হলেন কেন?’ বললেন, ‘আমি মসজিদে যাই, নামাজ পড়ি; কিন্তু ওই আন্দাজি ধর্মে বিশ্বাস হলো না।’ ‘আন্দাজি ধর্মে বিশ্বাস হলো না’ কথাটা আমার খুব কানে লেগেছিল। ‘আন্দাজি ধর্মে যখন বিশ্বাস নেই তখন ভজব কেমনে? দেখছি মানুষ তাই ভজনা করি।’ সুতরাং লোকায়ত ধর্ম বাস্তব মন্দিরের চেয়ে দেহমন্দিরকে প্রাধান্য দেয়। নিজের দেহকে। দেবতার চেয়ে মানুষকে বড় মনে করে এবং পরলোকের চেয়ে ইহলোককে বড় মনে করে। যে-কোনো অভিজাতধর্মের পথ খুঁজলে দেখা যাবে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান ধর্মের পুস্তক পড়লে দেখা যাবে যে, আমাদের মৃত্যুর পর কী হবে তা অনেকটা চিন্তা করার আছে। হয় জন্মান্তর হবে বা কেয়ামত হবে, একটা কিছু হবে এবং এই জীবনের যা প্রতিফল তা নাকি পরের জন্মেও হতে পারে। ভালো করলে ভালো, খারাপ করলে খারাপ - এসব বিশ্বাস নিয়ে আমরা বাঁচি। লোকধর্ম এটা বিশ্বাস করে না, বলে বর্তমানই হলো আসল ধর্ম। এই বর্তমানই তুমি দেখ। এই বর্তমানেই তুমি ধর্ম পালন করো। কোনো লোকধর্ম জন্মান্তরে বিশ্বাস করে না। লোকধর্ম এও বিশ্বাস করে না যে, অনেক জন্ম পেরিয়ে মনুষ্যজন্ম পেয়েছি। এটাই তারা শ্রেষ্ঠ জন্ম বলে মনে করে - এরপরে আর কিছু নেই। মানুষের যা মনে নেই, পৃথিবীতে তা নেই। ‘যাহা নাই ভাণ্ডে, তাহা নাই ব্রহ্মাণ্ডে’ - আমার এই দেহভাণ্ডে যা নেই, ব্রহ্মাণ্ডে তা নেই। সুতরাং যত কল্পনা সব বাজে, সব বাতিল এবং সবই হচ্ছে অনুমান। বর্তমান হচ্ছে আমি, আমার দেহ। আমার দেহ কোনো শুদ্ধ দেহ নয়, বৈরাগ্যময় দেহ নয়। আমার এই দেহ হচ্ছে সকর্মক দেহ - যা কামনার বশীভূত, তা দেহধর্ম পালন করতে চায়, যা মিলতে চায় এবং রজোবীজের মিশ্রণ সেখানে হবেই, পুরুষ আর নারীর সম্মেলন সেখানে হবেই। এবার সেই সম্মেলনকে নিয়ন্ত্রণ করার যে-সাধনা তারই নাম লোকায়ত সাধনা। এই সাধনা সমুদ্রের মধ্য দিয়ে নৌকা নিয়ে যাবার মতো কঠিন, পুরুষ আর নারীর যৌনজীবন যেন জলের মধ্যে মাছ ধরার মতো কঠিন। কাম-কুমির এসে কামড়ে দিতে পারে যে-কোনো সময়ে, সেই কাম-কুমিরের হাত থেকে বাঁচার জন্য গুরু ধরতে হবে। গুরু লোকটা কে? মারফতিধর্মে তাকেই বলা হয়েছে মুরশিদ - আমরা যাকে গুরু বলি। কিন্তু গুরু বলে যাঁকে ধরি, কিছুদূর পর্যন্ত তিনি আমাদের অগ্রসর করে দিতে পারেন। আমরা যখন মহাবিদ্যালয়ে পড়ি তখন সেখানকার মাস্টারমশাই এক-দুই পর্যন্ত এগিয়ে দেন - বিশ্ববিদ্যালয় আরো - এইবার আমাদের বলে দেন তোমাদের বিদ্যার শেষ এবার কিন্তু তোমরা স্বাধীন। এবার আমরা হঠাৎ বিশ্বসংসারে দেখি মাস্টারমশাইরা তো অনেকদূর এগিয়ে দিয়েছেন এবার তা প্রয়োগ হবে আমাদের জীবনে। কাজেই শুরু হচ্ছে সেই পর্যন্ত যে-পর্যন্ত মানুষের অনুশীলনের সময়, তারপরে আত্মজগৎ। সেখানে সেই শুরুকে চেনাই কিন্তু আসল বোঝা এবং সেই গুরুর নামে শরীরের মধ্যে যে-শ্বাসক্রিয়া যে-শ্বাস আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, শ্বাসই শুরু, এই শ্বাসকে বুঝতে পারাই গুরুকে বুঝতে পারা। আমরা যদি এই শ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তাহলে আমাদের যৌবন এবং যৌনজীবন নিয়ন্ত্রিত হবে। শ্বাসকে যে বশ করতে পেরেছে সে-ই হচ্ছে সাধক। কায়াসাধনার মূল কথা হচ্ছে শ্বাসের সাধনা। আমি অনেক সুফিসাধক দেখেছি। একজন সুফিসাধকের সভায় গিয়েছিলাম - তিনি এসে আসরে বসলেন, দুপাশে এবং পেছনে তাকিয়া - সারারাত তাঁর সামনে কাওয়ালি হচ্ছে আমরাও শুনছি গোটা পঞ্চাশজন। ওপর থেকে যদি সি'রচিত্র তুলে রাখা যেত তাহলে দেখা যেত, আমরা সারারাত শরীরের কত ভঙ্গি করছি, চা খেতে যাচ্ছি। কখনো মনে হচ্ছে শুয়ে পড়ি আর পারছি না; কিন্তু সেই সাধক একভাবে টানা সারারাত বসে থাকলেন। একবারের জন্যেও হেলান অবধি দিলেন না। পরদিন সকাল ৮টা নাগাদ উঠে ঠাকুরঘরে গেলেন। যে-বাড়িতে তিনি উঠেছিলেন তাঁদের জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তিনি ঠাকুরঘরে তো গেলেন! আচ্ছা! তিনি কোথা থেকে এসে বসেছিলেন।’ ওঁরা জানালেন, উনি তার আগের দিন দুপুর দুটোয় ঠাকুরঘরে গিয়েছিলেন - ঠাকুরঘর থেকে সভায় এসেছিলেন রাত ৮টা - সভা থেকে উঠে সকালে আবার ঠাকুরঘরে গেলেন সকাল ৮টায় এবং সেখান থেকে বেরোলেন দুপুর দুটোয়। এই মানুষটা কিন' ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং প্রাকৃতিক প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন। কেমন করে গেলেন? কী সেই প্রক্রিয়া? - তারই নাম কায়াসাধনা। হঠাৎ যদি আমাদের জীবনে কোনো লোকের সংবাদ আসে, কোনো আপনজন বা কেউ মারা গেছেন এমন সংবাদ পাই, আমরা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে চলে যাই। পরপর সেই সমগ্র ঘটনাটা আমাদের মধ্যে ঘটে যায়, শ্মশানে যাই এবং দাহ করে ফিরে আসার পর মনে হয় যে, বারো ঘণ্টা আমরা প্রাকৃতিক নিয়মের বশীভূত ছিলাম না, আমাদের মনটা ছিল না দেহের মধ্যে - মনটা ছিল ওইখানে। তাহলে, দেহটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সুফিসাধক যেরকম করে করেছেন। কায়াসাধনা মানে কিন্তু শ্বাসের সাধনা, শ্বাসের সাধনা যদি নিয়ন্ত্রণে থাকে তাহলে আমরা যে-সমস্ত আরাম-টারাম পছন্দ করি - একটু পা ছড়িয়ে বসা, একটু তাকিয়ায় হেলান দেওয়া - এই ইচ্ছেগুলো তো হচ্ছে আমাদের মানসিক দুর্বলতা। কাজেই দেহকে যদি সাধনার দ্বারা ওই স্তরে নিয়ে যেতে পারি তাহলে কায়াসাধক হতে পারব।
লোকায়ত ধর্মের মূল সূত্র হলো দেহ ও বর্তমান এবং মানুষ। দেহের মধ্যে সবকিছুকে উপলব্ধি করাটাই কায়াসাধনার মূল কথা, তা যদি হয় তাহলে তো বেশ কঠিন জিনিস। সে তো নিছক এই গান শোনা নয়। এ তো আমাদের ভদ্রলোকদের গানের আসর নয়। এই গানগুলোর মধ্যে তো একটা সত্য রয়েছে। চর্যাপদের যুগ থেকেই সেই কায়াসাধনার সত্য আছে। চর্যাপদের গান আমরা যখন কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি - শশিভূষণ দাশগুপ্তের কাছে আমি নিজে চর্যাপদ পড়েছি - উনি পড়ে বলতেন, ‘এসব অত্যন্ত কঠিন, নিগূঢ় তত্ত্ব আছে এর মধ্যে - এসব তত্ত্ব এক হাজার বছর আগেকার তত্ত্ব, এ ভেদ করা যায় না।’ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, মাত্র দুবছর আগে একটা গ্রামের মধ্যে গিয়ে এক বৃদ্ধ, অশিক্ষিত ফকিরকে বললাম যে, এক হাজার বছর আগেকার কিছু গান শোনাচ্ছি গদ্যে। বললেন, ‘বলতো কী বলছে?’ আমি চর্যাপদের গান গদ্যে বললাম - লোকটা তার সঙ্গে সঙ্গে মানে করে দিলেন আমার কাছে। শশিভূষণবাবু পারেননি - অতবড় পণ্ডিত পারেননি - আর অশিক্ষিত ফকির বললেন, ‘আরে এই কথা’ - বলে তার একটা বাউল গান শুনিয়ে দিলেন আমার কাছে। আমি তখন বুঝলাম এক হাজার বছর আগেকার সেই মগ্ন পরম্পরা বয়ে গেছে ওই বাউলের মধ্যে, যা আমার মধ্যে নেই, কারণ আমি শিক্ষিত হয়ে গেছি। শশিভূষণবাবুর দলে চলে গেছি। আমি তো পুঁথিপড়া পণ্ডিত হয়ে গেছি। আমি তো জীবনের মূল স্রোত থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গেছি। সেইজন্য চর্যাপদ আমার কাছে দুর্বোধ্য - কিন্তু ওঁর কাছে দুর্বোধ্য নয়। সেজন্যে ভেবে দেখতে হবে আমাদের সত্যিকারের ধর্ম কোনটি? সে কি হিন্দু না মুসলমান না খ্রিষ্টান - এরা কি অনেকখানিই আনুষ্ঠানিক নয়? সেটা কি অনেকটাই লোকদেখানো নয়? আমরা যে হিন্দু বা মুসলমান সেটা কি অনেকটাই নিরাপত্তার জন্য নয়? তা কি নয় আমাদের রাজনীতির জন্য? আর আমাদের ভেতরকার অন্তরতম সত্তা বলে যদি কিছু থাকে, সত্যিকারের মানবিক সত্তা বলে যদি কিছু থাকে, কোনো মানবিক সত্য, মানবিক আদর্শ যদি কিছু থাকে, তাহলে কি আমরা ভেদ করব না এই ধর্মের বিধানগুলোকে? উল্লঙ্ঘন করে যাবো না এই ছোট ছোট সীমা রেখাগুলোকে? লৌকিক সাধকেরা তা পেরেছেন। তাঁরা তো হিন্দুও নন, মুসলমানও নন, কী করে পারলেন তাঁরা? আমি কুবির গোঁসাইয়ের গান পড়ে দেখেছি, অসংখ্য ইসলামি তত্ত্ব তাঁর গানের ভেতরে রয়েছে। কোথা থেকে এত ইসলামি তত্ত্ব তিনি জানলেন? মানুষটা তো হিন্দু। লালন ফকিরের গান পড়লে দেখা যায় বৈষ্ণব ভাবনার অসংখ্য গান আছে। চমৎকার বৈষ্ণব পদাবলি লিখেছেন, কী করে লিখলেন? তার কারণ পুঁথির মধ্যে দিয়ে তাঁরা কিছু পাননি, তাঁরা পেয়েছেন মুক্ত সাধনার পরম্পরা থেকে। মুক্ত সাধনার পরম্পরা - সেটা বড় আশ্চর্য জিনিস, সেটা হঠাৎ আমাদের দেশে হয়নি, এটা অনেকদিন ধরে ছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা সেটা পাইনি। আমরা ইংরেজের কাছ থেকে লেখাপড়া শিখে সব ভুল জিনিস জেনে বসে আছি। এইবার লৌকিক গায়কদের কয়েকটা লাইন পড়ে শোনাই। তাঁরা কী বলছেন? - ‘রাধা-কৃষ্ণ-মহম্মদ, একাঙ্গ একাত্ম সার।’ তাঁরা বলছেন - আমরা বলতে পারছি না।
‘অগণনায় বর্ণ লেখা রাধাকৃষ্ণ, যিশুখ্রিষ্ট, খোদা আল্লা এক।’ এটা গান থেকে বললাম - এটা লৌকিক সাধকই উচ্চারণ করতে পেরেছেন - আমরা পারিনি। ‘আল্লা আলজিহ্বায় থাকেন কৃষ্ণ থাকেন টাকরাতে।’
এই কথার মানে হচ্ছে, আমরা যখন কোনো কথা উচ্চারণ করি তখন টাকরা এবং আলজিহ্বার সাহায্যে উচ্চারণ করি - আমাদের প্রতিটি উচ্চারণ স্পৃষ্ট হয়ে যাচ্ছে একবার আল্লাহ একবার কৃষ্ণতে। এই দুটো স্পৃষ্ট হয়ে তত্ত্বের বাণী বার হয়। তাহলে আমাদের প্রতিটি উচ্চারণই কৃষ্ণ এবং আল্লাহকে মিলিয়ে হচ্ছে। কিসের এত ধর্মের ভেদ তাহলে? ‘রহিম, করিম, রাধা, কালী - এ বোল সে বোল যতই বলি, শব্দভেদে ঠেলাঠেলি হইতেছে সংসারে।’
আমরা যে-সমস- রাধা, কালী, - রহিম, করিম বলছি, এগুলো আসলে শব্দ। এই শব্দের ঠেলাঠেলি চলছে। রাধা বললেই বলছি হিন্দু, রহিম বললেই বলছি মুসলমান - এইটা করছে কে? আমরাই তো করছি। লোকায়ত মানুষ কোনোদিন করেননি। ‘করিম কিষণ হরি হজরত লীলার ছলে ঘোরে।
ভাবে ডুবে খুঁজে দেখো ভেদাভেদ কিছু নাই ওরে॥’
- এই উচ্চারণ যাঁরা করেছিলেন তাঁদেরই আমরা লোকধর্মের মানুষ বলে মনে করি। সেই মানুষগুলি কারা? তাঁদের কয়েকজনের কথা বলি। যেমন লালনের জন্মের কথা বলেছি (আনুমানিক ১৭৭৪)। আউলচাঁদ বলে একজন ফকিরের কথা একটু আগে বললাম, উনি কর্তাভজা ধর্ম তৈরি করেছেন - তিনি কল্যাণীর ঘোষপাড়ায় এসেছিলেন ১৭৪৬ সালে, সেখানে রামশরণ পাল নামে একজন সদগোপ চাষিকে মনুষ্যধর্মে দীক্ষা দিয়েছিলেন। মানুষই সবচেয়ে বড়ো, এই ছিল আউলচাঁদের বাণী। সাহেবধনী সমপ্রদায় যিনি পত্তন করেছিলেন, তাঁর নাম ছিল চরণ পাল। তাঁর জন্মসাল ১৭৪০। দুলালচাঁদ হচ্ছেন রামশরণ পালের ছেলে, তাঁর জন্মসাল ১৭৭৬। পাগলা কানাই হচ্ছেন ১৮০৯ সালের লোক। লালনের সমকালীন আরেকজন গীতিকার পাঞ্জু শাহ্‌র জন্মসাল হচ্ছে ১৮৫১ সালে। এঁরা সবাই প্রায় একই সময়ে জন্মেছেন একশ বছরের বৃত্তে। আমাদের সব লোকধর্মের প্রচারকরা জন্মেছেন এক শতাব্দীর মধ্যেই। কিন্তু তাঁদের নিয়ে আমরা কোনো নবচেতনার কথা লিখিনি। আমরা বাঙালিরা রেনেসাঁসের ইতিহাস লিখেছি। আমরা রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত ইতিহাসকে শনাক্ত করেছি; কিন' তাঁর সমান্তরালে যে যরংঃড়ৎু ভৎড়স নবষড় িনিচের তলার যে-ইতিহাস, যে-ইতিহাস উঠে পড়ছে ওপরদিকে, সেই ইতিহাসটা আমরা আজো লিখতে পারিনি। যদি লিখতে পারতাম তাহলে লালনকে নেতৃত্বে রেখে লালনপন্থী, পাগলাকানাই, সাহেবধনী, কর্তাভজা, খুশীবিশ্বাসী, বলাহাড়ি - এইরকম একটা একটা করে মত আমরা পেতাম। এগুলো সব এক-একটা মত - স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় কিন্তু - পরস্পরের সঙ্গে মিলেমিশে আছে। লোকধর্মের মজা হচ্ছে যে, সাহেবধনী সমপ্রদায়ের সঙ্গে কর্তাভজা সমপ্রদায়ের খুব মিলমিশ আছে। লালনপন্থার সঙ্গে পাঞ্জু শাহের খুব পার্থক্য নেই। কোথাও কোথাও বেশ মিল আছে। এই যে থিওরিগুলো এঁরা তৈরি করেছেন, কেন করেছেন আমি বারবার বোঝাবার চেষ্টা করছি - যে-মানুষ সমুদ্র বা গঙ্গা দেখেননি, যে-মানুষ উচ্চধর্মে নিরাপত্তা পাননি, যে-মানুষ মানবস্বীকৃতি পাননি সমাজের কাছে; ইতর, নিম্নজ, অন্তযজ, ব্রাত্য বলে যাঁদের আমরা চিরকাল সরিয়ে রেখেছি, সেই মানুষগুলোকে বাঁচানোর যে-দিশা, সেই দিশার নামই হচ্ছে লোকধর্ম এবং সেই লোকধর্মের সবচেয়ে বড় যিনি মানুষ তিনি লালন শাহ। তাঁর নিজের শিষ্যদের মধ্যে হিন্দুও ছিল, মুসলমানও ছিল। খুব সোজা হিসাবে ১৭৭৪ সালে যাঁর জন্ম তাঁর যে-শিষ্যদের মুসলমান বলা হচ্ছে তারা তো মূলে হিন্দু এবং হিন্দুধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমান। সেইজন্য লালনের গানের মধ্যে যে-তত্ত্বটা আছে তা হিন্দু এবং মুসলমান দুজনেরই খুব সুন্দর লাগে। মুসলমান একজন লেখক লিখেছেন যে, ‘আমি গ্রামে দুটো লক্ষ্মী দেখতাম। একটা ঘটলক্ষ্মী এবং একটা ধান্যলক্ষ্মী। ঘটের লক্ষ্মীকে কখনো প্রণাম করিনি; কিন্তু ধানের লক্ষ্মীকে প্রণাম করেছি। মা বলতেন, পা দিও না, ধান লক্ষ্মী।’ - কী করে এক মুসলমান মা একথা বলতেন? তার কারণ, তিনি লিখছেন, ইসলামের জন্ম হয়েছে আরবে - সেখানে একটাও পাতা নেই, একটাও গাছ নেই, কোনো প্রকৃতি নেই, সেই অর্থে। সেই ইসলাম যখন এই বাংলাদেশে ভয়ংকর প্রকৃতিময়তার মধ্যে এসে পড়েছে, এই নিসর্গের রহস্য, এই প্রকৃতির আকর্ষণ আর সম্মোহন, তার গন্ধ, তার আবিলতা তখন তার সামনে নতজানু হয়েছে। হয়ে বলছে - হে প্রকৃতি, তোমায় প্রণাম করি; হে ধানলক্ষ্মী, তোমায় প্রণাম করি। সেইজন্য ইসলাম যখন বাউনি বেঁধেছে, পার্বণ করেছে, সে যখন ব্রত পালন করেছে, সে যখন গরুকে পুজো করেছে তখন শরিয়তপন্থীরা বলেছে - তোমরা ভুল করছ, এগুলো ইসলামের কাজ নয়। কিন্তু আমাদের দেশে যাঁরা মুক্ত সাধনা করেছেন, হিন্দু-মুসলমানের সাধনা, তাঁরা কেউই হিন্দু নন, কেউই মুসলমান নন। গ্রামের মধ্যে সেই মানুষগুলি থাকেন। তাঁরা ধান উঠলে আনন্দ করেন, নবান্ন করেন। সকলেই করেন, হিন্দুও করেন, মুসলমানও করেন। পদ্ধতি হয়তো আলাদা। নদিয়া বা মুর্শিদাবাদে মুসলিম-বাড়ি গেলে তারা ভালো সাদা আতপ চালকে সেদ্ধ করে তাই দিয়ে রুটি তৈরি করে খাওয়ায় - চালের রুটি। ধানের সঙ্গে এই যে সংসর্গ, মুসলমান জীবনের তা অতি সত্য সংসর্গ - ধানের সংসর্গ, মাটির সংসর্গ, জলের সঙ্গে সংসর্গ, সংসর্গ মাছের সঙ্গে, গাছের সঙ্গে সংসর্গ, পঞ্চভূতের সঙ্গে সম্পর্ক। ওই যে প্রকৃতিময় আমাদের দেশ, নিবিড় নিসর্গময় আমাদের দেশ - এই দেশে মানুষ বেশিক্ষণ ধর্মের বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে পারে না। ধর্মের বন্ধন ভেঙে যায়। লোকাচার আর সংস্কৃতি এসে যায়। আমরা মুসলমানকে পাঠিয়ে দিই ফল আর সে পাঠিয়ে দেয় শিন্নি। আমরা সত্যপিরের শিন্নি খেয়ে নিচ্ছি। হিন্দুবাড়িতে যদি কারোর জ্বরজারি হয়, তাহলে মসজিদের থেকে জলপড়া এনে খাইয়ে দিই। এই যে পারস্পরিক বিশ্বাস, এই বিশ্বাস আমরা লোকধর্ম থেকে পেয়েছি। অভিজাত ধর্ম এই বিশ্বাস আমাদের কোনোদিন দেয়নি। খবরের কাগজ পড়লে দেখি যে, সেখানে যে-সমাধানটা করা হয় ‘দুটো ধর্ম রেখে দাও, দুজনকেই ধর্মপালনের স্বাধীনতা দাও’ - এটাই তাঁরা বারবার বলেন। আর লোকধর্ম সবসময়ে বলে, দুটো ধর্মকে মিশিয়ে দাও। একই শোষণে শোষিত, একই দারিদ্র্র্যে নিষ্পেষিত, একই প্রকৃতিতে মোহাচ্ছন্ন মানুষ, একই ধানের নিবিড় গন্ধে যে-মানুষ জেগে আছে, বেঁচে আছে, তার কাছে ঈশ্বরের যে-অনুভূতি তা তো কোনো মন্দিরে-মসজিদে আবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁরা ঈশ্বরকে পেয়েছেন প্রকৃতিময়তায়, মানবিকতায়, বিশ্বাসে। জীবনের প্রতিদিনের যাপনে পেয়েছেন তাঁরা। আমাদের অভিজাত বিশ্বাস দিয়ে আমাদের প্রথাগত ইতিহাসবোধের মধ্যে দিয়ে আমরা কোনোদিন লোকধর্মকে অনুধাবন করতে পারব না। যদি পারতাম তাহলে লালনের গান আমাদের অনেক আগেই পাঠ্য হয়ে উঠত - আমরা অনেক আগেই বুঝতে পারতাম তাঁর মানবিকতার মহিমা, আমরা দেখতে পেতাম গানের মধ্যে দিয়ে তিনি আমাদের কাছে এক বিশাল সেতুবন্ধ করে দিয়ে গেছেন লোকায়ত এবং অভিজাতের মধ্যে। সত্য যদি কিছু থাকে - ইতিহাসের নতুন সত্যকে, আমাদের অনুধাবন করতে হবে। ইতিহাসকে যদি আমরা লিখি যা যরংঃড়ৎু ভৎড়স নবষড় িসেই ইতিহাসটাই আমরা লিখব। আমাদের মূল ধারাস্রোতের ইতিহাস, যে-ইতিহাস থেকে আমরা ভ্রষ্ট হয়েছি ইংরেজদের শিক্ষাব্যবস্থার চক্রান্তে, যে-শিক্ষাব্যবস্থার নিগড় থেকে আমরা আজো মুক্তি পাইনি। যদি পাই, যদি কোনোদিন পাই, আমাদের দেশের উৎস এবং শিকড়ের সন্ধান যদি কোনোদিন পাই, তবে সেইদিন সার্থক হবে লালন-বহতা, সেদিন সার্থক হবে লালনের স্বপ্ন।