সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

                                 

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন:

উৎস থেকে আজও নিরন্তর লিখে চলেছেন

মিজানুর রহমান রানা

বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত মহিলা ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেন। তিনি ১৯৪৭ সালের ১৪ জুন রাজশাহী শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার হাজিরপাড়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম এ কে মোশাররফ হোসেন এবং মায়ের নাম মরিয়মন্নেসা বকুল। সাত ভাইবোনের মধ্যে সেলিনা হোসেন ছিলেন চতুর্থ। তাঁর বড় বোনের নাম সুরাইয়া এবং ছোট বোনের নাম লাকি। সে নেফ্রাইটিস রোগে মৃত্যুবরণ করে।
সেলিনা হোসেনের পিতার আদিবাড়ি নোয়াখালি হলেও চাকুরিসূত্রে তিনি বগুড়া ও পরে রাজশাহী থেকেছেন দীর্ঘকাল ধরে। তাই সেলিনা হোসেনকে একেবারে নোয়াখালিতে বেশিদিন থাকতে হয়নি। মহান ভাষা আন্দোলনের দু’বছর পর পর (অর্থাৎ ১৯৫৪ সালে) বগুড়ার লতিফপুর প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হন বালিকা সেলিনা। কেননা, ক্লাস ওয়ান আর টু-র পড়া শেখা হয়েছিলো বাড়িতে বসেই। সে কালে সে রকমই হত। যা হোক প্রাইমারি শিক্ষা ওই লতিফপুর স্কুলেই শেষ হল। প্রায়ই ক্লাসে শিক্ষক এসে আবৃত্তি করতেন, “পাখি সব করে রব রাত্রি পোহাইল; কাননে কুসুমকলি সকলই ফুটিল।” পদ্য আবৃত্তি শেষ করে তারপর শিক্ষক বলতেন, “সোনামণিরা, তোমরা সবাই কুসুমকলি। তোমরা সবাই একদিন ফুলের মতন ফুটবে, দেখ।” এই কথাটাই বালিকা সেলিনার মনে ভীষণ দাগ কেটেছিলো। সেলিনা হোসেনের পরবর্তী জীবনে যতই আপদ-বিপদ এসেছিলো-ওই লতিফপুর স্কুলের শিক্ষক এসে যেন ফিসফিস করে তাঁর কানে কানে বলতেন, শক্ত হ মা। হার মানিস্ নে। তোর এক মেয়ে মরেছে তো কী হয়েছে!
বালিকা সেলিনার কী সৌভাগ্য যে- অমন একটা স্কুলের মহৎ হৃদয়ের শিক্ষকদের সান্নিধ্যে প্রাথমিক লেখাপড়া শিখেছিলেন তিনি। এর দু’বছর পর, ১৯৫৭ সাল। সেলিনা হোসেন ক্লাস ফাইভে ভর্তি হলেন ভিএম গালর্স স্কুলে। নতুন স্কুল; নতুন জীবন। হেডমিসট্রেস ছিলেন সালেহা খাতুন। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড একজন বদরাগী মহিলা। সারাক্ষণ জ্বালিয়ে মারতেন। যা হোক। বেশিদিন ওই স্কুলে থাকতে হয়নি সেলিনার। বাবা বদলী হয়ে চলে এলেন রাজশাহী । দু’বছর পর অর্থাৎ ১৯৫৯ সালে রাজশাহীর নাথ গালর্স স্কুলে ক্লাস এইটে ভর্তি হল কিশোরী সেলিনা। নাথ গালর্স স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষক-শিক্ষকাই ছিলেন উদার আর মহৎ। কেননা, ছাত্রীদের তারা কেবল সিলেবাসে আটকে রাখেননি। সিলেবাসের বাইরে কতকিছু যে কথা বলতেন তারা। কিশোরী সেলিনার ছিলো উৎসুক মন। ভালো লাগত জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা শুনতে; ভালো লাগত ভাষা, বাংলা ও ইংরেজি ভাষা। ভালো লাগত অক্ষর, শব্দ। ভালো লাগত লিখতে। টুকটাক মনের কথা লিখতে। কবিতা পড়তে। তখনই একদিন প্রথম জীবনানন্দের কবিতা পড়ে আনন্দিত ও উৎসাহ বোধ করেছিল কিশোরী সেলিনা। রাজদর্শনের মত দিনটাকে কখনও ভোলা গেল না। তারপর জীবনটা আর আগের মতো থাকেনি কিশোরীর। ধানসিঁড়ি নদীটি কোথায়? ওই নদীর ওপর মেঘ জমে, সোনালি ডানার চিল ওড়ে? হায়, চিল সোনালি ডানার চিল, তুমি আর ঘুরে ঘুরে উড়ে নাকো ধানসিঁিড় ...ধানসিঁিড় নদীটি কোথায়? বুকের ভিতর কী এক আবেগ তখন থরথর করে কাঁপত তার। মাঝরাতে অন্ধকারে শুয়ে শোনা যেত পদ্মার পাড় ভাঙ্গার শব্দ। অন্ধকারে কে যেন তখন ফিসফিস করে বলত, “পাখি সব করে রব রাত্রি পোহাইল কাননে কুসুমকলি সকলই ফুটিল।”
সারারাত দু’চোখে ঘুম আসত না তার। আমি কে? আমি এখানে কেন? আমি ঘুমাতে পারি না কেন? ভোরে দূরের হেতেম খাঁ মসজিদের মুয়াজ্জিনের আজান শোনা যেত। চোখে জলে ভরে যেন কবি কিশোরীর। ধানসিড়ি নদীটি কোথায়? এই প্রশ্নটাই জীবনভর তাড়িয়ে বেড়াবে তাকে।  জীবনানন্দ কে? কবি কে? শব্দ কি? সেই কিশোরী দিনগুলোয় কী এক ব্যাথা বাজত তার বুকে। ওই নাথ গালর্স স্কুল থেকেই ম্যাট্রিক (তখন এসএসসি বলা হত না) পাশ করল কিশোরী সেলিনা ১৯৬২ সালে। ১৯৬২ সালে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হলেন ঠিকই কিন্তু তখন শরীর এমনই কাহিল যে ক্লাস করা হল না। আহা তখন কী যন্ত্রণাই না সময় কেটেছিল কিশোরী সেলিনার। শিক্ষক এসে যেন ফিসফিস করে বলতেন, শক্ত হ মা। হার মানিস নে। রাজশাহী উইমেন্স কলেজে ভর্তি হল সেলিনা। মজা এই- সেলিনারাই ছিলো ওই কলেজের প্রথম ব্যাচ। শরীরে যন্ত্রণা তো কি-সারাদিন দাপাদাপি করে বেড়াত তরুণী সেলিনা। ক্লাসমেটদের মধ্যে উজ্জ্বলতম বুদ্ধিমতী একটি মেয়ে। এত কথা বলত! কবি তো। তাই।
১৯৬৪ সাল। রাজশাহীতে আর্ন্তকলেজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। সব মিলিয়ে সাতটি ইভেন্টে নাম লেখাল সেলিনা। প্রথম হল ছটিতে- একটি ইভেন্টে হল তৃতীয়। সেলিনা ছিলো রাজশাহী উইমেন্স কলেজের সবচে উজ্জ্বলতম বুদ্ধিমতী একটি মেয়ে। এই মেয়েই তো একদিন বাংলায় উপন্যাস লিখে দু-বাংলার বোদ্ধা মহলে ঝড় তুলবে। লিখবে ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’র বিপুলায়তন উপন্যাস। কলেজ জীবন শেষ করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ভর্তি হল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবার তার জীবনে যুক্ত হল নিবিড় সাংস্কৃতিক ও গভীর রাজনৈতিক অধ্যায়।
১৯৬৭ সালে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পাঞ্জাব যাওয়ার কথা থাকলেও অস্থির রাজনৈতিক অবস্থার কারণে যাওয়া হয়নি। এই আক্ষেপ আজও কাঁটার মত বিঁধে আছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই বিএ অনার্স পাশ করলেন ১৯৬৭ সালে। এমএ পাশ করলেন পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৮ সালে।
১৯৬৮ সালের ২ ফেব্র“য়ারি সেলিনা হোসেন বিয়ে করেন। তাঁর বড় কন্যা লাজিনা মুনা জন্মগ্রহণ করে ১৯৬৯ সালে এবং ছোট কন্যা ফারিয়া লারার জন্ম ঢাকায় ১৯৭০ সালের ১৬ এপ্রিল। ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর তাঁর প্রথম স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৭৩ সালে সেলিনা হোসেনের মা এবং ১৯৯৪ সালে তাঁর বাবা মারা যান। তখন তিনি লন্ডনে অবস্থান করছিলেন।
এরপর আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পুত্র সাকিব আনোয়ারের জন্ম হয় ১৯৭৭ সালে। ছোট মেয়ে ফারিয়া লারা ১৯৭৮ সালে কোরিয়ান চিলড্রেন সেন্টার পুরস্কার, ১৯৭৯ সালে ফিলিপস বাংলাদেশ পুরস্কার, ১৯৮০ সালে নিপ্পন টেলিভিশন নেটওর্য়াক আয়োজিত প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক, ১৯৮৪ সালে ভারতের শংকর আন্তজার্তিক পুরস্কার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতায় উপস্থিত বক্তৃতায় পুরস্কার অর্জন করেন। ফারিয়া লারা ১৯৯২ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক পাশের পরপরই পাইলট হওয়ার জন্যে পাইলট প্রশিক্ষণে ভর্তি হয়। ১৯৯৮ সালের ১৯ মার্চ লারা বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্স লাভ করেন। এরপরই তিনি পাইলটদের প্রশিক্ষক হওয়ার প্রশিক্ষণ নেন। তিনি পাইলট হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ক্লাশ নেওয়ার পাশাপাশি উড্ডয়নের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। পঞ্চাশ ঘণ্টার এই প্রশিক্ষণের শেষ দিনটি ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ সালে বরিশাল থেকে ঢাকায় ফেরার পর পোস্তগোলা এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে লারা মৃত্যুবরণ করে।
বড় মেয়ে লাজিনা মুনা এইচআইভি/এইডস-এর ওপর লন্ডন স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন এন্ড হাইজিন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ইউএইডস এ কর্মরত রয়েছেন। ছেলে সাকিব আনোয়ার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’বছর শিক্ষকতা করার পর এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে কর্মরত রয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে বড্ড ভালো লাগে সেলিনার। লোকগানের মধ্যে ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া। যন্ত্রসংগীতের মধ্যে বাঁশী ও শানাই। ষাটের দশকের মধ্যভাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে তাঁর লেখালেখির সূচনা।
সেলিনা হোসেন বাংলা একাডেমিতে যোগ দেন ১৯৭০ সালে। কর্মরত অবস্থায় তিনি বাংলা একাডেমীর ‘অভিধান প্রকল্প’, ‘বিজ্ঞান বিশ্বকোষ প্রকল্প’, ‘বিখ্যাত লেখকদের রচনাবলী প্রকাশ’, ‘লেখক অভিধান’, ‘চরিতাভিধান’ এবং ‘একশত এক সিরিজের’ গ্রন্থগুলো প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ২০ বছরেরও বেশি সময় ‘ধান শালিকের দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমীর প্রথম মহিলা পরিচালক হন। ২০০৪ সালের ১৪ জুন চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
সেলিনা হোসেন রচিত প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। ভ্রমণ যদিও তাঁর অন্যতম একটি নেশা তবুও তিনি আজও উৎস থেকে নিরন্তরের পথে লিখে চলেছেন অবারিতভাবে। তাঁর রচিত মোট উপন্যাসের সংখ্যা ২৬টি, গল্প গ্রন্থ ১৮টি, প্রবন্ধগ্রন্থ ৯টি, সম্পাদনা গ্রন্থ ৬টি, শিশুতোষ গ্রন্থ ১২ টি।
গ্রন্থতালিকা:
কথাসাহিত্য: জলোচ্ছ্বাস (১৯৭৩), হাঙ্গর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬), মগ্ন চৈতন্যে শিস (১৯৭৯), যাপিত জীবন (১৯৮১), নীল ময়ূরের যৌবন (১৯৮২), চাঁদবেনে (১৯৮৪), ক্ষরণ (১৯৮৮), পোকা মাকড়ের ঘরবসতি (১৯৮৬), কাঁটাতারে প্রজাপতি (১৯৮৯), কালকেতু ও ফুল্লরা (১৯৯২), নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি (১৯৮৭), টানাপোড়েন (১৯৯৪), গায়ত্রী সন্ধ্যা (এক- ১৯৯৪, দুই-১৯৯৫ এবং তিন-১৯৯৬),  যুদ্ধ (১৯৯৮), লারা (২০০০), কাঠ কয়লার ছবি (২০০১), মোহিনীর বিয়ে (২০০২), আণবিক আঁধার (২০০৩), ঘুমকাতুরে ঈশ্বর (২০০৪), মর্গের নীল পাখি (২০০৫)।
গল্পগ্রন্থ: উৎস থেকে নিরন্তর (১৯৬৯), জলবতী মেঘের বাতাস (১৯৭৫), পদশব্দ (১৯৮২), খোল করতাল (১৯৮২), পরজন্ম (১৯৮৬), খুন ও ভালোবাসা (১৯৯০), ভালোবাসা প্রীতিলতা (১৯৯২), নির্বাচিত গল্প (১৯৯৩), মতিজানের মেয়েরা (১৯৯৫), দীপান্বিতা (১৯৯৭), একটি উপন্যাসের সন্ধানে (১৯৯৯)।
‘মানুষটি’ একটি গল্পগ্রন্থ। এর গল্পগুলো হলো- মানুষটি, জলহাওয়া, প্রার্থনা, কষ্টিপাথর, দাঁড়কাক, স্পর্শ, ঘৃণা, ঘরজুড়ে জ্যোৎস্না, বাঁচা, বসন্ত বাউরি, ময়েজের পরাজয়, শব্দ ও কাঁচি, ক্রোধ, উনসত্তর, থুতু৷
‘গল্প সমগ্র’ (২০০২) বইটিতে রয়েছে আটটি গল্প: উৎস থেকে নিরন্তর, জলবতী মেঘের বাতাস, পরজন্ম, মানুষটি, খোল করতাল, মতিজানের মেয়েরা, অনূঢ়া পূর্ণিমা, একালের পান্তাবুড়ি, গল্পসমগ্র সংকলিত হয়েছে।
পুরস্কার: ড: মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক (১৯৬৯), বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮০), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), কমর মুশতারি স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৭), ফিলিপস্ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪), অনন্যা ও অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪), রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার (২০১০)। এছাড়াও তিনি ১৯৯৪-৯৫ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ পান। ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
ইংরজি, হিন্দি, মারাঠি, কানাড়ি, রুশ, মালে, মালয়ালাম, ফরাসি, জাপানি, ফিনিস, কোরিয়ান প্রভৃতি ভাষার তাঁর বেশ কয়েকটি গল্প অনূদিত হয়েছে। ১৯৮৩ সালে ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ২০০০ সালে প্রকাশ হয় ‘টানাপোড়েন’ উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ ও ২০০১ সালে মালয়ালাম ভাষায় অনূদিত এবং ভারতের কেরালা প্রদেশ থেকে প্রকাশিত হয়৷ পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সেলিনা হোসেন রচিত ‘যাপিত জীবন’ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ উপন্যাস পাঠ্যসূচিভুক্ত। শিলচরে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫টি উপন্যাস এম. ফিল গবেষণাভুক্ত। ২০০৫ সাল থেকে শিকাগোর ওকটন কলেজের সাহিত্য বিভাগ দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য কোর্সে তাঁর ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসটি পাঠ্যসূচিভুক্ত হয়।
তথ্য সূত্র: উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

সৈয়দ আলী আহসান


আধুনিক বাংলা কবিতার কণ্ঠস্বর, চল্লিশের দশকের শক্তিশালী কবি সৈয়দ আলী আহসান-এর  জন্ম  ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ বর্তমান মাগুরা জেলার আলোকদিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তিনি পুরোনো ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত আরমানিটোলা সরকার হাইস্কুল থেকে এন্ট্রান্স (এসএসসি) এবং ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে ঢাকা কলেজ) থেকে এফএ (এইচএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে স্নাতক (বিএ) এবং ১৯৪৪ সালে স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি কলকাতা চলে যান। সেখানেই বিয়ে করেন ৭ জুলাই, ১৯৪৬ সালে।

কর্মজীবনে অল ইন্ডিয়া রেডিও কলকাতা কেন্দ্রে এবং রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রে কর্মসূচি নিয়ামক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সলে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ওই পদে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬০-১৯৬৭ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমীর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সে সময় ‘চেনাকণ্ঠ’ ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭২-১৯৭৫ পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব করেন। পরবর্তীতে আবারও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও ধর্ম সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পদে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুইডেনের নোবেল কমিটির সাহিত্য শাখার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে অভিষিক্ত হন এবং সে বছরই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। শেষ বয়সে দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

 তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সম্পাদক, অনুবাদক। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ হলো: ‘অনেক আকাশ’ (১৯৬০), ‘একক সন্ধ্যায় বসন্ত’ (১৯৬২), ‘সহসা সচকিত’ (১৯৬৮),  ‘উচ্চারণ’ (১৯৬৮), ‘আমার প্রতিদিনের শব্দ’ (১৯৭৩)। প্রবন্ধ গ্রন্থ: ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ (আধুনিক যুগ) [মুহম্মদ আবদু হাই-এর সাথে] (১৯৫৬)

title

আধুনিক কবিতার পাঠক

 রানা জামান

ত্রিশ দশকের আগে কবিতায় দুর্বোধ্যতা ছিলো না বললেই চলে। মাইকেল মধূসুদন দত্ত অন্তমিলের বাইরে অন্তমিল বিহীন অমিত্রাক্ষল ছন্দের প্রবর্তন করলেও  কবিতায় দুর্বোধ্যতা আসে নি; যদিও ব্যবহৃত শব্দ ছিলো কঠিন। তিনি এভাবেই মেঘনাদবধ, ব্রজাঙ্গনা, হেক্টর বধ ইত্যাদি মহাকাব্য রচনা করে গেছেন। তিনি সবসময় চেয়েছেন কবিতাঙ্গনে নতুন কিছু দিতে; তাইতো তিনি ইটালি থেকে বিশেষ ধরনের গীতিকবিতা সনেটের প্রবর্তন করেন। তিনি আমরণ এই দুই ধারায় কবিতা রচনা করে গেছেন। তখনকার কবিদের সবাই গীতিকবিতাই লিখতেন। হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, বিহারীলাল চক্রবর্তী, প্রমুখ কবিগণের কবিতার অন্তমিল বিন্যাস ছিলো এরকম:



রবী ঠাকুরের প্রথম রচিত কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোয় ভাব, ভাষা, ছন্দ ও অলঙ্কারে অক্ষয় কুমার চৌধুরী, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাইকেল মধুসূধন দত্তের প্রভাব স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়। তাঁর কবিতায় ক্রমান্বয়ে স্বকীয়তার প্রতিষ্ঠিত হতে থাকলেও সেগুলো গীতিকবিতা শ্রেণীর। ‘গীতাঞ্জলী’র সকল কবিতাই গান। এই ‘গীতাঞ্জলী’ কাব্যই ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ায় তাঁকে বিশ্বখ্যাতি এনে দেয়; তিনি ১৮৯৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর রচিত কবিতায় ব্যবহৃত শব্দ কোমল চড়–ই পাখির শরীরের মতো নরোম, ছন্দ অনুপম, অন্তমিল সাধারণ এবং প্রবাহমানতা ঝর্ণাধারা চেয়েও সাবলিল সুরাশ্রয়ী। কবিতার জগতে শুরু হয়ে যায় রবীন্দ্রযুগ। তখন তাঁর কবিতা, ছন্দ, ভাষা, অলঙ্কার ইত্যাদিতে প্রভাবিত হয়ে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যতীন্দ্র মোহন বাগচী, কুমুদ রঞ্জণ মল্লিক, করুণা নিধান বন্দোবপাধ্যায়, কিরণ ধন চট্টোপাধ্যায়, কালিদাস রায়, প্রমুখ কবিগণ কবিতা রচণা শুরু করেন। তখনকার কবিতার প্রধান উপজীব্য ছিলো রোমান্টিকতা, সত্য ও সুন্দরে বিশ্বাস, গ্রামের সারল্য ও সূচিতা, নিটোল ও  সরল প্রেম, জাতীয়তা ইত্যাদি।
বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ ও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রথম দিককার কবিতাও ছিলো রবীন্দ্র প্রভাবে প্রকট(‘মর্মবাণী’, ‘ঝরাপালক’ ও ‘তন্বী’)। কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম রবীন্দ্র ঘরাণার রোমান্টিকতার বাইরে ভিন্ন সুরে সমসাময়িক এবং শাসকশ্রেণীকে সরাসরি আক্রমণ করে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে বিদ্রোহী কবির খেতাব পেলেও পরবর্তীকালে তিনিও রোমান্টিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন; তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় বহু ইসলামী কবিতা ও গান লিখেন। নজরুলের কবিতা ও গানে চিত্তাকর্ষক শব্দ, ছন্দ ও মাধুর্য থাকায় শতাব্দি পেরিয়ে গেলেও আজও মানুষের মুখে মুখে আছে। মোহিতলাল মজুমদার, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ও যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রবীন্দ্র বলয় থেকে মুক্ত হয়ে কবিতা লিখতে চেষ্টা করেছেন; কিন্তু সেগুলো যথার্থ হয়ে না উঠায় জনপ্রিয়তা পায়নি।
তিরিশ দশকে বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বীষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী রবীন্দ্র বলয় থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু দেবার মানসে আধুনিক কবিতা রচনা করতে শুরু করেন। এই আধুনিক কবিতা তাঁদের নিজস্ব কোন উদ্ভাবন নয়- পাশ্চাত্য থেকে অনুরকণ ও অনুসরন করা অন্যান্য বিষয়াদির মতো এটাও টিএস ইলিয়ট ও পাউণ্ড থেকে দেখা ও শেখা। একটা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি পাশ্চাত্যে কবিতার এই নবধারা দেখেননি? আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাশ্চাত্যের সাথে যথেষ্টই পরিচিত ছিলেন; তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় বিলেত থেকে, তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করেছেন এবং বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত সাহিত্যিক ও ব্যক্তিদের সাথে তাঁর পত্র যোগাযোগও ছিলো; তিনি পাশ্চাত্য সাহিত্য তথা ইংরেজি সাহিত্যে পরিচিতি ও প্রবেশ করার জন্য অদম্য তাগিদ থেকেই ‘গীতাঞ্জলী’কে ইংরেজিতে অনুদিত করেন এবং অবধারিতভাবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা বিষয় এখানে বলা যায় যে, মাইকেল মধুসুধন দত্ত পশ্চিমা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হবার মানস নিয়ে শুরু থেকেই ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করেন এবং প্রচুর কবিতা ও নাটক লিখেছেন, শেষে ধর্মান্তরিত হয়েছেন; কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেননি; মনের দুঃখে তিনি ‘বঙ্গভূমি’ নামে সনেট রচনা করেন এবং পরবর্তীতে বাংলায় কবিতা নাটক তথা সাহিত্য রচনা করেন। তাহলে কি টিএস ইলিয়ট ও পাউণ্ডের রচনা বিশ্বকবির নজরে পড়েনি? এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। এ প্রসঙ্গে বলা যায় পাশ্চাত্যে কবিতার জগতে এই পরিবর্তন তিনি আমলে নেননি এবং সে কারণেই তিনি পঞ্চপাণ্ডব কর্তৃক বাংলা কবিতায় আধুনিক কবিতার প্রবর্তন করলে তিনি তীব্র বিরোধিতা করেন এবং বলেন:
‘এক টুকরো কাঁকর আমার কাছে কিছুই নয়, একটি পদ্ম আমার কাছে সুনিশ্চিত। অথচ কাঁকর পদে পদে ঠেলে ঠেলে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয়, চোখে পড়লে তাকে তোলবার জন্য বৈদ্য ডাকতে হয়, ভাঁতে পড়লে দাঁতগুলো আঁতকে উঠে; তবু তার সত্যে পূর্ণতা আমার কাছে নেই। পদ্ম কনুই দিয়ে বা কটাক্ষ দিয়ে ঠেলাঠেলির উপদ্রব একটুও করে না, তবু আমার সমস্ত মন তাকে আপনি এগিয়ে গিয়ে স্বীকার করে। যেমন বরণীয়কে বরণ করে নেয়, তার শূচিবায়ুর পরিচয় দেই। সজনে ফুলে সৌন্দর্যের অভাব নেই। তবু ঋতুরাজের রাজ্যভিষেকের মন্ত্রপাঠে কবিরা সজনে ফুলের নাম করে না। ও যে আমাদের খাদ্য খর্বতায় কবির কাছেও সজনে আপন ফুলের যথার্থ হারাল।’
আধুনিক কবিতার সংজ্ঞা সর্ম্পকে বুদ্ধদেব বসু বলেন, ‘ ..... এই আধুনিক কবিতা এমন কোনো পদার্থ নয় যাকে কোনো একটা চিহ্ন দ্বারা অবিকলভাবে সনাক্ত করা যায়। একে বলা যেতে পারে বিদ্রোহের, প্রতিবাদের কবিতা, সংশয়ের, ক্লান্তির, সন্ধানের, আবার এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে বিস্ময়ের জাগরণ, জীবনের আনন্দ, বিশ্ব বিধানে আস্থাবান চিত্তবৃত্তি। আশা আর নৈরাশ্য, অর্ন্তমুখিতা বা বহির্মুখিতা, সামাজিক জীবনের সংগ্রাম আর আত্মিক জীবনের তৃষ্ণা, এই সবগুলো ধারাই খুঁজে পাওয়া যাবে শুধু ভিন্ন-ভিন্ন কবিতে নয়, কখনো হয়তো বিভিন্ন সময়ে একই কবির রচনায়।’
এ প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশ বলেন, ‘বাংলা কাব্যে বা কোনো দেশেরই বিশিষ্ট কাব্যে আধুনিকতা শুধু আজকের কবিতায় আছে-অন্যত্র নয়-একথা ঠিক নয়। আমাদের দেশের পুরোনো কবিদের একটা বড় কাব্যাংশে, শেক্সপীয়রের নাটক ও সনেটে, ডানের ও রবীন্দ্রনাথের ঢের কবিতায় আধুনিকত্ব ক্ষুন্ন হবার কোনে কারণ ঘটবে বলে আজকের দৃষ্টি নিয়ে অন্তত আমি বুঝতে পারছি না।’ অথার্ৎ শুধু সময়ের দিক থেকে আধুনিক হ'লে আধুনিক কবিতা হয় না । জীবনানন্দ শেষ পর্যন্ত বুদ্ধদেবের  মতোই বলেছেন, ‘ ......... নতুন সময়ের জন্যে নতুন ও নতুন ভাবে নির্ণীত পুরোনো মূল্য, নতুন চেতনা ও নতুন ভাবে আবিস্কৃত পুরোনো চেতনার যে একান্ত দরকার শিল্পে ও জীবনে এ-কালের কোনো -কেনো বাঙালী কবি’ সেটা বুঝতে পেরেছেন................।’
১৯৪০ সালে আবু সায়ীদ আইয়ুব  আধুনিক কবিতার সংজ্ঞা দিলেন এভাবে-‘ কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ-পরবর্তী, এবং ভাবের দিক থেকে রবীন্দ-প্রভাবমুক্ত, অন্তত মুক্তিপ্রয়াসী , কাব্যকেই আমরা আধুনিক কাব্য বলে গণ্য করেছি।’
পঞ্চপাণ্ডব রবীন্দ্রবলয় থেকে মুক্ত হবার জন্য কবিতায় কী ধরনের পরিবর্তন এনে তাকে আধুনিক কবিতা বললনে অর্থাৎ আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য কী তা জানা দরকার। আধুনিক কবিতা ব্যবচ্ছেদ করে মোটামোটিভাবে নিম্নবর্ণিত বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া যায়:
১।         নগরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক সভ্যতার অভিঘাত;
২।         বর্তমান জীবনে ক্লান্তি ও নৈরাশ্যবোধ;
৩।         আত্মবিরোধ ও অনিকেত মনোভাব;
৪।         বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হ'তে সচেতনভাবে প্রয়োজনীয় বিষয় গ্রহণ;
৫।         ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানের প্রভাব। অবচেতন মনের ক্রিয়াকে প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে চিন্তাধারার  
অসম্বদ্ধতা;
৬।         ফ্রেজার প্রমুখ নৃতাত্ত্বিক ও প্ল্যাঙ্ক, বোর, আইনস্টাইন প্রভৃতি আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানীর প্রভাব;
৭।         মননধর্মিতা-অনেক সময় জ্ঞানের বিপুল ভারে দুরূহতার সৃষ্টি;
৮।         বিবিধ প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধে (যেমন প্রেম, সুন্দর, কল্যাণ, ধর্ম ) সংশয় এবং তৎসঞ্জাত
অনিশ্চয়তার উদ্বেগ;
৯।         দেহজ কামনা, বাসনা ও তৎপ্রসুত অনুভূতিকে স্বীকার করা এবং প্রেমের শরীরি রূপকে প্রত্যক্ষ
করা;
১০।       রবীন্দ্র-ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ এবং নতুন সৃষ্টির পথসন্ধান;
১১।       বাক্রীতি ও কাব্যরীতির মিশ্রন । গদ্যের ভাষা, প্রবাদ, চলতি শব্দ, গ্রাম্য শব্দ ও বিদেশী শব্দের
ব্যবহারে গদ্য, পদ্য ও কথ্য ভাষার ব্যবধান বিলোপের চেষ্টা । পরবর্তী পর্যায়ে অতি-ব্যবহৃত
পদ্যগন্ধি শব্দকেও গ্রহণ অর্থাৎ ভাষা সম্বন্ধে সর্বপ্রকার শুচিবায়ু পরিহার;
১২।       প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পুরাণ এবং বিখ্যাত কবিদের কাব্য অথবা ভাবনা থেকে উদ্বৃতির যত্রতন্ত্র
প্রয়োগে সিদ্ধ রসকে চূর্ণ করা বা অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন অনুভূতির সমন্বয় সাধন;
১৩।       প্রচলিত কবিপ্রসিদ্ধ উপমা ও বর্ণনার বিরলতম ব্যবহার । প্রচলিত কাব্যিক শব্দ, যথা-ছিনু,
গেনু, মম, মোদের, হিয়া প্রভৃতি বর্জন;
১৪।       প্রাচীন উপমা বা শব্দের অভিনব অর্থে প্রয়োগ এবং তৎসহযোগে নতুন চিত্রকল্প সৃষ্টি;
১৫।       শব্দ প্রয়োগে বা গঠনে মিতব্যয়িতা ও অর্থঘনত্ব সৃষ্টির চেষ্টা;
১৬।       এই মিতব্যয়িতার উদ্দেশ্যে বাহুল্য বর্জনের ফলে মধ্যবর্তী চরণের অনুল্লেখ । তার জন্য
চিন্তাধারার মধ্যে একটা উল্লম্ফনের সৃষ্টি, আপাত-দৃষ্টিতে যাকে মনে হয় অসম্বদ্ধ । ছড়ার
উল্লম্ফনের সঙ্গে তার পার্থক্য মৌলিক;
১৭।       নামবাচক বিশেষ্য, বহুপদময় বিশেষণ, অব্যয় এবং ক্রিয়ার পূর্ণরূপের ব্যবহার । চলতি 
ক্রিয়াপদের সঙ্গে সংস্কৃতবহুল বিশেষ্য বা বিশেষণের সংযোগ;
১৮।       প্রচলিত পয়ার, সনেট ও মাত্রা প্রধান ছন্দের রূপান্তর এবং মধ্যমিলের সৃষ্টি;
১৯।       গদ্যছন্দের ব্যবহার;
২০।       ব্যঙ্গ, বিতর্ক, অদ্ভুত, বীভৎস রসের বহুল ব্যবহার;
২১।       শব্দালংকার অপেক্ষা বিরোধাভাস, বক্রোক্তি , স্মরণ প্রভৃতি অর্থালংকারের ব্যবহার;
২২।       বিষয়বৈচিত্র্য।

উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যকে ধারন করে করে পঞ্চপাণ্ডব নিজ নিজ অবস্থান থেকে সৃষ্টি করে যেতে থাকেন আধুনিক কবিতা। তাঁদের সৃষ্ট কবিতায় শব্দ চয়নের নতুনত্ব ও অভিনব উপমার গুণে কবিতা হয়ে উঠে দুর্বোধ্য ও কঠিন। তখন বলা হয়েছিলো যে, আধুনিক কবিতা স্বল্পশিক্ষিত পাঠকের জন্য নয়-যারা উচ্চ শিক্ষিত এবং শব্দের ভেতর ঢুকে আসল মানেটা বের করতে পারে তাঁদের জন্যই আধুনিক কবিতা; অর্থাৎ আধুনিক কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় প্রচণ্ড রকমের রহস্যময়তা- কবিতার বাহ্যিক মনে একটা; কিন্তু রহস্যময়তার গুণে ভেতরে অনেক মানে-যে যেভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে। তাঁরা বললেন: আধুনিক কবিতা পাঠের জন্য প্রয়োজন শিক্ষার, যেমন শিক্ষার প্রয়োজন শিল্প কলার অন্যান্য ক্ষেত্র - চিত্র, ভাস্কর্য, কিংবা মার্গসংগীত উপভোগের জন্য। কবিই শুধু সর্বজনবোধ্য কবিতা রচনা  করবেন তা নয়, পাঠককেও তার রস সম্যক উপলব্ধি করবার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। সুধীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘যে দুরূহতার জন্ম পাঠকের আলস্যে, তার জন্যে কবির উপরে দোষারোপ অন্যায়।’ এ ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা অব্যাহত থাকায় আধুনিক কবিতা থেকে সাবলিলতা ও কমনীয়তা হয়ে গেছে বিলীন।
রবী ঠাকুর প্রতিবাদ অব্যাহত রেখে বলেন: ‘পাশ্চাত্যের কাব্যকলায় বিজ্ঞানের প্রভাবের জন্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন হতে পারে। সে দেশের সাহিত্য অন্তত: বিজ্ঞানের দোহাই পেড়ে এই দৌরাত্বের কৈফিয়ত দিতে পারে। কিন্তু যে দেশে অন্তরে বাহিরে বুদ্ধিতে ব্যবহারে বিজ্ঞান কোনখানেই প্রবেশাধিকার পায় নি, সে দেশের সাহিত্যে ধার করা নকল নির্লজ্জতাকে কার দোহাই দিয়ে চাপা দেবে? ভারত সাগরের ওপারে যদি প্রশ্ন করা যায় ‘তোমাদের সাহিত্যে এত হট্টগোল কেন?’ উত্তর পাই, ‘হট্টগোল সাহিত্যের কল্যাণে নয় হাটের কল্যাণে। হাটে যে ঘিরেছে!’ ভারত সাগরের এপারে যখন প্রশ্ন  জিজ্ঞাসা করি তখন জবাব পাই,‘হাট ত্রিসীমানায় নেই বটে, কিন্তু হট্টগোল যথেষ্ট আছে। আধুনিক সাহিত্যের ঐটেই বাহাদুরী।’
আধুনিক কবিতায় গ্রাম্য শব্দের পাশেই ইংরেজি শব্দ এমনকি সংস্কৃত পদাংশের সঙ্গে প্রচলিত প্রবাদের যথেচ্ছ ব্যবহার হতে থাকায় এটাকে বিপর্যয় ভেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের সাহিত্যে বিদেশের আমদানীর যে একটা বেআব্র“তা এসেছে সেটাকেও এখানকার কেউ কেউ মনে করেছেন নিত্য পদার্থ; ভুলে যান নিত্য তা অতীতকে সম্পূর্ণ প্রতিবাদ করে না। মানুষের রসবোধে যে আব্র“ আছে সেইটেই নিত্য , যে আভিজাত্য আছে রসের ক্ষেত্রে সেইটেই নিত্য। এখানকার বিজ্ঞান মদমত্ত ডিমোক্রাসি তাল ঠুকে বলছে,ঐ আব্র“টাই দৌর্বল্য, নির্বিচার অলজ্জতাই আর্টের পৌরষ।’ তিনি এই আধুনিকতা গ্রহণ করতে না পেরে পুণরায় বলন- ‘ল্যাঙটা-পড়া গুলি পাকানো ধুলোমাখা আধুনিকতা।’ তিনি ‘সাহিত্যের পথে’ প্রবন্ধে আরেক জায়গায় বলেন-‘আধুনিক কাব্যের কাজ মনোহারিতা নয় মনোজয়িতা, তার লক্ষণ লালিত্য নয় যথার্থ।.....কাব্যে বিষয়ীর আত্মতা ছিলো উনিশ শতাব্দিতে, বিশ শতাব্দিতে বিষয়ের আত্মতা।’
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। কবিতা রচনা করা তাঁর কাছে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের চেয়েও সহজ কাজ। রবীন্দ্র সম্ভার পর্যালোচনা  করলে জানা যায় তিনি কবিতা বা গান রচনার জন্য কোন বিষয়ই বাদ দেননি-প্রেম-মিলন-বিহর-প্রকৃতি-বিহর-বৈষম্য ইত্যাদি সব বিষয় নিয়েই তিনি একাধিক কবিতা গান ছড়া ইত্যাদি রচনা করেছেন। তাহলে পঞ্চপাণ্ডবের প্রবর্তিত আধুনিক কবিতা রচনা বাদ যাবে কেনো? তিনি ওদের অনুসরণ না করে নিজ বৈশিষ্ট্য আরোপ করে রচনা শুরু করেন আধুনিক কবিতা এবং প্রবর্তন করেন দুই প্রকার ছন্দ: মুক্তক ও গদ্য। তিনি অধিকাংশ কবিতা গদ্যছন্দে রচনা করেছেন।
মুক্তক ছন্দে অন্য তিন প্রকার ছন্দের মতোই হিসেব-নিকেশের ব্যাপার থাকলেও গদ্যছন্দে একেবারেই নেই: এখানে অন্তমিল নেই, সারিতে পর্ব বা পর্ব বিভাজন হিসাবের বাধ্যবাধকতা নেই; হাত খুলে লিখে যাওয়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই নিজ বলয় থেকে বেরিয়ে আরেক ধরনের আধুনিক কবিতার সৃষ্টি করেন। এখনকার অধিকাংশ কবিরা রবীন্দ্রনাথের গদ্যছন্দে কবিতা রচনা করে যাচ্ছেন। পঞ্চপাণ্ডবও এই ছন্দে কবিতা রচনা করেছেন। কবি সৈয়দ শামছুল হক ‘মার্জিনে মন্তব্য’ গ্রন্থে তা স্বীকার করে সপক্ষেই কথা বলে গেছেন। তাহলে  কি আমরা প্রকৃতপক্ষেই রবীন্দ্রবলয় থেকে মুক্ত হতে পেরেছি?
পাঠকপ্রিয়তার দিক দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে এখনো রবীন্দ্রনাথের গীতিকবিতাই সাধারণ পাঠকের মনে গেঁথে আছে; কোনো অনুষ্ঠানে এখনো রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ বা ‘দুইবিঘা জমি’ ইত্যাদি উচ্চারণ করা হয়ে থাকে: তাঁর গদ্যকবিতা কোথাও পাঠ করতে শোনা যায় না। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই গীতিকবিতাসমূহ শতাব্দিব্যাপি জনপ্রিয় হয়ে থাকলেও তাঁর গদ্যকবিতার কোনো খবর নেই। তাঁর গদ্য কবিতা পঞ্চপাণ্ডব কর্তৃক সৃজিত আধুনিক কবিতার চেয়ে তুলনামূলকভাবে সহজ ও সরল আর সহজবোধ্য হওয়া সত্ত্বেও পাঠকের মনে ঠাঁই পায়নি।
কবিতা তথা সাহিত্য রচনা কার জন্য? পাঠকের জন্য নয় কি? কিন্তু আমরা আধুনিক কবিতা কার জন্য রচনা করছি? পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে একমাত্র জীবনান্দ দাশের ‘বনলতা সেন’, ‘আকাশলীনা’, ‘হায় চিল’ এবং রূপসীবাংলা সনেটগুচ্ছ বেশ জনপ্রিয়; যদিও তিনি আধুনিক কবিতার চিন্তা-চেতনা ধরে রাখার জন্য জীবদ্দশায় রূপসীবাংলা প্রকাশ করেননি। বনলতা সেন জনপ্রিয় কবিতার বিষয় ও শব্দ চয়নের জন্য। আর অন্য চার জন? বীষ্ণু দে ও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা এতোই দুর্বোধ্য ও দূরূহ যে এঁদের কবিতা পাঠকের অন্তরে নেই, আছে দুয়েকজন সমালোচকের মনে যারা দায় সারতে জন্মদিন বা মৃত্যুদিন উপলক্ষ্যে এঁদের কবিত্ব নিয়ে নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করে থাকেন; কিন্তু তাঁদের কবিতা উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহৃত হয় না কখনো কোথায়ও। আর ক’টা বছর গেলেই আধুনিক কবিতা শত বছর অতিক্রম করবে; কিন্তু আধুনিক কবিতা সম্পর্কে অধিকাংশ পাঠকের মনোভাব আগের মতোই: আধুনিক কবিতা পত্রিকার একটি কলামের মতো অথবা একটা প্রবন্ধের দুই দিক থেকে কিছু অংশ কাঁচি দিয়ে বরাবর কেটে নেবার পর যা দাঁড়ায় তাই আধুনিক কবিতা। গেলো এক শুক্রবারে একটি সাহিত্য আসরে আধুনিক কবিতা সম্পর্কে একজন একটি গল্প বললেন। গল্পটা এরকম: এক সাহিত্য আসরে এক ভদ্রলোক আধুনিক এক তুড়িতেই কয়েকটা লিখে ফেলা যায় বললে আধুনিক কবিতার কবিরা জোরেশোরে প্রতিবাদ করতে থাকেন; তখন ভদ্রলোকটি বললেন এখন দুটো আধুনিক কবিতা পড়ে শুনাবো, আপনারা মতামত দেবেন কবিতা দুটো কেমন হয়েছে; ভদ্রলোক গদ্যছন্দের সাথে তুলনীয় দুটো কবিতা পড়ে শুনালেন; উপস্থিত কবিতাপ্রেমীরা কবিতা দুটো নিয়ে আলোচনা করে বেশ প্রশংসাই করলেন; তখন ভদ্রলোকটি দুটো প্রবন্ধ দেখিয়ে বললেন যে ঐ প্রবন্ধ দুটো থেকেই তিনি আধুনিক কবিতা বলে কিছু অংশ পাঠ করেছেন!
তাহলে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক আধুনিক কবিতার পাঠক কারা? এক কথায় উত্তর-নেই। আমরা আধুনিক কবিতার পাঠক সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হচ্ছি। এটা কিসের জন্য হচ্ছে? প্রশ্নটির উত্তর আধুনিক কবিতার কবি এবং আধুনিক কবিতার আলোচক ও সমালোকদের প্রতি রইলো। প্রতিবছর বাংলা একাডেমিতে একুশের বইমেলায় গদ্যের চেয়ে কবিতার বই-ই বেশি প্রকাশিত হচ্ছে। পাঠক কম থাকলেও বই বেশি প্রকাশিত হচ্ছে কেনো? কবিতার বই প্রকাশে খরচ কম এবং পুসিং সেল করতেও সুবিধা। অর্থাৎ কবিতার বই এখন পুসিং সেলে সীমাবদ্ধ। ১৯৯৬ সালে ঢাকা বইমেলায় রফিক আজাদের কবিতা সমগ্র প্রকাশের পর একুশে বইমেলায় বইটি কিনতে গেলে প্রকাশককে জিজ্ঞেস করলে বলেন যে পাঁচটি কপিও বিক্রি হয়নি। ‘ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাবো’ কবিতার কবি জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে কোন অংশে কম নয়। কিন্তু বই বিক্রি হয় না।
যদি কবিতা পণ্য হয়ে থাকে এবং তা বিকোবার প্রয়োজন হয় তাহলে পাঠকের মনোভাব জেনে কবিতা সৃষ্টি করা উচিত। এর জন্য পাঠক জরিপের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে এবং পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী কবিতার প্যাটার্ন, আঙ্গিক, বৈশিষ্ট্য, পরিবর্তন করে কবিতা রচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে যত তাড়াতাড়ি পদক্ষেপ নেয়া যাবে তত তাড়তাড়ি কবিতা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়া সহজ হবে।
কোনো রচনাতেই পাঠকের বিকল্প নেই। পাঠক বর্জিত রচনা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহারের জন্য মলাটবদ্ধ হয়ে পড়ে থাকে আর্কাইভে। নিচের কবিতাটি কেমন ধরনের আধুনিক কবিতা? এটা কি পাঠকপ্রিয়তা পাবার যোগ্য হবে? ঠিকে থাকবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল অথবা জসীমুদ্দিনের কোন একটি কবিতার মতো?

      বিপ্লবি বীজ

আত্মঘাতি সন্মুখ সমরে কৌশল বাঁচায়
একটি মোক্ষম কবিতা মার্শাল ল-কে নাচায়
হামাগুড়ি, কখনো বা সুরঙে শুধু সন্মুখে
হাতুড়ি পেটায় না তো খরগোস চিতানো বুকে
ভাঙ্গতে হলে শৃঙ্খল দরকার সশস্ত্র বিপ্লব
পেটে উঠে আসবে ঘামে ফলানো ফসল সব
শত ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ভরেছে দেশটায়
শুধু ভাওতাবাজি ঘাপটি মেরে রয়েছে বেশটায়
মাকাল ঝুলানো ওদের রহস্যের হাসিতে
লুটতে পুরো মুনাফা ঝুলায় শ্রমিক ফাঁসিতে
অস্তিত্বে কেবল চে’ জাগ্রত হলেই তখন
শুকনো জমিনে বিপ্লবি বীজ জন্ম দেয় বন
পিপড়ে বিপ্লবি বলেই মাথায় অধিক বোঝা
একত্ববাদে বিশ্বাসি মূর্তিতে দেয় না পূজা
সব মূর্তি ভেঙ্গে থাকে পাঁচ ওয়াক্ত সেজদায়
রণে কৌশল খাটিয়ে লক্ষ্যবস্তু হাতে পায়।

একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ

 

মীজান রহমান

 

নারী, সৃষ্টি ও বিজ্ঞান
পূরবী বসু
নবযুগ প্রকাশনী
ঢাকা ২০০৯
মূল্য : ২৪০ টাকা।

 

দেশের মানীগুণী কবি-সাহিত্যিকদের ভূমিকা দিয়ে গ্রন্থের ওজন ভারি করার একটা প্রবণতা আজকাল অনেক প্রবাসী লেখকের মধ্যেই লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠছে। এতে করে গ্রন্থের প্রাথমিক আকর্ষণটি কিঞ্চিৎ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এরকম দু-চারটি আপাত-আকর্ষণীয় বই পড়তে শুরু করে শেষ পর্যন্ত অগ্রসর হওয়া বেশ কষ্টসাধ্য মনে হয়েছিল বলে সন্দেহ জাগতে থাকল মনে, মানীগুণী ব্যক্তিটি বইটি আদৌ পড়েচিলেন কি না। পড়ুন বা না-পড়ুন তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত ভূমিকা দ্বারা গ্রন্থপ্রণেতার মান বর্ধিত হলেও তাঁর নিজের ওজন কিঞ্চিৎ হ্রাসপ্রাপ্ত হয় বলেই আমার বিশ্বাস।

পূরবী বসু প্রবাসের অন্যঅন্য নাম-না-জানা লেখকদের একজন নন। তিনি দেশে এবং বিদেশে, উভয় স্থানে সমানভাবে সুপরিচিত, সুনন্দিত এবং সম্মানিত কথাশিল্পী। তাঁর বইতে কোনো ‘মহৎ’ ব্যক্তির ভূমিকার প্রয়োজন হয় না- তাঁর নিজের নামই তাঁর ভূমিকার জন্য যথেষ্ঠ। তবু তাঁর আলোচ্য গ্রন্থটিতে হায়াৎ মামুদের অত্যন্ত সুলিখিত ভূমিকাটি একেবারে বেমানান বা নিষ্প্রয়োজন মনে হয়নি আমার কাছে। হায়াৎ মামুদের প্রতি আমার এতোটাই ভক্তি যে, পূরবী বসুর লেখা আমাকে সহজভাবে টানা সত্ত্বেও বইটি হাতে পাওয়ার পর প্রথমেই আমি ভূমিকাটি পড়ে ফেললাম। এতে আমার তিনটি উপকার হলো। এক, হায়াৎ মামুদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা  দ্বিগুণ বেড়ে গেল, কারণ ভূমিকার ভেতর এতটাই সততা ও আন্তরিকতা ব্যক্ত হয়েছে যে তিনি যে আদ্যোপান্ত পড়েছেন বইটি, সম্ভবত একাধিকবার, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকলো না।  পড়ার পর গ্রন্থের মূল রসটুকু সংক্ষেপে বর্ণনা করে ছেন পাঠকের সুবিধার্থে। দুই, বিজ্ঞানের পঠন-পাঠন-অধ্যয়ন এই পরিচিত অনুশীলনগুলো সঙ্গে ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ হওয়ার  কী পার্থক্য তা অত্যন্ত স্বচ্ছ-সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন সাধারণ পাঠককে।  কবিতার আকারে কিছু লিখলেই যেমন কবি হয়ে যায় না কেউ,  গল্পকার মাত্রই  না কথাশিল্পী, তেমনি বিজ্ঞানে বড় বড় ডিগ্রি বা পদবি থাকলেই কেউ ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ হয়ে ওঠে না।  আসলে বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হওয়ার জন্য কাউকে  বিজ্ঞানচর্চা করতে হয় না, মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিবাদের আনুগত্য মানলেই যথেষ্ঠ। তিন, আমার ব্যক্তিগত রুচির বিচারে ‘বইটিকে না পড়ে থাকবার উপায় নেই’, এমন একটা তাড়ার ভাব তিনি সৃষ্টি করে দিয়েছেন আমার মনে।

আমি ভাগ্যবান যে, লেখিকার সঙ্গে  আমার ব্যক্তিগত আলাপ-পরিচয়ের সুযোগ হয়েছে।  প্রকৃতি, সমাজ এবং বিশ্বজগতের অনেক বিষয়ের ওপরই  আমাদের চিন্তাধারাতে মিল আছে। আমি জানি যে, পূরবী বসুর দুটি পরিচয়- কথাশিল্পী এবং পুষ্টিবিজ্ঞানী। উভয়ক্ষেত্রে  তাঁর পরিচিতের পরিধি সুবিস্তৃত। বিজ্ঞানজগতে পূরবী বসু একটি সম্মানিত নাম, বাংলাসাহিত্যে তাঁর কলমের খ্যাতি সর্বত্র। তাঁর প্রতিভার এই দ্বিমুখী ধারা এই গ্রন্থটির মধ্যে এক অপূর্ব মোহনায় মিশেছে- বইটি পড়ে এই মনে হয়েছে আমার।

বাইশটি রচনাসংবলিত এই সুখপাঠ্য বইটিকে মোটাদাগে তিন ভাগে ফেলা যায়। এক, সম্পূর্ণ  বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা তথ্যসম্ভার, যাতে লেখকের নিজস্ব আবেগ অনুভূতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। যেমন, ‘যুগলবন্দীর ইতিকথা’, ‘বালোবাসার রসায়ন’, ‘সৃষ্টির রহস্য: নারী ও পুরুষ’। এই লেখাগুলো দারুণ উপভোগ্য মনে হয়েছে আমার কাছে।  ‘ভালোবাসার রসায়ন’ লেখাটি তিনি শুরু করেছেন এভাবে: : ‘বুক ধড়ফড়। গলা শুকনো। চোখে বাষ্প। হাতের তালু ভেজা ভেজা। উষ্ণ ও দ্রুত নিশ্বাসপ্রশ্বাস। শরীরে  উত্তাপ।‘ প্রথম যৌবনের এই চিরপরিচিত প্রেমানুভূতিগুলোকে তিনি শুভ্রবসনা রসায়নশাস্ত্রবিদ গবেষকের শীতল গাম্ভীর্যের সঙ্গে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে স্থাপন করে বুঝিয়ে দিয়েছেন পাঠককে যে, এগুলো আসলে হরমোন নামক রাসায়নিক দ্রব্যের আকস্মিক আক্রমণের বাহ্যিক লক্ষণ ছাড়া কিছু নয়। চেলেদের হরমোনটির নাম হলো টেস্টোস্টারেন, মেয়েদেরটির এস্ট্রোজেন। এ দুটি মৌলিক হরমোনেরই নানা হেরফের মিলেমিশে রচনা করে নর-নারীর  যৌনজীবনের নানা বিচিত্র পাঁচালি। যেমন মেয়েদের বেলায় এস্ট্রেজেন আর অক্সিটোসিনের রাসায়নিক সংযোগে  তাদের শরীরে যৌনতাভাব  সৃষ্টি হয়। আবার অক্সিটোসিনের সঙ্গে পলিকটিন যখন মেশে তখন তাদের মনে মাতৃসুধা জন্ম নেয়। ছেলেদের বেলাতেও অনুরূপ মেশামেশির ব্যাপার আছে, অবশ্যই। লেখক আমাদের এখানে জানিয়েছেন যে, মস্তিষ্কবিষয়ক গবেষণা থেকে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, ‘...প্রেম ও নেশা জৈবিকভাবে প্রায় একই রকম।’

‘সৃষ্টির রহস্য: নারী ও পুরুষ’ লেখাটিতে মেয়ে-পুরুষের  যৌনসংযোগজাত সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে উদাহরণ টেনেছেন প্রাণী ও উদ্ভিদজগৎ  থেকে- দুই প্রকারের মাছি, ব্যাঙ,  কোকিল, ফুল। উপসংহারে তিনি বলেছেন : ‘...সন্তানের মঙ্গল ও সুস্থ প্রজন্ম তৈরি স্ত্রী জাতির সবচেয়ে বড়ো আকাঙ্ক্ষা। তার একান্ত ব্যক্তিগত আচরণ, পছন্দ-অপছন্দের অনেকাই সেই চিন্তার চারপাশে ঘোরে। অন্যদিকে পুরুষের প্রধানত দুটি লক্ষ্য। এক, যত বেশি ও যত রকম বৈচিত্যপূর্ণ স্ত্রীসঙ্গ উপবোগ করা যায়। দুই, নিজের বংশ বা জিনস-এর বিস্তার ঘটানো ও তার পবিত্রতা রক্ষা করা।‘ শেষের লাইন দুটি পড়ার পর একটু নড়েচড়ে বসতে হলো চেয়অরে। তাহলে পুরুষ হিসেবে একটা পুংমক্ষিকার সঙ্গে আমার তফাৎটি দাঁড়াল শুধু এইখানে যে, আমি পূরবী বসুর বিজ্ঞান বইয়ের রিভিউ লিখতে পারি, মাছি পারে না। আর তো কোনো তফাৎ দেখছি না! দুই বিজ্ঞানভিত্তিক নারীবাদী রচনা। ১৮৪ পৃষ্ঠার বইটিতে শতাধিক পাতাজুড়ে এই সুরটি বারবার ধ্বনিত হয়েছে, নানা ছন্দে, নানা বর্ণে, নানা অলংকরণে এবং সঙ্গত কারণেই। লেখক নিজে নারীজীবনের তিনটি বিপুল পারাবার পারাপার করেছেন- তরুণীম, গৃহিণী, মা। নারী, বিশেষ করে বাঙালি নারীর সকল সুখ-দু:খ, আনন্দ-বেদনা, জ্বালা-যন্ত্রণার প্রতিটি শোণিত কণায় তাঁর নিত্য বিচরণ। বাঙালি নারীর প্রতিটি ব্যাহত আকাঙ্ক্ষা, প্রতিটি  বিধ্বস্ত স্বপ্নের সঙ্গে  তাঁর অঙ্গাঙ্গী পরিচয়।  সেই পরিচিতির অগাধ সম্পদের সঙ্গে  মিশেষে গবেষণাগারের শীতলক্ষ থেকে অর্জিত লিঙ্গনিরপেক্ষ জ্ঞান। এই দুয়ের  বস্তুনিষ্ঠ সংমিশ্রণ কোনো পুরুষ লেখকের লেকাতে প্রকাশ পেত বলে আমি মনে করি না। যেমন তাঁর  ‘রজস্বলা নারী’ নিবন্ধটির এক জায়গায় আছে- ‘...কোটি কোটি রজস্বলা নারী, যাদের নিয়ে আমাদের সকলের এতো মাথাব্যথা, যাদের মাসিক একবার বন্ধ হলে সম্ভাব্য নতুন প্রাণের সংযোজনের আশঙ্কায় এবং এর অর্থনৈতিক পরিণামের ভয়াবহতায় সকলে শঙ্কিত হয়ে ওঠে, তারা প্রতিমাসে একটি করে সপ্তাহ কেমন করে কাটায়, শরীর নিয়ে কতোটা ব্যস্ত, বিব্রত ও সংকুচিত থাকে, তার খবর কেউ রাখি না আমরা। এ বিষয়টি যে আলাদা কোনো গরুত্ব পেতে পারে তাও কেউ মনে করি না।‘ তাই তো। আমি নিজে কি কখনো করেছি? করিনি। আমার বোনেরা যখন বড় হচ্ছিল আমার চোখের সামনে তখন যেমন করিনি, নিজের স্ত্রী যখন প্রতিমাসে  একবার রান্নাবান্না বন্ধ রেখে বিছানায় শুয়ে ককাতো, তখনো করিনি। সেই মেয়েলি বিষয়টিকে কোনোরকম গুরুত্ব দেয়ার মনমানসিকতা নিয়ে জন্মই হয়নি আমাদের এবং হয়নি বলেই পুরুষ-নির্মিত ধর্মগুলো ‘...রজস্বলা নারীদের ধর্মস্থানে যেতে বা ধর্মীয় আচরণ করতে বারণ’ করে দিয়েছে।

‘বাঙালি পরিবারে নারী-অধিকার:  চার মৌলিক উপাদান’ শীর্ষক লেখাটিতে পূরবী  বসু রজস্বলা মেয়েদের প্রসঙ্গটি আবার তুলে এনে এটিকে চার উপাদানের একটি বলে চিহ্নিত করেছেন। এ-সমস্যাটি গ্রামের গরীব মেয়েদের জীবনকে কতোখানি বিভীষিকাময় করে রেখেছে তা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন: ‘...তাদের না আছে নিভৃতি বা নির্জনতা, না আছে নিজস্ব ঘর, পরিচ্ছন্ন কাপড় বা প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপাদান। ফলে মাসের ওই প্রত্যাশিত দিনগুলা তাদের কাছে অবির্ভূত হয় বিভীষিকার মতো, বিশেষ করে অল্পবয়সী সদ্য রজস্বলা নারীদের জন্য।‘ ভারি সুন্দর, মনোগ্রাহী একটি রচনা। গৃহবধূর জীবন যে একঘেঁয়েমি আর চিরক্লান্তির কাদামাটিতে কী নিদারুণভাবে নিমজ্জিত তার অত্যন্ত মর্মন্তুদ বর্ণনা রয়েছে এতে। প্রতিটি পুরুষেরই বোঝা উচিত লেখাটি পড়ে, তার জীবনের সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটির প্রতি কত অর্বাচীন অবহেলায় কতো কষ্ট, কত দু:খ, অপমান আর যন্ত্রণার সুতীক্ষ্ণ বাণ নিক্ষিপ্ত হয়েছে তার পাষাণ পুরুষহৃদয় থেকে।

‘পিল’ শীর্ষক লেখাটি াামার আরেকটি দারুণ পছন্দের লেখা। এসে সব আছে: নারীর অধিকার-চেতনা, বিজ্ঞান, বিবেকবান পরুষ বিজ্ঞানীর সাগ্রহ সহযোগিতা, গল্প, ইতিহাস, ব্যক্তিত্ব। একটি সত্যিকার স্বয়ংসম্পূর্ণ চনা। ‘পিল অবশেষে তৈরি করে দিল স্বাধীন মানুষ হিসেবে নারীর পথচলার প্রশস্ত ও অপেক্ষাকৃত মসৃণ এক রাস্তা।‘ তাঁর এই মূল্যায়নের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত, যদিও ঠিক একই কারণে হয়তো পিলকে পৃথিবীর প্রায় সকল ধর্মপ্রতিষ্ঠানই শত্রু মনে করে। পিলের বিরোধিতা যেন ভ্যাটিকানের দ্বিতীয় ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘নারীদেহে অপ্রয়োজনীয় ও বিপজ্জনক অস্ত্রোপচার’ একটি রোমহর্ষক নিবন্ধ। পুরুষজাতির সদস্য হিসেবে গল্পটি আমাকে লজ্জায়-ঘৃণায় কুঁকড়ে ফেলেছে।  মেয়েদের খৎনার ব্যাপারটি আমি জানতাম, কিন্তু ‘সতীচ্ছদ মেরামতের কারণে অস্ত্রপচার’- সেটি আমার জানা ছিলো না। মেয়েদের সুখ, আহ্লাদ বোধ, অনুভূতির ব্যাপারে আমরা খুব উদাসীন- সেটা মাতানত করে মানছি। কিন্তু এতোটা নিষ্ঠুর, এতোটা নির্মম হতে পারি নিজেদের  ভ্রষ্ট পৌরুষ আর নগ্ন আধিপত্য  প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে , সেটা মেনে নেওয়া সহজ নয়। সৌভাগ্যবশত এ-দুটি বর্বর প্রথা পাকিস্তানের সীমানা অতিক্রম করে আমাদের দেশের দিকে  এগোতে পারেনি, অন্তত এখন পর্যন্ত। কিন্তু বাংলাদেশ একটি বিপুল মুসলিমগরিষ্ঠ দেশ এবং ইসলাম নিয়ে আমাদের যারপরনাই অহংকার, অথচ এ দুটি বর্বরতার প্রধান অকুস্থল আরব এবং আফ্রিকায় গুটিকয় মুসলিমপ্রধান দেশ। আরবি ভাষা ও প্রথার প্রভাব বেশ লক্ষণীয়ভাবেই প্রবেশ পেতে শুরু করেছে আমাদের জাতীয় জীবনে, সুতরাং খৎনার প্রথাটিও যদি সুড়সুড় করে ঢুকে পড়ে কোনো পুণ্যবান মুসল্লির বাড়িতে, কে তাকে বাধা দেবে। অবশ্য পূরবী বসু এটা পরিষ্কার বলে দিয়েছেন যে, এই প্রথাগুলোর সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই, ইসলামের অনেক আগে থেকেই এটি প্রচলিত ছিল ওই গোত্রগুলোতে। তবে আমার দু:খ  এখানে যে, ইসলামের মতো একটি মহৎ ধর্ম তাতে কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি, যেমনটি আরোপ করেছে মদ্যপান আর শূকরমাংসের ওপর। লেখাটির শেষের দিকে লেখক আরো কতগুলো অস্ত্রোপচারের কথা উল্লেখ  করেছেন যেগুলো বলতে গেলে চাপিয়ে দেওয়া হয় নারীর ওপর, দরকার হোক বা না হোক। ‘ভাবখানা এমন যে নারীদেহ যদি কেবল সনতান বানাবার যন্ত্র ও সন্তানের খাদ্য যোগাবার যন্ত্র না হয়ে থাকে,  তাহলে তা শুধুই পুরুষের আনন্দ যোগাবার রসদ।‘ শুনতে বড় কঠোর মনে হয়, কিন্তু গভীরভাবে ভেবে দেখলে প্রতিবাদ করবার  ভাষা থাকে না।

নারীদেহকে পুরুষের যৌনসুখ আর বংশবৃদ্ধির যন্ত্র হিসেবে যদৃচ্ছ ব্যবহার করবার মানসিকতা যদি প্রাচীন বা মধ্যযুগীয় আঞ্চলিক প্রথা বলে মনে হয়ে থাকে, আগের প্রবন্ধটিতে, তাহলে ‘মানুষ বানাবার মেশিন : প্রযুক্তি ও জরায়ু নিয়ে ব্যবসা’ লেখাটিতে দেখা যাবে যে, আধুনিক প্রযুক্তিপ্রদীপ্ত ও মানবাধিকার-সচেতন মুক্তবিশ্বেও নারীদেহের ব্যবহার মৌলিকভাবে খুব একটা বদলায়নি। লেখাটির গোড়াতেই পূরবী বসু বলেছেন, ‘...অতি সম্প্রতি প্রজনন-প্রযুক্তির কিছু উন্নতি ও আবিষ্কার মেয়েদের আবার মুখ্যত প্রজনন-যন্ত্রের ভূমিকায় নিক্ষেপ করছে।‘ একদিকে পৃথিবীর এক অন্ধকার কোণাতে মেয়েদের ক্লাইটোরিস কেটে পুরুষের কুমারীভোগের চিরন্তন লালসা চরিতার্থ হয়ে চলেছে অব্যাহত গতিতে, অন্যদিকে আলোকিত জগতের বিশ্বায়িত বাজারে চলছে আরেক বিচিত্র খেলা।  লেখকের ভাষায, ‘জিম্বাণু, শুক্রাণু ও প্রজনন-অঙ্গের বিকিকিনি ও ভাড়ার মাধ্যমে আজ শুধু বন্ধ্যা নারীই নয়, যে-কোনো বিত্তবতী মহিলা সন্তান ধারণ করার শারীরিক অসুবিধার জন্য অথবা নান্দনিক কারণে অনায়অসে দেখেশুনে একটি মেয়েকে ভাড়া করে নিতে পারে সন্তানের জন্মদাত্রী হিসেবে।‘ অভাবী মেয়েদের শরীর নিয়ে অনাদিকাল থেকে যে-ব্যবসা চলে আসছে, আাজকের জরায়ু-ব্যবসা তারই এক অভিনব সংস্করণমাত্র।

নারীর প্রতি একপ্রকার কর্তৃত্বের দৃষ্টি শুধু যে আমাদের দেশেই পরিলক্ষিত হয় প্রকটভাবে তা নয়, চীন জাপান কোরিয়ার মতো অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশেও অবস্থা প্রায় একইরকম। এ যেন একটা সর্বজনীন বিষয়- পুরুষ প্রকৃতির সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দেখেশুনে মনে হয় যেন নারী নিজেও তা মেনে নিয়েছে। বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ কথাবার্তাতে ‘কর্তা’ এবং ‘গৃহিণী’ শব্দুটির ব্যবহার যত রসচ্ছলেই হোক, একটা প্রচ্ছন্ন উর্ধ্ব-নিম্ন জাতীয় বিভাজনী মনোভাব প্রকাশ করে। এ আধিপত্যবাদী মানসিকতা, দৈহিক শক্তির অসমর্থতা, সর্বোপরি ধর্মীয় বিধানের অপচ্ছন্ন অনুমোদন,এগুলোর রাসায়নিক মিশ্রণের নাম: নারীর প্রতি দুর্ব্যবহার, নির্যাতন, সহিংসতা। নারীজীবনের গোটা অস্তিত্বজুড়ে এই যে দানবিক ছায়া দাঁড়িয়ে আছে সারাক্ষণ তার ভয়াবহ মূর্তির একটা আভাস পাই ‘সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার নারী’সহ কতিপয় নিবন্ধে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নারীসমাজ, আজকের এই বিশ্বজোড়া নারীমুক্তি আন্দোলনের জয়জয়কারে যুগেও, কত বিবিধ প্রকারে দিনের পর দিন নির্যাতিত হয়েচলেছে, তার বিস্তারিত তথ্য পরিবেশিত হয়েছে এই লেখাটিতে সাম্প্রতিক জরিপের ফলাফলসমেত। জাপান প্রসঙ্গে লেখক জানিয়েছেন, ‘...শতকরা ৫৭% জাপানি মেয়ে- জীবনে কোনো না কোনো শারীরিক, যৌন ও মানসিক- এই তিন নির্যাতনেরই শিকার হয়েছে।‘ এমনকি ‘আমেরিকাসহ পশ্চিমা অনেক দেশেও এর প্রকোপ বিস্ময়কর।‘ মজার ব্যাপর যে, এই যে এতো ব্যাপক নারী-নির্যাতন বিশ্বজুড়ে,তার পেছনে নারীর নিজেরও সসহযোগিতা নেহাৎ নগণ্য নয়। ‘...অন্যায় বা বেয়অদবির জন্য স্বামী কর্তৃক স্ত্রী পেটানো মেনে নেওয়া যায় এই প্রশ্ন করলে মিসরের স্বয়ং মেয়েদেরই ৭০% বলেছে যৌনসঙ্গমে রাজি না হওয়া তেমন একটি কারণ।‘
‘...যৌতুকের জন্য স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বধূনির্যাতন বা বধূহত্যা...’ তো প্রায় প্রাত্যহিক ঘটনা আমাদের উপমহাদেশের পল্লীসমাজে। পূরবী বসুর সঙ্গে আমি একমত যে, ‘...আমাদের নীরব থাকার দিন শেষ হয়ে এসেছে। নারীর প্রতি সহিংসতা এখন আমার-আপনার সকলের সমস্যা।‘

এ-গ্রন্থের তৃতীয় ধারাটিতে অনেক তথ্যবিবরণীর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে লেখকের নিজস্ব কিছ ুক্ষোভ নীলিমা  আবেগ দু:খ, যার উৎস তাঁর ব্যক্তিগত জীবন না হয়েও এক হিসাবে পৃথিবীর সব নারীরই ব্যক্তিগত জীবন। নারীর কষ্ট যে কত গভীর তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় ‘মা হওয়া কি মুখের কথা?’ নিবন্ধটিতে তার মায়ের মুখে শোনা গান ‘শুধু প্রসব করলেই হয়না মাতা , মা হওয়া কি মুখের কথা?’ এবং তার প্রত্যুত্তরে তাঁর দিদিমার মুখের ‘শুধু প্রসব করলেই হয়না ব্যাথা, মা হওয়া কি মুখের কথা?’ গানটিতে। এই যে প্রসবের ব্যাপারটি, সেটা যে কত কষ্ট আর ঝুঁকিপূর্ণ একটি ঘটনা তার বিন্দুমাত্র ধারণা যদি থাকতো পুরুষজাতির তাহলে তারা প্রতিবছর একটি করে সন্তান ধারণ করতে বাধ্য করতো না অসহায় বউগুলোকে। ‘পিল’ আবিষ্কারের মূল উদ্যোক্তা, আইরিশ ক্যাথলিক পরিবারের তেজস্বী মেয়ে মার্গারেট সেঙ্গার, মায়ের অকালমৃত্যুতে কাতর হয়ে কফিনের সামনে দাঁড়ানো বাবাকে লক্ষ্য করে শক্ত গলায় বলেছিলেন,  তুমিই এর জন্য দায়ী, আমাদের মা এতগুলো সন্তান ধারণ করার জন্যই এভাবে অসময়ে মরে গেল।‘ (‘পিল’)। মার্গারেটের মা বিয়ের পর  থেকে এগারোটি জীবিত ও সাতটি মৃত সন্তান প্রসবের ধকল সহ্য করার পর যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে পঞ্চাশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। (‘পিল’ গল্পটি উপমহাদেশের বাবাদের কাছে পড়ে শোনালে কোনো লাভ হবে কি? সম্ভবত নয়)।  নারীর শরীর পুরুষের অস্থাবর সম্পত্তি ছাড়া কিছু নয়, এই মানসিকতাটি পাঁচ হাজার বছর ধরে বিরাজ করছে মানবসমাজে, তার মূল কারণ নারীর অসমর্থতা বা অযোগ্যতা নয়, পুরুষের ওপর নারীর আর্থিক ও সামাজিক নির্ভরতা। লেখক ঠিকই বলেছেন যে: ‘..নারী সেদিনই নিজের শরীরের দায়িত্ব নিতে পারবে,..যেদিন তার অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা আসবে, তার মৌলিক অধিকার নিয়ে সে সচেতন ও মুখর হবে।‘ (‘মা হওয়া কি মুখের কথা?’) এই স্বাবলম্বিতা অর্জনের প্রয়োজনীয় শর্ত- নারীমুক্তি- তার আন্দোলন অল্প অল্প করে শুরু হূেছিল আঠারো শতকের শেষদিককার ইউরোপে। সেউ ধূম্রায়মাণ আন্দোলন আজকে এতোটাই বেগবান হয়ে উঠেছে পশ্চিমে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এক পরিসংখ্যান থেকে তথ্য পাওয়া  গেল যে, চাকরির ক্ষেত্রে  নারী-পুরুষের প্রায় সমান সমান অবস্থান – মেয়েরা ৪৯.৮%, পুরুষ ৫০.২% (সূত্র: সাপ্তাহিক টাইম, ২৬ অক্টোবর, ২০০৯)। সে-তুলনায় আমাদের অভাগা দেশগুলো অনেক পেছনে পড়ে আছে। লেখক তাতে নিরুৎসাহিত হলেও আশাহীন নন। যখন ‘...পশ্চিমে নারীর সম-অধিকার নিয়ে চারদিকে তোলপাড় হচ্ছে, তখন ভারত উপমহাদেশে নারীর আক্ষরিক অর্থে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারের দাবি সবেমাত্র উচ্চারিত হতে শুরু করেছে।‘ (‘একুশ শতকে নারী –ভাবনা’) ‘বাঙালি পরিবারে নারী অধিকার: চার মৌলিক উপাদান’ শীর্ষক নিবন্ধটিতে সেই ক্ষীণ আশাটিকে আরেক ধাপ এগিয়ে দিতে তিনি বলছেন: ‘এটি সর্বজনবিদিত যে, কেনো দেশের উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি হচ্ছে নারীর অবস্থা ও অবস্থান। সেই বিচারে আমাদের নারীরা তাদের চলাচলের পরিধি আজ অনেকটাই বিস্তৃত করেছে।‘

নারীর প্রতি পুরুষশাসিত সমাজের চিরাচরিত অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লেখকের প্রতিবাদী কণ্ঠ সজোরে উচ্চারিত হয়েছে ‘কিছু অবাঞ্ছিত শব্দযুগল’, ‘পুরুষ ও প্রকৃতি- নারীর দুই চিরন্তন প্রতিপক্ষ’, ‘সুমাতা যদি হয় সুপিতা কেন নয়’- এ ধরনের কটি লেখাতে। কিন্তু তিনি উগ্র নারীবাদীদের মতো কোনো নারীশাসিত সমাজের স্বপ্ন দেখছেন না। বরং বলেছেন, ‘এখন আমরা চাই অবদমিত নারী এবং নারীর সহযোগী শক্তি প্রগতিশীল পুরুষের যৌথ উদ্যোগে কিছু মানবিক মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটাতে- রাজছত্রে এবং পরিবারে। ...কেননা পিতৃতন্ত্রের বদলে মাতৃতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা আমাদের মোটেও কাম্য নয়।‘ (‘একুশ শতকে নারী-ভাবনা’)। অর্থাৎ তাঁর  স্বপ্ন একটি মানবতান্ত্রিক সমাজের। এই কল্পনাটি পূর্ণ আকার লাভ করেছে ‘একটি নারী-রাষ্ট্রের সন্ধানে’ নিবন্ধটিতে। নারী-রাষ্ট্র বলতে তিনি কোনো নারীপ্রধান বা নারীতান্ত্রিক রাষ্ট্র বোঝাচ্ছেন না, বোঝাচ্ছেন নারীসুলভ গুণগুলো থাকবে যে-রাষ্ট্রে। অর্থাৎ যেখানে ‘...সাধারণ মানুষের মধ্যে সামাজিক কল্যাণমূলক অনেক বেশি প্রকল্প থাকে, যেমন- সাধারন নাগরিকদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিনোদন, স্যঅনিটেশন, বাসস্থান এ নিরাপত্তার ভার সরকার গ্রহণ করে থাকে, যাতে জনসাধারণের মৌলিক চাহিদাগুলো অনায়াসে পূর্ণ হয়।‘ এই লৈকাটি থেকে আমরা জানতে পারি যে, Geert Hafstede-সহ কিছু গবেষক ও চিন্তাবিদের মতানুসারে পৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহকে পুরুষ-রাষ্ট্র আর নারী-রাষ্ট্র- এই দুভাগে ভাগ করা যায়। পুরুষ-রাষ্ট্র, অর্থঅৎ যেখানে ‘...শ্রেণীবিভাজন প্রগাঢ় এবং সহমর্মিতার চেয়ে প্রতিযোগিতার প্রভাব’, যার উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও জাপান। আর নারী-রাষ্ট্রের কাতারে পড়ে গুটিকয়েক রাষ্ট্র- সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, নেদারল্যাণ্ডস। আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে  চাইলে নারী ও পুরুষ দুই পক্ষকেই  হতে হাত মিলিয়ে কাজ চালাতে হবে বৃহত্তর মানবকল্যাণের স্বার্থে, এই বাণীটিই উদাত্তস্বরে প্রকাশ পেয়েছে লেখকের গোটা বইটিতে। মানবসমাজে ভেদ-বিভেদের পরিবর্তে প্রেমের বন্যা বইয়ে দিতে  নারী-পুরুষ উভয়কেই তাই নিজের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসতে হবে। পুরুষকে তার আগ্রাসী ভূমিকা ছেড়ে অনেকটা নারীর মতো ধৈর্য্যশীল, পরমতসহিষ্ণূ ও কল্যাণময় হয়ে উঠতে হবে। আর নারীকেও সেইসঙ্গে হতে হবে  অধিকার-সচেতন, আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী।‘ (‘একটি নারী-রাষ্ট্রের সন্ধানে’)।

পশ্চিমা বিশ্নে মোটমাট প্রায় পঞ্চাশ বছর থাকা হলো আমার। নিজেকে আমি লেখকের সেই ‘প্রগতিশীল পুরুষদের’ই একজন বলে ভাবতে ভালোবাসি; যদিও সত্যি সত্যি তা কিনা আমি, তার বিচার আমাকে নয়, আমাকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন জেনেছেন, তাদের। তবু ‘পাশ্চাত্যে কর্মজীবী বিবাহিতা বাঙালি’র মতো সূক্ষ্ম অবলোকন ও বীক্ষণধর্মী রচনা আমার পক্ষে লেখা সম্ভব হতো না। অসম্ভব ভালো লেখা একটি। এতোদিন পর ‘শিকবিশনা’ (শিক্ষিত কর্মজীবী বিবাহিত শহুরে নারী) ও ‘প্রশিকবিশনা’দের (প্রবাসী ‘শিকবিশনা’) মনের কথাগুলো কিছুটা জানলাম। এ-গল্প পূরবী বসুর মতো একজন সফল ‘প্রশিকবিশনা’র পক্ষেই বলা সম্ভব। এ-গল্প অন্যান্য প্রশিকবিশনার সবারই জানা, তাই ওঁদের না পড়লেও চলবে। কিন্তু ‘শিকবিশনা’রা পড়লে উপকৃত হবেন, তার চেয়েও উপকৃত হবেন ‘শিকবিশপু’রা (শিক্ষিত কর্মজীবী বিবাহিত শহুরে পুরুষ), যদি তারা আদৌ গরজ করে পড়েন বইটা। আরো একটি গোষ্ঠীর  জন্য এটিকে আমি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে সুপারিশ করব: ‘প্রছেসথাশা’ ৯প্রবাসী ছেলের সঙ্গে থাকতে আসা শাশুড়ি)। প্রশিকবিশনাদের শরীরে যতটুক রক্তবিন্দু অবশিষ্ট থাকে স্বামী-সংসার-কর্ম-সমাজের বহুবিধ চাহিদার কারণে, গৃহবাসী শাশুড়ি অতি উল্লাসের সঙ্গে  সেটুকু পান করে নেন, তার বেশকিছু দৃষ্টান্ত, আমার মতো স্থুলদৃষ্টি পুরুষেরও চোখে পড়েছে।

গ্রন্থটির শেষ নিবন্ধ: ‘নোবেলবিজয়ী নারী বিজ্ঞানী’। এই লেখাটি পড়ার পর কারো মনে সন্দেহ থাকবে না যে, সুযোগ  পেলে জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও নারী পুরুষের সমকক্ষ হতে পারে। সাধারণ পর্যায়ের সমকক্ষতা শুধু নয়, সর্বোচ্চ পর্যায়ের দক্ষতা। ১৯০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়টিতে চারজন বিজ্ঞানী দুবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন; তার মধ্যে একজন ছিলেন নারী- মেরি কুরি। ১৯০৩ সালে স্বামী পিয়ের কুরির সঙ্গে যুগ্মভাবে  পয়েছিলেন পদার্থবিদ্যায়। তারপর ১৯১১ সালে একাই পেয়েছিলেন রসায়নশাস্ত্রে। শুধু তাই নয়, তাঁর মেয়ে আইরিন জুলিও কুরি, তিনিও রসায়নশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৩৫ সালে। মায়ের মতো তিনিও স্বামী ফ্রেডেরিকের সঙ্গে যুগ্মভাবে পেয়েছিলেন। পুরুষ প্রাপকের তুলনায় কম হলেও নোবেলবিজয়ী নারীর সংখ্যা নেহাৎ নগণ্য নয়। লেখক আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ‘বিজ্ঞানে মৌলিক অবদান রাখার জন্য যে পরিমাণ সাধনা, সময় এবং পরিশ্রম ব্যয় করতে হয়, যে-ত্যাগ ও তিতিক্ষার পরিচয় দিতে হয়, তা অনেক নারীর পক্ষেই সম্ভব হয় না বাস্তব কারণে।‘ তাদের বিজ্ঞান সাধনার পথে প্রকৃতি, পুরুষ ও সমাজ, এই তিনটি বিশাল শক্তি অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ‘...যে সময়টাতে একজন নারী বিজ্ঞানী সবচেয়ে বেশি কর্মক্ষম এবং সৃজনশীল, তখনই তাকে সন্তান ধারণ ও প্রতিপালর করতে হয়। অর্থাৎ বিজ্ঞান গবেষণার ঘড়িটি তার জৈব ঘড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে।।‘

নারীর জীবনকহিনি তার কষ্ট-বেদনা, তার অধিকার, এসব নিয়ে অনেক মানীগুণী লেখক অনেক লেখালেখি করেছেন বাংলা সাহিত্যে। কিন্তু পূরবী বসুর মতো বৈজ্ঞানিক তথ্যসমৃদ্ধ লেখা এর আগে কেউ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। লিখলেও সম্ভবত এরকম পূর্ণাঙ্গ পুস্তকাকারে লেখেননি কেউ।

বইটির বৈশিষ্ট্য হলো যে, এটি একাধারে একটি বিজ্ঞানবিষয়ক বই, একটি নারীবিষয়ক গল্প, একটি মানবাধিকার বিষয়ক গল্প। ‘নারী অধিকার যে মূলত একটি মানবাধিকার’, এ বাণীটি বিজ্ঞানের সাক্ষ্যপ্রমাণ ও কথাশিল্পের জাদুর মধ্যে দিয়ে অত্যন্ত কমনীয়ভাবে ফুটে উঠেছে বইটিতে। এ বইয়ের খুঁত বলে কিছু ধরা পড়েনি আমার চোখে, দু-চারটি মুদ্রণত্রুটি ছাড়া।  তবে আমার ব্যক্তিগত বিচারে একটি অসম্পূর্ণতা- একটি তথ্যসূত্রের তালিকা যোগ করতে পারলে ষোলকলা পূর্ণ হতে পারতো। সেটা থাকলে বিজ্ঞানমনস্ক অনুসন্ধানী পাঠক এ-বিষয়ে  আরো খোঁজাখুঁজি করতে পারতেন।

সূত্র: কালি ও কলম