সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

চিরকালের রবীন্দ্রনাথ
প্রবীর মজুমদার বাবুল


জোড়াসাঁকোর জমিদার পরিবারে ছোট্ট একটি ছেলে জন্ম থেকে মায়ের আদর তেমনি একটা বড় পাননি, চাকর-বাকরদের কোলেই মানুষÑ তাই মনে মনে ভারী অভিমান তাঁর। সত্যিকারের ভাব ছিলো খোলা নীল আকাশের সাথে, দূরের গাছপালা কিংবা রাতের উজ্জ্বল চাঁদের সাথে। এরাই যেন ছেলেটির আসল বন্ধু। এই প্রকৃতির সাথেই মন মিলিয়ে সে খেলতো ছন্দ গেঁথে। ছেলেবেলার এই ছেলেখেলাই পূর্ণবয়সে তাকে করে তুললো বিশ্বের সেরা কবি- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ছেলেবেলায় তাঁকে চাকরদের কঠিন শাসনই সইতে হয়েছিলো বলে লেখার মধ্য দিয়ে সকল প্রকার শাসন, বাঁধন আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে মত প্রচার করেন। যুদ্ধের প্রতি তাঁর ছিলো ভীষণ ঘৃণা। তাঁরই লেখা পড়ে এক আমেরিকান সৈন্য যুদ্ধ করতে নারাজ হয়। এই কবিই হলেন বাংলার সূর্য, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ।
এই কীর্তিমান কবি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সৌন্দর্যের পূজারী, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধক। শুধু কবিতা নয়, গল্প, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ সব কিছুতেই তাঁর দক্ষতা ছিলো বিপুল। বাংলা সাহিত্যে তিনিই ছোট গল্পের স্রষ্টা। তিনি খুব উঁচুদরের সংগীতজ্ঞ এবং অভিনেতাও ছিলেন। ভালো মানের ছবিও আঁকতে পারতেন তিনি।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়ে সমগ্র পৃথিবীর লোক মুগ্ধ হয়ে যায় এবং তাঁকে সাহিত্যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সম্মান নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। তৎকালীন এশিয়া মহাদেশে তিনিই সর্বপ্রথম নোবেল পুরস্কার পান।
বিশ্বকবি ছিলেন সত্যের প্রতীক। অন্যায়ের কাছে কখনও মাথা নত করেননি তিনি। বরং অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন কঠিন ভাষায়। জালিয়ানওয়ালাবাগে যখন ব্রিটিশ সরকার নির্দয়-নিষ্ঠুরভাবে গুলি করে হাজার হাজার স্বাধীনতাকামী লোকদের হত্যা করলো, ঠিক তখনই এই অন্যায়ের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশদের দেয়া ‘নাইট’ উপাধি বর্জন করলেন এবং ব্রিটিশ বড়লাটের কাছে কঠিন ভাষায় একখানা চিঠি লিখে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের জন্যে তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ ও বজ্রকঠিন সমালোচনা করলেন। সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ এমনি ছিলেন অকুতোভয়।
যে কালে ব্রিটিশ ভারতে সাহেবী পোশাকের বড় রেওয়াজ ছিলো এদেশে। গণ্যমান্য লোকেরা সাহেবী পোশাক পরেই সভা-সমিতিতে যেতেন কিন্তু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের স্বদেশপ্রেম-প্রীতি এতোই প্রখর ছিলো যে, তিনি জাতীয় পোশাক পরেই সর্বত্র যেতেন।
ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনেও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের দান ছিলো অপরিসীম। তাঁর লেখা গানে এবং তাঁরই দেয়া সুরে স্বদেশী গানে সমগ্র ভারতবর্ষ মেতে ওঠে। সেদিন কেবল লিখেই কর্তব্য পালন করেননি, সভা-সমিতিতেও গান গেয়ে অতঃপর কোরাসে কোরাসে স্বাধীনতার বীজ তথা স্বদেশ জাগরণী মন্ত্র প্রচার করেছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের লেখার মাধ্যমে বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যান্য সমৃদ্ধশালী ভাষার পাশে স্থান করে নিয়েছে। তাঁর লেখা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্বে। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ, প্রবন্ধ, রচনা। সাহিত্যের এমন কোনো দিক নেই, যেখানে বিস্ময়কর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোঁয়া পড়েনি।
দেশ-বিদেশ ভ্রমণ রবী ঠাকুরের কাছে খুবই প্রিয় ছিলো। বিশ্বের যেখানেই তিনি গিয়েছেন সেখানেই তিনি আদর-আপ্যায়ন, শ্রদ্ধা-সমাদর পেয়েছেন প্রচুর। কারণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ শুধু বাঙালিদের কবিই ছিলেন না, তিনি যে সমস্ত পৃথিবীর লোকদের নিয়েই লিখতেন। তাই তো তাঁকে বলা হয় ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। তিনি উঁচুদরের শিক্ষাবিদও ছিলেন। তাঁর ধারণা ছিলো বাঁধন-শাসনের মধ্য দিয়ে প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না। আর এই চিন্তাধারার উপরই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন বিশ্বভারতী। প্রতিভাধর শিক্ষায়, ছবি আঁকায় এবং সংগীতে অসামান্য স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
যুগে যুগে বিশ্বকবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নবরূপ রূপায়নে আমাদের জীবনকে ঐশ্বর্য্যমণ্ডিত করেছেন। উজ্জ্বল করেছেন সমগ্র বাঙালির মুখ সারাবিশ্বে। তাই তো তাঁর জন্মবার্ষিকীতে বাঙালিমাত্রই খুঁজে নেয় নিজ উৎসের মন্ত্ররূপটিকে। সমগ্র বাঙালি জাতি তথা বিশ্ববাসী কৃতজ্ঞ হয়ে আবেগভরে গেয়ে ওঠে ঃ
“চির নতুনের দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।”

 


মৃত্যু নদীর গান
 
জসিম মল্লিক
১.
মাঝে মাঝে মনে হয় কতকাল ধরে এই পৃথিবীতে বেঁচে আছি। পৃথিবীর পথ ধরে চলছি। চলতে চলতে কতজনকে আপন করেছি, কত আপনজন হারিয়েছি। আবার আপন করেছি। আবার হারিয়েছি। বুঝতে পারিনা পাওয়ার নাম জীবন না হারানোর! এই যোগ-বিয়োগের হিসাব সহজে মেলে না। চলতে চলতে কিছু মানুষ হারায়, কিছু মানুষ থাকে। আসলে জীবনে কী থাকে! শেষ পর্যন্ত কিছুই কী থাকে! এভাবে দিন চলে যায়। কিছুতেই সময়ের রাশ টেনে ধরে রাখা যায় না। কখনও কখনও সময় অনড় পাথরের মতো চেপে বসে। মনে হয় স্থবির হয়ে আছে পৃথিবীর সবকিছু। কোনো গতি নেই, আবেগ নেই, ভালবাসা নেই, পাওয়া নেই। চোখ বুজলেই আজকাল একটা ঘোলা জলের স্রোত দেখতে পাই। একটা নদী। নদীটা খুব চওড়া নয়। দু’পাড়ে মাইল মাইল জুড়ে নির্জনতা আর গরান গাছ, বাবলা বন। একদিকে ভাঙা পাড়ের মাটির মধ্যে খাঁজে খাঁজে ইট। কোনও এক স্থাপত্যের ধ্বংসস্তুপ। পাখি ডাকছে। নৌকো চলেছে ধীরে, উজান ঠেলে। জোয়ারের জল তীরের ঘাসপাতা ডুবিয়ে ছলাৎ ছল শব্দে ভাঙছে। গোসাবার পর ওই নির্জনতা আর নির্জনতা ছাড়া কিছু নেই। সে এক গহিন প্রাকৃত জগৎ। মায়ের সাথে ওই নদী দিয়ে কতবার গিয়েছি নৌকায়। আজকাল বারবার সেই নদীটার কথা মনে পড়ে। আর খুব স্নিগ্ধ হয়ে যায় মন। কে যেনো মলম মাখিয়ে দিয়ে যায় হৃদয়ের ছেঁড়া খোঁড়া ক্ষতস্থানে। মায়ার কাজল পরিয়ে দেয় চোখে।
এখন মা নেই। নির্জন সেই নদী সারাদিন এলোচুলে পা ছড়িয়ে বসে মৃত্যুর গান গায়। চারদিকে নিস্তব্ধ এক উপত্যকা, দু’ধারে কালো পাহাড়ের দেয়াল উঠে গেছে আকাশে। এই বিরলে শুধু মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাসের মতো হু-হু বাতাস বয়ে যায়। অজস্র সাদা ছোট বড় নুড়ি পাথর চারদিকে অনড় হয়ে পড়ে আছে। খুব সাদা, নীরব, হিম, অসাড় সব পাথরের মাঝখান দিয়ে সেই নদী- উৎস নেই, মোহনা নেই। সারাদিন এখানে শুধু তার করুণ গান, বিলাপের মতো। কিছু নেই, কেউ নেই। শুধু হাড়ের মতো সাদা পাথর পড়ে থাকে নিথর হয়ে উপত্যকা জুড়ে এক মৃত্যুর সম্মোহন। এলোচুলে পা ছড়িয়ে বসে নদী অবিরল গান গেয়ে যায়। সেই নদী কী করে আস্তে আস্তে হয়ে গেলো মৃত্যু নদী। এত সুন্দর একটি নিসর্গ দৃশ্যকে মৃত্যুর রং মাখালো কে?  চারদিকে হিম সাদা অনড় পাথড়, নির্জন উপত্যকা আর মোহনাহীন এক নদী সেই থেকে আমার সঙ্গে আছে।
২.
আমার মধ্যে ভাবাভাবির একটা বাতিক আছে। অনেকের কাছে যা অপ্রয়োজনীয় সেসব নিয়েও আমি ভাবি। আমার কথা কেউ যে খুউব মন দিয়ে শোনে তা না, আমি খুউব বেশী মানুষের সাথে আমার কথা শেয়ার করি না। আমার কথা বলার বেশী মানুষ নেই। আমার কথা শোনার মানুষেরও অভাব। সেজন্য আমার মধ্যে কোনো অনুতাপ নেই। আমি এটা জেনে গেছি যে আমাকে বোঝার মতো মানুষ আমি কখনও পাবোনা। নানা ধরনের ভাবনা নিয়ে কখনও কখনও উদাসীন হই, বিমুগ্ধ হই। কখনও কখনও লিখি। এলেবেলে সে সব লেখা। আজকাল এমন হয়েছে যে লিখতে বসলেই পুরনো স্মৃতি ভেসে উঠে। আমি ছিলাম খুব সাধারন। কিন্তু আমার স্মৃতিগুলো ছিল অসাধারন।
একবার আমার খুউব অসুখ হয়েছিল। জ্বরের ঘোরে প্রায়ই আমি অবচেতন হয়ে থাকি। এরকম এক এক ঘোরলাগা দুপুরে মা এসে আমার পাশে শুলেন। আমি মাকে বলছিলাম, ’মা, আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আর জন্মে আমি লেবুগাছ ছিলাম। এই যে আমার হাত দেখছেন, পা দেখছেন এসব ছিল ডালপালা। আর কুনুই, কবজি, কন্ঠা, বুক পিঠ ছিল অজস্র কাঁটা। কান নাক হাতে, তেলো ছিল সবুজ সুগন্ধি পাতায় ছাওয়া। তখন আমার শরীর জুড়ে সাদা সুঘ্রাণ ফুল ফুটত। আর ফুল ঝরে গিয়ে কচি কচি সবুজ তাজা লেবু ফলত। আমি যখন লেবু গাছ ছিলাম তখন আপনি ছিলেন এত্তোটুকু ফুটফুটে একটা মেয়ে, আর রোজ গিয়ে লেবু ছিঁড়তেন আমার ডালপালা থেকে। আমার খুব দুঃখ ছিল যে আমার কোনো ঘর নেই, দালান নেই, শীতে গ্রীষ্মে বর্ষায় রোদে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় এক জায়গায়, কোথাও যাওয়ার জো নেই। আর তখনই আপনাকে দেখে আমি মনে মনে ভাবতাম, এবার একদিন আমি মরে যাবো। তখন এই ফুটফুটে মেয়েটার বিয়ে হবে আর আমি ওর কোলে আসব ছেলে হয়ে।’ মা আমার কথা খুব মন দিয়ে শোনে আর তার চোখ ছল ছল করে। বলে, তোর মাথায় ঘুঘু ডাকছে আবার।
হ্যাঁ আমার মাথায় মাঝে মাঝে ঘুঘু ডাকে। আমার সত্যি আজও কোনো ঘর নেই, দালান নেই। এসব নিয়ে আমি কখনও ভাবিওনি। মা বুঝতে পারতেন। আমাকে বৈষয়িক হতে বলতেন। একটা বাড়ির কথা বলতেন সবসময়। এটা মায়ের একটা অবসেশন ছিল। বলতেন একটা বাড়ি করবি জলপাই তলায়, পুরো চোদ্দ কাঠা জমির ঘেরওলা, ছ’টা আম, চারটে কাঁঠাল, একটা ডুমুর, সজনে, দশটা সুপুরি আর দশটা নারকোল গাছ লাগাবি, পিছনে থাকবে কলার ঝাড়। কুঞ্জলতা আমার বড় পছন্দ, বুঝলি! বেড়ার গায়ে গায়ে লতিয়ে দেব। তুই তো সিম খেতে ভালবাসিস- একটু সিমের মাচান করবি, গোয়ালঘরের চালের ওপর লকলকিয়ে উঠবে লাউডগা। তখন মায়ের সেসব কথাকে অর্থহীন মনে হয়েছিল। এখন আর তা মনে হয় না।
৩.
সেটা ছিল এক ভোরবেলা। শীতের তখন শুরু। একটা প্রকান্ড পোড়ো মাঠ আর ঢেউ ঢেউ টিলার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। নীল আলোয় মাখামাখি আকাশ, লুটোপুটি অঢেল নরম রোদ। মহুর্তের মধ্যে আমি গলে যাই, মিশে যাই চারধারের সাথে। সেই যে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম সে থেকে আজও সেইখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছি যেনো। যেনো কোনোদিনই পুরোপুরি ফিরে আসতে পারিনি। হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে, মনে হয়, একটা বিশাল শালগাছের ছায়ায় আমি দাঁড়িয়ে, চারদিকে ঢাউস ঘুড়ির মতো বড় বড় পাতা খসে পড়ছে শীতের বাতাসে, আর আলোর পুকুর থেকে উঠে আসছে পৃথিবীর টিলার ঢেউ, আর অকাজের পোড়ো মাঠ চিত হয়ে শুয়ে আছে নিশ্চিন্তে।
ছলাত ছলাত শব্দে মাঝি যখন নৌকো চালিয়ে যেতো আমি নৌকোর গুলুইর সামনে গিয়ে বসে থাকতাম। দিগন্ত বিস্তৃত ধু ধু  মাঠ ঘাট পানিতে ডুবে যেতো। তার উপর বড় বড় ঢেউ উঠত। মনে হতো যেনো মাহাসাগর। নৌকোর পাশ কেটে সরাত করে চলে যেতো ঢোরা সাপ। মা ভয় পেতেন, বলতেন ভিতরে আয় পরে যাবি। কিন্ত আমি ভয় পেতাম না। আমি খুউব ভালো সাতার কাটতে জানতাম। নদী আমার বড় আপন।
এখনও আমি মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি একটা খুব বড় নদী, তার এপার ওপার দেখা যায়না। তার একধারে একটা বিরাট বালিয়াড়ি, আর একটা স্টিমার বাঁধার জেটি। সেখানে কেউ নেই। বালির ওপর একটা কেবল সাপের খোলস পড়ে আছে। মা মারা যাওয়ার পর থেকে এই স্বপ্ন দেখি আমি। এক দিন ঘুমের মধ্যে ওই স্বপ্ন দেখে জেগে উঠি। আবার ঘুমোই, আবার সেই স্বপ্ন। বারবার স্বপ্নটা দেখে আর ঘুম হয় না। শুধু উঁচু বালিয়াড়ি, ধু ধু বালি গড়িয়ে নেমে গেছে, বলির শেষে দূর থেকে একটা কালো জেটি দেখা যায়। তারপর জল। খুব অথৈ জল, অনন্ত জল, প্রকান্ড নদীটা, তার ওপর কালো আকাশ ঝুঁকে আছে..।
১১ জানুয়ারী ২০১১

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত সংগীত, ছোটগল্প, কাব্য ও নাট্যসম্পদ
চিরাচরিত কুপ্রথা, কুসংস্কার, অনাচার, নৈতিক অবক্ষয় ও অনাসৃষ্টির মূলে কুঠারাঘাত
মিজানুর রহমান রানা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১২৬৮ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসের ২৫ তারিখে। এ দিবসে আমরা কবি গুরুর রচনাবলী তথা তাঁর অমর সৃষ্টি ছোটগল্প, কাব্য, গান ও নাট্যসম্পদের প্রতি আলোকপাত করলে দেখতে পাই, তিনি তাঁর রচিত ছোটগল্প, কাব্য, গান ও নাটকের মাধ্যমে সমাজের চিরাচরিত কুপ্রথা, কুসংস্কার, অনাচার, মানুষের মধ্যকার নৈতিক অবক্ষয়, অনাসৃষ্টি, অসঙ্গতির বিপরীতে চির নবীন, তরুণদের জাগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, “ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।” ‘আধমরা’ বলতে যারা সমাজে কুসংস্কার, অনাচার, নৈতিক অবক্ষয়, অনাসৃষ্টি ইত্যাদি দেখেও না দেখার ভান করে “আমার করার কী আছে” ভেবে চুপটি মেরে বসে থাকে তিনি সত্যিকার অর্থে তাদেরই বুঝিয়েছেন। আধমরাদের ‘ঘা মেরে’ সমাজ সংস্কারের জন্যে সর্বদা চিরনবীনদের এগিয়ে আসার জন্যে আহ্বান করেছেন তিনি।
কবি বিশ্বজুড়ে চির-নবীনদের বিজয় কেতন উড়াতে চেয়েছেন এবং তিনি নিজেও তা’ করেছেন। তাঁর সাহিত্য-সংগীত প্রতিভা ও অন্যসব অমর সৃষ্টির আজ আমাদের ভাবিয়ে তোলে। তিনি ‘গীতাঞ্জলি’র জন্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্ববাসীর দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছেন এবং বিশ্ববাসীর মনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ, আগ্রহ ফুটিয়ে তুলেছেন।
রবী ঠাকুর রচিত ছোটগল্প, গান, কাব্য ও নাট্যসম্পদের অতলে একবার ডুব সাঁতার কাটলে দেখা যায় যে, তিনি তাঁর প্রায় প্রতিটি রচনায়ই একটা বিষয় ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তা’ হলো সামাজিক অবক্ষয়, আনাচার, পারিবারিক সীমিত গণ্ডির বেড়াজাল ও অচলায়তন ভঙ্গের এক বাস্তবতা ও জীবনমুখী নানা চিত্রকর্ম। তিনি তাঁর সৃষ্টিশীল রচনার মাধ্যমে চিরাচরিত সামাজিক কুপ্রথা, অদৃষ্টবাদিতা, কুসংস্কার ও গোঁড়ামীর মর্মমূলে কুঠারাঘাত করেছেন। তার সাহিত্যকর্ম নাট্য-সঙ্গীতÑ সবখানেই তিনি দেখিয়েছেন মানুষ কীভাবে ধর্মের আবরণে নানা ছল-চাতুরীর আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। রবীন্দ্র রচনার সবখানেই তার প্রতিবাদী এক কণ্ঠস্বর বেজে ওঠতে দেখা যায়।
শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর ‘ঘাটের কথায়’ একজন সন্ন্যাসী ও এক গ্রামীণ মেয়ের অন্তরঙ্গতা দেখিয়েছেন, কীভাবে একজন সন্ন্যাসীর মধ্যে মানুষের সহজাত সবকিছু থেকেও শুধুমাত্র ধর্ম, উপাসনাকে ব্রত রাখতে গিয়ে তিনি মনের কোঠরে জমে থাকা মানুষের প্রতি ভালোবাসাকে ত্যাগ করে চলে গেছেন সুদূর পরবাসে। এভাবে রবীন্দ্রনাথ ‘হৈমন্তী’ নামক অনবদ্য গল্পেও সমাজ, সংস্কার, ধর্মের গোঁড়ামীর প্রতি মানুষের একরোখা অন্ধবিশ্বাস মানুষকে সমস্যার আবর্তে পড়ে কোথায় নিয়ে যায় তার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়েছেন। তিনি সেখানে দেখিয়েছেন, অপু তার বিয়ে করা স্ত্রী হৈমন্তীর প্রতি শুধুমাত্র সমাজ, সংস্কার ও লোকলজ্জার জন্যে যথার্থ দায়িত্ব পালনে উদাসীন থেকেছে। যদিও অপুর মনে স্ত্রী হৈমন্তীর প্রতি যথেষ্ঠ ভালোবাসা বিদ্যমান ছিলো তবুও অপু শুধুমাত্র সামাজিক চিরায়ত অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কারের বাইরে এসে বলতে পারেনি, মানি না তোমাদের কুসংস্কার, মানি না তোমাদের অন্ধবিশ্বাস-অবক্ষয়। বরং স্ত্রীর প্রতি মানসিক নির্যাতন, কটুকথার বান বা সামান্য বয়স নিয়ে বাড়াবাড়ি ইত্যাদি দেখে-শুনেও নীরবে তা’ হজম করেছে। আজকের সমাজে যার প্রতিফলন অহরহই দেখা যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের উত্থান এমনি এক সময় ও যুগের প্রেক্ষাপটে যেখানে মানুষের মধ্যে ছিলো ধর্ম, সমাজ-সংস্কারের নামে অধর্মের চরম অনুশাসন। তিনি জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করেও জমিদারি নিয়ে অতিমাত্রায় ব্যস্ত থাকেননি। তিনি সাধারণ মানুষের সাথে মিশেছেন, তাদের সুখ-দুঃখ হাসি-কান্না হৃদয়ে ধারণ করছেন। সর্বোপরি, তাঁর রচনায় তা’ প্রকাশ পেয়েছে নানাভাবে, নানা আঙ্গিকে। ‘বিলাসী’, ‘হৈমন্তী’ ‘শেষের কবিতা’ তার সেই চিন্তাধারারই বহিঃপ্রকাশ। ফলে তিনি তাঁর রচিত ‘মুক্তির উপায়’ গল্পে মানব মুক্তির উপায় বর্ণনা করছেন এভাবে ঃ “শোন্ রে শোন্, অবোধ মন।/ শোন্ সাধুর উক্তি, কিসে মুক্তি/সেই সুযুক্তি র্ক গ্রহণ।/ভবের শুক্তি ভেঙ্গে মুক্তি-মুক্তা র্ক অন্বেষণ’।/ওরে ও ভোলা মন, ভোলা মন রে।”
এবার আসি অন্য কথায়, রবীন্দ্রনাথের নাট্যসঙ্গীত, সাহিত্য রচনার ভাষা প্রয়োগশৈলী, রচনার বিষয়-অনুসঙ্গ নির্বাচন তাঁর সৃষ্টিকে করেছে অনবদ্য ও প্রাণবন্ত। স্বদেশের বৃত্তে যতটাই ছিলেন আবদ্ধ তেমনি বিশ্বজনীনতায় তিনি ছিলেন তারচেয়ে অনেকটা মুক্ত। তার জীবনাচয়নে এবং সৃষ্টির স্বাচ্ছন্দে তিনি ছিলেন অনন্য, অসাধারণ ও নির্মোহ। বর্তমান সমাজ ও সমাজের মানুষ সম্পর্কে তার ‘শেষের কবিতা’য় একটি কথা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন পরিষ্কারভাবে ঃ ‘অমিত কেবলই ছোটো লেখককে বড়ো করে বড়ো লেখককে খাটো করবার জন্যেই। অবজ্ঞার ঢাক পিটোবার কাজে তার শখ, তোমাকে সে করেছে তার ঢাকের কাঠি।’
যুগে যুগে সামাজিক অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার তথা জুজুর ভয় দেখিয়ে সমাজে এক শ্রেণীর হোমরা-চোমরাগণ মানুষকে ঢাকের কাঠি হিসেবে ব্যবহার করে নানাভাবে, নানা মাত্রায়। পরিষ্কারভাবে রবীন্দ্র সাহিত্যে আমরা সেসব চিত্র দেখতে পাই নানা আঙ্গিকে। সেসব চিত্র তিনি সমাজের মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছেন আঙ্গুল তুলে এবং সমাজের এসব নানা অসঙ্গতি, কুসংস্কারের মূলে তিনি কুঠারাঘাত করেছেন চরমভাবে।
“সকল ধর্ম সমাজেই এমন অনেক পুরাতন প্রথা সঞ্চিত হইতে থাকে। যার ভেতর হইতে প্রাণ সরে গেছে। অথচ চিরকালের অভ্যাসবশত মানুষ তাকেই প্রাণের সামগ্রী বলে আঁকড়িয়ে থাকে, তাতেও কোথাও তার অভ্যাস তৃপ্ত হয়, কিন্তু তার প্রাণের উপবাস ঘোচে না। এমন করিয়া অবশেষে এমন একদিন আসে যখন ধর্মের প্রতিই তার অশ্রদ্ধা জন্মে, একথা ভুলে যায় যাকে সে আশ্রয় করেছিলো তা’ ধর্মই নয়, ধর্মের পরিত্যক্ত আবর্জনা মাত্র। ” (রবীন্দ্র নাট্য সঙ্গীত: করুণাময় গোস্বামী)
রবী ঠাকুর ছিলেন মানবতাবাদী এক দার্শনিক। মানুষের প্রতি মানুষের সহজাত ভালোবাসা, ক্ষমার কথা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর সৃষ্টিকর্মে ঃ ‘যে আমারে দেখিবারে পায়/অসীম ক্ষমায়/ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,/এবার পূজার তারি আপনারে দিতে চাই বলি।’ (শেষের কবিতা)।
রবীন্দ্রনাথের রচনাবলী হতে বাংলাভাষার যে আনন্দ-বেদনাবোধ, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসার অনুষঙ্গগুলো ও মানবিক নানা অনুভূতির সুক্ষ্মরেখার পরিতৃপ্তি মিলে তা’ খুবই বিরল। তিনি বাংলাভাষার প্রাণ প্রতিষ্ঠাকল্পে নিজের দখলে সংরক্ষিত ভাষার মিল-অন্তমিল, কল্পচিত্র, উপমার এক সুবিশাল প্রান্তর সাধারণের জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তিনি বাংলাভাষার সবধরনের অন্তমিল আবিষ্কার করেন। তিনি ভাষাকে পুষ্পমাল্যের মতো আদর-মমতায় পরতে পরতে গেঁথে, শব্দের সুস্পষ্ট আলোড়ন তুলে তা’ তাঁর  অমর সাহিত্যকর্ম ও গানের মাধ্যমে উপস্থাপনা করেছিলেন প্রবল ছন্দময় সৃষ্টিতে যা ছিলো অভূতপূর্ব।
বাংলাভাষার এক প্রনিধানযোগ্য কবি আল-মাহমুদ তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘রবীন্দ্রভাষা এমনিতেই মর্মস্পশী, সেই সময়ের জন্য ছিল শব্দে-গন্ধে, ছন্দের লালিত্যে এক অভিনব ভাষার আবিষ্কারের আনন্দঘন শিহরণ। সমক্ষক আর কোনো কবির কথা রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি উত্থাপন করা যায় না। আধুনিক বাংলাভাষার মধুরতম শিহরণ সৃষ্টিকারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজেই। তার সঙ্গে মিশেছিল আত্মবিশ্বাস, আত্মসমর্পণ ও শব্দ বিষয়ে সুবিবেচনার লক্ষণগুলো। এর মধ্যে তার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আকর্ষকিতায় সমগ্র ভারতবর্ষই দারুণ অহংকারে স্ফীত হয়ে উঠেছিল ...এভাবেই রবীন্দ্রনাথ এক বিশ্বজয়ী কবি প্রতিভার দুর্লভ খ্যাতি অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। এটা আকস্মিকভাবে ঘটে গেলেও রবীন্দ্রনাথ নিজেকে এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিলেন। এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাভাষার চরম আনন্দ ও আশার বাণী বেজে উঠেছিল রবীন্দ্র কণ্ঠস্বরে। বাংলা কবিতার সব অলিগলি এমনকি গদ্য ভঙ্গিটিও রবীন্দ্রকাব্যে আমরা দেখতে পাই। সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ঘটনা হলো, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় গভীর আস্থাশীলতার অসংকোচ প্রকাশ। এমন দিক নেই যা রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষার জন্য উদ্ঘাটন করেননি। এমনকি গীতি-নৃত্যে রবীন্দ্রনাথের যে স্বার্থকতা তৎকালীন বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছিল সেটা এককভাবে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করেছিলেন। ”
বিদেশী আর্ট ক্রিষ্টিরা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বলেছেন, ‘এতদিন ধরে আমরা যা করার চেষ্টা করেছি, তুমি তাই করেছো।’ আবার কেউ কেউ বলেছিলেন, ‘তুমি যে কত বড়ো আমরা তা’ জানতাম, কিন্তু তুমি যে সত্যই এতই বড়ো তা’ জানতাম না।’ বার্লিনে ন্যাশনাল গ্যালারী রবীন্দনাথের কয়েকটি চিত্রকর্ম কিনে রেখে দিয়েছিলো। জীবিত অবস্থায় এই সম্মান ওদের কাছ থেকে ছিলো বিরল; যা তারা কোনো চিত্রকরকে জীবিত অবস্থায় দেয়নি।
তৎকালীন সময়ে রবীন্দ্রনাথের চারদিকে প্রচুরমাত্রায় খ্যাতি থাকলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মোহহীন। তিনি জানতেন তার সত্যিকার পরিচয়, বাঙালি। তখনকার আত্মনিমগ্ন, কুসংস্কারপ্রবণ ও গোঁড়ামীতে পরিপূর্ণ বাঙালি জাতি নিয়ে তার মনে ছিলো অত্যন্ত বেদনাবোধ। কিন্তু যখন সাহিত্য ক্ষেত্রে বাঙালির কৃতিত্বের কথা উঠত তখন তার মুখমণ্ডল উজ্জ্বল আভা পেত। তিনি বলতেন, ইংরেজ না এলেও বাংলাদেশে এ সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বন্যা আসতই। বাংলাভাষার জন্যে, বাঙালি জাতির জন্যে যিনি এতোটা দায়িত্ব বহন করেছিলেন তিনি যেন জানতে চান বাঙালি জাতি তাকে কতটা গ্রহণ করেছে। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, শীতলক্ষ্যার পাড় ঘেঁষে সাধারণ মানুষের যে জীবনগাঁথা, তারা যে রবীন্দ্রনাথেরই পরম আতœীয়। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত যে তারই শিল্পময় হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় রচিত। বাংলাকে তিনি গভীর ভালোবাসতেন বলে বারবার ছুঁটে এসেছেন এদেশের প্রতিটি জনপদে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তরে বসে তিনি রচনা করেছেন তার সাহিত্য-শিল্প কর্ম। কবি তাই বলেন, ‘তোমার অন্তরে পড়েছে আমার ছায়া, তার সঙ্গে মিলেছে তোমার আনন্দের দীপ্তি, তারই উপলব্ধিতে আমার অন্তরতম কবি উল্লসিত। পদে পদে তোমার আনন্দের ছটায় আমার প্রাণে করে ভাষার সঞ্চার। আমার মন জাগে তোমার ভালোবাসার প্রবাহবেগে, তার প্রেরণায় আমার যথার্থ স্বরূপকে জানি। তোমাতেই পাই আমার প্রকাশরূপিণী বাণীকে।’ শতবর্ষেরও অধিককাল ধরে রবীন্দ্রসাহিত্য-ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গান ইত্যাদির ওপর বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও আঙ্গিকে বিচার-বিবেচনা করা হয়েছে। নাট্যতত্ত্বের ক্ষেত্রে রবীন্দ্র-ছোটগল্পের ওপর দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই যে, এর মধ্যে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনার এক প্রান্তর। যে প্রান্তরের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। কে যেন বলেছিলেন, ‘আমি যদি সারাটি জীবনও রবীন্দ্রনাথের রচিত সাহিত্য, নাট্যসম্পদ নিয়ে গবেষণা করতে যাই এবং সেগুলো পাঠ করতে থাকি তাহলে এই জীবনে তা’ কুলিয়ে উঠতে পারব না, নতুন আরেক জন্ম লাগবে।’ যথার্থও তাই। রবীন্দ্রনাথের রচনা যে সাগরের মতো বিশাল।
রবীন্দ্রনাথের রচিত ছোট গল্প ও নাটকগুলো যদিও ভিন্ন অনুসঙ্গ তবুও তার ছোটগল্পগুলো এমনভাবে লিখিত যে, অনায়াসেই ইচ্ছে করলে তার এ ছোটগল্পগুলোকে নাট্যরূপ সম্ভব। তার ছোটগল্পগুলোর কাহিনীবিন্যাস, পটভূমি এমনভাবে করা হয়েছে যে, তার ছোটগল্পকেই নাটকের অসম্পূর্ণ টেক্সট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকে। এ প্রসঙ্গে বিশ্বজিত ঘোষ বলেন, “জীবন-রহস্যের পরিচয়, দৃশ্যগুণ, সংঘাত, চিত্র ও কাব্যধর্ম, সংলাপ, ঘটনার বৈপরীত্য ও নানামাত্রিক ফ্রেম, সেট-ডিজাইনÑএইসব মাত্রায় বিবেচনা করলে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের নাট্য-সম্ভাবনা আবিষ্কার সহজ হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের প্রায় প্রতিটি ছোটগল্পে জীবন-রহস্যের যে ছায়াপাত আছে, উত্তরকালের পাঠককে তা’ নতুনভাবে আবিষ্কার করে নিতে হয়। ‘পোস্টমাস্টার’ বা ‘কাবুলিওয়ালা’ কিংবা ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ কি ‘জীবিত ও মৃত’Ñ এসব গল্পে জীবনরহস্যের যে পরিচয় আছে, সেখানে লুকিয়ে আছে নাটকীয়তার অপার সম্ভাবনা। রবীন্দ্রগল্পের গোপন রহস্যকে একালের সৃষ্টিশীল নাট্যকার নতুনভাবে দৃশ্যমান করে তুলতে পারেন।”
পরিশেষে বলবো, কোনো প্রকার আবেগের বশবর্তী না হয়ে নিরপেক্ষ ভূমিকা অবলম্বন করে আমাদের স্বার্থে, ভাষার স্বার্থে রবী ঠাকুরকে সত্যিকার অর্থে আমাদের জানতে হবে। তাঁর অমর রচনাবলীকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করে, বুঝে, শুনে এর সঠিক মর্ম অবগত হয়েই আমরা পারি তাঁর সঠিক মূল্যায়ন করতে। অন্যথায় তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। আর যে সমাজ গুণী মানুষের কদর করে না সে সমাজ ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর। ফলে আমাদের স্বার্থেই তাঁর প্রতি যথার্থ মূল্যায়ন করবোÑ এটাই প্রত্যাশা।
লেখক পরিচিতি ঃ মিজানুর রহমান রানা, বিভাগীয় সম্পাদক (সাহিত্য পাতা ও পাঠক ফোরাম), দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ, চাঁদপুর। ০১১৯৫৪২৯৭৮৫

নাটকে নজরুল-আফসার আহমদ

কাজী নজরুল ইসলামের নাটকে জীবনের হুবহু অনুকরণ ঘটেনি, তা হয়েছে জীবনের ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যা কাব্যের অনুপম ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ হয়ে জীবনকেই তুলে ধরেছে। নজরুল বাংলা নাট্যরচনার ধারায় হাজার বছরের বাংলানাট্যের সংগীতময়তাকে আধুনিককালের প্রেক্ষাপটে দাঁড় করাতে পেরেছেন। কারণ নজরুলের নাটকের ভাষা কাব্যগন্ধী এবং গীতায়ন গীত ও কাব্যের বঙ্গীয় রূপটি নজরুল সর্বশেষে স্পর্শ করতে চেয়েছেন বলে হয়তো তাঁর ভেতরের গীত সুধারসের ধারায় তা প্লাবিত হয়ে গেছে। সুরের এই প্লাবন হয়তো অনেকের কাছেই তাঁকে সার্থক নাট্যকার হিসেবে চিহ্নিত হতে দেয়নি। সে ত্রুটি কবির নয়, তা ঔপনিবেশিক শিল্পভাবনাপুষ্ট সমালোচকদের। কারণ তাঁরা যে বাংলাদেশের হাজার বছরের গেয়মূলক পরিবেশনার খোঁজ রাখতে চান না।
কাজী নজরুল ইসলাম জীবনের শুরুতে জীবিকার তাগিদে যোগ দিয়েছিলেন গ্রাম্য লেটো গানের দলে। লেটো গানের মধ্যে পাচনা পালা এবং লোকজীবনের সঙ্গে অঙ্গীকৃত সব ভাবনার মহৎ প্রকাশ ঘটে। ফলে বালক নজরুলের মধ্যে সেই যে বাংলাদেশের প্রাণের সুরধারা প্রতিষ্ঠা পেল তা সারাটা জীবন তাঁকে তাড়িয়ে নিয়েছে নতুন নতুন সৃষ্টিশীলতায়। লেটো গানে পালা রচনার মধ্য দিয়ে নজরুলের নাট্য-প্রতিভার যাত্রা ঘটেছে বলেই সুর ও কাব্য তাঁর পরিণত জীবনে লেখা নাট্য থেকে বিসর্জিত হয়নি। এই ক্ষেত্রে আমরা রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ উত্তরসূরি তাঁকে বলতে পারি এ জন্য যে রবীন্দ্রনাথের মতোই সুর ও কাব্যময়তাকে বাঙালির শিল্পভাবনার উেসর কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন নজরুল। বালক কবির হাতে রচিত লেটো গানের পালার আধুনিক রূপায়ণ ঘটেছে আলেয়া, ঝিলিমিলি, শিল্পী, সেতুবন্ধ, মধুমালা প্রভৃতি নাটকে।
কবি-জীবনের শুরুতে নজরুল দর্শকপ্রিয়তাকে মূল বিবেচনায় রেখে রচনা করেছিলেন দাতা কর্ণ, শকুনি বধ, চাষার সং, মেঘনাদবধ, কবি কালিদাস, আকবর বাদশা প্রভৃতি নাট্যপালা। পালাগানগুলো তিনি আসরে সুর, সংলাপ ও অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করতেন। জীবনের নানা বাঁকে কত যন্ত্রণা সয়েছেন, কত মানুষই তাঁকে ছেড়ে গেছে, কিন্তু সুর তাঁকে ছাড়েনি। তা আরও পরিণত হয়ে উঠেছে। নতুন নতুন নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে কবি তাঁর নাট্যভাবনাকে পরিণতির দিকে নিয়ে গেছেন। এর একটি উদাহরণ ১৯২৮ সালে গ্রামোফোন কোম্পানির জন্য একাঙ্কিকা ও রেকর্ড-নাট্য রচনার প্রচেষ্টা। একেবারেই বৈষয়িক প্রয়োজনে কবি নাটিকাগুলো রচনা করেছিলেন, তাতে সুরের মধ্য দিয়ে শ্রোতার সামনে বহু চিত্রকল্পের সমাহার ঘটেছে। এভাবে তাঁর গাননির্ভর নাট্যও সেই বালক নজরুলের ঐতিহ্যমনস্ক কবির বিচিত্র ভুবনের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠতে থাকে। কবির এ পর্যায়ের রচনাগুলো অপ্রধান হলেও উল্লেখের দাবি রাখে। আজ পর্যন্ত প্রাপ্ত একাঙ্কিকা ও রেকর্ড-নাট্যের মধ্যে রয়েছে ছিনিমিনি খেলা, খুকী ও কাঠবেড়ালী, জুজুবুড়ির ভয়, পুতুলের বিয়ে, শ্রীমন্ত, আল্লার রহম, কবির লড়াই, কলির কেষ্ট, কানামাছি ভোঁ ভোঁ, বনের বেদে। সময়টি নজরুলের নাট্যরচনার প্রক্রিয়াকাল।
নজরুলের নাট্যরচনার পরিণতি ও সমৃদ্ধি ঘটেছে নাট্যমঞ্চের সঙ্গে কবির সরাসরি সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। তিনি এ সময় উপলব্ধি করেছেন, মঞ্চ ছাড়া নাটকের প্রায়োগিক শৈলী কখনোই শরীরী হয়ে ওঠে না। এভাবে তাঁর নাটক বাংলা নাট্যের হাজার বছরের রূপটি অঙ্গীকরণপূর্বক আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠেছে। সংস্কৃত নাট্যের দৃশ্যকাব্য কথাটি হয়তো নজরুলের বিবেচনাকে ঋদ্ধ করেছিল। তিনি মঞ্চায়নের বিষয়টিকে শুধু বড় করে দেখেননি, নাটকের পাঠযোগ্যতাকেও বিবেচনায় রেখেছেন। দেখা ও শোনার এই অদ্বৈত রূপটি গড়ে উঠেছে বাংলা নাটকের হাজার বছরের সংগীতময়তাকে কেন্দ্রে রেখে। এখানেই নজরুলের স্বাতন্ত্র্য এবং শিল্পসিদ্ধি। বাংলা নাট্যের বিকাশ ও বিবর্তনে নাট্যকার হিসেবে নজরুলের অবস্থানকে চিহ্নিত করতে গেলে এই শিল্পবোধের পুনঃপাঠ প্রয়োজন।
কাজী নজরুল ইসলাম যে সময়ে নাটক রচনায় হাত দিয়েছেন তাঁর অব্যবহিত পূর্বকালেই রবীন্দ্রনাট্যের জয়যাত্রা শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় শিল্পরীতির আলোয় পরিস্নাত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাট্য-প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছে। ইউরোপমনস্ক সমালোচকেরা যেমন করে রবীন্দ্রনাট্যের রূপক-সংকেত বিশ্লেষণ করেন, সেই দৃষ্টিভঙ্গির ধোঁয়ায় নজরুলের নাটকের স্বতন্ত্র রীতিটি হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুল ইউরোপীয় রূপক-সাংকেতিকতার আদলে কোনো নাটক রচনা করেননি। রূপক কিংবা সাংকেতিকতা তাঁদের নাটকের মূল অবলম্বন নয়, মূল শিল্পভাবনার বিচ্ছুরণ মাত্র। রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের নাটক বিচারের ক্ষেত্রে আমরা বরং একেবারেই প্রাচ্য ঘরানার শিল্পতত্ত্বের উত্থান লক্ষ করি। রূপক-সাংকেতিকতার ভাবনাটি ইউরোপীয় শিল্পতত্ত্ব থেকে আলাদা হয়ে আমাদের শিল্পভাবনার সঙ্গে অঙ্গীকৃত হয়েছে।
নজরুলের আলেয়া সেকালে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। গ্রামীণ জনপদের বিরান প্রান্তরে, বিলের ধারে হঠাৎ জ্বলেই আবার হারিয়ে আলেয়া। মানুষের মনেও হঠাৎ প্রেমের শিখা জ্বলে ওঠে এবং তা অনির্দেশ্য কোনো বেলাভূমিতে আবার হারিয়ে যায়। এসব বিবেচনায় এটিকে প্রতীকী নাটক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই মতটির সঙ্গে আমাদের খুব বেশি বিরোধিতা নেই। কিন্তু গীতিপ্রাবল্যের কারণে এই নাটককে গীতিনাট্য নামে অভিহিত করলেই আমাদের মধ্যে শিল্পবিচারের মাপকাঠি নিয়ে মতদ্বৈধ তৈরি হয়। গীতের আধিক্য গীতিনাট্য হলে বাংলাদেশের হাজার বছরের আসরে পরিবেশনামূলক গেয় কাব্যের অভিনয়রূপটি মিছে হয়ে যায়। কারণ হাজার বছরের বাংলানাট্যের প্রাণটি লুকিয়ে রয়েছে গীতের শরীরে। তাই গীতিনাটক নয় তা বাঙালির হাজার বছরের নাট্যরীতি। এই বিচারে নজরুলের আলেয়া গীতিনাটক নয়, পরিপূর্ণ নাটক। গীত তার অবলম্বন, যেমন শরীরকে অবলম্বন করে থাকে আত্মা। নাটকের গঠনকাঠামোর মধ্যেই আলেয়া নাটকের সংগীত প্রোথিত বলে তা নাট্যের বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।
আলেয়া নাটক প্রেমের আখ্যানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই নাটকের নায়িকা জয়ন্তীর প্রেম ব্যাকুলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং আবেগের তীব্রতা শেষ পর্যন্ত নাট্যঘটনায় ট্র্যাজিক আবর্ত তৈরি করেছে। জয়ন্তী, মীনকেতু এবং উগ্রাদিত্যের ত্রিভুজ প্রণয়কাহিনি নাটকের আখ্যানকে পরিণামমুখী করেছে। কিন্তু জয়ন্তী আসলে কাকে ভালোবাসে তা নিরূপিত নয়। এ যেন রবীন্দ্রনাথের মায়ার খেলা নাটকের প্রতিচ্ছবি। তবে গল্পের জটিলতা ও নাট্যের তীব্র গতির কারণে এটি স্বতন্ত্র ও অনবদ্য হয়ে ওঠে। আলেয়া নাটকের সংলাপ রচিত হয়েছে গীত ও কাব্যের দ্বৈত বন্ধনে।
বাস্তবতা ও কল্পনার মিশেলে লেখা নজরুলের আরেকটি নাটক ঝিলিমিলি। বাস্তবজীবনের প্রেম ও বিরহকে কেন্দ্র করে এটি লেখা। নজরুল যতই রোমান্টিক কিংবা বাস্তববুদ্ধিবিবর্জিত হোন না কেন ঝিলিমিলি নাটকের প্রেম হেরে গেছে বাস্তবের কাছে। এ নাটককে রূপক বলা যেতে পারে এই অর্থে যে তা প্রাচ্য শিল্পভাবনাজাত জীবন ও প্রেমের নবতর ব্যাখ্যা, ঘটনার অন্ধ অনুকরণ নয়। এই কথিত রূপক সাংকেতিক ধারার আর একটি নাটক সেতুবন্ধ।
সেতুবন্ধ তিন দৃশ্যের একটি একাঙ্কিকা। আমরা এই নাটকে দেখি প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলে প্রকৃতি কীভাবে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। অনেকেই রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারার সঙ্গে এর সাদৃশ্য খুঁজতে পারেন। কিন্তু এই নাটকে নজরুল ইসলাম মানব জীবনের সংগ্রামী উত্থানকে ভিন্নতর দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। নদীর ওপরে সেতু নির্মাণ করে নদী শাসন করাকে কেন্দ্র করে এই নাটকের গল্প রচিত হয়েছে। নাটকের শেষে এভাবে প্রকৃতির বিজয় ঘোষিত হয়েছে। পদ্মা যন্ত্রকে বলেছে, ‘জানি যন্ত্ররাজ। তুমি বারে বারে আসবে, কিন্তু প্রতিবারেই তোমায় এমনি লাঞ্ছনার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ফিরে যেতে হবে।’
নজরুলমানসের একবারেই ভিন্নরূপ দেখি মধুমালায়। নজরুল রূপকথার মধুমালা-মদনকুমার, কাঞ্চনমালার গল্প নিয়ে মধুমালা নাটক রচনা করেছেন। রূপকথার অনিবার্য সংগীতময়তাকে মূল বিবেচনায় রেখে এই নাটকে নজরুল বহুসংখ্যক গানের সম্মিলন ঘটিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, নাটকটির গদ্য সংলাপও সুর ও কাব্যের মিলমিশে অগ্রসর হয়েছে। এই নাটকের চরিত্রগুলো বাস্তবতার ঘাত-প্রতিঘাতে বেড়ে উঠেছে। রূপকথার চরিত্রগুলো পার্থিব সংসারের মধ্যে স্বপ্নের আবহ তৈরি করেছে। স্বপ্নে দেখা অপরূপা রাজকন্যা মধুমালার সন্ধানে অজানার উদ্দেশে বের হয় মদনকুমার। পথে আরেক রাজকন্যা কাঞ্চনমালার সঙ্গে পরিচয় ও প্রণয়। তারপর কাঞ্চনমালাকে রেখে আবার মধুমালার সন্ধানে চলে যায় মদনকুমার। অবশেষে মধুমালার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটে। মধুমালা ও মদনকুমার সমুদ্রপাড়ে বেড়াতে গিয়ে বিষণ্ন যোগিনী কাঞ্চনমালাকে দেখে। মধুমালা কাঞ্চনমালার পরিচয় পেয়ে উপলব্ধি করে ক্লিন্ন বাস্তব সংসারে তার এবং মদনকুমারের প্রেম সার্থক হবে না। মধুমালা সাগরের জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।
নজরুল শিল্পবোধের কালোচিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে রূপকথার একটি যৌক্তিক পরম্পরা তৈরি করেছেন। কারণ শাশ্বত এবং আদ্য সৌন্দর্য কারও ভোগ্য হতে পারে না। এ যেন পৌরাণিক নারী উর্বশী, যে কারও স্ত্রী, কন্যা বা মা নয়। আদ্য সৌন্দর্যের প্রতীক মধুমালা তাই সাগর জলে হারিয়ে যায়। এই নাটকের সংলাপ সুরেলা ও কাব্যময়। এ যেন আবহমান রূপকথার আধুনিক রূপ। নাটকটিতে রূপকথার আবেদন রয়েছে, কল্পনার চরিত্রগুলোর বিকৃতি ঘটেনি। যাঁরা বাংলানাট্যের মূল প্রণোদনাকে উপলব্ধি না করে মধুমালা নাটককেও গীতিনাট্য বলতে চান তাঁদের ঔপনিবেশিক মানসিকতাপুষ্ট শিল্পবিচারকে বড়জোর করুণা করা যায়, প্রশংসা নয়। নজরুলের মধুমালা দৃশ্য ও কাব্যের সংমিশ্রণে গঠিত বলে এটি সত্যিকার অর্থেই দৃশ্যকাব্য। গীত ও সংলাপের মধ্য দিয়ে এই নাটকের চরিত্রগুলো ক্রমাগত গঠিত হয়েছে। রূপকথা কিংবা ঐতিহ্যের ভেতরে থেকেই নাট্যচরিত্র ও নাট্যঘটনা বিনির্মিত হয়ে সম্পন্ন হয়েছে ঐতিহ্যের আধুনিক ও বিশ্বাসযোগ্য নাট্য নির্মিতি।
নজরুলের নাটক বিচার করতে হবে হাজার বছরের নৃত্যগীত ও কাব্যময় বাংলা নাট্যের প্রেক্ষাপটে। উনিশ শতকের ইউরোপীয় ক্লিশে নাট্যধারার অনুকৃতির বদলে বাংলা নাটকের শাশ্বতকালের সুরধর্মিতা অঙ্গীকরণের ফলে নজরুলের নাটকের সচেতন গীতবহুলতা তাঁকে স্বতন্ত্র করেছে। সে ক্ষেত্রে বাংলা নাট্যধারায় কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উত্তরসূরি। নজরুল হাজার বছরের আখ্যানধর্মী বাংলা নাট্যের সুর ও কাব্যভাষাকেই অন্বিষ্ট ভেবেছেন ঐতিহ্যের অনুপ্রেরণায়। কাজী নজরুল ইসলামের নাটক বিশ্লেষণে এই শিল্পবিবেচনাটি আজকের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার দাবি রাখে। কাজী নজরুল ইসলামের নাটকে জীবনের হুবহু অনুকরণ ঘটেনি, তা হয়েছে জীবনের ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যা কাব্যের অনুপম ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ হয়ে জীবনকেই তুলে ধরেছে। নজরুল বাংলা নাট্যরচনার ধারায় হাজার বছরের বাংলানাট্যের সংগীতময়তাকে আধুনিককালের প্রেক্ষাপটে দাঁড় করাতে পেরেছেন। কারণ নজরুলের নাটকের ভাষা কাব্যগন্ধী এবং গীতায়ন গীত ও কাব্যের বঙ্গীয় রূপটি নজরুল সর্বশেষে স্পর্শ করতে চেয়েছেন বলে হয়তো তাঁর ভেতরের গীত সুধারসের ধারায় তা প্লাবিত হয়ে গেছে। সুরের এই প্লাবন হয়তো অনেকের কাছেই তাঁকে সার্থক নাট্যকার হিসেবে চিহ্নিত হতে দেয়নি। সে ত্রুটি কবির নয়, তা ঔপনিবেশিক শিল্পভাবনাপুষ্ট সমালোচকদের। কারণ তাঁরা যে বাংলাদেশের হাজার বছরের গেয়মূলক পরিবেশনার খোঁজ রাখতে চান না।
কাজী নজরুল ইসলাম জীবনের শুরুতে জীবিকার তাগিদে যোগ দিয়েছিলেন গ্রাম্য লেটো গানের দলে। লেটো গানের মধ্যে পাচনা পালা এবং লোকজীবনের সঙ্গে অঙ্গীকৃত সব ভাবনার মহৎ প্রকাশ ঘটে। ফলে বালক নজরুলের মধ্যে সেই যে বাংলাদেশের প্রাণের সুরধারা প্রতিষ্ঠা পেল তা সারাটা জীবন তাঁকে তাড়িয়ে নিয়েছে নতুন নতুন সৃষ্টিশীলতায়। লেটো গানে পালা রচনার মধ্য দিয়ে নজরুলের নাট্য-প্রতিভার যাত্রা ঘটেছে বলেই সুর ও কাব্য তাঁর পরিণত জীবনে লেখা নাট্য থেকে বিসর্জিত হয়নি। এই ক্ষেত্রে আমরা রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ উত্তরসূরি তাঁকে বলতে পারি এ জন্য যে রবীন্দ্রনাথের মতোই সুর ও কাব্যময়তাকে বাঙালির শিল্পভাবনার উেসর কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন নজরুল। বালক কবির হাতে রচিত লেটো গানের পালার আধুনিক রূপায়ণ ঘটেছে আলেয়া, ঝিলিমিলি, শিল্পী, সেতুবন্ধ, মধুমালা প্রভৃতি নাটকে।
কবি-জীবনের শুরুতে নজরুল দর্শকপ্রিয়তাকে মূল বিবেচনায় রেখে রচনা করেছিলেন দাতা কর্ণ, শকুনি বধ, চাষার সং, মেঘনাদবধ, কবি কালিদাস, আকবর বাদশা প্রভৃতি নাট্যপালা। পালাগানগুলো তিনি আসরে সুর, সংলাপ ও অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করতেন। জীবনের নানা বাঁকে কত যন্ত্রণা সয়েছেন, কত মানুষই তাঁকে ছেড়ে গেছে, কিন্তু সুর তাঁকে ছাড়েনি। তা আরও পরিণত হয়ে উঠেছে। নতুন নতুন নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে কবি তাঁর নাট্যভাবনাকে পরিণতির দিকে নিয়ে গেছেন। এর একটি উদাহরণ ১৯২৮ সালে গ্রামোফোন কোম্পানির জন্য একাঙ্কিকা ও রেকর্ড-নাট্য রচনার প্রচেষ্টা। একেবারেই বৈষয়িক প্রয়োজনে কবি নাটিকাগুলো রচনা করেছিলেন, তাতে সুরের মধ্য দিয়ে শ্রোতার সামনে বহু চিত্রকল্পের সমাহার ঘটেছে। এভাবে তাঁর গাননির্ভর নাট্যও সেই বালক নজরুলের ঐতিহ্যমনস্ক কবির বিচিত্র ভুবনের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠতে থাকে। কবির এ পর্যায়ের রচনাগুলো অপ্রধান হলেও উল্লেখের দাবি রাখে। আজ পর্যন্ত প্রাপ্ত একাঙ্কিকা ও রেকর্ড-নাট্যের মধ্যে রয়েছে ছিনিমিনি খেলা, খুকী ও কাঠবেড়ালী, জুজুবুড়ির ভয়, পুতুলের বিয়ে, শ্রীমন্ত, আল্লার রহম, কবির লড়াই, কলির কেষ্ট, কানামাছি ভোঁ ভোঁ, বনের বেদে। সময়টি নজরুলের নাট্যরচনার প্রক্রিয়াকাল।
নজরুলের নাট্যরচনার পরিণতি ও সমৃদ্ধি ঘটেছে নাট্যমঞ্চের সঙ্গে কবির সরাসরি সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। তিনি এ সময় উপলব্ধি করেছেন, মঞ্চ ছাড়া নাটকের প্রায়োগিক শৈলী কখনোই শরীরী হয়ে ওঠে না। এভাবে তাঁর নাটক বাংলা নাট্যের হাজার বছরের রূপটি অঙ্গীকরণপূর্বক আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠেছে। সংস্কৃত নাট্যের দৃশ্যকাব্য কথাটি হয়তো নজরুলের বিবেচনাকে ঋদ্ধ করেছিল। তিনি মঞ্চায়নের বিষয়টিকে শুধু বড় করে দেখেননি, নাটকের পাঠযোগ্যতাকেও বিবেচনায় রেখেছেন। দেখা ও শোনার এই অদ্বৈত রূপটি গড়ে উঠেছে বাংলা নাটকের হাজার বছরের সংগীতময়তাকে কেন্দ্রে রেখে। এখানেই নজরুলের স্বাতন্ত্র্য এবং শিল্পসিদ্ধি। বাংলা নাট্যের বিকাশ ও বিবর্তনে নাট্যকার হিসেবে নজরুলের অবস্থানকে চিহ্নিত করতে গেলে এই শিল্পবোধের পুনঃপাঠ প্রয়োজন।
কাজী নজরুল ইসলাম যে সময়ে নাটক রচনায় হাত দিয়েছেন তাঁর অব্যবহিত পূর্বকালেই রবীন্দ্রনাট্যের জয়যাত্রা শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় শিল্পরীতির আলোয় পরিস্নাত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাট্য-প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছে। ইউরোপমনস্ক সমালোচকেরা যেমন করে রবীন্দ্রনাট্যের রূপক-সংকেত বিশ্লেষণ করেন, সেই দৃষ্টিভঙ্গির ধোঁয়ায় নজরুলের নাটকের স্বতন্ত্র রীতিটি হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুল ইউরোপীয় রূপক-সাংকেতিকতার আদলে কোনো নাটক রচনা করেননি। রূপক কিংবা সাংকেতিকতা তাঁদের নাটকের মূল অবলম্বন নয়, মূল শিল্পভাবনার বিচ্ছুরণ মাত্র। রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের নাটক বিচারের ক্ষেত্রে আমরা বরং একেবারেই প্রাচ্য ঘরানার শিল্পতত্ত্বের উত্থান লক্ষ করি। রূপক-সাংকেতিকতার ভাবনাটি ইউরোপীয় শিল্পতত্ত্ব থেকে আলাদা হয়ে আমাদের শিল্পভাবনার সঙ্গে অঙ্গীকৃত হয়েছে।
নজরুলের আলেয়া সেকালে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। গ্রামীণ জনপদের বিরান প্রান্তরে, বিলের ধারে হঠাৎ জ্বলেই আবার হারিয়ে আলেয়া। মানুষের মনেও হঠাৎ প্রেমের শিখা জ্বলে ওঠে এবং তা অনির্দেশ্য কোনো বেলাভূমিতে আবার হারিয়ে যায়। এসব বিবেচনায় এটিকে প্রতীকী নাটক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই মতটির সঙ্গে আমাদের খুব বেশি বিরোধিতা নেই। কিন্তু গীতিপ্রাবল্যের কারণে এই নাটককে গীতিনাট্য নামে অভিহিত করলেই আমাদের মধ্যে শিল্পবিচারের মাপকাঠি নিয়ে মতদ্বৈধ তৈরি হয়। গীতের আধিক্য গীতিনাট্য হলে বাংলাদেশের হাজার বছরের আসরে পরিবেশনামূলক গেয় কাব্যের অভিনয়রূপটি মিছে হয়ে যায়। কারণ হাজার বছরের বাংলানাট্যের প্রাণটি লুকিয়ে রয়েছে গীতের শরীরে। তাই গীতিনাটক নয় তা বাঙালির হাজার বছরের নাট্যরীতি। এই বিচারে নজরুলের আলেয়া গীতিনাটক নয়, পরিপূর্ণ নাটক। গীত তার অবলম্বন, যেমন শরীরকে অবলম্বন করে থাকে আত্মা। নাটকের গঠনকাঠামোর মধ্যেই আলেয়া নাটকের সংগীত প্রোথিত বলে তা নাট্যের বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।
আলেয়া নাটক প্রেমের আখ্যানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই নাটকের নায়িকা জয়ন্তীর প্রেম ব্যাকুলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং আবেগের তীব্রতা শেষ পর্যন্ত নাট্যঘটনায় ট্র্যাজিক আবর্ত তৈরি করেছে। জয়ন্তী, মীনকেতু এবং উগ্রাদিত্যের ত্রিভুজ প্রণয়কাহিনি নাটকের আখ্যানকে পরিণামমুখী করেছে। কিন্তু জয়ন্তী আসলে কাকে ভালোবাসে তা নিরূপিত নয়। এ যেন রবীন্দ্রনাথের মায়ার খেলা নাটকের প্রতিচ্ছবি। তবে গল্পের জটিলতা ও নাট্যের তীব্র গতির কারণে এটি স্বতন্ত্র ও অনবদ্য হয়ে ওঠে। আলেয়া নাটকের সংলাপ রচিত হয়েছে গীত ও কাব্যের দ্বৈত বন্ধনে।
বাস্তবতা ও কল্পনার মিশেলে লেখা নজরুলের আরেকটি নাটক ঝিলিমিলি। বাস্তবজীবনের প্রেম ও বিরহকে কেন্দ্র করে এটি লেখা। নজরুল যতই রোমান্টিক কিংবা বাস্তববুদ্ধিবিবর্জিত হোন না কেন ঝিলিমিলি নাটকের প্রেম হেরে গেছে বাস্তবের কাছে। এ নাটককে রূপক বলা যেতে পারে এই অর্থে যে তা প্রাচ্য শিল্পভাবনাজাত জীবন ও প্রেমের নবতর ব্যাখ্যা, ঘটনার অন্ধ অনুকরণ নয়। এই কথিত রূপক সাংকেতিক ধারার আর একটি নাটক সেতুবন্ধ।
সেতুবন্ধ তিন দৃশ্যের একটি একাঙ্কিকা। আমরা এই নাটকে দেখি প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলে প্রকৃতি কীভাবে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। অনেকেই রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারার সঙ্গে এর সাদৃশ্য খুঁজতে পারেন। কিন্তু এই নাটকে নজরুল ইসলাম মানব জীবনের সংগ্রামী উত্থানকে ভিন্নতর দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। নদীর ওপরে সেতু নির্মাণ করে নদী শাসন করাকে কেন্দ্র করে এই নাটকের গল্প রচিত হয়েছে। নাটকের শেষে এভাবে প্রকৃতির বিজয় ঘোষিত হয়েছে। পদ্মা যন্ত্রকে বলেছে, ‘জানি যন্ত্ররাজ। তুমি বারে বারে আসবে, কিন্তু প্রতিবারেই তোমায় এমনি লাঞ্ছনার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ফিরে যেতে হবে।’
নজরুলমানসের একবারেই ভিন্নরূপ দেখি মধুমালায়। নজরুল রূপকথার মধুমালা-মদনকুমার, কাঞ্চনমালার গল্প নিয়ে মধুমালা নাটক রচনা করেছেন। রূপকথার অনিবার্য সংগীতময়তাকে মূল বিবেচনায় রেখে এই নাটকে নজরুল বহুসংখ্যক গানের সম্মিলন ঘটিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, নাটকটির গদ্য সংলাপও সুর ও কাব্যের মিলমিশে অগ্রসর হয়েছে। এই নাটকের চরিত্রগুলো বাস্তবতার ঘাত-প্রতিঘাতে বেড়ে উঠেছে। রূপকথার চরিত্রগুলো পার্থিব সংসারের মধ্যে স্বপ্নের আবহ তৈরি করেছে। স্বপ্নে দেখা অপরূপা রাজকন্যা মধুমালার সন্ধানে অজানার উদ্দেশে বের হয় মদনকুমার। পথে আরেক রাজকন্যা কাঞ্চনমালার সঙ্গে পরিচয় ও প্রণয়। তারপর কাঞ্চনমালাকে রেখে আবার মধুমালার সন্ধানে চলে যায় মদনকুমার। অবশেষে মধুমালার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটে। মধুমালা ও মদনকুমার সমুদ্রপাড়ে বেড়াতে গিয়ে বিষণ্ন যোগিনী কাঞ্চনমালাকে দেখে। মধুমালা কাঞ্চনমালার পরিচয় পেয়ে উপলব্ধি করে ক্লিন্ন বাস্তব সংসারে তার এবং মদনকুমারের প্রেম সার্থক হবে না। মধুমালা সাগরের জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।
নজরুল শিল্পবোধের কালোচিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে রূপকথার একটি যৌক্তিক পরম্পরা তৈরি করেছেন। কারণ শাশ্বত এবং আদ্য সৌন্দর্য কারও ভোগ্য হতে পারে না। এ যেন পৌরাণিক নারী উর্বশী, যে কারও স্ত্রী, কন্যা বা মা নয়। আদ্য সৌন্দর্যের প্রতীক মধুমালা তাই সাগর জলে হারিয়ে যায়। এই নাটকের সংলাপ সুরেলা ও কাব্যময়। এ যেন আবহমান রূপকথার আধুনিক রূপ। নাটকটিতে রূপকথার আবেদন রয়েছে, কল্পনার চরিত্রগুলোর বিকৃতি ঘটেনি। যাঁরা বাংলানাট্যের মূল প্রণোদনাকে উপলব্ধি না করে মধুমালা নাটককেও গীতিনাট্য বলতে চান তাঁদের ঔপনিবেশিক মানসিকতাপুষ্ট শিল্পবিচারকে বড়জোর করুণা করা যায়, প্রশংসা নয়। নজরুলের মধুমালা দৃশ্য ও কাব্যের সংমিশ্রণে গঠিত বলে এটি সত্যিকার অর্থেই দৃশ্যকাব্য। গীত ও সংলাপের মধ্য দিয়ে এই নাটকের চরিত্রগুলো ক্রমাগত গঠিত হয়েছে। রূপকথা কিংবা ঐতিহ্যের ভেতরে থেকেই নাট্যচরিত্র ও নাট্যঘটনা বিনির্মিত হয়ে সম্পন্ন হয়েছে ঐতিহ্যের আধুনিক ও বিশ্বাসযোগ্য নাট্য নির্মিতি।
নজরুলের নাটক বিচার করতে হবে হাজার বছরের নৃত্যগীত ও কাব্যময় বাংলা নাট্যের প্রেক্ষাপটে। উনিশ শতকের ইউরোপীয় ক্লিশে নাট্যধারার অনুকৃতির বদলে বাংলা নাটকের শাশ্বতকালের সুরধর্মিতা অঙ্গীকরণের ফলে নজরুলের নাটকের সচেতন গীতবহুলতা তাঁকে স্বতন্ত্র করেছে। সে ক্ষেত্রে বাংলা নাট্যধারায় কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উত্তরসূরি। নজরুল হাজার বছরের আখ্যানধর্মী বাংলা নাট্যের সুর ও কাব্যভাষাকেই অন্বিষ্ট ভেবেছেন ঐতিহ্যের অনুপ্রেরণায়। কাজী নজরুল ইসলামের নাটক বিশ্লেষণে এই শিল্পবিবেচনাটি আজকের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার দাবি রাখে।

বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র রাবেয়া খাতুন

  মিজানুর রহমান রানা

নিরলস সাহিত্যকর্মী, ঔপন্যাসিক রাবেয়া খাতুন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের জগতে অত্যুজ্জ্বল নাম। তবে তিনি শুধুমাত্র ঔপন্যাসিকই নন, তাঁর পদচারণা ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, স্মৃতিকথা, গবেষণামূলক গ্রন্থ, শিশু-কিশোরদের জন্যে রচিত গ্রন্থাবলীতেও। ১৯৬৩ সালে ‘মধুমতি’ উপন্যাস দিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন জয়যাত্রা- আজ অবধি অত্যন্ত সফলতার সাথে কথামালা বুনে চলছে গুণী এই কথাশিল্পী। সৃষ্টি করে চলছেন অমর সাহিত্য-সম্ভার। সামগ্রিকতার প্রেক্ষাপটে তাঁর রচনায় মানব জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, আশা-নিরাশা, যন্ত্রণা-ব্যর্থতা, হাসি-আনন্দের ভেতর থেকে জয়লাভ করেছে চূড়ান্ত এক মানবতা। সাহিত্যের অভিযাত্রায় স্রোতহীন বাধা কোনোকালেই রুখতে পারেনি তাঁকে। তিনি শুরু থেকেই ক্রমাগতভাবে সৃষ্টি করে চলছেন বিষয়-বৈচিত্র্য ভরপুর সমৃদ্ধ রচনাসমূহ। রাবেয়া খাতুন রচিত গ্রন্থ সমূহ ঃ উপন্যাসগ্রন্থ- মধুমতি (১৯৬৩) অনন্ত অন্বেষা (১৯৬৭), মন এক শ্বেত কপোতী (১৯৬৭), রাজাবাগ (১৯৬৭), সাহেব বাজার (১৯৬৯), ফেরারী সূর্য (১৯৭৪), অনেক জনের একজন (১৯৭৫), জীবনের আর এক নাম (১৯৭৬), দিবস রজনী (১৯৭১), নীল নিশীথ (১৯৮৩), বায়ান্ন গলির এক গলি (১৯৮৪), মোহর আলী (১৯৮৫), হানিফের ঘোড়া ও নীল পাহাড়ের কাছাকাছি (১৯৮৫), সেই এক বসন্তে (১৯৮৬), বাগানের নাম মালনিছড়া (১৯৯৫), এই বিরহকাল (১৯৯৫), ই ভরা বাদর মাহ ভাদর (১৯৯৫), প্রিয় গুলশানা (১৯৯৫), মেঘের পরে মেঘ (২০০১), যা কিছু প্রত্যাশিত (২০০২), দূরে বৃষ্টি (২০০৩), সাকিন ও মায়াতরু (২০০৩), নগর বধূ (২০০৩), রমনা পার্কের পাঁচ বন্ধু (২০০৩), ঠিকানা বি এইচ টাওয়ার (২০০৫)। এছাড়াও তাঁর উপন্যাস তালিকায় রয়েছে সব পাখি করে রব, নয়না থেকে রূপবান দুপুর, মিড সামারে, সে এবং যাবতীয়, হিরণ দাহ, হোটেল গ্রীনবাটন, চাঁদের ফোটা, বসন্ত ভিলার ছেলেমেয়েরা, ছায়া রমণী, সৌন্দর্য সংবাদ, হৃদয়ের কাছের বিষয়, মালিনীর দুপুর, রঙিন কাঁচের জানালা, তারায় তৃষ্ণা প্রভৃতি। ছোটগল্প গ্রন্থ- আমার এগারোটি গল্প (১৯৮২), নির্বাচিত গল্প (১৯৯০), মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী (১৯৮৬), সুমন ও মিঠুর গল্প (১৯৭৮), লাল সবুজ পাথরের মানুষ (১৯৮১), তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা (১৯৮৪), মধ্যরাতে সাত মাইল (১৯৯৬) প্রভৃতি। স্মৃতিকথা- একাত্তরের নয় মাস (১৯৯৬), স্বপ্নের শহর ঢাকা (১৯৯৪)। ভ্রমণ কাহিনী- টেমস থেকে নায়াগ্রা (১৯৯৩), কুমারী মাটির দেশে (১৯৯৪), হিমালয় থেকে আরব সাগরে, মোহময়ী ব্যাংকক, হে বিদেশী ভোর, কিছুদিনের কানাডা, চেরি ফোটার দিন জাপানে, চমক নগরী হংকং (২০০৭) প্রভৃতি। গবেষণা গ্রন্থ- জীবন ও সাহিত্য (১৯৯৬), পাবনা মানসিক হাসপাতাল, স্মৃতির জ্যোতির্ময় আলোকে যাদের দেখেছি প্রভৃতি। শিশু-কিশোরদের জন্যে- দুঃসাহসিক অভিযান (১৯৬৭), সুমন ও মিঠুর গল্প (১৯৭৮), লাল-সবুজ পাথরের মানুষ (১৯৭৯), একাত্তরের নিশান (১৯৯২), তীতুমীরের বাঁশের কেল্লা (১৮৮১), একাত্তরের নিশান (১৯৯২), সোনা হলুদ পিরামিডের খোঁজে (১৯৯৭), এবং ঈশা খাঁন (২০০৩) প্রভৃতি রচনা করেছেন। আমাদের সাহিত্যাঙ্গণের বরেণ্যে এই কথাসহিত্যিকের ক্ষেত্র প্রধানত কথাসাহিত্য হলেও এবং ছোটগল্প, উপন্যাস তাঁর মূল সৃজনভূমি হলেও এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে ভ্রমণ সাহিত্যের এক আলোকোজ্জ্বল সমভূমি। দেখা গেছে, আমাদের গদ্য সাহিত্যে গল্প-উপন্যাসের প্রাধান্য থাকলেও ভ্রমণ সাহিত্যের স্রোতটি ক্রমান্বয়ে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। সে ক্ষেত্রে রাবেয়া খাতুনকে বলা চলে ব্যতিক্রমী  এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। যিনি কথাসাহিত্য রচনার পাশাপাশি প্রচুর ভ্রমণ কাহিনীও লিখেছেন। একজন সৃষ্টিশীল কর্তব্যনিষ্ঠ সাহিত্যপিপাসু মানুষ বলেই তিনি আজ অবধি সাধারণের ভ্রমণ কাহিনীর চেয়ে তাঁর ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন ভিন্নতরভাবে। তাই এসব দিক বিচার-বিশ্লেষণে রাবেয়া খাতুনকে যদি বাংলাদেশের ভ্রমণসাহিত্যের প্রধানতম লেখকও বলা হয় তাহলে হয়তো অত্যুক্তি হবে না। এজন্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো ভ্রমণ কাহিনীকার হিসেবে রাবেয়া খাতুনের নামও উঠে আসবে ভবিষ্যতে। কারণ পূর্বসূরীদের মতো ভ্রমণ করতে গিয়ে তিনি শুধু নান্দনিকতাই অবলোকন করেননি, সত্য-সুন্দরের মর্মমূল বিশ্লেষণে সচেষ্ট থেকেছেন অত্যন্ত সচেতনভাবে এবং এতে একাত্ম করেছেন নিজের দেশের অভিজ্ঞতা ও স্বীয় মনের মাধুরী। অন্যদিকে দেখা যায়, একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবেও রাবেয়া খাতুনের রচনায় রয়েছে ভিন্নমাত্রা। তিনি উপন্যাস রচনা করেছেন পঞ্চাশটিরও বেশি। ছোটগল্পের সংখ্যা চারশোরও অধিক এবং ছোটদের জন্যে রচিত গল্প-উপন্যাসের সংখ্যাও কম নয়। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম-সাময়িক লেখকদের দিকে যদি আমরা অবলোকন করি, তাহলে দেখা যাবে তাঁর লিখনি শক্তি কতোটা দক্ষ ও গভীর। ব্যক্তিগতভাবে শামসুদ্দীন আবুল কালাম, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান, জাহানারা ইমাম, রিজিয়া রহমান প্রমুখ লেখকের সঙ্গে তিনি ছিলেন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বর্ণিত এসব খ্যাতিমান লেখকের সঙ্গে সমান তালে চলেছে তাঁর কলম এবং দীর্ঘ সময় পরিক্রমায় কলমে ছেদ পড়েনি কখনও। তাঁর উপন্যাস-ছোটগল্পে মানুষকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে আবর্তিত হয়েছে নানা আখ্যান। কারণ একজন সমাজসচেতন মানুষ হিসাবে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন সে সময়ের বিচিত্র ঘটনাবলী। এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মঙ্গা-দুর্ভিক্ষ, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, কংগ্রেস-মুসলিম লীগের রাজনীতি, দেশভাগ, মোহাজের সমস্যা-সঙ্কট, ১৯৫২ সালের মাতৃভাষার সংগ্রাম, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। সংগঠিত উল্লেখিত ঘটনার বিচার-বিশ্লেষণ, সঙ্কট-অভিঘাত তাঁর রচনাকে করেছে আরো গতিশীল ও প্রাণবন্ত। বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যনির্ভর সর্বপ্রকার মানুষের জীবনকেই লেখনিতে ধারণ ও রূপায়িত করেছেন তিনি। এছাড়াও সমাজে বসবাসকারী মধ্যবিত্ত মানুষের টানাপড়েন, তাদের সংগ্রাম-প্রচেষ্টা, শ্রেণী বৈষম্য ও পারস্পরিক সংঘাত তাঁর রচনার প্রধান উপজোব্য। রাবেয়া খাতুন মুক্তিযুদ্ধের দীপ্ত চেতনায় উজ্জীবিত একজন লেখক। ‘একাত্তরের নয় মাস,’ ফেরারী সূর্য, ঘাতক রাত্রি, হিরণ দাহ, বাগানের নাম মালনিছড়া, হানিফের ঘোড়া প্রভৃতি গ্রন্থে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্মৃতিকথন, বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষা, চাওয়া-পাওয়া প্রভৃতি সুনিপুনভাবে চিত্রায়িত করেছেন। এছাড়াও বধ্যভূমি নামে যে উপন্যাসটি লিখেছেন তাতে আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ফুটে উঠেছে। তিনি যখন লিখতে শুরু করেছিলেন সে সময় জীবনের প্রাকৃতিক নিয়মেই বুঝে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গিকে। তাই পুরুষের সঙ্গে তিনি সমান তালে লিখনি চালিয়েছেনÑ ভেবেছেন সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে। সাহিত্যের আড্ডায় মেতে উঠেছেন তাঁর সমকালের সেরা লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে, যাঁদের অধিকাংশই পুরুষ। অথচ নারী বলে যে ব্যক্তি সঙ্কটের মধ্য দিয়ে তাঁকে সামনে অগ্রসর হতে হতো তাতেও জীবনকে আরো গভীরভাবে অনুভব করতে শিখেছিলেন। এ কারণেই তাঁকে ‘নারী লেখক’ বলে অভিহিত করে বৃত্তবন্দী করে সঙ্কীর্ণ অভিধা দেয়া যায় না। রাবেয়া খাতুন কথাসাহিত্যিক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন এমন এক সময়ে যখন ঢাকা অঞ্চলের মানুষ অবস্থান করছিল আধুনিকতা ও গ্রামীণতার সন্ধিক্ষণে। যেখানে বাঙালির চিরকালের লোক-সংস্কৃতির সম্পদ আপনা আপনি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ঢাকাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত সমাজের সঙ্গে তিনি গ্রামীণ জীবনের শিথিল সম্পর্ককে তুলে ধরেছেন উপন্যাস ও ছোটগল্পের হৃদয়ের ক্যানভাসে। সে সময় পুরনো ঢাকা কাঠামোগত দিক থেকে নগর হয়ে উঠলেও গাঢ় হয়ে ওঠেনি তার যথার্থ নাগরিক জীবন। তবে এখানকার নগর জীবনযাত্রার সঙ্গে গ্রামের জীবনযাত্রার ছিলো বিস্তর ফারাক। সেকালের ঘটমান সমাজমানসে ক্রিয়াশীল ছিলো যে চেতনা-প্রবাহ তার অনেক অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো ফুটে উঠেছে তাঁর গল্প-উপন্যাসের মাঝে। অন্যদিকে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁর সংবেদনশীল হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে বলে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নানা ঘটনাবলীও তাঁর রচিত গল্প-উপন্যাসে স্থান পেয়েছে অবলীলায়। তাই বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের জন্যে রক্তদান, ত্যাগ, তিতিক্ষার দিনগুলোর দিনলিপিও একদিকে হয়ে ওঠে সহৃদয় হৃদয় সংবেদ্য সাহিত্য, অন্যদিকে হয়ে ওঠে প্রামাণ্য দলিল।  রাবেয়া খাতুনের স্বামী (বর্তমানে মরহুম) ফজলুল হক ছিলেন একজন চলচ্চিত্রকার। তবে চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগেই ফজলুল হক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সিনেমা’ নামে চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা। সেই সূত্রে এবং নিজের লেখা উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপলাভের সূত্রে রাবেয়া খাতুন চলচ্চিত্র জগতেরও মানুষ। এই জগতের মানুষদের সম্পর্কে তিনি অনেক কাছে থেকে জেনেছেন। ফলে তিনি লিখে ফেলতে পারেন রঙিন কাচের জানালা বা কখনও মেঘ কখনও বৃষ্টি উপন্যাস। তাতে রুপালি পর্দার জীবনের অন্তরালে তিনি মধ্যবিত্ত জীবনে ব্যক্তির সঙ্কটকে উন্মোচন করেন এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে নিজের জীবন উপলব্ধিকে প্রকাশ করেন ভিন্নমাত্রায় সজীবতায়। রাবেয়া খাতুন চলচ্চিত্রের জন্যেও গান লিখেছেন। নিজের উপন্যাস মধুমতি অবলম্বনে একই শিরোনামে নির্মিতব্য চলচ্চিত্রের জন্যে গানটি লিখেছেন তিনি। গানের কথা “তোরা কে কে যাবি বাইচ খেলিতে বড় বাড়ির নায়/আসতে হলে আয়রে চলে বেলা বয়ে যায়...।” শেখ সাদী খানের সংগীত পরিচালনায় গানটি গেয়েছেন আলী মাহমুদ। আর এতে ঠোঁট মিলিয়েছেন অভিনেতা রিয়াজ। শাহজাহান চৌধুরী পরিচালিত এ চলচ্চিত্রের একটি নৌকা বাইচের দৃশ্যে গানটি ব্যবহৃত হয়েছে। এ চলচ্চিত্রে অভিনয় শিল্পীরা হলেন- রিয়াজ, চৈতী, ইলোরা গহর, সাদেক বাচ্চু, সিবি জামান, আহমেদ শরীফ প্রমুখ। পুরস্কার ঃ পুরস্কার কৃতীর চূড়ান্ত পরিচায়ক না হলেও তা’ যে কৃতীকে নির্দেশ করে তাতে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে স্বল্প যে ক’জন বহুল পুরস্কারে ভূষিত তাঁদের মধ্যে রাবেয়া খাতুনের নামটি অন্যতম। তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদকসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। সম্প্রতি সে তালিকায় সংযোজিত হয়েছে খালকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার। আজ ২৭ ডিসেম্বর রাবেয়া খাতুনের জন্মদিন। এ উপলক্ষে তাঁকে জানাই জন্মদিনের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা। দীর্ঘ সুন্দর নান্দনিক জীবন হোক তাঁর। সত্যের জন্যে উৎসর্গিত কলম থাকুক সর্বদা সচল ও ক্লান্তিহীন- এই কামনা করছি। 

free counters

Click to add text, images, and other content

লেখা আহ্বান

সুপ্রিয় সাহিত্যবোদ্ধা বন্ধু।
আমাদের এই সাইটে আপনাকে স্বাগতম। আপনি আপনার সাহিত্য-সংস্কৃতি-ক্রীড়া সম্পর্কিত বা প্রবাস জীবনের নানা সমস্যা, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে লিখতে পারেন। আপনার লেখাটি মেইল করুন আমাদের ই-মেইলে। আমরা সাদরে গ্রহণ করবো।

মিজানুর রহমান রানা
সম্পাদক
মোবাইল- ০১১৯৫৪২৯৭৮৫
ই-মেইল-mizanrana11@yahoo.com