সাহিত্য আলো

Editor: Mizanur Rahman Rana , E-Mail: mizanranabd@gmail.com
Mobile: 01742057854

সাহিত্য আলো - কিছু কথা

সাহিত্য আলো একটি সাহিত্য বিষয়ক সাইট। এই সাইটে আপনিও লিখতে পারেন। লেখা পাঠানোর অ্যাড্রেস : mizanranabd@gmail.com


সম্পাদক
মিজানুর রহমান রানা


01742057854

খন্দকার আযহা সুলতানের জনপ্রিয় গল্প অপূর্ব প্রেম

বর্ষাস্নাত সকাল। বাসে সফর করছে অনি। পুরা নাম : অনিরুদ্ধ হাওলাদার। সংসারে অনিকে আদরে আদরে গ্রহণ করে রুদ্ধকে যখন অনাদরের কারাবাসে নিক্ষেপ করা হয়, তখন পূর্ণরূপে রূপায়িত হয় 'অনি'। বর্তমানে তাকে 'অনিরুদ্ধ' বললে, বান্ধবমহলেও চেনা দায়। চালকের পশ্চাদাসনে আসীন। রঙিন চশমা পরে আছে চোখে। না_না_একেবারে রঙিন বলা সমীচীন হবে না_কৃষ্ণ রঙিন। বাইর হতে চক্ষুদ্বয় দর্শনের কোনও সুযোগ নেই। স্টপ স্টপে যাত্রী উঠানামা চলছে। আষাঢ়ের মাঝামাঝি সময়। এই সময়টাতে বর্ষণের উপর আস্থা রাখা যায় না, যখন তখন বর্ষণমুখর হয়ে উঠতে পারে_কখনও প্রবলাকারে মুষলধারে_কখনওবা শীতলাকারে থেমে থেমে। বর্তমানে আকাশের রঙ ফর্সা; তবু গুটিগুটি বৃষ্টিকণা ঝরছে অজস্র! ...অর্ধসিক্তা শুভ্র এপ্রন পরিহিতা একটি তরুণী উঠে বসল চালকাসন ঘেঁষে_হাঁটুদ্বয় স্পর্শ করে_একেবারে অনির সম্মুখে! বৃষ্টিধৌত তরুণীর অবয়বে ফুটে উঠেছে অপ্সরারূপ! আপ্লুত চিকুররাশি বেয়ে টপটপ করে ঝরছে স্বচ্ছ জলের ফোঁটা। ললনার এক হাতে কিছু বইখাতা_অন্য হাতে একখানা পরিষ্কার উপনেত্র ও একটি অসামান্য লেখনী। সহজে বুঝা যাচ্ছে_কোনেক কলেজছাত্রী_রওনা হয়েছে বিদ্যোপার্জনে। তবে...? হাঁ, ছাতা একখানা সঙ্গে ছিল, কিন্তু কলমটা ক্রয়কালীন যথাস্থান থেকে দোকানিকেও ফাঁকি দিয়ে উধাও! ... ...
কচুলতা ভোজনে যেমনে চুলকে উঠে গলা, তেমন করে যেন সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে অনির হাঁটুদ্বয়ে_অনুভূতি হচ্ছে দেহমনে! আড়চোখে_বারবার চক্ষুবিনিময় হচ্ছে উভয়! অনির পাশর্্বাসনে বসা একজন পঞ্চাশোধর্্ব বয়স্ক_জানালার ফাঁক দিয়ে বারবার বাইরে তাকাচ্ছে। ...এসব অবলোকন করছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না। এমন সময় চালকের এক অপূর্ব কাণ্ডকে অনেকে মন্দ বললেও অনির জন্য শুভক্ষণ : একেবারে প্রভুর দয়া_আশীর্বাদই বটে! 'ঘটেছে কী' কৌতূহলী অনেকে_নিরীহ এক কুকুরকে বাঁচাতে চালক গতিরোধ করলে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে অসতর্ক যাত্রীগণে। সেই মুহূর্তে অনি মেয়েটির বুকে শিরাসন করলে : লজ্জায় হতবুদ্ধি যুগল_'দুঃখিত' 'দুঃখিত' বলে অনি দুঃখপ্রকাশ করলে : ব্রীড়ানতমুখে মেয়েটি ঈষৎ হাসে_বলে_ঠিক আছে...ও কিছু না। তারপর...কিছুক্ষণ পর মেয়েটি তার গন্তব্যোদ্দেশে অবতরণ করে_যেতে যেতে পুনঃপুন পশ্চাতে দেখে। অনিও উপনেত্রটা মাথায় তুলে বাতায়নফাঁকে অপলকে চেয়ে থাকে।
অনি যাচ্ছে বাড়ি। কিন্তু এমুহূর্তে হৃদয় তার হারিয়ে গেছে কল্পদিগন্তে! যেখানে মাসে-দু-মাসে একবার যাওয়া-আসা হয় না তার, সেখানে সাপ্তাহিক যাতায়াত করতে লাগল আজকাল! উদ্দেশ্য কী, সেটা ব্যক্ত করার প্রয়োজন বোধ করব না_

অনি সদ্য বিএ পাশ করা একজন কর্মিষ্ঠ যুবক। শহরে একটি পোশাক-রপ্তানি-কোম্পানির উচ্চপদস্থ কেরানি। মাসিক বেতন চৌদ্দ হাজার। সংসারে মা আর ছোট্ট একটি বোন। ... ...গ্রামের দূরত্বটা বাইশ মাইল। ইতোমধ্যে কয়েকবার বাড়িতে আসাযাওয়া হয়ে গেছে : মেয়েটির দর্শন হল না। এখানে কথাটি ন্যায্য : পথের দেখা কে কবে মনে রাখে! ঘটে তার বিপরীত। আরেকদিন_বর্ষামৌসুমটা যায় যায়_কাঠফাঁটা রৌদ্র বের হয়েছে গগন বিদীর্ণ করি_অনি যাচ্ছে বাড়ি_মেয়েটি উঠল গাড়িতে! মহিলাসন হতে পুরুষাসনাবধি কোথাও একখণ্ড স্থান অবশিষ্ট নেই যে, দু-দণ্ড স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত জনভিড়ে_ঠেলাঠেলি করে একজন যাত্রিণী আসন ব্যতীত দাঁড়িয়ে থাকবে, এটা যে-কোনও সভ্য দেশের জন্য অসভ্যব্যাপার, তেমনি অশ্রদ্ধেয় কালিমার বিষয়ও বটে এবং এমন অসৌষ্ঠব অশিষ্টতাকে যারা আস্বাদ মনে করে : তারা বর্বর_মনুষ্যনামের কলঙ্ক।
একটুপর অনির চোখাচোখি হল মেয়েটির_মিষ্টি হেসে বলল, আপনি!
অনি কবে হতে আসন ত্যাগ করে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটির জন্যে! মুখগহ্বরে মৃদু হাসে_নয়নেশারায় তার আসনে বসার আমন্ত্রণ জানায়... ...
মেয়েটি ঈষৎ হাসে_আপত্তিকণ্ঠে ধন্যবাদ জানায়_অক্ষীঙ্গিতে বুঝাচ্ছে, যথাস্থানে ঠিক আছে। কিন্তু, অনির বিনয়ী আবেদনে সাড়া না দিয়ে পারল না... ...। অনি দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটির আসনপাশ্বর্ে। সত্তর কিলোমিটার বেগে ছুটে চলছে গাড়িটি। চালকের ব্র্যাক কষাকষিতে হেলেদোলে বারাবার স্থির হচ্ছে দণ্ডায়মান যাত্রীসকল। মেয়েটি পুনঃপুন... ...অনিও বারবার... ...পরস্পর পরস্পরকে সঙ্কোচ করছে। লজ্জায় একে অপরকে কিছু বলতে পারছে না। আড়াআড়িভাবে উভয় উভয়ের প্রতি আকৃষ্ট দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। দু-জনার চোখেমুখে লজ্জানুরক্ত হাসি। চালক সজোরে ব্র্যাক কষল_টালমাটাল যাত্রীগণ পতিতোপক্রম_মেয়েটি অনির হাত ধরে টেনে স্থির করল। অনি হেসে বলল, ধন্যবাদ। লজ্জারুণ মেয়েটি আনতমুখে কিঞ্চিৎ হাসে...
হঠাৎ বজ্রসঙ্কেত_প্রলয়ান্ধকার হয়ে তুফানবেগে ছুটছে বাতাস! গাছপালা ভেঙে চুরমার হয়ে বোধহয় এক্ষুনি মাটিতে পাতবে আসন! যাত্রীগণ চালককে বারবার সতর্কবার্তা শুনাচ্ছে_গতিশক্তি যাতে কমায়, প্রয়োজনে গাড়ি রোধ করে; আকাশের পরিণতি কি বুঝা যাচ্ছে না। ...তারপর ক্রমান্বয়ে বায়ুগতি হ্রাস পেল। মেয়েটির গন্তব্য এল। আসমানে এখনও ভাসছে কৃষ্ণ মেঘের ভেলা_একটু পরপর কুলিশধ্বনি। অনিকে অবতরণের আভাস দিয়ে সপ্তদশী গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। অনির হৃদস্পন্দন শত বেগে বেড়ে চলল! মিরের হাট যাত্রীছাউনি থেকে অর্ধার্ধক্রোশ পশ্চিমে মেয়েটির বিদ্যাপীঠ। নিয়মিত পদব্রজে গমনাগমন করতে হয় এটুকু পথ। রাস্তাটি প্রায়ই নির্জন_পথিকের চলাচল তেমন একটা চোখে পড়ে না। কারণ এখানকার বিদ্যার্থীদের জন্যে এ রাস্তার উৎপত্তি এবং বিদ্যালয়প্রাঙ্গণ পর্যন্ত গমন করেই তার যাত্রাবসান। এ সংকীর্ণ পথটি মেয়েটির জন্য নিরাপদ ও সংক্ষিপ্ত। ...দু-জন পাশাপাশি হাঁটছে_আলাপাদি টুকটাক চলছে_তবে কী কথোপকথন হচ্ছে তা শুনা যাচ্ছে না। কাষ্ঠপদে ভর করে একজন পঙ্গু ভিক্ষুক পাশ কেটে চলে যাচ্ছে_অনি ভিক্ষুকটির হাতে পাঁচটি টাকা গুঁজে দিল_ভিখারি যেন পৃথিবী পেল। এমন সময় ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি এল। সম্মুখে জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত একটা কাষ্ঠনির্মিত চৌচালা দোকান। অনি আর মেয়েটি দৌড়ে গিয়ে সেই দোকানটাতে আশ্রয় নিল। বোধ হচ্ছে সরীসৃপরাজ্য। কত বছর ধরে ব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়ে আছে বুঝার উপায় নেই। বায়ুকোণে মস্ত একটি বটবৃক্ষ। দোকানটি হেলে গিয়ে বৃক্ষটার গায়ে ঠেস দিয়ে কবে হতে দাঁড়িয়ে আছে কে জানে। এ গাছই আজ তার বড় সহায়ক। ঊর্ণনাভে বুনেছে যেখানে-সেখানে বাসা। উইপোকা গড়ে তুলেছে বল্মীক। ইঁদুর খোঁড়েছে অসংখ্য গর্ত। নৈর্ঋতকোণে সুখের নিদ্রায় ঘুমাচ্ছে একটি কুকুর। ঈশানকোণে দুটো বাচ্চা নিয়ে লোটে আছে একটি ছাগি। বৃষ্টি হচ্ছে দেদারছে_এক একটি ফোঁটা যেন এক একটি পাটকেল। কিছুক্ষণ পর ভনভন শব্দ শুনা গেল। ঘুণপোকায় আক্রান্ত_ছাদের একটা জীর্ণখুঁটিতে দর্শন মিলল একটি মৌচাকের! উভয় আশ্চর্য হল।
অনি বলল, এখনও বোধহয় কোনও সৌভাগ্যবান মধুসংগ্রাহকের নজরে আসে নি।
মেয়েটি বলল, হয়তো_তবে যার ভাগ্যে আছে : এটা নির্দিষ্টভাবে লিখা থাকে কিন্তু_সে অবশ্য ভাগ্যবান! ভাগ্যিস_
মেয়েটির মধুরসপ্রীতি দেখে যথাসম্ভব অনি বিস্মিত_বিস্ময়ে বলল, আপনার ভাল লাগে?
নন্দিনী বলল, লাগবে না মানে! মধু কার-না ভাল লাগে?
অনি রসিকতা করে বলল, এত দিন জানতেম, মধুর প্রতি দুর্বলতা কেবল পুরুষেরই আছে_আজ জেনেছি মেয়েদের দুর্বলতার কথা!
নন্দিনী হেসে বলল, দুর্বলতা! আকর্ষণ কেন নয়?
অনি হেসে বলল, যে জিনিসকে মানুষ মরিয়া হয়ে চায়, সেই জিনিসের কাছে সে সব সময় দুর্বল...এবং আকর্ষণের বিপরীত দিক হচ্ছে 'দুর্বল'।
নন্দিনী বলল, গুপ্তধনের প্রতি সকলের যেমন একটা টান_এও তো একপ্রকারের গুপ্তধন।
অনি বলল, গুপ্তধনের সন্ধান যখন অনায়াসে মিলেছে, তা হলে আর দেরি কেন_
নন্দিনী বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, বলেন কি! ...না না, আপনি এ কাজ করতে যাবেন না; এ কাজে কত শ্রমের দরকার আপনার জানা আছে?
অনি বলল, জানব না কেন_
ইতোমধ্যে উভয়ের আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে মাত্র নাম জানাজানির বিষয়কে গণ্য করে, অন্যান্য সবকে নগণ্য হিসাবে বর্জন করব_মেয়েটির সম্বোধনাখ্যা 'বর্ষা' এবং পূর্ণাখ্যা 'অর্পিতা প্রসাদ' হিন্দুসমপ্রদায়ের বামনতনয়া। ... ...অনি কিয়ৎমাত্র বিস্ময় বোধ করল না। কিন্তু বর্ষা 'অনিরুদ্ধ' নাম শ্রবণে একটু বিস্মিত হল। কারণ, সে বোধ করেছিল... ...
যাই হোক, ভাল লাগার বিষয় যেখানে_প্রেমের প্রধান্য সেখানে।
... ...অনি হাসতে হাসতে বিদ্রূপকণ্ঠে বলল, তাই তো বলি_বর্ষারূপের এত মাধুর্য কেন।
বর্ষা বলল, কেন?
অনি বলল, আপনার নাম... ...
এ নিয়ে বর্ষাও ঢের ঠাট্টাপরিহাস করল_বলল, পৃথিবীতে 'বর্ষা-বৃষ্টি' নামের এত অভাব হয়েছে যে, যা আমার নাম হলে চমৎকৃত হতে হবে!
অনি হেসে বলল, তা হবে কেন। তবে_
বর্ষা হেসে বলল, মেয়েদের গুণগান গাওয়া ছেলেদের নতুন কোনও বিষয় নয়_এটা ছেলেদের অভিনব এক সুকৌশল ফাঁদ।
অনি বলল, কথাটা যদি আমার উদ্দেশ্যে বলা হয়, তবে বলব_আমি সত্যকে গলাটিপে হত্যা করে মিথ্যার আশ্রয়ে কখনও পথ চলি না এবং কারও সঙ্গে রসিকতা করতে পারি_প্রবঞ্চনা না। আমার আরও কিছু বিশ্রী কাণ্ড আছে : আমি কাকে আঘাত করি ত ফুল দিয়ে_পাথর দিয়ে নয় এবং সাজা দিই ত শ্রীকান্তকারাগার_নির্জন কোনও অন্ধকার দ্বীপ নয়। আলোর ঘরে আমার জন্ম হয়েছে, আলোতেই আমার সব সময় পথযাত্রা। তুমি কী মনে করছ জানি না, তবে_এমন কিছু যদি মনে করে থাক তা হলে সেটা হবে তোমার নিতান্ত ভ্রম। কারণ, আমি কারও জীবন নিয়ে ঠাট্টা করতে পারি_জুয়া খেলতে পারি না। বাঁশবনের প্রত্যেকটি বাঁশ যেমন একই ধাঁচের হয় না, তেমনি বিধিসৃষ্টির সকল বস্তু এক রকমের হয় না।
বর্ষা অনুতপ্ত হয়ে বলল, দুঃখ পেলেন বুঝি? আপনাকে দুঃখ দেওয়া তো আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আসলে_'মরণাবধি মানুষের শিক্ষার প্রয়োজন আছে' কথাটা নেহাত সত্য। উপহাসে মানুষ বিরক্ত হয় জানি_উন্মত্ত হয় জানতাম না।
অনি বলল, কিছু কিছু মানুষের এরকম বদাভ্যাস থাকা শ্রেয়_যা আমি মনে করি।
বর্ষা বলল, আপনার ভাল লাগা আমার মোটেও ভাল লাগে নি।
অনি বলল, নাইবা লাগল_কিন্তু ওজনহারা মানুষকে কখনও আমি সুজন মনে করি না।
বর্ষা বলল, এ কথাটা ভাল লাগল।
দু-জন হাসির কল্লোলে ভেসে পাড়ি দিল যেন মহারত্নাকর। অতঃপর... ...রচিত হল বার হাজার প্রেমের আখ্যান।

বর্ষা মধ্যবিত্ত পরিবারের আদরের দুলালী। দুই ভাই_দুই বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠা। বাবা 'হরনাথ প্রসাদ' নিষ্ঠাবান একজন ব্যাংককর্মকর্তা_মা 'কাননবালা' প্রাইমারি স্কুলশিক্ষিকা। দিদির নাম 'তৃষা' পুরা নাম 'শ্রীমিতা প্রসাদ' বিয়ে হয়েছে এক বছর পূর্বে, এক বিত্তবান পরিবারে_থাকে স্বামীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায়। বড়দাদার নাম 'অতুলনাথ প্রসাদ' থাকে গ্লাফে_তেমন সুবিধা দেখা যাচ্ছে না, বোধহয় ফেরত আসবে। ছোটদাদার নাম 'প্রতুলনাথ প্রসাদ' বিএ পড়ছে, সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছে_থাকে ছাত্রাবাসে। সংসার একেবারে ঝঞ্ঝাটমুক্ত বলা যায়।
... ...তাদের প্রেম এতই ঘনীভূত হল যে, অচিরেই উভয়-পরিবারে এবং উভয়-পরিজনমহলে জানাজানি হতে কানাকানিতে অবতরণ করল। বর্ষাদের স্বজনরা ধিক্কারশব্দে_'হুঁ...একটা ম্লেচ্ছকে... ...!' কেউ বলছে_'জ্ঞাতিগোত্রে এতই কি অভাব হয়েছে যে, একজন বিজাতিকে... ...! ছি...লজ্জাহায়া সংসার থেকে উঠে গেল বুঝি!' ইত্যাদি। এদিকে অনির পরিবারবর্গে তেমন একটা হইহুল্লোর শুনা যাচ্ছে না; কারণ ওর পরিবারে আছেইবা কে_নানার বাড়ির দিক থেকে হাতেগুনা গুটিকয়েক আত্মীয়। তার পরেও দুয়েক কথা শুনতে হয় নি এমন কথা নয়। মা বলছে_'এমন বিধর্মী... ...আমাদের সমাজে মানায় না বাবা।' মামা-মামিরা বলছে, '... ...চৌদ্দ গোষ্ঠীর মান-ইজ্জত ডুবাবে আরকি; না হয় এমন কুলহারাকে নিয়ে কেউ ঘর পাততে চায়!' ইত্যাদি ইত্যাদি। বর্ষাকে গৃহবন্দি করে_বিদ্যালয়-যাতায়াত বন্ধ করা হল। অনির সঙ্গে সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হল। বর্ষা পাগলপ্রায় : অনিও তাই_
মাস দুয়েক ঘাতপ্রতিঘাতে অতিবাহিত হল। একদিন খবর এল, বর্ষাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে পিসির বাড়ি কলকাতায়! জানা গেল, যাত্রাকালে অন্তর্যামিনী ঘনিষ্ঠা বান্ধবী অর্শার হাতে রেখে গেল অনির জন্যে একখানা হস্তলিখন : অসামান্য একটা চিঠি :_
হাজার বছর পরে
হয়তো আবার দেখা পাবে আমার_
এ করুণার বাসভূমে হয়তো আর আসব না ফিরে।
এ বাংলার লোকালয় তখন হয়তো রবে না
রবে না হয়তো এ বঙ্গদেশের কোনও চিহ্নপ্রতীক
রবে না,
রবে না হয়তো জাতিভেদের কোনও ভেদাভেদ
রবে না রবে না হয়তো মানুষে মানুষে বিবেদ-বিদ্বেষ
রবে না মৃত্তিকায় কেউ_রবে না অট্টালিকার আত্মগরিমায়
ধনীগরিব_উঁচুনিচু_আর্য-অনার্য প্রভেদ ভুলে মনুষ্যজাতি হবে এক
তখন?
তখন হয়তো পৃথিবীর আরেক দেশে জন্ম হবে আমার_অন্যরূপে_
তুমি হবে আরেক_হয়তো রবে দূরে_কিবা_তবু হৃদয়ের কাছে
তোমার আঙিনার হলুদবনে গুলঞ্চলতার ফুলটিরে ভালবাসবে তুমি_
হয়তো সে আমি_অনুভবে সকল অনুভূতি করবে কি বন্ধু স্মরণ!
তখন?
খুঁজে দেখো, ঐ পথের ধারে কলমিডাটায় বসে আছে যে ফড়িং_
তোমার বাড়ির উঠানে_শজনেগাছে বসে আছে যে হলুদ পাখিটি
কিবা বসে আছে পেয়ারাডালে_বারবার উঁকি দিচ্ছে ওই ঘুলঘুলিতে।
অথবা তোমার চলার পথে_দ্রোণ হয়ে জড়িয়ে আছি পায়ে
টের পাবে না বন্ধু!
যে ভালবাসার সমাধি হয়ে চলে যাচ্ছি গহিনারণ্যে
জেনে রেখো মিত্র, সেখানে আমার কবর_
এই যে এ বিদায়ের পল_এই যে অপূর্ণ প্রণয়বিকল
যদি কখনও পূর্ণ হয়_তবে হোক ওই ধরাধামে
চিরানন্দভবে_
এ জগজ্জড়তার ছত্রছায়ায় চাই না একবিন্দু ঠাঁই
চাই না নির্দয়ের কাছে করুণার কড়িমাত্র পাথেয়
চাই না বিরূপ এ চরাচরে মানবরূপে জন্ম নিই আবার
ধর্মান্ধতার যাঁতাকলে বলির মৃগ হতে চাই না_
বন্ধু!
আমায় যদি মনে পড়ে_তবে দেখো, ওই নক্ষত্রের ধারে
খদ্যোতাভায় জ্বলছে মিটিমিটি_দলেদলে করছে নর্তন
হয়তো সেখানে আমি একজন_আলোর মশাল জ্বেলে
প্রিয়তমের প্রতীক্ষায় বসে আছি আহ্লাদে শুধু আহ্লাদের ঘরে
মনে রেখো,
সেদিন ফুটবে না আর কোনও বেদনার নীলকমল
আসবে না আর কোনও বিদায়ব্যথার করুণমুহূর্ত
যেতে হবে না দূরে_অনেক দূরে_প্রিয়জন ছাড়ি
এবার চলে যাই_যেতে বাধ্য_আমি নিরুপায় আশ্রয়হীন
বন্ধু, বিদায়_
অপরাধিনী আমি নই_তবে ভাবো যদি অপরাধী
মানি বিধিলিখন_ধন্য তবে ধিক্কারের বাণী যদি পাই
আবার জন্ম যদি সত্য হয়_চাইব না এ হিংস্র জীবন
পুনর্জন্মে যদি আসি মাছরাঙা হয়ে ওই নদীটির কিনারে
ধন্য সেই জনম।
__
...পড়তে পড়তে অনির অশ্রুতে সিক্ত হল পত্রপর্ণ_ভাঁজ করে রেখে দেয় পকেটে। বারবার পড়ে আর অক্ষিতে ঠেকায়_তারপর চিরদিনের জন্য বন্দি করে হৃদয়কুটিরে।
বার বছর কেটে গেল_এক বিন্দু সুখ ফিরে এল না! ইতোমধ্যে_অনেক আগে মা মরে গেল। আরেকদিন আদরের বোনটিরে বেঁধে দিল চিরবন্ধনের ডোরে। অতঃপর বড়ই একা_ছন্নছাড়া জীবন_একেবারে নিঃস্ব হয়ে বের হয় ভবঘুরে। আজ এখানে : কাল ওখানে_দেশ হতে দেশান্তরে। কোথায় যাত্রাসমাপ্তি_শেষ ঠিকানা কোথায় কে জানে। এ-ই দীর্ঘ দাড়িগোঁফ_লম্বা চুলে ধরেছে পাক। মলিন বস্ত্র পরনে চলছে_চলছে_চলছে_সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এক আশ্রমের দ্বারে এসে শেষ আশ্রয়! এক শ চার ডিগ্রি জ্বরের তাপমাত্রায় স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না আর। কাশিতে জর্জরিত বক্ষ। অাঁখিদ্বয়ে বয়ে যাচ্ছে শত বেদনার ক্রন্দনাশ্রু। একটি রমণী এসে মাথা তুলে নিল কোলে। অশ্রুপূর্ণ চোখে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। রমণীর অাঁচলে মুছে দিচ্ছে চক্ষুদ্বয়। হঠাৎ বৃষ্টি এসে ধুয়ে দিল উভয়কে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরল বুকে! আজ চবি্বশ বছর পর... ...যেন স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করছে বর্ষা... ...বিশ্বাস কি করে হয়... ...একি! চৌতুর্দিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখে_না না, সব দিকে ঠিক আছে প্রকৃতি! তা হলে? ... ...হাজার প্রশ্ন মনে! কান্নার জলে ভেসে যাচ্ছে দু-জনের নয়ন। অনি কাশতে কাশতে ক্ষীণকণ্ঠে জিজ্ঞেস করে : বর্ষা, তুমি এখানে! কিভাবে?
বর্ষা চুম্বনের পর চুম্বন দিয়ে বলল, সেই অনেক কথা_আমাকে জোর করে বিয়ে দিতে চেয়েছিল তারা।
অনি বলল, তা হলে?
বর্ষা কান্নাজড়িতকণ্ঠে বলল, রাতের অাঁধারে পালিয়ে এসে এ আশ্রমের কর্ত্রীর নিকট আশ্রয় নিই। বড়ই মহতী ছিলেন এ বৃদ্ধা কর্ত্রী। আমাকে সন্তানাধিক ভালবাসতেন। অতঃপর আমার হাতে আখড়ার ভার সোপর্দ করে আরেকদিন চলে গেল বিধির আমন্ত্রণে। বর্ণনাশেষে যখন বলতে লাগল_'চল মঠে যাই।' দেখা গেল, ততক্ষণে অনির চোখে ঘুম এসে গেছে। আহা! এ তো কোনও সাধারণ ঘুম নয়_একেবারে চিরনিদ্রা! বর্ষা একবিন্দু চোখের জল বিসর্জন দিতে হল না আর_একটুপর টলে পড়ে বর্ষার নিথর দেহ অনির বুকের উপর। স্তব্ধ হয়ে যায় পৃথিবীর নাড়ির বন্ধন! থেমে গেছে সব কোলাহল! মিটে গেছে অপূর্ণ প্রেমের ক্ষুধিত যন্ত্রণা। ... ...আখড়ার লোকজন এসে... ...অতঃপর... ...অনির লাশের উপর তাণ্ডব : অপরিচিত জন_হিন্দু না মুসলিম_বৌদ্ধ না খ্রিস্টান... ...অবশেষে... ...

স্বরচিত চাঁদ : রাত্রিদৃশ্যের আন্তর অনুশীলন 

।। প্রণব আচার্য্য
বাংলা কবিতার বয়স কত? হাজার না শত; কাদামাটির এ বাংলায় কার হাতে প্রথম রচিত হয়েছিল কবিতা, কার বুকে ধ্বনিত হয়ছিল প্রথম পদ্য- এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা নেই; কৌতুহলী মন জানতে চায়। জীবনানন্দকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ক্লিন্টন বি সিলি বলেছিলেন বাংলাদেশের আবহাওয়া নাকি কবিতার জন্য খুব উপযোগী। এটা যদি সত্য হয়, তবে বিপদ। প্রকৃতি ও আবহাওয়ার দয়ায় কবিতা বড় জোর আবেগের উপাখ্যান হতে পারে। বুদ্ধি ও চিন্তার উৎকর্ষ থাকবে না।
 
ধর্মীয় আখ্যান নিয়ে কবিতা লিখেও মধুসুদন প্রথম কবি যিনি ধর্মবিমুখ। কবিতাই যার ধর্ম ছিল। বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনিই প্রথম উদহারণ যিনি কবিতা লিখেছেন নিছক আবেগ দিয়ে নয়, সহজাত মেধার সাথে যুক্ত করেছিলেন অধ্যাবসায় ও বৌদ্ধিক চর্চা। ফল সরূপ বাংলা কবিতা মুক্ত হলো পয়ার-ত্রিপদির দীর্ঘ আলিঙ্গন থেকে।তারপর আজ অবধি নানা বিচিত্র পথে এগিয়েছে বাংলা কবিতা। সেই পথের বহু যাত্রী ও ছদ্মযাত্রীর ভীড়ে হারিয়ে গেছে কবিতা। মানে এদেশের আবহাওয়াজনিত কবি ও চিন্তোৎকর্ষ কবি মিলে তৈরি করেছে এক অদ্ভুতুড়ে বাংলা কবিতার ইতিহাস। তাই পাঠককে খুঁজে নিতে হয়, খুদ থেকে বেছে নিতে হয় চালকে।ঠিক এরকম একটি ভাবনা মনে রেখে পড়ছিলাম একটি কবিতার বই। যে বইয়ের প্রথম কবিতার প্রথম পঙ্‌ক্তিটি এরকম- একটি লাল মাছির গান শুনে জেগে উঠে দেখি/ আমার সামনে তুমি (লাল মাছি)। বোঝা গেলো কবি ঘুমিয়েছিলেন (অথবা মগ্ন ছিলেন), জেগে উঠলেন গান শুনে; কার গান? –একটি লাল মাছির। খাটকা লাগে। লাল মাছি কেন? মাছির রঙ বলা যেতে পারে কিছুটা সবুজ, অথবা নীল। অবশ্য আরেকটি কবিতায় (মেঘের জানালা) কবি জানাচ্ছেন এই লাল মাছিরা নাকি তর্ক প্রিয়। যারা আত্মমগ্ন থাকতে পছন্দ করে। তর্কপ্রিয় লাল মাছি গান গায়; সেই গানের আওয়াজে কবির নিদ্রাভঙ্গ হয়, জেগে ওঠেন। এ জেগে ওঠা বিস্ময়ের, জানতে পারি কবি নিজে কোনদিন রাত্রির গানে সুর সাধেননি; যদিও তিনি বাউল ছিলেন, তবে স্বভাব বাউলদের মতো ঘরছাড়া পরিব্রাজক নন। অর্থাৎ কবি অন্তর্জগতে চর্চা করে চলেছিলেন সাধনমগ্নতা। যে মগ্নতায় ছেদ পড়ে লাল মাছিদের গানে এবং এখান থেকেই শুরু হয়ে যায় এই কাব্যগ্রন্থের।

 

গ্রন্থটির নাম স্বরচিত চাঁদ। কবি মোহাম্মদ নূরুল হক। এ গ্রন্থের কবিতাগুলো মুলত অক্ষরবৃত্ত প্রধান। অন্যান্য ছন্দের নমুনাও আছে। পুরো গ্রন্থে কবি ছন্দশুদ্ধ থাকতে চেয়েছেন। ছন্দের বিশুদ্ধতায় উন্মোচন করেছেন রাত্রিময় প্রকৃতির আর্দ্রপাঠ। যে রাত্রি পৃথিবীর বলে মনে হয়, আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায় বাংলার। তবে প্রকৃতির পুরোটাই ঈশ্বর সৃষ্ট নয়, কবি নিজেও সেখানে নিজস্ব রঙ দেন, নিজের মত করে তৈরী করে দৃশ্য- যেখানে লালমাছি গান গায়, সন্ধ্যাস্নানে ভেজে ঈশ্বরীর মন; যেখানে সন্ধ্যার বাতাসে প্রথিত থাকে শিশুঘুম, কল্লোলিত হয় নদীর তৃষ্ণা।

এ গ্রন্থের ঋতু শ্রাবণ। সময় রাত্রিকাল; আর দৃশ্য প্রকৃতিলব্ধ, মাঝে মাঝে লোকগাঁথার। গ্রন্থজুড়ে কবি এঁকেছেন শ্রাবণের ধারা ও নদীর বেদনা। এঁকেছেন নিশুতি বাংলার বিজন বৈচিত্র। অবশ্য প্রায় সব বাংলা কবিতাই প্রকৃতিসম্ভুতা। এ গ্রন্থের কবিতাগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে প্রকৃতির এই কবিতা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে কবি নূরুল হক স্বাক্ষর রেখেছেন নিজের স্বতন্ত্র কবি প্রতিভার। কবিতা নির্মাণ-কলায় পূর্বজ ও সমকালিনদের থেকে নিজের ব্যবধান স্পষ্ট রাখেন।

কবিকে হতে হয় বিশুদ্ধ প্রেমিক। কে না জানে প্রেমিক হৃদয়ের অতুল সংবেদন। গ্রন্থের প্রথম দিকেই তাই পেয়ে যাই প্রেমিক উচ্চারণ, যা আকাঙ্খা ও দ্বিধায় ভরপুর। সূর্যাস্তের আগে নির্বাচিত গ্রীবার আঁধারে/ চল আজ পাঠ করি নির্জন পাথর (শ্রাবণমেঘ)। এ উচ্চারণের পরপরই পাই একটি ব্যথিত প্রশ্ন- বৃষ্টি তুমি অশ্রু কার? এই ব্যথিত প্রশ্নের পর কবি জেগে ওঠেন তার বিশুদ্ধ সত্ত্বায়, চুড়ান্ত প্রশ্ন রাখেন- একরত্তি দেহে কেন তৃষ্ণা জাগে শ্রাবণ মেঘের? বোঝা যায়, কবি প্রেমে আক্রান্ত, তবে তৃষ্ণা চরিতার্থ করার বদলে কৌতুহলী হয়ে ওঠেন- যা কামুক ও প্রেমিকের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়; উজ্জ্বল করে কবিচৈতণ্য।

আরেকটি কবিতায় তিনি ব্যক্ত করেন লুণ্ঠিত হবার বাসনা। সন্ধ্যাগ্রস্থ হাঙরের গালে চুমো খেতে খেতে ভাবি-/ একটি নির্মম রাত যদি আসে! (লাল ডাকাত অথবা মেঘের গল্প)। কবির ভাবনা থেকে আমারও ভাবনা তৈরী হয়। যদি আসে! আবার রাতমুগ্ধ কবি বলেন, অনেক জেগেছি রাত/…/ এবার শ্রাবণ এলে চোখজোড়া দিঘি পেতে চাই (শনিবার)। তবে কি কবি কিছুটা ক্লান্ত, আকাঙ্খা করছেন শ্রবাণের? তৃষ্ণা সমগ্র নামের একটি কবিতায় পাই, তবে জ্বলে ওঠো অন্ধকারে বাঘিনীর চোখের সমান/ কালোরাত্রি গলে যায় জলের সম্পাতে/ তৃষ্ণার গহনে। এবার অনেকটাই বুঝতে পারি রাত জাগার ক্লান্তি নয় কবি তৃষ্ণার্ত। তার দৃষ্টি জুড়ে চাতকজিজ্ঞাসা, সেই তৃষ্ণা কবিকে আরো দৃশ্যশিকারী করে তোলে; তিনি দেখেন, মাইল-মাইল স্বপ্নমেঘ উড়ন্ত পারদ (তৃষ্ণা সমগ্র)। এভাবে দৃশ্য ও স্বপ্নের মেঘে ভাসতে থাকেন তিনি, বাউল-বেদনা নিয়ে পাঠ করেন রাত্রির শ্রাবণ। গ্লাসভর্তি সন্ধ্যা নাচে, অন্ধরাত, নির্ঘুম রাতের গান, মেঘের জানালা, বৃষ্টির ছবি, সন্ধ্যার আগে প্রভৃতি কবিতায় কবি রাত্রিকে মূর্ত করেছেন প্রেমে। সেই প্রেমও নানা মাত্রায় উদ্ভাসিত হয় অক্ষরবৃত্তের দ্যোতনায়।

কবির রাত্রিও স্বতন্ত্র। চিরাচরিত কালো নয়, এ গ্রন্থের রাত্রি কিম্বা আঁধারে কালো নয় প্রকট হয়ে ওঠে লাল রঙ। অবশ্য সন্ধ্যা কখনো কখনো নীল হয়ে ওঠে; শব্দপ্রকৌশলে কখনো সন্ধ্যা কখনো ডাকাত কখনো বা নদী রঙের স্পর্শে বাঙ্‌ময়। সেরকম রঙজারিত কিছু পঙ্‌ক্তি পাঠ করা যাক-

আমি সেই নীলসন্ধ্যা আর রাতগন্ধা তারাগুলো
আমার বুকের বাম পকেটে রাখিনি বলে বৃষ্টি
এসে আমাকে ভিজিয়ে দিল লাল ডাকাতের মতো
(লাল ডাকাত অথবা মেঘের গল্প)।

আমাদের ঘুম গেছে স্বেচ্ছা নির্বাসনে। রাতগুলো
হলুদ নদীর স্রোত অথবা শ্মশান
তবে কি কার বিস্ময়ের নাম লাল সন্ধ্যা?
(আমাদের ঘুম)

আমার হলুদ ঘুমে কারা আজ নাচো স্বপ্নবান?
(গ্লাসভর্তি সন্ধ্যা নাচে)

বিনম্র সূর্যের পিঠে গলে পড়ে কামুক রোদ্দুর
চিন্তার লাল অরণ্যে দিক্‌ভ্রান্ত রাত
(অন্ধরাত)

আমার কেবল এই রাত্রিজোড়া লাল অন্ধকার!
(মেঘের জানালা)

রাত্রি, সন্ধ্যা, নদী, মৃত্যু, ঘুম, সূর্য, শ্রাবণ আর অতি অবশ্যই চাঁদ এইসব চাবি শব্দে পুরো গ্রন্থটি ঋদ্ধ। কিন্তু শব্দ এখানে শুধুমাত্র আর শব্দ থাকে না, শব্দগুলো নিজস্ব অর্থ অতিক্রম করে সৃষ্টি করে ভিন্ন উপনিবেশ। তাই ‘লাল মাছিদের মিছিলের’ এই দৃশ্যকল্পটি হাজির করে বহুবিধ অর্থের সম্ভাবনা। কবি প্রায় প্রতিটি অনুষঙ্গকেই নিজে পুননির্মাণ করেন। তবে এই নির্মাণ শুধু মাত্র কল্পণাপ্রসুত নয়। নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তিনি আত্মস্থ করেন প্রকৃতি ও নিজেকে। তারপর চিন্তা ও আবেগের সংরাগ রূপ দেন কবিতার নির্মেদ সজ্জায়। তিনি শুধু কবিতাই নির্মাণ করেন না, কবিতা নির্মাণের ছলে আসলে নিপুণ কারিগরের মতো নিজেকেই নির্মাণ করতে থাকেন। সে আত্মনির্মাণের ইতিহাসও রচিত হয় নিঃসঙ্গ উচ্চারণে- একটুকরো চান্দের লোভে পুড়ি একাকী পতঙ্গ/ এক টুকরো অঙ্গার (একাকী পতঙ্গ)।

পৃথিবীতে রাত্রি ছাড়া চাঁদ অস্তিত্বহীন প্রায়; পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা একটি উপগ্রহ মাত্র। কিন্তু রাত্রিকালে সেই চাঁদ হয়ে ওঠে স্বপ্ন, পৃথিবীর মায়াবী লাস্য। কবিও তাই রাতেই সচ্ছন্দ থাকেন, প্রতীক্ষা করেন লাল-নীল রাত্রির। তবে যেটা বলেছি কবির কবিতার অন্যান্য শব্দের মতো রাত্রিও এখানে প্রচলিত অর্থ বহন করে না। এ রাত্রি অর্থ কবির সৃষ্টি, এর অর্থ কবির সত্ত্বার পরিপুরক, আর আমার কাছে ‌অন্তহীন সৌন্দর্যের উৎস।

<a href="http://chandpurtimes.com">চাঁদপুর টাইমস দেখুন</a> 

এখন ঘুমাক রাত; আমি জেগে আছি। জেগে থাকি
অনন্ত রাতের শেষে। আবার কি নামবে না রাত?
(নির্ঘুম রাতের গান)

কাব্যগ্রন্থ: স্বরচিত চাঁদ
কবি: মোহাম্মদ নূরুল হক
প্রচ্ছদ: মোস্তাপিজ কারিগর
প্রকাশক: পাঠসূত্র

- See more at: http://chandpurtimes.com