সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

                           এ. এফ. এম. ফতেউল বারী রাজা

 
প্রথম ইসলামী রেকর্ড সঙ্গীত
 
রচনায় ইসলামী দর্শন

 


কাজী নজরুল ইসলামের গানে গিরিঝর্ণায় গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে যখন নেমে আসছিলো আধুনিক রাগপ্রধান শ্যামাসংগীত, কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালী, ঝুমুর প্রভৃতি বহুবিচিত্র ধারায় রেকর্ডের পর রেকর্ড তখন মুসলমান সমাজ ছিলো গান-বাজনার ঘোর বিরোধী। তাই বহুপূর্বে নজরুল ইসলামী সঙ্গীত ‘বাজলো কিরে ভোরের শানাই’ লিখে থাকলেও রেকর্ড করার চিন্তা করেননি। এ সময় আব্বাস উদ্দিন আহমদ কলকাতায় শিল্পীর আসনে প্রতিষ্ঠিত। শিল্পীর আসনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আব্বাসের মাথায় খেয়াল চাপলো মুসলমানদের হৃদয়-সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার। এ ল্য বাস্তবায়নে তিনি বেছেনিলেন দু’টি পথ। এর একটি এদেশের লোকগীতি অপরটি ইসলামী গান। কারণ বাংলার মানুষ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং ধর্মভীরু।
এমতাবস্থায় একদিন কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিৎপুর রোডে গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল ঘরে তিনতলায় তাঁর কামরায় গান লিখছেন। হঠাৎ আব্বাস উদ্দিন সেখানে ঢুকলেন। কাজী সাহেব মহা উৎসাহে বলে উঠলেন, ‘‘আরে আব্বাস, তুমি কবে এলে? বসো, বসো।” আরও বললেন, ‘‘সবাই আমায় কাজী সাহেব বলে, তুমি কিন্তু কাজী দা’ বলে আমাকে ডাকবে। হ্যাঁ, তোমার জন্যে গান লিখতে হয়। আচ্ছা, ঠিক হবে।” কিন্তু আব্বাস যতবারই গ্রামোফোন কাবে যান, দেখেন কাজী সাহেবকে ঘিরে রয়েছে অনেকে। সঙ্কোচে কিছুই বলতে পারছিলেন না। পাশের ঘরে পিয়ারু কাওয়াল রিহার্সেল দিচ্ছেন উর্দু কাওয়ালি গানের। আব্বাস বললেন, ‘‘কাজী দা, পাশের ঘরে পিয়ারু কাওয়াল, কালু কাওয়াল এরা উর্দু কাওয়ালি গায়, এদের গানও শুনি অসম্ভব বিক্রি হয়। এ ধরনের বাংলায় ইসলামী গান আমায় লিখে দিলে হয় না? তারপর আপনি তো জানেন কীভাবে ‘কাফের’, ‘কুফর’ ইত্যাদি বলে বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে আপনাকে অপাংক্তেয় করে রাখার জন্যে আদা-জল খেয়ে লেগেছে একদল ধর্মান্ধ। আপনি যদি ইসলামী গান লেখেন তাহলে মুসলমানের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয়গান।”
আব্বাস উদ্দিনের এই প্রস্তাবে নজরুল উৎসাহিত হলেন এবং এ ব্যাপারে তিনি গ্রামোফোন কোম্পানির রির্হাসেল ইনচার্জ ভগবতী ভট্টাচার্যের অনুমতি নিতে বলেন। আব্বাস উদ্দিন ভগবতী বাবুর কাছে বাংলায় ইসলামী গানের রেকর্ডের প্রস্তাব করলে তিনি কোম্পানির লাভ-লোকসানের কথা চিন্তা করে আব্বাসের প্রস্তাবে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং বলেন, ‘‘এ ধরনের রেকর্ড বিক্রি হবে না।” কারণ তখনও বাংলায় মুসলমানের ঘরে গ্রামোফোন ব্যবহারের চল শুরু হয়নি। এক বছর কেটে গেল। এবার আব্বাস বেশ বুদ্ধিমত্তার সাথে কৌশলে রিহার্সেল ইনচার্জ ভগবতী ভট্টাচার্যের কাছে পুনরায় প্রস্তাব রাখলেন। এবার ‘না’ নয়। এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলেন। তবে এই শর্তেÑ বাংলায় ইসলামী গান রেকর্ড হবে, যদি বিক্রি না হয় পুনরায় বাংলা ভাষায় আর ইসলামী গান রেকর্ড হবে না। ভগবতী ভট্টচার্য রাজি হওয়ার সাথে সাথে আব্বাসও তার রুম থেকে বের হয়ে নজরুলের খোঁজে একে-ওকে জিজ্ঞেস করে অবগত হন, নজরুল তিনতলায় তাঁর নিজস্ব কামরায় আছেন। আব্বাস ঘরে প্রবেশ করেই দেখতে পেলেন নজরুল ইন্দুবালাকে গান শেখাচ্ছেন। আব্বাস নজরুলের কাছে বসে বসে তাঁর কানে কানে বললেন, ‘‘ভগবতী ভট্টাচার্য মহাশয় রাজি হয়েছেন বাংলায় ইসলামী গান রেকর্ড করতে। নজরুল সাথে সাথে গান শেখানো বন্ধ করে ইন্দুকে বললেন, ‘‘ইন্দু তুমি আজ বাড়ি যাও আমার সাথে আব্বাসের কাজ আছে।” ইন্দুবালা চলে গেলে আব্বাসকে বললেন, “দশরথকে ডেকে চা ও পানের ব্যবস্থা কর।” এ সময় কলকাতার ম্যাগন থিয়েটারের বিশ ও তিরিশের দশকের প্রধান নাট্যকার ও প্রখ্যাত সুরশিল্পী জনাব আগা হাশরের রচিত এবং সুরারোপিত একটি বিখ্যাত জনপ্রিয়:
 ‘‘হাম জায়েঙ্গে ওয়াহী খুশ্দিলে
দিওয়ানা যাহা হো”
উর্দু গানটির সুর নজরুলের মনের মাঝে দোলা দিতে থাকে। ইতোমধ্যে দশরথ এক ঠোঙ্গা পান ও চা নিয়ে এলে তা’ নিয়ে আব্বাস নজরুলের রুমে ঢুকলেন। তিনি আব্বাসকে বললেন, ‘‘দরজা বন্ধ করে দিয়ে চুপ করে বসে থাকো।” নজরুল আগা হাশরের ওই বিখ্যাত জনপ্রিয় উর্দু গানের সুর ও ছন্দ পুঁজি করে সামনে ঈদের আনন্দকে হৃদয়ে লালন করতে সেই সুর ও ছন্দে মাত্র ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে রচনা করে ফেললেন :
“ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে
এলো খুশির ঈদ।”
তখনি সুর সংযোগ করে শিখিয়ে দিলেন। পরের দিন ঠিক এই সময় আসতে বললেন। পরের দিন আব্বাস এলে লিখলেন :
‘‘ইসলামের এই সওদা লয়ে
এলো নবীন সওদাগর। ”
গান দু’খানা লেখার ঠিক চার দিন পরেই এইচ. এম. ভি. কোম্পানিতে রেকর্ড করা হলো। গান রেকর্ড করার পূর্ব মুহূর্তে নজরুলের ধৈর্য মানছিলো না। তাঁর চোখে-মুখে কী আনন্দই যে খেলে যাচ্ছিল! তখনকার দিনে যন্ত্র ব্যবহার হত শুধু হারমোনিয়াম আর তবলা। গান দু’খানা তখনও আব্বাসের মুখস্ত হয়নি। নজরুল যা লিখে দিয়েছিলেন মাইকের পাশ দিয়ে হারমোনিয়ামের ওপর ঠিক আব্বাসের চোখ বরাবর হাত দিয়ে নজরুল নিজেই সেই কাগজখানা ধরলেন, আব্বাস গেয়ে চললো। এভাবেই রেকর্ডে বাণীবদ্ধ হলো প্রথম ইসলামী সঙ্গীতের রেকর্ড।
মুসলমান সমাজে কুকুরকে নাপাক বলা হয়। কুকুর স্পর্শ করলে ওজু না করলে নামাজ পড়া যায় না। তাই গ্রামোফোন কোম্পানি রেকর্ড বাজারজাত করার পূর্বে গ্রামোফোন রেকর্ডে ওপরের কুকুরের ছবি ওয়ালা ‘‘লোগো’’ বদল  করে নতুন ‘‘লোগো’’-এর প্রচলন করে। দু’মাস পরে ঈদুল ফিতর। আর ঈদের সময়েই রেকর্ডটি বাজারজাত করা হলো। রেকর্ড নম্বর এন-  ৪১১১। প্রকাশকাল : ফেব্র“য়ারি ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ। আজ থেকে ৭৭ বছর পূর্বে ইসলামী সঙ্গীতের এই রেকর্ড বাংলার আকাশে-বাতাসে মহা-আলোড়ন সৃষ্টি করে বাঙালি মুসলমানের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। এই রেকর্ড বিক্রি করে গ্রামোফোন কোম্পানি লাভবান হলো তা’ নয়। এই রেকর্ডের জন্যে ল ল গ্রামোফোন তৈরি হয়ে বিক্রি হতে লাগলো। সাথে সাথে ল-কোটি গ্রামোফোন রেকর্ড বাজাবার পিন। গ্রামোফোন কোম্পানি চারদিক থেকে লাভবান হতে থাকলো।
প্রথম ইসলামী রেকর্ড সঙ্গীত রচনায় নজরুলের ইসলামী দর্শন ল্যণীয়। যার বিষয়বস্তু ছিলো গান-বাজনা, নৃত্য এবং আনন্দ। সে যুগে গান রেকর্ড করতে যে যন্ত্র ব্যবহৃত হত তা’ হল- হারমোনিয়াম, তবলা এবং ডুগি। সঙ্গীতে যে সপ্তস্বর বা সরগম ব্যবহৃত হয়, হারমোনিয়াম সেই সপ্তস্বরের যন্ত্র। পবিত্র কোরআনের ২১ পারায় সূরা লোকমানের ১৯ নং আয়াতে দেখা যায়, “তোমরা যেখানেই যাও স্বর সংযত রেখ, নিশ্চয়ই গাধার স্বর সব চাইতে অপ্রীতিকর।” হারমোনিয়ামে আবদ্ধ সপ্তস্বর বিভিন্ন পশু-পাখির কণ্ঠ থেকে ধারণ করা হয়েছে। যেমন :
সা- ষড়জ। ময়ূরের কণ্ঠস্বর থেকে।
রা-ঋষভ। বৃষ বা ষাঁড়ের কণ্ঠস্বর থেকে। মতান্তরে চাতক পাখির কণ্ঠস্বর থেকে।
গা- গান্ধার। অজ বা ছাগের কণ্ঠস্বর থেকে।
মা- মধ্যম। সারস বা বক জাতীয় পীর কণ্ঠস্বর থেকে।
পা- পঞ্চম। কোকিলের কণ্ঠস্বর থেকে।
ধা- ধৈবত। অশ্ব বা ঘোড়ার কণ্ঠস্বর থেকে। মতান্তরে ভেক-এর কণ্ঠস্বর থেকে।
না- নিখাদ। হস্তির কণ্ঠস্বর থেকে।
দেখা যায়, এই সপ্তস্বরের মধ্যে অপ্রীতিকর গাধার কণ্ঠস্বর থেকে কোনো
স্বর গ্রহণ করা হয়নি।

নজরুলের ইসলামী দর্শনে এবার নবী করিম (সা:)-এর একটি হাদিসের উল্লেখ করতে চাই। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) বর্ণনা করেছেন, ‘একদা ঈদের দিন আনাস গোত্রের দুই যুবতী মেয়ে আমার নিকট দফ বাজিয়ে নৃত্য করে গান গাইছিলেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ঘরে প্রবেশ করলেন এবং কম্বল মোড়া দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে রইলেন। ইতোমধ্যে আমার পিতা হযরত আবু বকর (রা:) আসলেন এবং ওই মেয়ে দু’টিকে তখন তিনি ভীষণ ভৎসনা করলেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) কম্বল থেকে মুখ বের করে বললেন, হে আবু বকর! ওদের বাধা দিওনা। কেননা আজ ঈদের দিন। নিশ্চয়ই প্রত্যেক জাতির জন্যে আনন্দের দিন আছে। আজ তোমাদের ঈদ অর্থাৎ আনন্দের দিন।”
তবলা দফের আধুনিক প্রকরণ। যা উপমহাদেশের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আমির খসরু প্রবর্তন করেন। ‘দফ’ হলো এক পিঠে বাজানো যন্ত্র যার আর এক পিঠ খোলা। যা বাজাতে একটু অসুবিধা ছিলো। ওস্তাদ আমির খসরু এটাকে আধুনিকীকরণ করে তবলা এবং ডুগি তৈরি করেন।
নজরুল তাঁর প্রথম ইসলামী রেকর্ড সঙ্গীতে হারমোনিয়াম, তবলা এবং ডুগি ব্যবহার করেছিলেন। আর ঈদকে উপল করে ওই সঙ্গীত রচনা করে ঈদের মধ্যে বাজারজাত করার ব্যবস্থা করেছিলেন। যাতে করে আলেম সমাজ থেকে কোনো বাধা-বিপত্তি এলে কোরআন এবং হাদিসের আলোকে ইসলামী দর্শন উপস্থাপন করে তার মোকাবেলা করতে পারেন। কিন্তু কবিকে তা’ করতে হয়নি। কারণ ভারতবর্ষের আপামর মুসলমান জনগণ ইসলামী সঙ্গীত সাদরে গ্রহণ করে সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে ফেলেছে।

লেখক পরিচিতি : এ.এফ.এম. ফতেউল বারী রাজা,  সভাপতি, চাঁদপুর লেখক পরিষদ।

                                                                                            এ. এফ. এম. ফতেউল বারী রাজা

নজরুলের সাথে প্রথম পরিচয়
 
শিল্পী হিসেবে আব্বাসের প্রতিষ্ঠা


কাজী নজরুল ইসলামের গজলের সুললিত বাণীর মাদকতায় এবং সুরের মূর্ছনায় বাংলার মানুষ যখন দুলছিলো, তখন হিন্দু সমাজে তাঁর ভক্তিগীতির প্রবল জোয়ার। যাতে তিনি দেব-দেবীর নাম করেছিলেন। যার জন্যে বাংলার আলেম সমাজ তাঁকে কাফের বলে আখ্যায়িত করে। তাছাড়া সে যুগে মুসলিম সমাজ গান-বাজনাকে হারাম বলে জানতো। ঠিক এই সময় গানের মধ্য দিয়ে নজরুলের নামের সাথে আব্বাসউদ্দীন আহমদের প্রথম পরিচয়।
 
আব্বাসের পিতা মৌলভী জাফল আলী আহমদ ছিলেন তখনকার নামকরা উকিল। পুত্রকে তিনি জাঁদরেল ব্যারিস্টার বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা’ আর হলো না। কারণ প্রকৃতির মুক্ত পরিবেশ এবং গ্রামীণ আবহাওয়ায় গড়ে উঠা আব্বাসের মনকে পল্লীর খেলাধুলা, বাউল গান, গাড়িয়ালের গান, রাখালের গান, বেদের গান, কৃষাণের বারোমাসী গানের সুর নিয়ে যায় কল্পনার রাজ্যে। গ্রাম্য যাত্রা আর গ্রামোফোন রেকর্ডের গান তাঁকে করত উদ্দীপ্ত। তাছাড়া প্রখ্যাত যাত্রা-গায়ক মুকুন্দ দাসের স্বদেশী গান তখন তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। এসময় আব্বাসউদ্দীন পল্লীগীতির সাথে প্রচুর স্বদেশী গান গাইতেন। এমনি করে যৌবনের প্রারম্ভে তিনি সুকণ্ঠের জন্যে সকলের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেন।

প্রতি বছর কুচবিহার স্কুল এবং কলেজ মিলে যৌথভাবে বার্ষিক মিলাদ করত। ১৯২৪ সালের ঘটনা। আব্বাস তখন কুচবিহার কলেজে বি.এ. কাসের ছাত্র। এ বছর কুচবিহার স্কুল এবং কলেজের যৌথ বার্ষিক মিলাদ উপলে স্কুল-কলেজের ছাত্রদের প থেকে আব্বাস উদ্দীন ট্রেন থেকে নজরুলকে অভ্যর্থনা করা এবং সকল রকম দেখাশুনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আব্বাসের বন্ধুদের কারো মুখে নজরুল জানতে পারেন, আব্বাস ভালো গান গাইতে পারে। মিলাদ শেষে সভায় নজরুল আব্বাসউদ্দীনকে গান গাইতে বলেন। আব্বাসের গান শুনে নজরুল খুব খুশি হন। আব্বাসকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, ‘‘সুন্দর মিষ্টি কণ্ঠ, কলকাতায় চলো, তোমার গান রেকর্ড করা হবে’’। এভাবেই নজরুলের সাথে প্রথম পরিচয়ের সূত্রপাত।

দ্বিতীয় বার দেখা দার্জিলিং-এ ‘লুই-জুবিলি স্যানিটোরিয়াম-এ এক গানের জলসায়। এখানে নজরুলের সাথে দেখা হতেই নজরুল আব্বাসকে গান গাইতে বলেন এবং গান শেষে আব্বাসকে নানাভাবে উৎসাহ দেন এবং কলকাতা গিয়ে রেকর্ডে গান দিতে বলেন। নজরুলের উৎসাহ ও বন্ধুদের তারিফ তার মনে রেখাপাত করে। পড়ালেখা আর এগোয় না। গ্রামোফোন রেকর্ডে গান দেয়ার জন্য মনে মনে কলকাতা যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। সুযোগ এসে গেলো, বন্ধু জীতেন মিত্রের বিয়ের বরযাত্রী হয়ে কলকায় যেতে হলো। বিয়ের পালা শেষ হতেই তিনি নজরুলের সাথে দেখা করতে গ্রামোফোন কোম্পানিতে গেলেন, নজরুলকে পাওয়া গেল না। দেখা হলো একসময় কুচবিহারে বসবাসকারী বিমলদাস গুপ্তের সাথে। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে আব্বাস বিমল দাস গুপ্তকে তার গান রেকর্ড করিয়ে দেয়ার  জন্যে অনুরোধ করেন। বিমল দাস গুপ্ত গান শুনে খুশি হন। তার গান রেকর্ড করার আশ্বাস দেন এবং ঠিকানা রেখে যেতে বলেন। আর জানান, সব ব্যবস্থা হয়ে গেলে যথাসময়ে চিঠি লিখে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। আব্বাস উদ্দীন নিজ ঠিকানা লিখে তার হাতে দিয়ে বিদায় নেন। কুচবিহার ফিরে গিয়ে মাসখানেক পরে আব্বাস তার এক বন্ধুর সাথে বেড়াতে গেলেন কার্সিয়াং। ওখান থেকে পত্রে যোগাযোগ হলে তিনি জানতে পারেন রেকর্ড করার সব ব্যবস্থা ঠিক হয়ে গেছে। তার কলকাতা পৌঁছানো দরকার। যথারীতি আব্বাস বিলম্ব না করে কলকাতা পৌঁছে গ্রামোফোন কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করেন। গান রচনা, সুরারোপ ও যথারীতি নিয়মে প্রশিণ চলতে থাকে। প্রথম গানটি ঃ ‘‘কোন বিরহীর নয়ন জলে/বাদল ঝরে গো।”  রচনা করেন বন্ধু শৈলেন রায়। সুুরারোপ যুগ্মভাবে শৈলেনরায় ও আব্বাস উদ্দীন আহমদ। দ্বিতীয় গান ঃ ‘‘স্মরণ পারের ওগো প্রিয়।” রচনা ও সুরারোপ করেন ধীরেন দাস। গান তৈরি হবার পর রেকর্ড করার জন্যে যখন হাজির হয়েছেন রেকর্ডিং সেন্টার বেলেঘাটায়, তখন হঠাৎ করে সেখানে দেখা হয় কে. মল্লিকের সাথে। বিমল দাস গুপ্ত আব্বাসউদ্দীনের সাথে তার পরিচয় করিয়ে দেন। কে. মল্লিক আব্বাসউদ্দীনের গান দুটো শুনতে চাইলেন। আব্বাস গান দু'টো শুনার পর কে. মল্লিক বিমল দাস গুপ্তকে গান দু'টো ওইদিন রেকর্ড করতে বারণ করলেন এবং অভিমত দিলেন আব্বাসের গাণের বাণীর উচ্চারণ ঠিক নয়। উচ্চারণ ঠিক করে এক দিন পর রেকর্ড করার জন্যে। আর এ কাজের ভার নিলেন স্বয়ং কে. মল্লিক। তিনি তখন থেকেই গানের বাণী মাইকের সামনে কী করে উচ্চারণ করতে হবে তা’ শিখিয়ে দেয়ার জন্যে তৎপর হয়ে উঠলেন। কে. মল্লিক একদিনেই আব্বাসের উচ্চারণ ঠিক করে পরের দিন গান দুটো রেকর্ড করিয়ে দিলেন। গান দুটোঃ-
(১) ‘‘কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল ঝরে গো
কোন ব্যথিতের বুকের ব্যথায় বাতাস পরে গো”
(২) ‘‘স্মরণ পারের ওগো প্রিয়
তোমার মাঝেই আপনহারা
আকুল বাঁশীর সুরের খেয়ায়
দিয়েছে তাই তোমায় সারা।”
রেকর্ড নম্বর এন - ৩২৬৫। প্রকাশকাল ডিসেম্বর ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ। রেকর্ড বাজারজাত হওয়ার সাথে সাথেই আব্বাস উদ্দীন আহমদ কলকাতায় শিল্পীর আসনে প্রতিষ্ঠিত হলেন।