সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

title

Click to add text, images, and other content


 
বাংলা নববর্ষ: বাঙালি জাতির অনন্য ঐতিহ্যের পরিচায়ক

মিজানুর রহমান রানা

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ। এ দিনটি বাঙালি জাতির জন্যে একটি উৎসবের দিন হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। সারাবিশ্বের মধ্যে যেখানেই বাঙালি রয়েছে, সেখানেই এ নতুন দিনে নতুনভাবে সবাই মিলে এ বছরটিকে বরণ করে নেয়। আর ভুলে যেতে থাকে বিগত বছরের নানা রকম কেশ, দুঃখ ও হতাশাকে। প্রতিটি বাঙালিরই কামনা থাকে নতুন বছরের নতুন সূর্যোদয় যেন তাদের জীবনকেও অনুরূপ নতুনত্বের ছোঁয়ায়, আনন্দে-ভালোবাসায় রাঙিয়ে দেয়।
বাংলা নববর্ষ বা বাংলা সন হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হত গ্রেগরিয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। তবে বর্তমানে আমাদের দেশে যেমন নববর্ষ বাঙালি জাতির নতুন বছরের সূচনার জন্যে একটি সর্বজনীন উৎসব হিসেবে পরিগণিত, পালিত হয়ে আসছে তা’ একসময় এমন ছিলো না। তৎকালীন সময়ে নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ ‘আর্তব উৎসব’ তথা ঋতুধর্মী উৎসবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিলো কৃষিকাজ। কারণ সে সময় আধুনিককালের মতো প্রযুক্তির ছোঁয়া ছিলো না বলে কৃষকদের ঋতুর ওপরই ভরসা করতে হতো।
এক সময় ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী জনগণের কাছ থেকে নির্ধারিত কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতো। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা’ কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। ফলশ্র“তিতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করার জন্যে বাধ্য করা হতো। যা ছিলো নিতান্তই অমানবিক। তাই মুঘল সম্রাট আকবর সুষ্ঠুভাবে ও সঠিক সময়ে খাজনা আদায়ের জন্যে সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে বাংলা সন প্রবর্তনের নির্দেশ প্রদান করেন। সম্রাটের নির্দেশনা অনুযায়ী তৎকালীন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ্ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিলো ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।
সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। তবে ১৯১৭ সালে আধুনিক নববর্ষ উদ্যাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায়। (তথ্য: উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে) এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের বর্ণনা পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনেও ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালন করার একটা সংস্কৃতি চালু এ দেশে। এভাবেই বাঙালি সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাঙালি চেতনার, বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্যের একটা অংশ হয়ে যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার যে প্রধান তিনটি ুদ্র জাতিস্বত্বা রয়েছে, এদের প্রত্যেকেরই বছরে নতুন দিনে উৎসব রয়েছে। ত্রিপুরাদের ‘বৈশুখ’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ ও চাকমাদের ‘বিজু’ উৎসব। তিনটি জাতিস্বত্বাই একত্রে  মিলে এখন এই উৎসবটি পালন করে থাকে। যৌথ এই উৎসবের নাম হচ্ছে ‘বৈসাবি’।
বাংলার সব জাতি-উপজাতি, গোত্র, ধর্ম, বর্ণ আজ তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য-ঐশ্বর্যে লালিত-পালিত হচ্ছে। তারা বাংলার নিবিড়-নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে বুকে ধারণ করে দেশের প্রতি পরম মমতা ও ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছে। তাই বলা চলে, বাঙালি চিরকালই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিপ্রিয় জাতি। এ জাতির নিজস্ব স্বকীয়তা হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতি। বাংলা সন, বাংলা গান, বাঙালি খাদ্য, অভিরুচি, আপ্যায়ন সবই তাদের নিজস্ব ঢংয়ে। এ জাতির রীতি-নীতি, কৃষ্টি-সংস্কৃতি একদমই অন্য জাতি থেকে পৃথক। বছরের শেষ দিনে যেমন দেখা যায় হালখাতা উৎসব, ঠিক তেমনি নতুন বছরের শুরুতে যখন দেখা যায় প্রাণখোলা আনন্দের বন্যা। তরুণীরা নতুন বছরের শুরুতে সাদা জমিনের লাল পাড় দেয়া শাড়ি পরে, তরুণ-যুবকরা ফতুয়া, পাঞ্জাবি পরে উদ্বেলিত, শিশু-কিশোররা মেতে ওঠে মেলায় নানা রকমের খেলনা সামগ্রী নিয়ে। ঐতিহ্যপ্রিয় বাঙালি সমাজে পান্তাভাত, ইলিশ মাছ ও বেগুণভাজি খাওয়ার ধুম পড়ে।
উৎসবের ভেতর দিয়ে মানুষ ুদ্র থেকে বৃহৎ হয়, এ বিষয়ে অনেকেই সন্দেহমুক্ত থেকেছেন। পহেলা বৈশাখে বাঙালি চেতনার মাঝে যেসব প্রাণবন্ত সত্তা জাগরিত হয় সে সত্তা বাঙালিকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। বাঙালির প্রাণে তখন সঞ্চারিত হয় সম্প্রসারিত চেতনার উন্মেষ, জেগে ওঠে মানবিক মূল্যবোধ।
বাঙালি জাতির চিন্তা-চেতনাবোধ, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অনন্য বৈশিষ্ট্য কেন অন্য জাতিসমূহের চাইতে পৃথক? কীভাবে এ জাতির মধ্যকার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি চেতনা পলে পলে গড়ে ওঠেছে? কারণ হচ্ছে- এ দেশের অতুলনীয় অনাবিল নৈসর্গিক প্রকৃতি অন্য দেশের চাইতে পৃথক, স্বকীয়। অনেক লেখক বাঙালি জাতি বা বাঙলাকে ‘হঠাৎ করে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে জেগে ওঠা’ বলে অভিহিত করেন। সেইসব লেখক এ অধমের চাইতেও অধিক জ্ঞানী, প্রবীন, বিদ্যায় অনেক বেশি বলে তাঁরা আমার চাইতে জানেন বেশি বলে আমি তাঁদের জ্ঞানের প্রশংসা করি। কিন্তু আমি নগণ্য একজন অতি সামান্য সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চারত মানুষ হিসেবে বলতে চাই, প্রিয় অগ্রজ, আমি ‘হঠাৎ করে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে জেগে ওঠা’য় একদম বিশ্বাস করি না বা করতেও চাই না।
ইতিহাসের বিচারে হয়তো ওই কথা সত্যি হতে পারে একটি ভূ-খণ্ডের ব্যাপারে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠিত জাতির কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সাহিত্য ‘হঠাৎ করে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে জেগে ওঠে’ বলে কেউ কি বিশ্বাস করবে? কারণ এটা প্রমাণিত সত্য যে, পৃথিবীর কোনো জাতিরই চিন্তা-চেতনাবোধ, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অনন্য বৈশিষ্ট্য আলাদিনের যাদুর চেরাগের এক ফুঁতেই সৃষ্টি হয় না। বরং তা’ এক বিশাল সময়, যুগ-যুগান্তরের সমন্বয়ে, তিলে তিলে, ক্রমে ক্রমে, বিন্দু বিন্দু আকারে সৃষ্টি হতে থাকে। বাঙালি জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য চেতনা, সংস্কৃতিও এভাবে হাজার হাজার বছর ধরে ক্রিয়া-বিক্রিয়ারই ফসল। তবে এই ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় যে তলানী জমেছে সেটাই হলো বাঙালির অতি আধুনিকতার মাত্রাতিরিক্ত অপসংস্কৃতির ুদ্র অংশটুকু। যেটি ‘অপসংস্কৃতি’ শিরোনামে কানাডা প্রবাসী লেখক জালাল কবিরের রচনায় বর্ণনা দেয়া আছে।
প্রবন্ধকারের মতে, মীরজাফর, রাজাকার, আলবদর, দেশের সূর্যসন্তানদের হত্যাকারী ও বিগত দিনের স্বৈরাচারী শাসকরা হচ্ছে জাতির সেই ক্রিয়া-বিক্রিয়ার পঁচা তলানী। যে পঁচা অপদার্থ তলানীটুকু শুধু জাতির অন্তরে ঘা তৈরি করেছিলো কিন্তু সেই ঘা-তে পচন ধরাতে পারেনি বলেই আমাদের বিশ্বাস। বরং আজকের সময়ে জাতির ইচ্ছে হচ্ছে, জাতির হৃদয়ে জমে ওঠা সেসব অপদার্থ তলানীটুকু নবপ্রজন্মরা নিংড়ে ফেলে দেবে। যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন বাঙালি জাতিকে, জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সুবিশাল ইতিহাসকে ভূলুণ্ঠিত করতে না পারে। যারা মনে করেন (বা বলেন) যে, ‘হঠাৎ করে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে জেগে ওঠেছে’ এই দেশটি এক সময়। তাঁদের কথা দেশের ভৌগোলিক আকৃতি বা একটি ভূখণ্ড সৃষ্টির ব্যাপারে হয়তো সত্যি। কিন্তু বলা দরকার, জাতি সৃষ্টি আর ভৌগোলিক ভূখণ্ড সৃষ্টি এক কথা নয়। একটি ভূখণ্ড হঠাৎ জেগে ওঠতে পারে বা ধ্বংস হতে পারে কিন্তু একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি হঠাৎ জেগে ওঠার মতো নয়। ‘বাঙালি’ নামক একটি জাতির ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে, বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি অনেক পুরোনো, যা আজ বিভিন্ন স্থানে খনন করে প্রাপ্ত উপাদানসমূহ বলে দিচ্ছে।
তাই দেখা যায়, আজ এদেশের মুগ্ধ প্রকৃতির পানে তাকিয়ে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা বলেন, কি সুন্দর এদেশের প্রকৃতিÑ মাঠ-ঘাট, অরণ্য, নদী-নালা, পাহাড়-পবর্ত। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে খুলনায় প্রকৃতি নিজের হাতে গড়ে তুলেছে বিশাল সবুজের সমারোহ। যশোরের সনেট কবি মাইকেল মধুসূদনের ঐতিহাসিক সাগরদাঁড়ি গ্রাম আর কপোতা নদ, কুষ্টিয়ার লালন ফকিরের বসতভিটে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি বাংলাদেশের প্রান্তবর্তী জনপদ চট্টগ্রাম, যার কথা যুগে যুগে কবি-সাহিত্যকগণ এর বর্ণনা করেছেন বিভিন্ন উপমায়, শৈল-কিরীটিনী, নদী-মালিনী ইত্যাদি বলে, প্রাচীন ‘বাকলা চন্দ্র দ্বীপ’ নামের বর্তমানের বরিশাল, পাঁচটি গড়ের সমষ্টি পঞ্চগড়, পুরোহিত ঠাকুর পরিবারের নামানুযায়ী ঠাকুরগাঁও, নীলচাষের কেন্দ্রভূমি নীলফামারী, রঙ্গ বা রেশম সুতার উৎপাদনের শহর রংপুর, বিপ্লবী কৃষক নেতা নুরুলদিনের ঘনিষ্ট সাথী ‘লালমনি’র নামের নামের লালমনিরহাট, প্রাচীন বাংলার মৌর্য ও গুপ্ত শাসনামলে ‘পুন্ড্রনগর’ বগুড়া, নাট্যপুর নামের নাটোর, রাজ ও শাহীর সম্মিলিত রাজশাহী, স্বাধীন বাংলাদেশের সূতিকাগার এবং অস্থায়ী রাজধানী ও ঐতিহাসিক মুজিবনগর মেহেরপুর, বাংলা মাঘ শব্দ থেকে মাগুরা, চাঁদ সওদাগর অথবা জমিদার চাঁদরায়ের নামের চাঁদপুর, কামালাঙ্ক তথা কুমিল্লাসহ বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায়-ই বিচরণ করলে দেখা যাবে বাংলার প্রাচীন জনপদ ও মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতিপ্রিয়তা ও ঐতিহ্যকে লালনের নমুনা।
বাঙালি স্বত্ত্বা অন্য কোনো জাতির সংস্কৃতিকে আঁকড়ে না ধরে নিজস্ব সংস্কৃতির জগতে বিচরণ করে। তাই পহেলা বৈশাখে নতুন বছরের শুরুতে বাঙালি জাতি মেতে ওঠে খুশির আমেজে। কাজী নজরুল বলেন:
 “ঐ নতুনের কেতন উড়ে কালবৈশাখীর ঝড়
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।”
পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ নিয়ে আসে নতুনত্বের কেতন, যা কালবৈশাখীর গতিসম্পন্ন। কবি একে জয়ধ্বনি করার কথা বলেছেন। বছরের শুরুতে বিভিন্ন স্থানে বসে বৈশাখী মেলা। এ মেলা বাঙালি জাতির নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিচয় বিমূর্ত করে বাঙালি জাতিকে দেয় ভিন্নমাত্রা। নববর্ষের শুরুতে পান্তা-ইলিশ খেয়ে বাঙালি জাতি তাদের নিজস্ব সত্ত্বার অস্তিত্বের জানান দেয়। অনেক একে হয়তো ‘অতি আধুনিকতা’ বা ‘বছরের একটি দিনেই শুধু বাঙালি সাজা বলে’ অভিহিত করে, করুক। কিন্তু আশার কথা এই যে, বাঙালি জাতি অন্তত একটি দিনের জন্যে হলেও তো বাঙালির পরিচয় দিতে পারে। পৃথিবীতে এমন জাতিও তো আছে যারা নিজেদেরকে প্রকাশ করতে পারে না। অপরের সংস্কৃতিকে লালন করে পরগাছার মতো বেঁচে থাকে সারাজীবনভর। সেসব জাতির মতো নিজস্ব স্বকীয়তাকে সমূলে বিসর্জন দিয়ে বৈরাগী হওয়ার চাইতে বাঙালি জাতি অন্তত একদিন হলেও বাঙালিত্বের সাধ গ্রহণটাও কম কিছু নয়। অন্তত একটা দিনের জন্যে হলেও আমরা উপলব্ধি করি যে, আমরা বাঙালি। যদিও এই উপলব্ধিটা সারা বছরের জন্যেই একান্ত প্রয়োজন ও অনস্বীকার্য।
যুগে যুগে বাঙালি জাতি তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা রার জন্যে প্রাণ পর্যন্ত বিলিয়ে দিতেও কার্পণ্য করেনি, যা আজ সারা বিশ্বের কাছে প্রমাণিত সত্য। সে জন্যে দেখা যায়, বাঙালিরাই পেরেছে প্রাণপনে তাদের স্বকীয় সত্তাকে ধরে রাখতে। অন্যের মাঝে বিলীন হতে দেয়নি।
বাঙালি জাতির জন্যে প্রতীতি পহেলা বৈশাখ। আমাদের অতি আকাঙ্খিত বাংলা নববর্ষ। চৈত্রের শেষদিনে হালখাতার সমাপ্তি এবং বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ এলে যে ধনী-গরিব নির্বিশেষে মিষ্টি খাবার ধুম পড়ে তা’ বাঙালির একান্ত নিজস্ব সংস্কৃতি। তাই আমরা কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে সুর মিলিয়ে স্বাগত জানাই বাংলা নববর্ষকে। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো....।’
বাংলা নববর্ষের আগমনে প্রতিটি বাঙালির জীবন ভরে উঠুক সুখ, শান্তি ও অনাবিল খুশির বারতা। বাংলা নববর্ষ হোক বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রাণের মাধ্যম। পরিশেষে কবির ভাষায় বলি:
“অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই,
চাই মুক্ত বায়ু,
চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু।”
..................................................................................................................................
 
 
 
চলে গেছেন
নজরুলের সরাসরি প্রশিণপ্রাপ্ত
 
সংগীত শিল্পী দীপালি নাগ তালুকদার

এএফএম ফতেউল বারী রাজা


নজরুল সংগীতের অবিস্মরণীয় শিল্পী দীপালি নাগ ছিলেন কলকাতার টালিগঞ্জ সংগীত রিসার্চ একাডেমীর রিসার্চ বিভাগের প্রধান। উপমহাদেশে জানামতে তিনিই পদ্ধতিগতভাবে রাগপ্রধান গানের প্রথম মহিলা শিল্পী। তিনি বিশ্বের বহুদেশে গিয়েছেন হয় তিনি নিজে সংগীতের ওপর শিা গ্রহণ করতে, নয়তো উপমহাদেশের ধ্র“পদী সংগীত পরিবেশন করতে। বিদেশে বেতার, স্টেজ এবং টিভিতে উপমহাদেশের উচ্চাঙ্গ সংগীত বিশেষ করে খেয়াল গানের বিশ্লেষণ ও পরিবেশন করেছেন।
শিল্পী দীপালি নাগ ২২ ফেব্র“য়ারি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে দার্জিলিং শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা অধ্যাপনা সূত্রে আগ্রায় বসবাস করতেন। তাই তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটে আগ্রাতে। বাল্যকালে সঙ্গীতের প্রতি গভীর নিষ্ঠা থাকায় পিতা লেখাপড়ার পাশাপাশি সংগীতেও শিাদানের ব্যবস্থা করেন। তিনি আগ্রা ঘরণায় ফৈয়াজ খান সাহেবের কাছে ১৯৩৬ সালে সংগীত শিা শুরু করেন। বয়স যখন ১৬/১৭-এর মাঝামাঝি তখন সবেমাত্র কলেজে ঢুকেছেন। প্রতি বছর কলকাতায় যাওয়া হত। সেবারও গেলেন। সালটা ১৯৩৭/৩৮ হবে। তখন কলকাতায় প্রচুর জায়গায় গান করে বেড়াতেন। বিশিষ্ট জায়গাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো ভবানীপুর সংগীত সম্মেলন এবং দীলিপ রায়ের বাড়ি। গান গেয়ে বেড়ানোর সুবাদে কোনো এক সময় এইচ এম ভি-র বিখ্যাত শ্রীযুক্ত হেম চন্দ্র সেন দীপালি নাগের গান শোনেন। গান শুনে দীপালির পিতা শ্রীযুক্ত জীবনচন্দ্র তালুকদারকে এইচ এম ভি-তে মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। সেই আমন্ত্রণে দীপালি পিতার সাথে নলিন সরকার স্ট্রিটের এইচ এম ভি-র রিহার্সেল রুমে যান। ঢুকেই দেখেন এক ভদ্রলোক জ্বলজ্বলে চোখ, মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল, কিছুটা মোটার দিকেই এবং মুখে পান ভর্তি, সামনে আবার বাটাও, পরণের কাপড় নেহাতই সাদামাটা, ২/১ টা বালিশের ওপর ভর করে বসে আছেন। হাতে কলম-পেন্সিল। কিছুণ কথাবার্তার পর দীপালিকে বললেন, ‘বাংলা জানো?’ বললো, ‘হ্যাঁ।’ ‘গান শোনাও।’ দীপালি তখন জয়জয়ন্তী আর নট-বেহাগ শিখছে। হৈ হৈ করে জয় জয়ন্তী রাগে ‘মেরে মন্দিরে আব্লো ন্যহি আওয়ে’ আর  নট বেহাগ রাগে ‘ঝন্ ঝন ঝন ঝন পায়েল বোলে’ ছোট দু’টি খেয়াল শুনিয়ে দিল। খেয়ালগুলো নজরুলকে খুব আকৃষ্ট করলো। উত্তেজিত, ঘুম নেই। কী ভাবলেন, ভেবে বললেন, ‘কাল এসো’ বলেই খাতার কাগজে খস্ খস্ করে লিখে চললেন। কাল এলো, আবার দেখা। প্রাণোচ্ছল হাসি হেসে খাতা থেকে খেয়াল জয়জয়ন্তী রাগে ত্রিতাল গানের অনুকরণে লিখা:
‘মেঘ-মেদুর বরষায় কোথা তুমি
ফুল ছড়ায়ে কাঁদে বনভূমি ॥
ঝুরে বারিধারা
ফিরে এস পথহারা
কাঁদে নদীজল তট চুমি ॥’
গানের পাতাটি ছিঁড়ে দীপালির হাতে দিলেন। বললেন, ‘সুর করে নিও।’ আরও বললেন, ‘গতকাল খেয়াল জয় জয়ন্তী রাগে ত্রিতালÑ এর যে গানটি শুনিয়েছ সে রাগেই কথাগুলো বসিয়ে নিও।’ কমল দাস গুপ্তকে দায়িত্ব দিলেন রেকর্র্ডিং পরিচালনা করতে। দীপালি নাগ বন্দেসটিতে শুধুমাত্র কথাগুলো বসিয়ে দিলেন। আর সৃষ্টি হলো ইতিহাস। দীপালি নাগ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, ‘সেই দিন থেকে আমার আর এক জন্ম।’

রেকর্ডের অপর পিঠের জন্যে খেয়াল নট-বেহাগ রাগ ত্রিতাল-এর অনুকরণে গান লিখে দিলেন:
‘রুম ঝুম্ ঝুম্ ঝুম্ ঝুম্
নূপুর বোলে
বন-পথে যায় কে বালিকা
গলে শেফালি মালতী মালিকা দোলে।
চম্পা-মুকুল গুলি
চাহে নয়ন তুলি
নাচে নট-বিহাগ শিখি তরুতলে ॥’
রেকর্ড নম্বর এন-১৭১৯৩, প্রকাশকাল-সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ।
এই দুটো গানই ছিলো দীপালি নাগের প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড। রেকর্ডটি বাজারজাত হওয়ার সাথে সাথে অসাধারণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। আজো অসম্ভব জনপ্রিয় এই গান। দীপালি নাগের কণ্ঠে প্রথম সংগীত রেকর্ড হয় সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে। এর পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে রেডিওতে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করতে শুরু করেন। আর এ বছরই তিনি আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ পাশ করেন।
গান রেকর্ডিংয়ের পর দীপালি নাগ বাবার সাথে যখনই কলকাতায় আসতেন নজরুলের কাছে ছুঁটে যেতেন এবং আগ্রা ঘরণার কোনো নতুন শেখা রাগাশ্রয়ী গানের ছকে গান লিখিয়ে নিয়ে সুর রপ্ত করে গ্রামোফোন রেকর্ডে বাণীবদ্ধ করতেন। এবার এমনি একটি গানের উল্লেখ করছি যেটি দীপালি নাগ নজরুলকে আগ্রা ঘরণার ‘কাফি-কানাড়া’ রাগ ॥ ত্রিতাল ‘পাবনা পায়ে তুমহারে মহিমা’ শুনিয়ে ওই গানের ছকে বাংলা একটি গান রচনা করে দেবার জন্যে অনুরোধ করেন। নজরুল গানটি খুব মনোযোগ দিয়ে বেশ কয়েকবার শুনে ওই গানের ছকে কাফি-কানাড়া রাগে একটি গান রচনা করলেন বটে কিন্তু তাঁর নিজের আঙ্গিকে ত্রিতালের পরিবর্তে আড়া-চৌতালে।
‘আঁখিপাতা ঘুমে জড়ায়ে আসে
ওগো চাঁদ জাগিয়া থেকো
সুদূর আকাশে।’
আড়া-চৌতাল ব্যবহার করায় গানের রূপ একেবারে বদলে গেল। এইচ এম ভি রেকর্ড নম্বর এন-২৭০৭৩, প্রকাশকাল-১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ। রেকর্ডের অপর পিঠের জন্যে লিখে দিয়েছিলেন-
গৌড়মল্লার ॥ তেতালা
‘ফিরে নাই এলে প্রিয়
ফিরে এল বরষা
গুঞ্জরিল বনে বিরহিণী লতিকা
আমারি আশা-লতা হল না গো সরসা।’
নজরুল গবেষক আসাদুল হক সাহেব দীপালি নাগের পাঁচ বছরের ছোট হলেও নজরুল সংগীতের সূত্র ধরে তাঁর সাথে জানাশোনা দীর্ঘকাল থেকে। পঞ্চাশের দশকে কলকাতা থেকে চলে এলেও আন্তরিকতার এতটুকুও কমতি হয়নি। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে শিল্পী দীপালি নাগ তালুকদার টালিগঞ্জ, কলকাতার সংগীত রিসার্চ একাডেমীর রিসার্চ বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত। এই সময়ে কোনো একদিন আগে থেকে যোগাযোগ না করে আসাদুল হক সাহেব সস্ত্রীক টালিগঞ্জে তাঁর অফিসে গিয়ে দেখা করেন। সেদিন তিনি খুব ব্যস্ত ছিলেন। সেদিন সংগীত রিসার্চ একাডেমীতে খেয়াল গানের আলাপ পদ্ধতির ওপরে একটি সর্বভারতীয় সেমিনারের তিনিই ছিলেন কন্ভেনার। তবুও তিনি যখন শুনলেন ওনারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন তাঁর সাথে দেখা ও নজরুলের গানেরই বিষয় আলোচনা করার জন্যে, তিনি তাঁর অফিসের কামরায় তাদের বসিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করার ভাষণ দিতে গেলেন এবং সবিনয়ে আসাদ সাহেব এবং তাঁর স্ত্রীকে অপো করার জন্যে বলে গেলেন। ওনাদের চা পর্ব শেষ না হতেই তিনি পুনরায় এসে তাদের সাথে কথা বলতে শুরু করলেন। নজরুলের বিষয় তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি নজরুলের সৃষ্টির কথা বলতে গিয়ে আবেগভরে এক সময় একটি গানের দু’টি চরণও আসাদ সাহেব এবং তাঁর স্ত্রীকে গেয়ে শোনালেন। তিনি বার বার নজরুলকে চমৎকার সুরারোপের কথা বলে কবির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছিলেন।
আলোচনার মাঝে নজরুলের কোনো কোনো গানের আরোহণ, অবরোহণ এমনকি বন্দেশও খালি গলায় গেয়ে সুরের বিশ্লেষণ দিচ্ছিলেন। তিনি মত প্রকাশ করেন, ‘নজরুল এক অসাধারণ মতার অধিকারী সংগীত প্রতিভা। নজরুল মূক হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের সংগীত জগতে যে প্রভূত তি সাধিত হয়েছে শিল্পী সে কথা বার বার উল্লেখ করেছেন। ণজন্মা এই সংগীত প্রতিভার জন্যে তিনি হৃদয়ে বেদনা অনুভব করেন।
দীপালি নাগ তালুকদার-এর সারাজীবনের রেকর্ডকৃত গানের সংখ্যা প্রায় ২৫টি। এর মধ্যে নজরুল রচিত রেকর্ডকৃত গানের সংখ্যা প্রায় ২০টি কিংবা ২২টি। এইচ এম ভি রেকর্ড কম্পানিতেই তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড হয়েছে ১৭টি। শিল্পীর গাওয়া রেকর্ডের সন্ধান করা সম্ভব হয়েছে ১৬টির। শিল্পীর জীবনের রেকর্ডকৃত গাওয়া শেষ নজরুল সংগীত দুটি হল:
সাওন্তী কল্যাণ ॥ তেতাল
‘বিষাদিনী এস শাওন সন্ধ্যা
কাঁদিব দুজনে’
ভীম পলশ্রী ॥ তেতালা (ঢিমা)
‘আমার মনের বেদনা
হে অভিমানী বুঝিলে না’ ॥
রেকর্ড নম্বর ই পি ই- ৩১৭০, প্রকাশকাল-১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ। উল্লেখিত সংগীত দু’টি নজরুল নিজ হাতে শিল্পী দীপালির খাতায় লিখেছিলেন। আসাদুল হক সাহেব নজরুলের গান দু’টির ফটোকপি নিতে চাইলে দীপালি নজরুলের আরো দু’টি স্বহস্তে লিখিত গান দেখালেন। অত্যন্ত আনন্দের সাথে তাঁর খাতা থেকে চারটি গানের ফটোকপি দিলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই দীপালি নাগ ঢাকায় এসেছিলেন, বাংলাদেশের রাগ-সংগীতের মান নির্ণয় করতে। তখন তিনি উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ নজরুল গবেষক আসাদুল হক সাহেবকে এই বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, বাংলাদেশ যদি কখনো তাঁর কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের েেত্র কোনো সহযোগিতা চায় তবে তিনি তাঁর সাধ্যমত সাহায্য করতে প্রস্তুত। তাছাড়া তিনি আনন্দের সাথে বাংলাদেশ ভ্রমণ করবেন যদি তাঁকে হাতে সময় দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়। শিল্পীর এ যাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডাকসু’ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের ছবি সংগ্রহ করা গেলেও শিল্পীর বক্তব্যের কোনো কপি সংগ্রহ করা যায়নি। এ অনুষ্ঠানে শিল্পীর সাথে তবলায় সহযোগিতা করেন ঢাকার শিল্পী মোহাম্মদ হোসেন। অনুষ্ঠানে গানের পরিবর্তে তিনি অনেক সময় নজরুল রচিত খেয়াল গান পরিবেশন করেছিলেন।
 এই বরেণ্যে শিল্পী তাঁর কথা রেখেছিলেন এবং শেষবারের মত ঢাকায় এসেছিলেন আন্তর্জাতিক নজরুল চর্চাকেন্দ্রের আমন্ত্রণে গত বছর আগস্ট, ২০০৮ নজরুল মৃত্যু দিবসের অনুষ্ঠানে। রাতে আসাদুল হক সাহেব তাঁর বাসায় দীপালি নাগসহ তাঁর সফরসঙ্গীদের সম্মানে খাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন ড. বাঁধন সেন গুপ্ত, ড. জলজ ভাদুড়ী এব শিল্পী মাধবী মজুমদার। তাঁর পছন্দের রিচ খাবার ‘বিরিয়ানী।’ সেদিন তিনি আসাদুল হক সাহেবকে বলেছিলেন, ‘তুমি কলকাতা গেলে আমি নিজের হাতে তোমাকে বিরিয়ানি রান্না করে খাওয়াবো।’
ঢাকা থেকে বিদায়ের দিন বিয়াম মিলনায়তনে রুমের মধ্যে অনেক লোক। অটোগ্রাফ দিচ্ছেন অকাতরে। নজরুল গবেষক আসাদুল হক সাহেবকে দেখে বললেন, ‘আস, আমার পাশে বস।’ তিনি গিয়ে তাঁর পা ছুঁয়ে পাশে বসলেন। কথাচ্ছলে বললেন, ‘তুমি এত লোককে অটোগ্রাফ দিচ্ছ, তোমার সাথে আমার এতদিনের পরিচয়, আমাকে তো একটা অটোগ্রাফ দিলে না কোনোদিন।’ তিনি ঘাড় বাঁকিয়ে বললেন, ‘তাই।’ পাশে রাখা রাইটিং প্যাডটা টেনে নিলেন। লিখলেন ছয় লাইনের কবিতা।
প্রিয়,
আসাদুল, আমাদের
নজরুল,
আমাদের প্রিয় নজরুলের
আরো একটা অতুল রূপ তোমাদের
কাছে বাঁধা থাকবেÑ এটা
দারুণ আনন্দের কথা
দীপালি নাগ
৩০/০৮/০৮
‘নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার ২০০৮’ গ্রহণের সুবাদে আসাদুল হক সাহেবকে কলকাতা যেতে হলো। কলকাতা গিয়েই তিনি চেনা-জানাদের কাছে দীপালি নাগ দিদির কুশলাদি জিজ্ঞেস করে জানলেন, শান্তি নিকেতনের এক অনুষ্ঠানে যাবার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙ্গেছে। চিন্তা করলেন নির্ঘাত তাহলে বাসায়, বেডরেস্ট। ২৬ এপ্রিল পুরস্কার গ্রহণ করে ২৯ তারিখেই ছুটলেন বেহালা, কলকাতার উদ্দেশ্যে দীপালি নাগ তালুকদারের বাড়ি। বাসায় গিয়ে শুনলেন তিনি অফিস করছেন টালিগঞ্জে। গেলেন সেখানে। দেখলেন ভীষণ ব্যস্ত। ওনাকে দেখে কী যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন তা’ লিখে বুঝানো যাবে না। আসাদুল হক সাহেব তাঁর পা ছুঁতে ছুঁতে অনুযোগ করে বললেন, ‘তোমার এই শরীরে কাজ করছ কেন? বিশ্রাম নাও।’ অদ্ভুত হাসি ছড়িয়ে তেজদীপ্ত উচ্চারণে তিনি আসাদুল হক সাহেবকে বললেন, ‘আমি অত সহজে মরছিনে। ওই সব পা ভাঙ্গা-টাঙ্গা আমি কেয়ার করি না।’ তিনি আরো বললেন, ‘জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি কাজের মধ্যে, সুরের মধ্যে থেকে মরতে চাই। ঘরে বসে থাকতে আমার ভালো লাগে না। আমি যা কিছু শিখেছি তা যে দিয়ে যেতে পারছি সেটা অনেক বড় বিষয়। তোমরা আমাকে আশির্বাদ কর। আমি যেন হাসতে হাসতে মরতে পারি, জরাজীর্ণ, কান্ত হয়ে নয়।’
কাজ ছাড়া তিনি এক মুহূর্তও থাকতে পারতেন না। আর চলাফেরায়ও কারো সহযোগিতা তিনি চাইতেন না পারতপ।ে ভাঙ্গা পা নিয়েই অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতেন। অসুস্থতা কাটিয়ে ওঠার আগেই আবার হঠাৎ পা ফসকে পড়ে গিয়ে মাথা ফাটালেন। আবার হাসপাতাল। ছোট একটা অপারেশনও হলো। গুজরাট থেকে ছেলে দীপাঙ্কর নাগ চৌধুরী এলেন। সুস্থ হলেন বটে কিন্তু স্মৃতি কিছুটা বিভ্রাটের পর্যায়ে চলে গেল। তারপরও কলকাতা-শান্তি নিকেতন ছাড়তে চাননি তিনি। তাই একটু সুস্থ হলেই ছেলেকে চলে যেতে হলো গুজরাটে। কিন্তু মা বলে কথা। আবার ফিরে এসে অনেকটা জোর করেই তাঁকে নিয়ে তোলেন গান্ধীনগর নিজের বাসায়। ইচ্ছা মাকে কিছুটা সেবা-শুশ্রƒষা দেবেন। কিন্তু দীপাঙ্করকে সে সুযোগ তিনি দিয়েছেন মাত্র মাসখানেক।
২০ ডিসেম্বর ২০০৯, রবিবার বেলা ১২:৩০ মিনিটে ৮৭ বছর বয়সে তিনি ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে পরলোকে পা বাড়ালেন। আশির্বাদ করি, পরম করুণাময় তাঁর আত্মার সদ্গতি করুন।

শিল্পী দীপালি নাগ তালুকদার এবং নজরুল গবেষক আসাদুল হক সাহেবের কথোপকথন, স্মৃতিচারণসহ আসাদুল হক সাহেবের দু’টি লেখাকে পূঁজি করে আমার আজকের লেখা। সহায়ক-মাসিক সরগম, ৪র্থ বর্ষ ॥ ৬ষ্ঠ সংখ্যা ॥ ১ মার্চ, ২০০০ এবং মাসিক সরগম ১৪ বর্ষ ॥ সংখ্যা ৪ ॥ জানুয়ারি, ২০১০।

লেখক পরিচিতি: এএফএম ফতেউল বারী রাজা, বিশিষ্ট নজরুল গবেষক।